Image description

মাহমুদুর রহমান

আজ ৫ আগস্ট, আমাদের মুক্তির দিন। যে হাজারো শিশু, বালক, কিশোর ও তরুণের জীবন ও রক্তের বিনিময়ে দেশীয় ফ্যাসিবাদ এবং বিদেশি আধিপত্যবাদের শৃঙ্খল থেকে বাংলাদেশ দুই বছর আগে মুক্তি পেয়েছিল, তাদের শ্রদ্ধাপূর্ণ সালাম ও স্নেহপূর্ণ ভালোবাসা জানাই। এই প্রজন্ম বিশ্বদরবারে বাংলাদেশকে গর্বিত, আলোকিত করেছে। আমাদের জুলাই বিপ্লব নিয়ে আলোচনা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আজও চলমান। এই যে পাশের দেশে জেন-জিদের তেলাপোকা আন্দোলন ক্ষমতাসীনদের আতঙ্কিত করে তুলেছে, সেখানেও বাংলাদেশের বর্ষাবিপ্লবের উদাহরণ টানা হচ্ছে। বাংলাদেশের নবীন, প্রকৃতপক্ষেই তোমরা আমাদের মতো বুড়ো ‘আধমরাদের ঘা মেরে’ বাঁচিয়েছো। এ দেশে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছো। বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশ হয়ে থেকো তোমরা অনন্তকাল। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তোমাদের গল্প শুনে অনুপ্রাণিত হোক। এবার শিরোনামের আলোচনায় ফিরি।

শেখ হাসিনার ফেরার গল্প শুরু হয়েছিল ১৯৮১ সালের ১৭ মে। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের প্রথম স্বৈরাচারী শাসক শেখ মুজিবুর রহমানের একদলীয় বাকশাল সরকারের পতনের পর শেখ হাসিনা তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর আশ্রয়ে গিয়ে উঠেছিলেন। দিল্লিতে ছয় বছর ভারতীয় ‘ডিপ স্টেটের’ তত্ত্বাবধানে থেকে তিনি বাংলাদেশকে ভারতীয় শৃঙ্খলে আবদ্ধ করার মিশন নিয়ে নিজ জন্মভূমিতে ফিরেছিলেন। তার ফেরার দুই সপ্তাহের মধ্যেই ৩০ মে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা এবং এ যাবৎকালের সর্বাধিক জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়া চট্টগ্রামে এক রহস্যজনক সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হয়েছিলেন। জেনারেল জিয়াকে হত্যার সঙ্গে শেখ হাসিনা এবং ভারতের সম্পর্ক আজ পর্যন্ত উদঘাটিত না হলেও এটা প্রমাণিত যে, সেনাবাহিনীর পলাতক হত্যাকারীরা ভারতেই আশ্রয় নিয়েছিলেন। এদের মধ্যে একজন, রক্ষীবাহিনীর মেজর মোজাফফর সম্প্রতি ঢাকায় গ্রেপ্তার হয়েছেন। প্রেসিডেন্ট জিয়াকে হত্যার পর সেও দীর্ঘদিন ভারতে ছিল। এটা বোধহয় কাকতালীয় নয় যে, ফ্যাসিবাদের পনেরো বছরের সহযোগী, গুম-খুন এবং গণহত্যায় অভিযুক্ত সব জেনারেল এখন ভারতেই পালিয়ে আছেন। বাংলাদেশের সব মীরজাফরের ঠিকানা শেষ পর্যন্ত অবধারিতভাবে সে দেশেই হয়। ইতিহাসের খাতিরে এ প্রসঙ্গে আরো একটা কথা বলে রাখা ভালো যে, জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের অভ্যুত্থানে কোনো সৈনিক জড়িত ছিলেন না। জেনারেল মঞ্জুরের নেতৃত্বে একদল ভারতপন্থি, মুক্তিযোদ্ধা অফিসার সেই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিলেন। 

