শহীদ মুক্তিযোদ্ধার নাতি হওয়ায় সরকারি চাকরিতে কোটার সুবিধা পাওয়ার সুযোগ ছিল তার। কিন্তু ব্যক্তিগত সেই সুবিধা গ্রহণকে নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য মনে করেননি। তার বিশ্বাস ছিল, দীর্ঘদিন ধরে মুক্তিযোদ্ধা কোটা সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রতি বৈষম্য সৃষ্টি করেছে এবং রাষ্ট্রের জন্যও এটি টেকসই নয়।
সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি ব্যক্তিগত সুবিধার বিপরীতে অবস্থান নিয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনে যুক্ত হন, যা পরে জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের অংশে পরিণত হয়।
এমন অভিজ্ঞতা ও আন্দোলনের নানান স্মৃতি তুলে ধরেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ও বর্তমানে জাতীয় ছাত্রশক্তির জবি শাখার আহ্বায়ক মো. ফয়সাল মুরাদ। সে সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ছিলেন তিনি।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, কোটা সংস্কারের দাবির পাশাপাশি রাষ্ট্র সংস্কারের প্রত্যাশা, সহযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ, পুলিশের দমন-পীড়ন, আত্মগোপনের দিনগুলো এবং ব্যক্তিগত নানান ত্যাগের অভিজ্ঞতা আন্দোলনে তার সম্পৃক্ততাকে আরও দৃঢ় করেছে।
নিজের কোটার সুবিধা প্রত্যাখ্যানের নৈতিক অবস্থান
ফয়সাল মুরাদ জানান, তার দাদা ১৯৭১ সালের একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। সে হিসেবে তিনি নিজেই মুক্তিযোদ্ধা কোটার অন্যতম সুবিধাভোগী হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি মনে করতেন, লক্ষাধিক চাকরিপ্রার্থীর দেশে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রতি বৈষম্য সৃষ্টি করে এবং রাষ্ট্রের জন্যও এটি টেকসই নয়।
ফয়সাল মুরাদের পুরো বক্তব্যের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল– ব্যক্তিগতভাবে মুক্তিযোদ্ধা কোটার সুবিধাভোগী হওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি সেই সুবিধার পক্ষে দাঁড়াননি। তার বিশ্বাস ছিল, রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার, মেধার মূল্যায়ন এবং বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন একটি সমান সুযোগভিত্তিক ব্যবস্থা।
তার মতে, শহীদ পরিবারের প্রতি অবশ্যই রাষ্ট্রের দায়িত্ব রয়েছে। তবে সেই দায়িত্ব পালনের উপায় হওয়া উচিত শিক্ষাব্যবস্থায় বিশেষ সুযোগ, আর্থিক সহায়তা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; চাকরিতে দীর্ঘদিন ধরে বিশাল আকারের কোটা বহাল রাখা নয়।
তার ভাষ্য, চাকরিতে কোটা থাকলেও তা ২.৫ থেকে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। ব্যক্তিগত সুবিধার চেয়ে তিনি মেধাভিত্তিক প্রতিযোগিতাকেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন।
কোটা আন্দোলন থেকে রাষ্ট্র সংস্কারের স্বপ্ন
ফয়সালের ভাষ্য অনুযায়ী, কোটা ইস্যুটি তার কাছে কেবল একটি চাকরির প্রশ্ন ছিল না। তিনি শুরু থেকেই আওয়ামী লীগবিরোধী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
তার দাবি, বিচার বিভাগ, পুলিশ প্রশাসনসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ফলে তিনি কোটা আন্দোলনকে রাষ্ট্র সংস্কার ও স্বৈরাচারবিরোধী বৃহত্তর আন্দোলনের একটি সুযোগ হিসেবে দেখেছিলেন।
তার ভাষায়, আন্দোলনের শুরু থেকেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন এটি কেবল কোটা সংস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিবর্তনের দাবিও একসময় সামনে আসবে।
লাইব্রেরি থেকে জিরো পয়েন্ট–জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনের সূচনা
