Image description

এম শামসুল আলম

জ্বালানি তেল কোনো সাধারণ বাজারপণ্য নয়। এটি এমন একটি কৌশলগত পণ্য, যার সরবরাহ, মূল্য ও প্রাপ্যতার সঙ্গে একটি দেশের খাদ্য উৎপাদন, পরিবহন, কৃষি, শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা সরাসরি সম্পর্কিত। ফলে জ্বালানি তেলের আমদানি, মজুত, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণন ব্যবস্থার প্রশ্নকে কেবল ব্যবসার স্বাধীনতা, বাজারে প্রতিযোগিতা কিংবা সরকারি প্রতিষ্ঠানের দক্ষতার আলোকে বিচার করলে চলবে না। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব, জনগণের জ্বালানি অধিকার এবং সর্বোপরি জ্বালানি সুবিচার।

সম্প্রতি পরিশোধিত জ্বালানি তেলের আমদানি ও বিপণনে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানোর লক্ষ্যে একটি নীতিকাঠামো তৈরির উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রকাশিত তথ্যে দেখা যাচ্ছে, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণনের একটি খসড়া নীতিমালা তৈরির নির্দেশ দিয়েছে।

আমার বিবেচনায়, এ ধরনের একটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রথমেই একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে—রাষ্ট্র কি জ্বালানি খাতের সমস্যা সমাধান করতে চাইছে, নাকি রাষ্ট্রের নিজের ব্যর্থতার দায় থেকে সরে দাঁড়াতে চাইছে? কারণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি আছে, অদক্ষতা আছে, অপচয় আছে কিংবা সুশাসনের ঘাটতি আছে; এটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিলুপ্ত বা দুর্বল করার যুক্তি হতে পারে না। বরং এগুলো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কার, স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার যুক্তি। রোগীর চিকিৎসা না করে রোগীকে সরিয়ে দেওয়াকে যেমন চিকিৎসা বলা যায় না, তেমনি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা দূর না করে তার দায়িত্ব বেসরকারি ব্যবসায়ীর হাতে তুলে দেওয়াকেও সংস্কার বলা যায় না।

সংস্কার আর বেসরকারিকরণ এক বিষয় নয়

বাংলাদেশে বহুদিন ধরে একটি বিপজ্জনক প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তাহলো ‘সংস্কার’ শব্দটিকে প্রায়ই ‘বেসরকারিকরণ’-এর সমার্থক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। যেন রাষ্ট্র কোনো খাত দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করতে না পারলে তার একমাত্র সমাধান সেটি ব্যক্তিখাতের হাতে ছেড়ে দেওয়া। অথচ অর্থনীতির তত্ত্ব কিংবা আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কোনোটিই বলে না যে বেসরকারিকরণ নিজে থেকেই দক্ষতা, সুশাসন বা কম মূল্য নিশ্চিত করে। একটি বাজারে সত্যিকারের প্রতিযোগিতা থাকলে, প্রবেশের বাধা কম হলে, তথ্যের অসমতা না থাকলে, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান থাকলে এবং কোনো একটি বা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বাজার দখল করতে না পারলে বেসরকারি খাতে প্রতিযোগিতা দক্ষতা বাড়ে। কিন্তু জ্বালানি তেলের বাজার তার প্রকৃতিগত কারণেই সাধারণ ভোগ্যপণ্যের বাজারের মতো নয়।

তেল আমদানির জন্য বিশাল আর্থিক সক্ষমতা প্রয়োজন। প্রয়োজন বৈদেশিক মুদ্রা, আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী নেটওয়ার্ক, বন্দর অবকাঠামো, বড় আকারের স্টোরেজ, ডিপো, পরিবহন ব্যবস্থা, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং দেশব্যাপী বিপণন নেটওয়ার্ক। অর্থাৎ এই বাজারে প্রবেশের বাধা অত্যন্ত উঁচু। ফলে তাত্ত্বিকভাবে শত শত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রতিযোগিতার কথা বলা হলেও বাস্তবে কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর মধ্যেই বাজার কেন্দ্রীভূত হবে। তখন রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া ব্যবস্থাকে ভেঙে আমরা হয়তো একটি প্রতিযোগিতামূলক বাজার পাব না; বরং তৈরি হবে বেসরকারি অলিগোপলি বা গোষ্ঠীগত বাজার নিয়ন্ত্রণ। আর রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া ব্যবস্থার ওপর অন্তত সংসদ, সরকার, অডিট, আদালত, গণমাধ্যম এবং জনগণের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ জবাবদিহির সুযোগ থাকে। কিন্তু একই বাজার যদি কয়েকটি বৃহৎ বাণিজ্যিক গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তখন জনগণের সেই নিয়ন্ত্রণ আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।