হাসিনার দ্বিতীয় পলায়ন ২০০৭ সালে এক-এগারো সরকারের জামানায়।

মইন-মাসুদ-ফখরুদ্দীন ট্রয়কা তথাকথিত মাইনাস টু ফর্মুলা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করে ক্ষমতা দখল করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে লন্ডন থেকে ২০১৯ সালে প্রকাশিত আমার ইংরেজিতে লেখা The Political History of Muslim Bengal বইতে বিস্তারিত লিখেছি। বইটির পাণ্ডুলিপি জেলখানায় বসে সমাপ্ত করেছিলাম। যা-ই হোক, এক-এগারো সরকার খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনা, উভয় নেত্রীকে জেলজীবন অথবা দেশত্যাগের মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নিতে বললে শেখ হাসিনা পলায়নে সম্মত হন। তিনি শুধু পালিয়েই যাননি, পালানোর আগে এয়ারপোর্টে এক-এগারো সরকারের সব বেআইনি কর্মকাণ্ডের আগাম বৈধতা দিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে মইন-মাসুদ-ফখরুদ্দীনের যাবতীয় অপকর্মের বৈধতা দিয়ে তাদের সুরক্ষা দেওয়া হবে। শেখ হাসিনা তার কথা রেখেছিলেন। চুক্তি অনুযায়ী জেনারেল মইন শুধু তার সেনাপ্রধানের মেয়াদই পূর্ণ করেননি, বিডিআর ম্যাসাকার সম্পন্ন করে দেশকে নিরাপত্তাহীন করতেও সর্বতোভাবে শেখ হাসিনাকে সহায়তা করেছিলেন। অন্যদিকে জেনারেল মাসুদকে অস্ট্রেলিয়ায় হাইকমিশনার পদে বছরের পর বছর মেয়াদ বৃদ্ধি করে তারপর দেশে ফিরিয়ে এনে হাসিনা আরেক ভারতীয় দালাল এরশাদের দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও ফেনী থেকে ভুয়া পার্লামেন্টের এমপি বানিয়েছিলেন। হাসিনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুযোগ গ্রহণ করে জেনারেল মাসুদ মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর ব্যবসায় আওয়ামী লীগের আরো কয়েকজন প্রভাবশালী এমপি ও নেতার সঙ্গে মিলে সিন্ডিকেট বানিয়ে বাংলাদেশের দরিদ্র মানুষদের নিঃশেষ করে বিপুল অর্থের মালিক হয়েছেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আজ বাংলাদেশ সেনাবাহিনী যে ভাবমূর্তি সংকটে ভুগছে, তার সূত্রপাত হয়েছিল মইন-মাসুদের হাত ধরেই। 

যাহোক, ২০০৭ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর খাঁটি দেশপ্রেমিক, আপসহীন বেগম জিয়া সামরিক জান্তার হুমকি উপেক্ষা করে দেশেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। প্রসঙ্গক্রমে জানিয়ে রাখি, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও দেশে থাকার সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে গ্রেপ্তার হয়ে জেনারেল মাসুদের সহযোগীদের হাতে সেনা হেফাজতে নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। গ্রেপ্তারের কয়েক দিন আগে সেই দুঃসময়ে তার সঙ্গে আমার কী কথা হয়েছিল, সে সম্পর্কে মাত্র কিছুদিন আগেই লিখেছি বিধায় আজ আর পুনরাবৃত্তি করছি না। শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে লন্ডনে পালিয়ে গেলেও বেগম জিয়া দেশে থেকে দিল্লি সমর্থিত মইন-মাসুদদের বিরুদ্ধে তার প্রতিবাদ অব্যাহত রাখেন। এর ফলে জনগণের মধ্যে বেগম জিয়ার প্রতি সমর্থন আরো বৃদ্ধি পায়। জনমত দ্রুত আওয়ামী লীগের বিপক্ষে চলে গেলে সাংবাদিক এবিএম মূসার পরামর্শে শেখ হাসিনা দ্বিতীয়বারের মতো দেশে ফেরেন। তবে বাংলাদেশে ফিরতে তাকে তখন অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল। জেনারেল মইন প্রাথমিকভাবে তাকে ফিরতে দিচ্ছিলেন না কারণ তখনো মাইনাস টু বাস্তবায়ন করে প্রেসিডেন্ট বনে যাওয়ার পরিকল্পনা তার মাথায় ছিল। শেখ হাসিনা লন্ডন থেকে তার তৎকালীন অন্যতম ভারতীয় মুরব্বি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণব মুখার্জির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। শেষ পর্যন্ত দিল্লির হস্তক্ষেপে শেখ হাসিনা দেশে ফিরে এলে তাকে লোকদেখানো গ্রেপ্তার করা হয়।