২০১৮ সালের পরিপত্র বাতিলের প্রতিবাদে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনের সূচনা হয়। তিনি জানান, প্রথমদিকে কয়েকজন অগ্রজ শিক্ষার্থী নিজেদের অর্থ সংগ্রহ করে মাইক ভাড়া করেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক, তাঁতিবাজার ও জিরোপয়েন্ট এলাকায় আন্দোলন সংগঠিত করেন।
জিরোপয়েন্টের কর্মসূচিতে আন্দোলনের কৌশল হিসেবে বিভিন্ন ধরনের স্লোগান দেওয়া হলেও নিজের রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে শুরুতে তিনি কিছুটা সংযত ছিলেন। তবে আন্দোলনের বিস্তার ঘটার সঙ্গে সঙ্গে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত হন।
‘রাজাকার’ মন্তব্যের পর বদলে যায় পরিস্থিতি
১১ জুলাই তিনি গ্রামের বাড়ি ঠাকুরগাঁওয়ে অবস্থান করছিলেন। সেখানে স্থানীয় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আন্দোলনে অংশ নেন। ১৪ জুলাই আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকার’ বলে অভিহিত করার পর পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
পরদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও আশপাশে ছাত্রলীগের হামলায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বহু শিক্ষার্থী আহত হন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ঘটনার পর আন্দোলনকারীদের মধ্যে প্রবল ক্ষোভ সৃষ্টি হয় এবং আন্দোলনের চরিত্র বদলে যেতে শুরু করে।
ফেরদৌসের গুলিবিদ্ধ হওয়া বদলে দেয় সব সিদ্ধান্ত
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মিছিলে তার ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা ফেরদৌস গুলিবিদ্ধ হন। তিনি বলেন, ফেরদৌস ছিলেন তার ছোট ভাইয়ের মতো এবং রাজনৈতিক সহযোদ্ধা।
ফয়সালের দাবি, গুলিবিদ্ধ হওয়ার আগে ফেরদৌস বলেছিলেন, ‘আমার সঙ্গে কারও থাকা লাগবে না। আমি যদি মরেও যাই, তোরা কেউ মাঠ ছেড়ে দিস না।’
এ ঘটনা তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। তিনি মনে করেন, আর ঘরে বসে থাকার সুযোগ নেই। যে কোনো মূল্যে ঢাকায় ফিরে আন্দোলনে যোগ দিতেই হবে।
বাবার সেই কথায় চোখে পানি, তবু ঢাকার পথে রওয়ানা
১৭ জুলাই ভোরে ঠাকুরগাঁও থেকে ঢাকার উদ্দেশে বের হওয়ার সময় ঘটে তার জীবনের অন্যতম আবেগঘন মুহূর্ত। তার দাদা ১৯৭১ সালে শহীদ হওয়ার সময় তার বাবার বয়স ছিল মাত্র দুই বছর। বাবার শৈশব কেটেছে পিতৃহীন অবস্থায়, আর্থিক কষ্টে এবং নানান সংগ্রামে।
ফয়সাল জানান, বাসা থেকে বের হওয়ার সময় তার বাবা তাকে থামিয়ে বলেছিলেন, ‘আমার বাবার জেদের কারণে আমি এতিম হয়েছি। আমি শেষ বয়সে চাই না আমি আবার এতিম হই।’
বাবার চোখের দিকে তাকাতে পারেননি তিনি। কোনো টাকা ছাড়াই শূন্য হাতে বাবার নিষেধ উপেক্ষা করে ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা হন তিনি।
ইন্টারনেট বন্ধ, পুলিশি ঘেরাও, তারপর আত্মগোপন
১৮ জুলাই ঢাকায় পৌঁছে তিনি দেখেন পুরো ক্যাম্পাস পুলিশ ঘিরে রেখেছে। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় ফোনে যোগাযোগ করে কয়েকজন শিক্ষার্থী বাংলাবাজার এলাকায় জড়ো হলেও সেখানে পুলিশ তাদের ঘিরে ফেলে।
জুলাই আন্দোলনের শুরুতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ঢাকার গুলিস্তানের জিরোপয়েন্টে সমন্বয়ক ফয়সাল মুরাদ
১৯ জুলাই জুমার নামাজের আগে কবি নজরুল সরকারি কলেজের সামনে থেকে মিছিল বের করা হয়। পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, গ্রেফতার এবং পরে সরাসরি গুলির ঘটনার কথাও তুলে ধরেন তিনি। তার দাবি, ওইদিন কয়েকজন ঘটনাস্থলেই নিহত হন এবং অনেকেই আহত হন।
এরপর শুরু হয় ব্লক রেইড। তিনি জানান, তার নাম গোয়েন্দা সংস্থার কাছে চলে যাওয়ায় দীর্ঘ সময় আত্মগোপনে থাকতে হয়েছিল।
ফ্যান-লাইট বন্ধ করে দিনের পর দিন অন্ধকার ঘরে
ফয়সালের ভাষ্য অনুযায়ী, আত্মগোপনের সময় তিনি ঘরের ফ্যান ও লাইট বন্ধ রেখে অন্ধকারে মেঝেতে শুয়ে থাকতেন, যাতে বাইরে থেকে মনে হয় বাসাটি খালি।