জ্বালানি তেল পণ্য নয়, কৌশলগত অবকাঠামো

জ্বালানি তেলের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এর দাম শুধু তেলের ক্রেতাকেই প্রভাবিত করে না; পুরো অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে। ডিজেলের দাম বাড়লে কৃষকের সেচ ব্যয় বাড়ে। কৃষিপণ্যের পরিবহন ব্যয় বাড়ে। বাস-ট্রাকের ভাড়া বাড়ে। পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়ে। শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে তরল জ্বালানি ব্যবহৃত হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। শেষ পর্যন্ত এই বাড়তি খরচ খাদ্য থেকে শুরু করে প্রায় প্রতিটি পণ্য ও সেবার দামের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। অর্থনীতিতে একে ‘প্রাইস ট্রান্সমিশন ইফেক্ট’ হিসেবে দেখা হয়। অর্থাৎ জ্বালানি তেলের মূল্য এক টাকা বাড়া শুধু এক টাকা বাড়া নয়; এর বহুগুণ প্রতিক্রিয়া পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে। এ কারণেই জ্বালানি তেলের বাজারকে সাধারণ ভোগ্যপণ্যের বাজারের মতো ছেড়ে দেওয়া যায় না।

একটি রাষ্ট্রের জন্য জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ ঠিক যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যের সরবরাহ, পানি, প্রতিরক্ষা কিংবা জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা। যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, সমুদ্রপথে সংঘাত, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতার সময়ে একটি বেসরকারি কোম্পানির প্রথম দায়িত্ব তার ব্যবসা, বিনিয়োগ ও মুনাফা রক্ষা করা। রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব জনগণকে রক্ষা করা। এই দুটি উদ্দেশ্য কখনই এক নয়। এই মৌলিক পার্থক্যটি ভুলে গেলে জ্বালানি নীতি ভুল পথে যাবে।

সংবিধানের প্রশ্নটি কোথায়?

বাংলাদেশের সংবিধানের ১৩ অনুচ্ছেদ এখানে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সেখানে উৎপাদন ও বণ্টনের উপকরণের ওপর জনগণের মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণের নীতি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এবং রাষ্ট্রীয়, সমবায়ী ও ব্যক্তিগত, এই তিন ধরনের মালিকানাকেই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দটি হলো “কন্ট্রোল” বা নিয়ন্ত্রণ। তাই একটি দেশের কৌশলগত উৎপাদন ও বণ্টনব্যবস্থার ওপর জনগণের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ থাকবে কীভাবে—এটাই সাংবিধানিক রাজনৈতিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

যদি এমন একটি ব্যবস্থার সৃষ্টি হয় যেখানে জ্বালানির আমদানি, মজুত, পরিবহন ও বাজারের বড় অংশ কয়েকটি বেসরকারি গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়; রাষ্ট্র তাদের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে; জনগণ মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় কোনো ভূমিকা রাখতে না পারে; ব্যবসায়িক স্বার্থ জনস্বার্থের ওপর প্রাধান্য পায়; তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে, সেই ব্যবস্থা সংবিধানের জনমালিকানা ও জননিয়ন্ত্রণের মৌলিক চেতনার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ। আসলেই প্রকৃত বিতর্ক হলো: জ্বালানির ওপর শেষ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ থাকবে জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী রাষ্ট্রের হাতে, নাকি কয়েকটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের হাতে?

দুর্বল নিয়ন্ত্রক কাঠামোর মধ্যে বেসরকারিকরণ

বেসরকারিকরণের পক্ষে সাধারণত বলা হয় ব্যবসা করবে বেসরকারি খাত, আর সরকার নিয়ন্ত্রণ করবে। তত্ত্বের দিক থেকে কথাটি আকর্ষণীয়। কিন্তু তখন দ্বিতীয় প্রশ্ন আসে—কে নিয়ন্ত্রণ করবে নিয়ন্ত্রককে? যে রাষ্ট্র বাজারে মূল্য কারসাজি ঠেকাতে পারে না, যে প্রশাসন সিন্ডিকেট ভাঙতে ব্যর্থ হয়, যে নিয়ন্ত্রক সংস্থা তার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে পারে না, যে ব্যবস্থায় বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠী নীতিনির্ধারণকে প্রভাবিত করতে পারে—সেই ব্যবস্থায় সরকারি ব্যবসাকে বেসরকারি ব্যবসায় রূপান্তর করলেই জনস্বার্থ রক্ষা হবে, এমন নিশ্চয়তা কোথায়?