লোকদেখানো এ কারণে বলছি যে, ২০০৭ এবং ২০০৮ সালের ঘটনাপ্রবাহ থেকে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি বিএনপিকে ধ্বংস করে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাসীন করার জন্যই এক-এগারো ঘটানো হয়েছিল। এই পুরো ঘটনায় দিল্লি সাফল্যের সঙ্গে ওয়াশিংটনকে ব্যবহার করেছিল। আজ যেমন করে ইসরাইল আমেরিকাকে ব্যবহার করছে। যায়যায়দিনের সম্পাদক শফিক রেহমান ২০১৬ সালে কাশিমপুর জেলে আমার পাশের সেলে বন্দি থাকা অবস্থায় আমাকে নিশ্চিত করেছিলেন যে, বিএনপিবিরোধী ষড়যন্ত্রের জাল বেগম জিয়ার চারদলীয় সরকারের সময়কালেই বোনা শুরু হয়ে গিয়েছিল। এ দেশের অত্যন্ত প্রভাবশালী সেক্যুলার সুশীল সমাজের একটি অংশ সেই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন। বাংলাদেশের অন্যতম বিখ্যাত দুই সম্পাদক সে সময় শফিক ভাইকে এই কাজে ভেড়াতে তার কাছে উপস্থিত হয়েছিলেন। বলাই বাহুল্য, শফিক ভাইয়ের কাছ থেকে তাদের বিফলমনোরথ হয়ে ফিরতে হয়েছিল। পাঠকদের হয়তো মনে থাকতে পারে যে, তাদের একজন এক-এগারো সরকারের তথ্যমন্ত্রী ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনকে প্রকাশ্যে ধমক দিয়ে বলেছিলেন, ‘ভুলে যাবেন না, এই সরকারকে আমরা এনেছি।’

বঙ্গবন্ধুর মেয়ে পালায় না, হাসিনা পালায় না, ইত্যাদি বলে দম্ভোক্তি করা শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৃতীয় বারের মতো পালিয়েছেন। লক্ষ করার মতো বিষয় হলো, প্রতিবার তার পলায়নের সঙ্গে দিল্লি সম্পৃক্ত থাকে। ১৯৭৫ সাল থেকে ১৯৮১ এবং ২০২৪ থেকে অদ্যাবধি তার আস্তানা দিল্লিতেই। ২০০৭ সালে তিনি লন্ডনে গিয়েছিলেন দিল্লির পরামর্শ নিয়ে এবং ফিরেছেন প্রণব মুখার্জির মাধ্যমে। প্রকৃতপক্ষে শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের ভারতের ‘ডিপ স্টেটের’ বাইরে কোনো আলাদা সত্তা নেই। সুতরাং, এবার দিল্লিতে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে তিনি মোদির আশ্রয়ে থেকে যা কিছু করেছেন এবং করছেন, তার সবই বাংলাদেশ নিয়ে ভারতীয় বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। আমার বিবেচনায় শেখ হাসিনার সব বক্তব্যকে ভারতের বক্তব্য হিসেবে ধরে নেওয়াই সংশ্লিষ্টদের জন্য বুদ্ধিমানের কাজ হবে। দিল্লি কিংবা অন্যত্র ভারত সরকারের নিয়ন্ত্রণে থেকে আওয়ামী লীগ অথবা অন্য কোনো দলের কোনো নেতার পক্ষেই স্বাধীনভাবে কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব বলে আমি মনে করি না। আপনি ভারতে অবস্থান করে তাদের গোয়েন্দা নজরদারি এড়িয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি করবেনÑএটা এক আকাশকুসুম কল্পনা অথবা নির্জলা মিথ্যাচার। আমি নিশ্চিত যে, শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগের অন্যান্য পলাতক নেতাকর্মীকে নিয়ে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনের বাগাড়ম্বর ‘র’-এর কারখানাতেই বিশেষ উদ্দেশ্যে সাজানো হয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন করছেন, আসলেই কি তিনি ফিরবেন? আমার ধারণায় শুধু তিন রকম পরিস্থিতিতে তিনি ফিরতে পারেন। 

১. ভারত এবং বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে যদি এ ধরনের চুক্তি হয় যে, শেখ হাসিনার ফাঁসি কার্যকর করার পরিবর্তে তাকে অনির্দিষ্টকাল জেলে বন্দি করে রাখা হবে এবং বিনিময়ে ভারত সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে বৈরী সম্পর্কের অবসান ঘটিয়ে ভবিষ্যতে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নাক গলানো থেকে বিরত থাকবে। তবে দিল্লির সঙ্গে এ ধরনের চুক্তি সম্পাদন বাংলাদেশের যেকোনো সরকারকে প্রবল রাজনৈতিক ঝুঁকিতে ফেলে দিতে পারে। সাহসী ও দেশপ্রেমিক জুলাইযোদ্ধারা ফ্যাসিস্ট হাসিনার প্রত্যাবর্তন বিনা প্রতিরোধে মেনে নেবে না। তাছাড়া, ক্ষমতাসীনদের নিশ্চয়ই এতদূর বিচক্ষণতা রয়েছে যে, তারা বুঝবেন আওয়ামী লীগকে রাজনীতি করতে দিলে ভোটের হিসাবে বিএনপিই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে নৌকার সমর্থকদের যে অংশ বিএনপিকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় এনেছে, তারা সবাই যে সুযোগ পেলেই ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে যাবে এ নিয়ে অন্তত আমার মনে কোনো সংশয় নেই। সুতরাং, বর্তমান পরিস্থিতিতে দিল্লি-ঢাকা সমঝোতার মাধ্যমে ডিসেম্বরে হাসিনার ফেরা প্রায় অসম্ভব।

