Image description

সোহরাব হাসান

বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি ছিলেন মো. সাহাবুদ্দিন। তার পদত্যাগের পর থেকেই নতুন রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন এ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন শুরু হয়েছিল। বর্তমানে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

বিএনপিতে বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ ও অভিজ্ঞ নেতা আছেন, তাদের মধ্য থেকে একজনকে বেছে নেওয়া হবে, এটাই রাজনৈতিক পরিসরে আলোচনায় ছিল। দলের বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, বর্তমান মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী করার বিষয়ে বিএনপি নেতৃত্ব মোটামুটি স্থির করেছে। নাটকীয় কিছু না ঘটলে রাষ্ট্রপতি পদে তিনিই সরকারি দলের প্রার্থী হবেন। এর আগে বর্তমান ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজউদ্দিন আহমদের নামও শোনা গিয়েছিল।

 

নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী, ২০ আগস্ট বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি পদে ভোট গ্রহণ হবে। ১৩ আগস্ট সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত মনোনয়নপত্র দাখিল করা যাবে। এর আগে বিএনপিকে প্রার্থিতা ঠিক করতে হবে। অনেকে বলেছেন, বিএনপির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে ১২ আগস্ট।

বিএনপির সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বিলম্বের কারণ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী করা হলে দলে তার উত্তরসূরি কে হবেন, সেই প্রশ্নের মীমাংসা হয়নি। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করায় তৃণমূল পর্যন্ত তার যে নিবিড় যোগাযোগ ছিল নতুন কাউকে সেটি করতে হলে বেগ পেতে হবে।

পরবর্তী মহাসচিব পদে দুটি নাম শোনা যাচ্ছে। স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ ও জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী। সালাহউদ্দিন আহমদ হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পদে নতুন কাউকে খুঁজতে হবে। কেননা একসঙ্গে দলের মহাসচিব ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করার রেওয়াজ নেই। এতে রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক বাড়বে। ধারণা করা হয়েছিল, এবারে রাষ্ট্রপতি পদে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে না। সরকারি দল যাকে মনোনয়ন দেবে, তিনি বিনা প্রতিন্দ্বিতায় নির্বাচিত হবেন।

বিএনপির সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বিলম্বের কারণ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী করা হলে দলে তার উত্তরসূরি কে হবেন, সেই প্রশ্নের মীমাংসা হয়নি। ছবি: চরচা
বিএনপির সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বিলম্বের কারণ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী করা হলে দলে তার উত্তরসূরি কে হবেন, সেই প্রশ্নের মীমাংসা হয়নি। ছবি: চরচা
 

১৯৯১ সালের পর রাষ্ট্রপতি পদে আর নির্বাচন হয়নি। ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীকেই সবাই মেনে নিয়েছেন। ৮ আগস্ট রাতে অনেকটা আকস্মিকভাবেই জামায়াতে ইসলামীর মজলিসে সুরা সিদ্ধান্ত নেয় যে তারা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। পরদিন ১১ দলীয় জোটের বৈঠকেও সেটি অনুমোদন পায় এবং এলডিপি নেতা অলি আহমদ বীর বিক্রমকে প্রার্থী করার ঘোষণা আসে।

জাতীয় সংসদে বর্তমানে সরকারি দলের দুই তৃতীয়াংশেরও বেশি সদস্য আছেন। ৩৪৯টি আসনের মধ্য বিরোধী দলের আসন সংখ্যা ৯০। আর সরকারি দলের ২৫৯টি। সেক্ষেত্রে বিরোধী দলের প্রার্থী জয়ী হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ সদস্যরা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিতে পারেন না। সেক্ষেত্রে বিরোধী দল আশা করতে পারে না যে তাদের প্রার্থী জয়ী হবে। অর্থাৎ পরাজয় নিশ্চিত জেনেও কেন জামায়াতে ইসলামী তথ্য ১১ দলীয় জোট কেন প্রার্থী দিল? জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির নেতারা প্রাকাশ্যে এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন। প্রথম অভিযোগ হলো, বিএনপি গণভোট অনুযায়ী বিএনপি জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করেনি। এর প্রতিবাদ হিসেবেই তারা রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী দিয়েছেন।

 

 

দ্বিতীয়ত, বিরোধী দল সংসদে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করতে চায়। সদস্য সংখ্যা যতই হোক তারা যে ঐক্যবদ্ধ আছে নির্বাচনের মাধ্যমে সেটা প্রমাণ করা।