এখানেই আসে অর্থনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা: ‘রেগুলেটরি ক্যাপচার’। নিয়ন্ত্রক সংস্থা যাদের নিয়ন্ত্রণ করার কথা, ধীরে ধীরে তাদেরই অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বা তথ্যগত প্রভাবে চলে যায়, তখন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা কার্যত উল্টো দিকে কাজ করতে শুরু করে। জনস্বার্থের বদলে শিল্পগোষ্ঠীর স্বার্থ সুরক্ষা নীতিনির্ধারণে প্রাধান্য পায়। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই ঝুঁকিকে কোনোভাবেই ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিইআরসি, বিএসটিআই, প্রতিযোগিতা কমিশন ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানসমূহে ভূমিকা এখন দৃশ্যমান।

এলপিজি খাতের অভিজ্ঞতাও আমাদের সতর্ক করে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বর্তমানে মাসভিত্তিক এলপিজির মূল্য নির্ধারণ ও সমন্বয় করে। কিন্তু শুধু কাগজে মূল্য নির্ধারণ করলেই নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ হয় না। সেই মূল্য বাজারে কার্যকর হচ্ছে কি না, সরবরাহব্যবস্থা প্রতিযোগিতামূলক কি না, ডিলার ও পরিবেশক পর্যায়ে অতিরিক্ত মার্জিন নেওয়া হচ্ছে কি না, ভোক্তা প্রতিকার পাচ্ছে কি না—এসবই কার্যকর নিয়ন্ত্রণের অংশ। ফলে প্রথমেই প্রয়োজন শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান। তারপর বাজার সংস্কারের প্রশ্ন। দুর্বল নিয়ন্ত্রণ রেখে বাজার আরও জটিল করে দেওয়া সংস্কার নয়; সেটি ভবিষ্যৎ সংকটের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

জ্বালানি সুবিচারের তিনটি প্রশ্ন

আমি জ্বালানি খাতকে শুধু সরবরাহ ও মূল্যের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি না। এর সঙ্গে জ্বালানি সুবিচার বা এনার্জি জাস্টিস-এর প্রশ্ন সরাসরি জড়িত। জ্বালানি সুবিচারের অন্তত তিনটি মৌলিক মাত্রা রয়েছে: এক. বণ্টনগত ন্যায়বিচার, দুই. প্রক্রিয়াগত ন্যায়বিচার এবং তিন. স্বীকৃতিগত ন্যায়বিচার।

বণ্টনগত ন্যায়বিচার জানতে চায়: জ্বালানি ব্যবস্থার সুবিধা কে পাচ্ছে এবং ব্যয় কে বহন করছে? একটি ধনী পরিবারের কাছে ডিজেলের দাম পাঁচ টাকা বাড়া হয়তো খুব বড় বিষয় নয়। কিন্তু একজন ক্ষুদ্র কৃষকের সেচ ব্যয়, একজন ট্রাকচালকের পরিচালন ব্যয়, একজন নিম্নআয়ের মানুষের বাসভাড়া কিংবা বাজারে চাল-সবজির মূল্য: এসবের ওপর এর প্রভাব অনেক বড়। অর্থাৎ মূল্যবৃদ্ধির বোঝা সবার জন্য সমান নয়।

প্রক্রিয়াগত ন্যায়বিচার জানতে চায়: জ্বালানির মূল্য, নীতি ও বাজারব্যবস্থা নির্ধারণে জনগণের অংশগ্রহণ কতটা আছে? নীতিমালা যদি বন্ধ কক্ষে তৈরি হয়, জনগণের প্রতিনিধি, ভোক্তা সংগঠন, বিশেষজ্ঞ, শ্রমজীবী মানুষ, কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মতামত না নেওয়া হয়, তাহলে সেই সিদ্ধান্তকে শুধু অর্থনৈতিক দক্ষতার প্রশ্নে বিচার করা যাবে না।