২. দুর্ভাগ্যজনকভাবে সরকার সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হলে যদি রাষ্ট্রে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় এবং সে ক্ষেত্রে যদি জনগণ পতিত ফ্যাসিবাদের প্রতি নমনীয় হয়ে পড়ে, তাহলে শেখ হাসিনার ফেরার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। তবে, জনমতের এতখানি পরিবর্তন হতে সময় প্রয়োজন। এ বছরের ডিসেম্বর তো দূরের কথা, আগামী সংসদ নির্বাচনের আগ পর্যন্ত এমন অরাজক পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার কোনো সম্ভাবনা আমি দেখতে পাই না। বরং বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষে যদি সরকারি এবং বিরোধী দলের মধ্যে ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি প্রকৃত দলনিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয় এবং সেই সরকার সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্পাদনে সমর্থ হলে ফ্যাসিস্ট হাসিনার প্রত্যাবর্তনের সব সম্ভাবনার সমাপ্তি ঘটবে। অন্তত এই একটি বিষয়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো একমত হবে বলে আশা রাখি। 

৩. শেখ হাসিনার ফেরার সর্বশেষ পথ হলো এক-এগারোর মতো আরেকটি ভারতপন্থি সেনা অভ্যুত্থান। তবে, বিভিন্ন কারণে বিশ্বে সেনা অভ্যুত্থানের সুযোগ অনেকাংশে সংকুচিত হয়ে গেছে। ফ্যাসিবাদের পতনের দেড় বছরের মধ্যে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ধারায় সাফল্যের সঙ্গে ফিরে যাওয়ায় এরশাদ কিংবা মইনের মতো কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষী জেনারেলের পক্ষেই বর্তমান পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীতে অভ্যুত্থানের পক্ষে জনমত তৈরি করা প্রায় অসম্ভব। হাসিনার তল্পিবাহক সেনা কর্মকর্তাদের পরিণতি এত তাড়াতাড়ি সম্ভবত আমরা ভুলে যাইনি। ২০১৩ সালে মিসরে আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি ইসরাইল ও সৌদি মদতে এবং পশ্চিমা বিশ্বের মৌন সম্মতিতে যেভাবে মুহাম্মদ মুরসির নির্বাচিত সরকারকে হটাতে পেরেছিলেন, বাংলাদেশে তার পুনরাবৃত্তি ভূরাজনৈতিক কারণেই সম্ভব নয়। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত অনেকটাই কোণঠাসা হয়ে গেছে। চীন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেউই শেখ হাসিনার প্রতি সন্তুষ্ট ছিল না। অপর পরাশক্তি রাশিয়ার বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কোনো ভূমিকা নেই। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে নানা বিষয়ে মতবিরোধ থাকায় তাদের বাংলাদেশের রাজনীতিকে কার্যকরভাবে প্রভাবিত করার সক্ষমতা নেই। সুতরাং, আমাদের সেনাবাহিনীতে মিসরের

আল-সিসির মতো কোনো সুযোগসন্ধানী চরিত্রের উত্থানের কোনো আশু সম্ভাবনা আমি দেখতে পাই না।

এমতাবস্থায়, প্রভুর কোলে বসে শেখ হাসিনার আস্ফালনে আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার তেমন কোনো কারণ নেই। স্বাধীনতা রক্ষার্থে অবশ্যই সব ষড়যন্ত্র সম্পর্কে আমাদের সতর্ক থাকা উচিত। বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ জুলাইযোদ্ধাদের অনৈক্য বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক জনগোষ্ঠীকে আশাহত করেছে। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেন ব্যক্তিগত অথবা দলীয় শত্রুতায় পরিণত না হয়, সেদিকে সংশ্লিষ্ট সবার দৃষ্টি রাখা আবশ্যক। সরকারের দায়িত্ব এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি দুর্ভাগ্যবশত ক্ষমতাসীনদের কাছ থেকে তথাকথিত মৌলবাদ বিরোধিতার যে বয়ান শোনা যাচ্ছে, তার সঙ্গে পতিত ফ্যাসিবাদের পনেরো বছরের প্রচারণার মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। এ-জাতীয় বক্তব্য শেখ হাসিনা ও তার প্রভুদের উৎসাহিত করতে পারে। আদর্শহীন চাটুকারদের পুরস্কৃত করার রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতি থেকে কবে আমাদের নিস্তার মিলবে সেটা একমাত্র আল্লাহই জানেন। আজকের বিশেষ দিনে ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্য অটুট থাকার আশাবাদ ব্যক্ত করে লেখা শেষ করছি।