তৃতীয়ত, বিএনপি সরকারের কার্যক্রম যে বিরোধী দল পছন্দ করছে, সেটাও জানিয়ে দিতে চায়। তৃতীয়ত স্থানীয় সরকার সংস্থার নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকার সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানে যে সরকার দলীয় লোক বসিয়েছে, এ নির্বাচনের মাধ্যমে তারও প্রতিবাদ করা।

 

৮ আগস্ট রাতে অনেকটা আকস্মিকভাবেই জামায়াতে ইসলামীর মজলিসে সুরা সিদ্ধান্ত নেয় যে তারা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। পরদিন ১১ দলীয় জোটের বৈঠকেও সেটি অনুমোদন পায় এবং এলডিপি নেতা অলি আহমদ বীর বিক্রমকে প্রার্থী করার ঘোষণা আসে।
৮ আগস্ট রাতে অনেকটা আকস্মিকভাবেই জামায়াতে ইসলামীর মজলিসে সুরা সিদ্ধান্ত নেয় যে তারা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। পরদিন ১১ দলীয় জোটের বৈঠকেও সেটি অনুমোদন পায় এবং এলডিপি নেতা অলি আহমদ বীর বিক্রমকে প্রার্থী করার ঘোষণা আসে।

 

চতুর্থত, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী দল হিসেবে জামায়াতের ওপর বিএনপির নেতারা যেই ছাপ দিয়ে রেখেছে, একজন খেতাপপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী করে সেটাও মুছে ফেলা। প্রার্থী হেরে গেলেও তারা বলতে পারবেন, রাষ্ট্রপতি পদে একজন নামকরা মুক্তিযোদ্ধাকেই তারা বেছে নিয়েছিলেন।

 

১৯৯১ সালে পঞ্চম সংসদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন যথাক্রমে আবদুর রহমান বিশ্বাস ও বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী। সেই সংসদে বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় জামায়াতের সমর্থন নিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করে। বিনিময়ে তারা জামায়াতকে সংরক্ষিত নারী আসনের দুটি ছেড়ে দেয়। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রাক্কালে বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী জামায়াতের তৎকালীন আমির গোলাম আজমের সঙ্গে দেখা করে তাদের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তাদের সমর্থন তিনি পাননি। এমনকি অন্যান্য বিরোধী দলের কিছু ভোট আবদুর রহমান বিশ্বাস পেয়েছিলেন।

 

ভোটের ফলাফল ছিল আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭০, বদরুল হায়দার চৌধুরী ৯২। ধারণা করা হয়, আওয়ামী লীগ যাদের ওপর ভরসা করে আলাদা প্রার্থী দিয়েছিল, তারাও বিরোধী দলের প্রার্থীকে ভোট দেননি। জাতীয় পার্টিসহ বেশ কিছু সদস্য ভোটদানে বিরত থেকেছিলেন।

এ ছাড়া চলমান রাজনীতির হিসেব নিকেশও আছে। ১১ দলীয় জোট যেদিন রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থিতা ঘোষণা করেছে, সেদিন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান হাটহাজারীতে হেফাজতে ইসলামের আমিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন এবং তাদের সমর্থন চেয়েছেন। জবাবে আমির ৭ দফা দাবি পেশ করেছেন, যার একটি হলো ইসলামবিরোধী কোনো আইন না করা। এর আগে হেফাজতের অনুসারী কয়েকটি দল আলাদা জোট গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। নির্বাচনের আগে জামায়াত যে ‘সব ইসলামী ভোট এক বাক্সে’ নিয়ে আসার ঘোষণা দিয়েছিল, ইসলামী আন্দোলন বেরিয়ে যাওয়ায় তাতে হোঁচট খেল। এখান হেফাজতের সমর্থকেরা আলাদা জোট করলে কিংবা জামায়াত থেকে দূরত্ব বজায় রাখলে এর রাজনৈতিক সুবিধা সরকারের পক্ষেই যাবে।

এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী দিয়ে জামায়াত নেতৃত্বধীন জোট নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের পাশপাশি সরকারকে এই বার্তাই দিতে চায় যে সংসদের ভেতরে ও বাইরে যে কোনো চ্যালেঞ্জ নিতে তারা প্রস্তুত আছেন।

সোহরাব হাসান: সম্পাদক, চরচা