আর স্বীকৃতিগত ন্যায়বিচার জানতে চায়: নীতিনির্ধারণের সময় দুর্বল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বাস্তবতা স্বীকার করা হচ্ছে কি না। জ্বালানি বাজারে রাষ্ট্রের ভূমিকা কমিয়ে দিলে এই তিন ধরনের সুবিচারই ঝুঁকিতে পড়ে। কারণ বাজার মানুষের প্রয়োজন দেখে না; বাজার দেখে ক্রয়ক্ষমতা। রাষ্ট্রের দায়িত্ব প্রয়োজন ও ক্রয়ক্ষমতার মধ্যকার এই ব্যবধান ভরাট করা।

বাজারের যুক্তি আর জনকল্যাণের যুক্তি এক নয়

একজন ব্যবসায়ীর কাছে তেলের অর্থ একটি পণ্য। নির্দিষ্ট দামে কিনবেন, তার সঙ্গে অর্থায়ন ব্যয়, পরিবহন, মজুত, পরিচালন ব্যয় এবং মুনাফা যোগ করে বিক্রি করবেন। এতে অন্যায় কিছু নেই। ব্যবসার স্বাভাবিক চরিত্রই এটি। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় যখন রাষ্ট্র একই জ্বালানিকে শুধু একটি ব্যবসায়িক পণ্য হিসেবে দেখতে শুরু করে। রাষ্ট্রকে কখনো কখনো এমন জায়গায়ও জ্বালানি সরবরাহ করতে হয় যেখানে তা বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক নয়। কখনো আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেও দরিদ্র ভোক্তাকে সুরক্ষা দিতে হয়। কখনো কৃষি উৎপাদন রক্ষায় ভর্তুকি দিতে হয়। কখনো দুর্যোগের সময় লোকসানে জ্বালানি সরবরাহ করতে হয়। কখনো কৌশলগত মজুত ধরে রাখতে হয়, যদিও সেই মজুত রাখা তাৎক্ষণিকভাবে লাভজনক নয়। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে এসব বাণিজ্যিক অদক্ষতা। রাষ্ট্রের কাছে এগুলো জনসেবামূলক বাধ্যবাধকতা। এই পার্থক্যটাই মৌলিক এবং জনস্বার্থের রক্ষাকবচ।

খাদ্যের নিরাপত্তা আর জ্বালানি নিরাপত্তা আলাদা নয়

খাদ্যে স্বনির্ভর হওয়ার সংগ্রামে বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় সহায়তা, কৃষি ভর্তুকি, সেচ, সার, বীজ, কৃষিঋণ এবং বাজার ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেখেছে। আমরা খাদ্যকে শুধু রাজস্ব সংগ্রহের উৎস হিসেবে দেখিনি। কারণ রাষ্ট্র বুঝেছে, খাদ্য নিরাপত্তা বাজারের ওপর পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া যায় না। ঠিক একইভাবে জ্বালানি নিরাপত্তাকেও শুধু ব্যবসার দৃষ্টিতে দেখা যায় না। বরং খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা পরস্পরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। ডিজেল ছাড়া কৃষির সেচ, ট্রাক্টর, পরিবহন ও কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণের বড় অংশ ব্যাহত হতে পারে। জ্বালানির সংকট খাদ্যের মূল্য বাড়ায়। খাদ্যের মূল্য বাড়লে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমে যায়। তারপর সামাজিক অস্থিরতা বাড়ে। অর্থাৎ জ্বালানি নিরাপত্তা আসলে খাদ্য নিরাপত্তারও পূর্বশর্ত।

স্বাধীনতা শুধু পতাকার নয়, জ্বালানিরও

একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অন্যতম আকাঙ্ক্ষা হওয়া উচিত কৌশলগত সক্ষমতা অর্জন করা। আমি একে বলব এনার্জি সভারেন্টি (জ্বালানি সার্বভৌমত্ব)। জ্বালানি সার্বভৌমত্বের অর্থ এই নয় যে দেশের প্রয়োজনীয় সব তেল দেশেই উৎপাদন করতে হবে। বাংলাদেশের মতো দেশে তা বাস্তবসম্মত নয়। এর অর্থ হলো—দেশ কোথা থেকে জ্বালানি কিনবে, কতটা মজুত রাখবে, কী মূল্যে জনগণকে দেবে, সংকটের সময় কাকে অগ্রাধিকার দেবে এবং কীভাবে সরবরাহব্যবস্থা পরিচালিত হবে—এসব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ওপর রাষ্ট্রের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে।

বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতাই দেখাচ্ছে, জ্বালানির সরবরাহ কত দ্রুত ভূরাজনৈতিক সংকটের অংশ হয়ে উঠতে পারে। ২০২৬ সালেও আন্তর্জাতিক সংঘাত ও সরবরাহঝুঁকির কারণে বাংলাদেশকে জ্বালানি মজুত ও সরবরাহ নিয়ে বাড়তি চাপ মোকাবিলা করতে হয়েছে। এমন এক বিশ্বে জনগণের জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থার ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ কি কমিয়ে দে’য়া যায়?