তিনি বাড়িওয়ালার সামনেও বের হতেন না। কেবল বিশ্বস্ত সহযোদ্ধারা এলে তাদের সঙ্গে বের হতেন। অনেক সময় এক বেলা খাবার খেয়েই দিন পার করতে হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তার দাবি, সে সময় অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ঢাকা ছাড়লেও বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলন ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।
সমন্বয়কদের ওপর নির্যাতন আন্দোলনকে আরও বেগবান করে
নাহিদ ইসলামসহ সমন্বয়কদের গুম ও নির্যাতনের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আন্দোলন নতুন গতি পায় বলে মনে করেন ফয়সাল।
২৯ জুলাই জিরোপয়েন্ট থেকে বাহাদুর শাহ পার্ক পর্যন্ত প্রতিবাদী গানের মিছিলে অংশ নেন তারা। পরে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য পৃথক সমন্বয়ক কমিটি গঠন করা হয়।
২ আগস্ট দ্রোহযাত্রা এবং ৩ আগস্ট শহীদ মিনারে এক দফা ঘোষণার কর্মসূচিতেও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ব্যাপক উপস্থিতির কথা জানান তিনি।
৪ ও ৫ আগস্ট: সংঘর্ষ, ব্যারিকেড আর আনহাবের আত্মত্যাগ
৪ আগস্ট সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় আত্মরক্ষার জন্য লাঠি ও পাইপ সংগ্রহ করেন তারা। অর্থকষ্ট থাকলেও আত্মীয়ের সহায়তায় এসব ব্যবস্থা করা হয়েছিল বলে জানান তিনি।
৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে তারা পুরান ঢাকার রায়সাহেব বাজারের ব্যারিকেড এড়িয়ে গলি পথে তাঁতিবাজার হয়ে শহীদ মিনারের দিকে এগিয়ে যান।
চানখাঁরপুল এলাকায় শাহরিয়ার খান আনাস নামে এক তরুণ মাথায় গুলিবিদ্ধ হন। ফয়সালের ভাষ্য অনুযায়ী, আনাস জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন না। তবে তিনি জগন্নাথের শিক্ষার্থীদের সঙ্গেই আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সৌরভ তার মরদেহ টেনে মিডফোর্ড হাসপাতালে নিয়ে যান।
ফয়সাল বলেন, আনাস তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী না হলেও আত্মত্যাগের কারণে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনের ইতিহাসে তিনি তাদেরই একজন শহীদ হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছেন।
তৎকালীন উপাচার্যের ভূমিকা নিয়েও মন্তব্য
ফয়সাল দাবি করেন, ‘তৎকালীন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক সাদিকা হালিম ১৭ জুলাই পুলিশকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ভেতরে প্রবেশ করে শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি চালাতে দেননি।’
বিপ্লবের পর বদলে যায় রাজনৈতিক অবস্থান
জুলাই আন্দোলনের পর তিনি ছাত্রদল ছেড়ে জাতীয় নাগরিক কমিটি এবং পরে জাতীয় ছাত্রশক্তির সঙ্গে যুক্ত হন।
তার দাবি, ৫ আগস্টের পর ছাত্রদলের একটি অংশ রাষ্ট্র সংস্কারের পরিবর্তে ছাত্রলীগের সাংগঠনিক ও আর্থিক কাঠামো দখলের রাজনীতিতে বেশি মনোযোগী হয়ে পড়ে। সে কারণেই তিনি আগের রাজনৈতিক সংগঠন থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন।
‘ব্যক্তিগত সুবিধার চেয়ে দেশের স্বার্থ বড় ছিল’
ফয়সাল মুরাদের পুরো বক্তব্যের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল– ব্যক্তিগতভাবে মুক্তিযোদ্ধা কোটার সুবিধাভোগী হওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি সেই সুবিধার পক্ষে দাঁড়াননি। তার বিশ্বাস ছিল, রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার, মেধার মূল্যায়ন এবং বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন একটি সমান সুযোগভিত্তিক ব্যবস্থা।
এই বিশ্বাস থেকেই, পরিবারের আপত্তি, জীবনের ঝুঁকি, সহযোদ্ধার মৃত্যু, আত্মগোপন এবং অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়েও তিনি আন্দোলনের মাঠে ছিলেন বলে তার দাবি।