বেসরকারি প্রতিযোগিতা কি দাম কমাবে?

বেসরকারিকরণের পক্ষে সবচেয়ে আকর্ষণীয় যুক্তি হলো, প্রতিযোগিতা বাড়লে দাম কমবে। কিন্তু জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে বিষয়টি এত সরল নয়। দেশে জ্বালানি তেলের খুচরা মূল্য নির্ভর করে আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য, ডলারের বিনিময় হার, পরিবহন ব্যয়, বীমা, মজুত ব্যয়, শুল্ক-কর, পরিচালন ব্যয় এবং বিপণন মার্জিনের ওপর।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এ খাতে প্রবেশ করলে এই ব্যয়গুলোর অধিকাংশই থাকবে। বরং এর সঙ্গে যুক্ত হবে তাদের নিজস্ব অর্থায়ন ব্যয় এবং মুনাফার মার্জিন। তাই শুধু মালিকানা বদলালেই মূল্য কমবে, এমন কোনো অর্থনৈতিক সূত্র নেই। বরং যদি জ্বালানি তেলের বাজার কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, তাহলে প্রতিযোগিতা রহিত হবে। সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় একচেটিয়ার জায়গায় বেসরকারি অলিগোপলি তৈরি হবে। এবং বেসরকারি অলিগোপলি রাষ্ট্রীয় একচেটিয়ার চেয়েও জনগণের জন্য আরো অনেক বেশি বিপজ্জনক হবে। কারণ সেখানে মুনাফা ব্যক্তিগত, কিন্তু ঝুঁকি শেষ পর্যন্ত সামাজিক।

রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার পুরস্কার হিসেবে বেসরকারিকরণ: একটি বড় ভুল

আমাদের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সমস্যার বড় অংশের উৎস মালিকানার ধরন নয়; বরং সুশাসনের সংকট। অস্বচ্ছ ক্রয়, ভুল পরিকল্পনা, জবাবদিহির ঘাটতি, অযৌক্তিক ব্যয়, স্বার্থের সংঘাত, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার অভাব এবং নীতিনির্ধারণে জনগণের অংশগ্রহণের ঘাটতি—এসব সমস্যার সমাধান না করে শুধু মালিকানা পরিবর্তন করলে সমস্যার চরিত্র বদলাবে, সমস্যা দূর হবে না। সরকারি প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি যদি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরিত হয়, সেটাকে সংস্কার বলা যায় না। রাষ্ট্রীয় অদক্ষতাকে ব্যক্তিগত মুনাফায় রূপান্তর করাও সংস্কার নয়। আর জনগণের সম্পদ ও বাজারের নিয়ন্ত্রণ কয়েকটি ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত করাকে কোনোভাবেই মুক্তবাজার বলা যায় না।

কেমন সংস্কার প্রয়োজন?

জ্বালানি খাতে সংস্কার অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সেই সংস্কারের লক্ষ্য হওয়া উচিত রাষ্ট্রকে সরিয়ে দেওয়া নয়—রাষ্ট্রকে সক্ষম করা। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন এবং এর অধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমকে পূর্ণ স্বচ্ছতার আওতায় আনতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তেল কেনার প্রতিটি বড় চুক্তিতে প্রতিযোগিতামূলক ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে। ক্রয়মূল্য, পরিবহন ব্যয়, কর, ডিলার কমিশন, পরিচালন ব্যয় এবং অন্যান্য উপাদানের ভিত্তিতে জ্বালানির প্রকৃত মূল্য কাঠামো জনগণের কাছে প্রকাশ করতে হবে।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মদক্ষতা পরিমাপের জন্য নির্দিষ্ট সূচক থাকতে হবে। কত কম দামে তেল কেনা হলো, কত কম সিস্টেম লস হলো, কত দ্রুত সরবরাহ হলো, কত দিনের কৌশলগত রিজার্ভ রয়েছে, কতটা অপচয় কমেছে—এসব পরিমাপযোগ্য সূচক হতে হবে। স্বাধীন অডিট শক্তিশালী হতে হবে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন, কারিগরিভাবে সক্ষম এবং জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে। প্রয়োজনে বেসরকারি খাত পরিবহন, লজিস্টিকস, টার্মিনাল পরিচালনা, প্রযুক্তি, ডিজিটাল মনিটরিং কিংবা নির্দিষ্ট সেবায় প্রতিযোগিতামূলকভাবে অংশ নেবে। কিন্তু রাষ্ট্রের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ, মূল্যনীতি এবং সরবরাহ সুরক্ষা-এর দায়িত্ব কোনোভাবেই সরকার ত্যাগ করতে পারে না। এখানেই পার্টিসিপেশন এবং প্রাইভেটাইজেশন-এর মধ্যে পার্থক্য। বেসরকারি খাত রাষ্ট্রকে সেবা দিতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্র তার সার্বভৌম দায়িত্ব বেসরকারি খাতকে দিয়ে দিতে পারে না।

জ্বালানি খাতকে রাজস্ব আহরণের যন্ত্র হিসেবে দেখা নয়

বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থার আরেকটি মৌলিক সমস্যা হলো, রাষ্ট্র জ্বালানিকে জনসেবা হিসেবে না দেখে রাজস্ব আহরণের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করেছে। জ্বালানি খাতের উদ্দেশ্য সরকারি কোষাগারের জন্য সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন হওয়া উচিত নয়। এর উদ্দেশ্য হওয়া উচিত জাতীয় অর্থনীতিকে সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত ব্যয়ে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ করা। জ্বালানি সস্তা এবং নির্ভরযোগ্য হলে শিল্পের উৎপাদন ব্যয় কমবে, কৃষি লাভজনক হবে, পরিবহন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে থাকবে, মূল্যস্ফীতি কমবে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়বে। সেখানে রাষ্ট্রের প্রকৃত লাভ সরাসরি জ্বালানি বিক্রির মুনাফায় নয়, পুরো অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে। এই রাজনৈতিক অর্থনীতির দর্শনটি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা জরুরি।

জ্বালানি সুবিচার হারালে সবচেয়ে বড় মূল্য দেবে সাধারণ মানুষ

জ্বালানি খাতে ভুল নীতির মূল্য কোনো করপোরেট প্রতিষ্ঠান শেষ পর্যন্ত দেয় না। দেয় সাধারণ মানুষ। ডিজেলের দাম বাড়লে ভাড়া বাড়ে। ভাড়া বাড়লে খাদ্যের দাম বাড়ে। সেচের ব্যয় বাড়লে কৃষিপণ্যের দাম বাড়ে। শিল্পে জ্বালানি ব্যয় বাড়লে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। বিদ্যুৎ ব্যয় বাড়লে ছোট ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু একজন শ্রমজীবী মানুষের আয় একই হারে বাড়ে না। এ কারণেই জ্বালানি নীতি শুধু অর্থনীতির-এর বিষয় নয়; এটি সুবিচার-এরও বিষয়। রাষ্ট্র যদি এমন একটি বাজারব্যবস্থা তৈরি করে যেখানে সামর্থ্যবান মানুষের জ্বালানি প্রাপ্তি নিশ্চিত থাকে, কিন্তু দরিদ্র মানুষের জ্বালানি ব্যবহার ক্রমে সীমিত হয়ে যায়, তাহলে সেটি অর্থনৈতিকভাবে যতই দক্ষ বলে দাবি করা হোক না কেন, সামাজিকভাবে তা ন্যায়সংগত নয়।

আজকের সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে ফিরিয়ে নেওয়া কঠিন হবে

রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা একবার ধ্বংস হয়ে গেলে তা পুনর্গঠন করা অত্যন্ত কঠিন। রাষ্ট্র যদি ধীরে ধীরে নিজস্ব আমদানি সক্ষমতা, মজুতব্যবস্থা, সরবরাহ নেটওয়ার্ক, মানবসম্পদ ও বাজার নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা হারায়, তাহলে ভবিষ্যতে সংকটের সময় তাকে সেই একই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হবে। তখন দরকষাকষির ক্ষমতা থাকবে কার হাতে? রাষ্ট্রের, নাকি সরবরাহকারীর? এই প্রশ্নের উত্তর আজই দিতে হবে। নীতিনির্ধারণে সবচেয়ে বিপজ্জনক ভুল হলো এমন একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া, যার সুবিধা স্বল্পমেয়াদি কিন্তু ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদি এবং প্রায় অপরিবর্তনীয়। জ্বালানি তেলের পূর্ণাঙ্গ বেসরকারিকরণ তেমন একটি সিদ্ধান্ত হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত বর্তমানে গভীর কাঠামোগত সংকটের মধ্যে রয়েছে। এ সংকট থেকে উত্তরণের জন্য গভীর সংস্কার প্রয়োজন। কিন্তু সংস্কারের নামে রাষ্ট্রের দায়িত্ব ত্যাগ করলে চলবে না। দুর্নীতি থাকলে দুর্নীতি দূর করতে হবে। অদক্ষতা থাকলে দক্ষতা বাড়াতে হবে। অপচয় থাকলে অপচয় বন্ধ করতে হবে। অস্বচ্ছতা থাকলে হিসাব জনগণের সামনে খুলে দিতে হবে। নিয়ন্ত্রক দুর্বল হলে নিয়ন্ত্রককে শক্তিশালী করতে হবে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ব্যর্থ হলে সেই প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। কিন্তু রাষ্ট্রের ব্যর্থতার চিকিৎসা রাষ্ট্রকে সরিয়ে দেওয়া নয়।

বিশেষ করে জ্বালানি তেলের মতো কৌশলগত পণ্যের আমদানি, মজুত, পরিবহন ও বাজারের ওপর রাষ্ট্রের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ হারানো মানে শুধু একটি সরকারি ব্যবসা বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়া নয়; এর অর্থ জাতীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণবিন্দু ব্যক্তিগত মুনাফার কাছে সমর্পণ করা। আমি বেসরকারি উদ্যোগের বিরোধী নই। একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বেসরকারি বিনিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু কোন খাতে বাজারের ভূমিকা কতটুকু হবে এবং কোথায় রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য; সেই সীমারেখা নির্ধারণ করাই দায়িত্বশীল রাষ্ট্রনীতির কাজ। জ্বালানি সেই সীমারেখার ভেতরের একটি খাত।

অতএব জ্বালানি তেলের আমদানি ও বিপণন ব্যবস্থায় পরিবর্তনের আগে সরকারের উচিত একটি পূর্ণাঙ্গ পাবলিক-ইন্টারেস্ট অ্যাসেসমেন্টএনার্জি-সিকিউরিটি অ্যাসেসমেন্ট এবং এনার্জি-জাস্টিস অ্যাসেসমেন্ট করা। সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় ভোক্তা প্রতিনিধি, স্বাধীন বিশেষজ্ঞ, নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান, কৃষি ও পরিবহন খাত, শিল্প এবং নাগরিক সমাজকে যুক্ত করা প্রয়োজন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করতে হবে—এই সংস্কারে ব্যবসার সুযোগ বাড়বে কি না, সেটি নয়; জনগণের জ্বালানি অধিকার আরও সুরক্ষিত হবে কি না? কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মুনাফা বাড়বে কি না, সেটি নয়; দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়বে কি না? এবং সর্বশেষ রাষ্ট্রের বোঝা কমবে কি না, সেটি নয়; জনগণের বোঝা কমবে কি না?

এই তিন প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর ছাড়া জ্বালানি তেলের আমদানি ও বিপণন বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ায় কোনো সংস্কার হবে না। বরং তা হবে একটি কৌশলগত পশ্চাদপসরণ। দুর্বল নিয়ন্ত্রণ, প্রাতিষ্ঠানিক অক্ষমতা ও বাজারকেন্দ্রীকরণের বর্তমান বাস্তবতায় এমন সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশকে জ্বালানি নিরাপত্তা থেকে আরও দূরে সরিয়ে দিতে পারে এবং সাধারণ মানুষের বহুদিনের প্রত্যাশিত ‘জ্বালানি সুবিচার’কে আরও অনিশ্চিত করে তুলতে পারে। রাষ্ট্রের তাই এখন দায়িত্ব বেসরকারিকরণের মাধ্যমে দায়মুক্ত হওয়া নয়; বরং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা পুনর্গঠন, জনগণের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য ও ন্যায়সংগত জ্বালানি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

লেখক: জ্বালানি উপদেষ্টা, কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) ও ডিন, প্রকৌশল অনুষদ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি