Image description

জুলাই কেন আমাদের লড়াই?

এর মধ্যে প্রথম কারণটি হল এই জুলাই অভ্যুত্থানকে সফল করার পেছনে বাংলাদেশে গোষ্ঠীগতভাবে, আদর্শিক ঘরানা হিসেবে আমাদেরকে সবচেয়ে বেশি ত্যাগ, কোরবানি, রক্ত এবং জীবনের নজরানা দিতে হয়েছে। ইতিহাসের সাধারণ নীতিই হলো, যে ঐতিহাসিক ঘটনার পেছনে যাদের যত বেশি ত্যাগ, শ্রম ও কোরবানি নিহিত থাকে, স্বাভাবিকভাবেই সেই ঘটনার প্রতি এবং তার অর্জিত ফলাফলের প্রতি তাদের দরদ, মমতা ও দায়বদ্ধতাও অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি থাকে। এখন অনেকের মনে এই প্রশ্ন জাগতে পারে যে, ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পেছনে আমাদের এমন কী অনন্য ত্যাগ ও কোরবানি ছিল যা অন্য সবার চেয়ে আলাদা।

ইসলামপন্থীদের রক্তের নজরানা

এর জবাব অত্যন্ত স্পষ্ট। আর তা হলো, চব্বিশের জুলাই বিপ্লব বা অভ্যুত্থানটি হুট করে একদিনে আকাশ থেকে পড়েনি; বরং এই দীর্ঘদিনের স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদ বিরোধী গণ-আন্দোলনের মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি বা পাটাতন তৈরি হয়েছিল ২০১৩ সালের ৫ মে ঐতিহাসিক শাপলা চত্বরে। কারণ ২০১৩ সালেই বাংলাদেশে প্রথম ফ্যাসিবাদের ভয়াবহ পদধ্বনি শোনা গিয়েছিল। তৎকালীন সময়ে শাহবাগের সেই ফ্যাসিবাদী বয়ান ও আধিপত্যবাদের মোকাবেলায় শাপলা চত্বরে যে ঈমানী জাগরণ ঘটেছিল সেটাই হলো ফ্যাসিবাদ বিরোধী এই জুলাই বিপ্লবের ভিত্তি।

বাস্তব সত্য হলো, ২০১৩ সালের সেই ঐতিহাসিক শাপলা চত্বরের নির্মম ট্র্যাজেডি ও রাষ্ট্রীয় জুলুমের মূল ভিকটিম ছিলাম আমরাই। শাপলার সেই ভয়াবহ গণহত্যায় যেসকল মানুষ নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন এবং রাজপথে যে পবিত্র রক্ত ঝরেছিল, তা ছিল মূলত আমাদেরই ভাইদের, আমাদেরই আলেম সমাজ ও তাওহীদী জনতার। আর সেই ত্যাগের ওপর ভিত্তি করেই ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের চূড়ান্ত সৌধ নির্মিত হয়েছে। আমরা যে কেবল ২০১৩ সালেই রক্ত দিয়েছি তা কিন্তু নয়; বরং ২০১৩ সাল থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের ‘৩৬শে জুলাই’ (৫ই আগস্ট) তথা স্বৈরাচারের পতন পর্যন্ত প্রতিটি ক্রান্তিলগ্নে, প্রতিটি আন্দোলনে ধারাবাহিকভাবে ধাপে ধাপে আমাদের আলেম সমাজ ও ইসলামপন্থীদের পক্ষ থেকে অকাতরে ত্যাগ, কোরবানি এবং রক্তের নজরানা পেশ করা হয়েছে।

২০২১ সালে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদের মূল আন্তর্জাতিক উৎস তথা ভারতের আধিপত্যবাদী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফর বিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষিতে আমাদের ওপর রাষ্ট্রীয় জুলুমের যে ভয়াবহ স্টিমরোলার চালানো হয়েছিল, তা এক অবর্ণনীয় ইতিহাস। সেই মোদি বিরোধী আন্দোলনের কারণে আমাদের এই ঘরানার শীর্ষস্থানীয় আলেম এবং অসংখ্য নেতাকর্মীকে বছরের পর বছর কারা নির্যাতন ভোগ করতে হয়েছে। শুধু সাধারণ কারাবাসই নয়, বরং কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে আমাদের ওপর যে ধরনের অমানুষিক ও নৃশংসতম নির্যাতন চালানো হয়েছিল, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। ব্যক্তিগতভাবে আমি ও আমার পরিবার তৎকালীন ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে চরম নিগ্রহ, রিমান্ডের নির্যাতন ও ভয়াবহ জুলুমের শিকার হয়েছিলাম। যার কারণে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, ২০১৩ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এই দীর্ঘ এক যুগের স্বৈরাচার বিরোধী লড়াইয়ে এবং জুলাই বিপ্লবের পেছনে যেসকল ত্যাগ ও কুরবানীকে আলাদা করে উল্লেখ করা যায়, তার মধ্যে আলেম সমাজের ইতিহাস অন্যতম। এর পাশাপাশি, ২০২৪ সালের জুলাই মাস জুড়ে দেশব্যাপী যে ছাত্র-জনতার আন্দোলন সংঘটিত হয়েছে এবং রাজপথে যে ঐতিহাসিক প্রতিরোধ গড়ে উঠেছে, সেখানে আমাদের হাজার হাজার ছাত্র, শিক্ষক, ও সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিল। বহু রক্ত ও জীবন বিসর্জিত হয়েছে। সুতরাং, এই ঐতিহাসিক আত্মত্যাগের কারণে জুলাই বিপ্লবের চেতনা রক্ষা করা এবং এর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার বিষয়ে আমরা এতটা আপসহীন ও দৃঢ়।

৭২ এর আধিপত্যবাদ বিরোধী রাজনীতি

এর পরের দ্বিতীয় কারণটি হলো—এই ঐতিহাসিক জুলাই বিপ্লবের সফলতার মাধ্যমে বাংলাদেশে ইসলামপন্থী ও আলেম সমাজের রাজনৈতিক অবস্থানকে সুসংহত ও শক্তিশালী করার একটি অনন্য ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হয়েছে। এ দেশের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিগত প্রায় অর্ধ শতাব্দী কাল ধরে বাংলাদেশে যে সাংবিধানিক কাঠামো ও রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে, তা মূলত ‘৭২-এর বন্দোবস্ত’ বা ১৯৭২ সালের সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ রূপরেখা। আর এই ৭২-এর রাজনৈতিক বন্দোবস্তটি ছিল ভারতের প্রত্যক্ষ প্রেসক্রিপশন ও রাজনৈতিক স্বার্থে। ভারতীয় আধিপত্যবাদের আলোকে এ দেশের মাটি ও মানুষের দ্বীন ইসলাম, ইসলামী রাজনীতি এবং মূল ধারার ইসলামপন্থীদের কোণঠাসা ও রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় করে রাখার একটি দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থাপনা। তবে ৭২-এর সেই একপেশে ও সেক্যুলার ব্যবস্থাপনাকে বিভিন্ন সময়ে দেশপ্রেমিক শাসকেরা কিছুটা দুর্বল বা সংশোধন করার চেষ্টা করেছিলেন; যেমনটি করেছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম এবং আল্লাহর উপর অবিচল আস্থা ও বিশ্বাসের কথা সংযোজনের মাধ্যমে। পরবর্তীতে সাংবিধানিকভাবে ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ ঘোষণা করে জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদও এই ধারায় ভূমিকা রেখেছিলেন।

কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, পরবর্তীতে শেখ হাসিনা পুনরায় ক্ষমতায় এসে তার দীর্ঘ ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরাচারী আমলে ৭২-এর সেই ইসলামবিদ্বেষী ও আধিপত্যবাদী বন্দোবস্তকে আরও বেশি শক্তিশালী করে দিয়ে গেছে।

সুতরাং এই দীর্ঘ সময় ধরে ৭২-এর নিবর্তনমূলক রাজনৈতিক বন্দোবস্তে আমরা ইসলামপন্থীরা ছিলাম সর্বদা ব্যাকফুটে বা রক্ষণাত্মক অবস্থানে। আমাদেরকে সবসময় এক প্রকার আত্মরক্ষামূলক ও রক্ষণাত্মক অবস্থানে থেকে রাজনীতি করতে হত। রাজপথে বা গণমাধ্যমে আমাদের সবসময় নিজেদের দেশপ্রেম ও নির্দোষিতার সাফাই গাইতে হতো এবং নানাভাবে নিজেদের আত্মপক্ষ সমর্থন করে দুর্বল রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করতে হত। স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়েও ইসলামপন্থীদের, আলেম সমাজের এবং ধর্মপ্রাণ জনগোষ্ঠীর জন্য এই ধরনের বৈষম্যমূলক পরিস্থিতি অসম্মানজনক ছিল। অতএব, বর্তমান প্রেক্ষাপটে জুলাই সনদের ভিত্তিতে যদি বাংলাদেশে বিকল্প আরেকটি রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠিত হয়, তবেই আমরা দীর্ঘ অর্ধশতাব্দিকালের ভারতীয় আধিপত্যবাদী বন্দোবস্ত থেকে মুক্তি পেতে পারি। আর এই নিবর্তনমূলক ব্যবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার প্রয়োজনীয়তা ও তাগিদ সবচেয়ে বেশি আমাদের তথা আলেম সমাজেরই। এই মুক্তি বা পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা বিএনপিরও ততটা নয়, কিংবা এনসিপিরও ততটা নয়, যতটা তীব্রভাবে প্রয়োজন এ দেশের শোষিত ও নির্যাতিত ইসলামপন্থীদের।

বাস্তবতা হল, রাষ্ট্রের এই ধরনের মৌলিক রাজনৈতিক বন্দোবস্ত পরিবর্তন করে আরেকটি সম্পূর্ণ নতুন ইনসাফপূর্ণ বন্দোবস্ত বাস্তবায়ন করার মতো ঐতিহাসিক উপলক্ষ বা সুযোগ বছরে বছরে কিংবা প্রতি যুগে যুগে আসে না; বরং এই ধরনের বৈপ্লবিক সুযোগ শতাব্দীকাল ব্যাপী সময়ে বড়জোর এক বা দুইবার আসে।

বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতার পর দীর্ঘ অর্ধ শতাব্দী পরে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আক্ষরিক অর্থেই সেই সোনালী সুযোগ ও ঐতিহাসিক উপলক্ষ তৈরি হয়েছে। কাজেই, এই জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে এবং এর ত্যাগ ও চেতনার বুনিয়াদের ওপর ভিত্তি করে যদি আগামীর নতুন বাংলাদেশ ও সংবিধান প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে তা হবে আমাদের জন্য সম্মানজনক। এই সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য অর্জনের জন্যই জুলাই চেতনার ভিত্তিতে আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণ হওয়াটা আমাদের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। এটি হলো আমাদের এই অবস্থানের পেছনের দ্বিতীয় জোরালো কারণ।

৪৭ এর প্রাসঙ্গিকতা

এর পাশাপাশি তৃতীয় মৌলিক কারণটি হলো, ৭২-এর ইসলামবিরোধী বন্দোবস্তের মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্র থেকে অত্যন্ত সুকৌশলে একটি ঐতিহাসিক অধ্যায়কে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। আর তা হলো ‘৪৭-এর প্রসঙ্গ’ বা ১৯৪৭ সালের দেশভাগের ঐতিহাসিক সত্য।

৭২-এর ধর্মনিরপেক্ষ বয়ানের মাধ্যমে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং এর পেছনের চেতনাকে এ দেশের ইতিহাস ও রাজনীতিতে একটি নিষিদ্ধ, অপ্রাসঙ্গিক এবং নেতিবাচক অধ্যায় হিসেবে চিত্রায়িত করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছিল। কিন্তু চব্বিশের এই ঐতিহাসিক জুলাই বিপ্লবের প্রচণ্ড ধাক্কায় সেই আড়ালে পড়ে থাকা সত্যটি আবার নবজীবন লাভ করেছে এবং এ দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ১৯৪৭-এর সেই প্রেক্ষাপট ও চেতনা আজ পুনরায় প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। আর এই ১৯৪৭-এর চেতনা যদি আবার বাংলাদেশে সঠিক উপায়ে পুনরুজ্জীবিত ও বাস্তবায়ন করা যায়, তবে এর দ্বারা সামগ্রিক বিচারে সবচেয়ে বেশি সুবিধা হবে এ দেশের ইসলাম, ইসলামপন্থী এবং বিশেষ করে দেওবন্দী ধারার আলেম সমাজের। ১৯৪৭-এর সেই ঐতিহাসিক প্রসঙ্গটি আমাদের আদর্শিক দর্শন, মনস্তাত্ত্বিক বুনিয়াদ এবং রাজনৈতিক চিন্তার জন্য অপরিহার্য। কারণ যখনই এ দেশে ৪৭-এর প্রসঙ্গ উত্থাপিত হবে, তখনই ইতিহাসের পাতা থেকে কিছু মৌলিক প্রশ্ন ও জিজ্ঞাসা জাগ্রত হবে। যেমন—১৯৪৭ সালে কেন ভারত বিভক্ত হয়েছিল? ৪৭-এ কিসের ভিত্তিতে এ দেশের মানুষ দেশভাগে অংশ নিয়েছিল? এই প্রশ্নের সরল ও অকাট্য ঐতিহাসিক সত্য হলো—৪৭-এ এই উপমহাদেশ বিভক্ত হয়েছিল ধর্মীয় আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে, যা ‘টু নেশন থিওরি’ বা ঐতিহাসিক ‘দ্বিজাতি তত্ত্ব’ নামে সুপরিচিত।

এই দ্বিজাতি তত্ত্বের আলোকেই এই উপমহাদেশের মজলুম মুসলমানদের জান-মাল, ইজ্জত ও ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষার নিমিত্তে আলাদা স্বাধীন ভূখণ্ড গঠিত হয়েছিল, যার পূর্বাঞ্চলীয় অংশটিই ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ও আজকের বাংলাদেশ। যা দেশভাগের পূর্বে ‘পূর্ববঙ্গ’ নামে পরিচিত ছিল।

সুতরাং, ১৯৪৭ সালের দেশভাগের মূল দর্শন ও অঙ্গীকার ছিল—এই ভূখণ্ডটি হবে এই অঞ্চলের মুসলমানদের জন্য একটি স্বাধীন আবাসভূমি, যেখানে বাস্তবায়িত হবে কুরআন-সুন্নাহর শাসন তথা ইসলামী নেযাম।

৪৭ ও দেওবন্দী আলেম সমাজ

আর এই ঐতিহাসিক ১৯৪৭ সালের দেশবিভাগ ও মুসলমানদের জন্য পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সেই মহান রাজনৈতিক আন্দোলনে আমাদের পূর্বসূরি দেওবন্দী আলেম সমাজের ছিল অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল ও ঐতিহাসিক ভূমিকা। বিশেষ করে, দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে মুসলমানদের জন্য আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের প্রচেষ্টায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল হাকিমুল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.)-এর অনুসারী আলেমদের। যার মধ্যে অন্যতম হলেন শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাব্বির আহমদ উসমানী (রহ.), আল্লামা যফর আহমদ উসমানী (রহ.), মুফতী-এ-আজম আল্লামা মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ.), আল্লামা শায়েখ সৈয়দ সুলায়মান নদভী (রহ.), আল্লামা শামছুল হক ফরীদপুরী রহ., আল্লামা আতহার আলী রহ. প্রমুখ। ১৯৪৭ সালে যখন দীর্ঘদিনের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে এই উপমহাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে এবং মুসলমানদের জন্য পৃথক রাষ্ট্র আত্মপ্রকাশ করে, তখন সেই নব্য স্বাধীন রাষ্ট্রের পূর্ব ও পশ্চিম- উভয় অংশে স্বাধীনতার প্রথম জাতীয় পতাকা উত্তোলন করার গৌরবময় দায়িত্ব লাভ করেছিলেন দুজন প্রখ্যাত দেওবন্দী আলেম; যার মধ্যে পশ্চিম পাকিস্তানে স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করেছিলেন আল্লামা শাব্বির আহমদ উসমানী (রহ.) এবং আমাদের এই পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশে স্বাধীনতার প্রথম পতাকা উত্তোলন করেছিলেন আল্লামা যফর আহমদ উসমানী (রহ.)।

ইতিহাসের পর্যালোচনায় এটিও উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ৪৭-এর সেই দ্বিজাতি তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে দেশবিভাগের এই রাজনৈতিক দর্শনের সাথে মাওলানা আবুল আলা মওদুদী সাহেব একমত ছিলেন না।

এই সমস্ত গভীর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক দর্শনকে ধারণ করেই জুলাই সনদের মাধ্যমে আগামীর বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো পুনর্গঠনে আমরা অত্যন্ত সক্রিয় ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ভূমিকা পালন করছি। ঐতিহাসিক ও আদর্শিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যায়, ১৯৪৭ সালের দেশভাগের ঘটনাটি জামায়াতে ইসলামীর জন্য ততটা রাজনৈতিক গৌরব ও গুরুত্বের বিষয় নয়, দেওবন্দী ওলামায়ে কেরামের জন্য এটি যতটা গৌরবোজ্জ্বল ও অপরিহার্য একটি অধ্যায়।

চব্বিশে এসে আবার জেগে উঠল ৪৭

সুদীর্ঘ সময় ধরে অবহেলিত থাকা ১৯৪৭-এর সেই ঐতিহাসিক পটভূমি ও মুসলমানদের জন্য পৃথক আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার চেতনাটি ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে আবার নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। জুলাই বিপ্লব পরবর্তী সময়ে রাজপথে আন্দোলনকারী বিপ্লবীদের কণ্ঠে এবং বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে ব্যাপকভাবে এই তত্ত্বটি আলোচিত ও সমাদৃত হয়েছে যে,আগামীর নতুন বাংলাদেশ গড়ে উঠবে ঐতিহাসিক তিনটি বুনিয়াদের ওপর। আর তা হল ১৯৪৭, ১৯৭১ এবং ২০২৪ সালের চেতনা। আজও পর্যন্ত যারা জুলাই বিপ্লবের মূল স্পিরিট ধারণ করেন এবং এর সপক্ষে ঐক্যবদ্ধ, তারা প্রত্যেকেই দ্বিধাহীনভাবে প্রথমে ১৯৪৭, এরপর ১৯৭১ এবং সর্বশেষে ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক ভিত্তির কথা বলেন।

যদি এই তিনটি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আগামীর বাংলাদেশ পুনর্গঠিত হয়, তবে সেই নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থায় এ দেশের ইসলামপন্থী ও আলেম সমাজ- এবং বিশেষ করে দেওবন্দী ধারার রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থান যে অত্যন্ত সংহত, মজবুত ও দৃঢ় হবে, তা দিবালোকের ন্যায় পরিষ্কার। আর তাই জুলাই বিপ্লব ও সফল গণ-অভ্যুত্থানের ওপর ভিত্তি করেই আমরা আগামীর বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গড়তে চাই। আর রাষ্ট্রে যখনই ১৯৪৭-এর সেই প্রেক্ষাপট প্রাসঙ্গিক হবে, তখনই ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি জনসাধারণের সামনে গুরুত্বের সাথে তুলে ধরা সম্ভব হবে।

বিগত অর্ধ শতাব্দিকাল ধরে '৭২-এর চেতনার' দোহাই দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতার নামে এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক দাবিকে সুকৌশলে ধামাচাপা দেওয়ার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে।

রাজনীতিতে ছোট দলগুলোর জন্য সুযোগ

আমাদের রাজনৈতিক অবস্থানের পেছনে চতুর্থ আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণও বিদ্যমান। তা হল, বাংলাদেশের বর্তমান দ্বিদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলোর প্রত্যক্ষ সাহায্য বা জোটবদ্ধতা ছাড়া আমাদের মতো ইসলামপন্থীদের সুযোগ খুবই সীমিত। বিগত দিনগুলোর রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এ দেশে ইসলামপন্থীরা যখনই জাতীয় রাজনীতিতে ভালো কোনো অবস্থানে যেতে চেয়েছেন কিংবা রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে সচেষ্ট হয়েছেন, তখনই বাধ্য হয়ে তাঁদেরকে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর শরণাপন্ন হতে হয়েছে। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে আমরা যে একটি সম্পূর্ণ নতুন ও ভারসাম্যপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছি, তা যদি বাস্তবায়ন করা যায় এবং দেশের রাজনীতিতে ভারসাম্য আনা যায়, তবে আমাদের এই দীর্ঘদিনের পরনির্ভরশীলতার অবসান ঘটবে। তখন আমরা বড় দুই দলের বৃত্ত এবং বিদ্যমান দ্বিদলীয় রাজনীতির চক্র থেকে বের হয়ে আসতে সক্ষম হব। এর ফলে দেশের রাজনীতিতে ছোট দলগুলোর জন্যেও ভূমিকা রাখার সুযোগ তৈরি হবে।

মূলত এসব কারণেই আমরা জুলাই বিপ্লবের মূল চেতনাকে আমাদের অন্তরের অন্তস্তল থেকে ধারণ করি এবং এর সুদৃঢ় বুনিয়াদের ওপর ভিত্তি করেই আগামীর নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই।

চেতনায় জুলাই বিপ্লব

এই প্রসঙ্গে বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, জুলাই বিপ্লবের চেতনা ও গণ-অভ্যুত্থানের মূল অভিপ্রায় বাস্তবায়ন করার পেছনে যে চারটি মৌলিক কারণের কথা আমি এতক্ষণ বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করলাম, এই রাজনৈতিক ও আদর্শিক অনুভূতিটি আমার নিজের ভেতর গভীরভাবে জাগ্রত হয়েছে ঠিক জুলাই বিপ্লবের সফলতার পর থেকেই। আমি দৃঢ়ভাবে মনে করি, জুলাই সনদকে পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করা এবং ১৯৪৭, ১৯৭১ ও ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক ভিত্তির ওপর আগামীর বাংলাদেশকে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা ও যৌক্তিকতা আলেম সমাজের দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে বেশি। এমনকি এনসিপি, জামায়াতে ইসলামী কিংবা বিএনপির চেয়েও এই পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা আমাদের জন্য অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ।

জুলাই সনদের বিরোধিতা আত্মঘাতী

আমাদের এই আলেম সমাজের মধ্যে যারা বর্তমান সময়ের এই ঐতিহাসিক বাস্তবতা ও জুলাই জাতীয় সনদের বিরোধিতা করছেন, আমি মনে করি তাদের এই অবস্থানটি ইসলামপন্থীদের জন্য আত্মঘাতী। আমাদের সমাজের কিছু মানুষ, বিশেষ করে কোনো কোনো আলেম এখনো দেশভাগের পূর্ববর্তী সেই ‘অখণ্ড ভারতের’ রাজনৈতিক চেতনাকে অবচেতন মনে ধারণ করে আছেন। অথচ বাস্তব সত্য হল, ১৯৪৭ সাল পর্যন্তই কেবল ‘ভারত বিভক্তি বনাম অখণ্ড ভারত’ সংক্রান্ত সেই ঐতিহাসিক বিতর্কের যৌক্তিক ক্ষেত্র ছিল। তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের জটিল রাজনৈতিক বৈচিত্র্য ও পরিস্থিতির দৃষ্টিকোণ থেকে দেশ কি ধর্মের ভিত্তিতে দ্বিখণ্ডিত হবে, নাকি অবিভক্ত থাকবে, তা নিয়ে তৎকালীন মনীষীদের মাঝে ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক দর্শন ও যুক্তি থাকাটাই ছিল স্বাভাবিক। আমাদের দেওবন্দী ধারার পূর্বসূরি আলেম-ওলামা ও মহান মনীষীদের মধ্যে শায়খুল ইসলাম হযরত মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী (রহ.)-সহ একাংশের রাজনৈতিক অবস্থান ছিল নিখিল ভারতের অখণ্ডতা বজায় রাখার পক্ষে। অপরদিকে হাকীমুল উম্মত হযরত আশরাফ আলী থানভী (রহ.)-সহ আলেমদের আরেকটি অংশের অবস্থান ছিল পাকিস্তান আন্দোলন তথা ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য আলাদা স্বাধীন ভূখণ্ড প্রতিষ্ঠার পক্ষে। ৪৭ এর পর সেই বিতর্কের আর সুযোগ নেই।

এই তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক বিতর্কের অবকাশ কেবল ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্টের পূর্ব পর্যন্তই যুক্তিযুক্ত ছিল। কিন্তু ১৯৪৭ সালে যখন বাস্তব ক্ষেত্রে দেশ বিভক্ত হয়েই গেল এবং মুসলমানরা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র লাভ করল, তখন সেই অখণ্ড ভারতের ধারণার আর কোনো বাস্তব কার্যকারিতা, রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা বা যৌক্তিকতা অবশিষ্ট থাকল না। হযরত মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী (রহ.) তৎকালীন সময়ে যেসকল যৌক্তিক কারণে ভারতকে অখণ্ড রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন, তার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল- দেশভাগ হলে ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কোটি কোটি সাধারণ মুসলমান বিপর্যয় বা শোচনীয় পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে পড়বে এবং পুরো ভারতজুড়ে ইসলামের ভবিষ্যৎ সংকটাপন্ন হয়ে যাবে। অর্থাৎ, আলেম-ওলামারা ভারতকে মূলত এই জন্যই অখণ্ড রাখতে চেয়েছিলেন যাতে মুসলমানরা সংখ্যাগতভাবে সম্মিলিত হয়ে অখণ্ড রাষ্ট্রে একটি শক্তিশালী অবস্থানে থাকতে পারে। কিন্তু যখন সকল বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে ভারত চূড়ান্তভাবে বিভক্ত হয়েই গেল আর এই দেশভাগের জন্য মুসলমানদেরকে চড়া মূল্যও চুকাতে হল। দেশভাগের পর তাৎক্ষণিকভাবে ভারতের লাখ লাখ নিরীহ মুসলমানকে নিজেদের পৈতৃক বাস্তুভিটা হারিয়ে রিফিউজি হতে হলো, অগণিত মানুষকে নিজেদের জীবন ও পবিত্র রক্ত উৎসর্গ করতে হলো। ভারতজুড়ে মুসলমানদের ওপর নেমে এলো চরম জুলুম-নিপীড়ন। আর সেই বিপুল ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে আমরা পেলাম ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য স্বাধীন ও সার্বভৌম ভূখণ্ড।

দেশভাগের এই ভয়াবহ চড়া মূল্য চুকানোর পূর্ব পর্যন্ত আলেমদের মাঝে এই বিতর্কটি হয়তো প্রাসঙ্গিক ছিল যে, এত বড় মূল্যের বিনিময়ে আমরা এই নতুন মুসলিম ভূখণ্ডটি আলাদাভাবে নেব কি না। কিন্তু যখন ইতিহাসের এক চূড়ান্ত ও নির্মম মূল্য ইতিমধ্যেই দেওয়া হয়ে গেছে এবং আমরা বাস্তব ক্ষেত্রে আমাদের একটি স্বাধীন ভূখণ্ড লাভ করেছি, তখন সেই অর্জনে আমাদের লাভ হলো নাকি ক্ষতি হল—তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ কেবল ১৯৪৭-পূর্ববর্তী একাডেমিক আলোচনার বিষয় হতে পারে, বর্তমানের বাস্তব রাজনীতির নয়। এখন, যে মূল্যের বিনিময়েই হোক না কেন, একটি স্বাধীন মুসলিম ভূখণ্ড অর্জনের পর, এই মুসলিম প্রধান দেশে ইসলামী রাষ্ট্র ও ইসলামী শাসনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবিকে সর্বাত্মকভাবে জোরালো করতে না পারা, কিংবা এর উপযোগিতার বিপক্ষে কোনো ধরনের হীনমন্যতামূলক কথা বলা চরম আত্মঘাতী। এর চেয়ে বড় রাজনৈতিক বোকামি আর কিছু হতে পারে না। এই মনস্তাত্ত্বিক বিষয়টি সহজভাবে স্পষ্ট করতে আমি একটি বাস্তব উদাহরণ দিচ্ছি।

ধরা যাক, গরুর হাটে আপনি একটি গরু কিনতে গেলেন। গরুটির বাজারদর হয়তো সত্তর থেকে আশি হাজার টাকা, কিন্তু কোনো কারণে আপনি গরুটি কিনলেন এক লক্ষ টাকায়। এখন একটি সরল প্রশ্ন হল, যেহেতু আপনি গরুটি বাজার মূল্যের চেয়ে বেশি দামে কিনে এক প্রকার ঠকে গেছেন, তাই বলে কি আপনি ক্ষোভে বা রাগে সেই গরুটি হাটে ফেলে দিয়ে চলে আসবেন? কিংবা এই মূল্যবান গরুর ওপর থেকে কি আপনি নিজের মালিকানা স্বত্ব ছেড়ে দেবেন? আপনি নিশ্চয়ই বুদ্ধিমান হলে কখনোই বলবেন না যে, যেহেতু আমি দামের দিক থেকে ঠকে গিয়েছি, তাই আমি গরুটি আর ঘরে নেব না বা এর মালিকানা দাবি করব না। আপনি যদি আশি হাজার টাকার গরু এক লক্ষ টাকায় কিনে থাকেন, তবে আপনার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে কেবল বিশ হাজার টাকা। কিন্তু এখন যদি সেই ক্ষোভে বা দুঃখে আপনি আস্ত গরুটিই হাটে ফেলে চলে আসেন কিংবা এর ওপর নিজের ন্যায্য অধিকার ত্যাগ করেন, তবে আপনার পুরো এক লক্ষ টাকাই গচ্ছা যাবে।

আমাদের দেশের কিছু মানুষের মনস্তাত্ত্বিক সমস্যাটি ঠিক এই জায়গাতেই। ১৯৪৭ সালের ঐতিহাসিক দেশভাগকে যারা আজও মন থেকে মেনে নিতে পারেননি। তারা মূলত এই স্বাধীন ভূখণ্ডের প্রতি এবং এর মাটির প্রতি সেই গভীর নাড়ির টান বা মমত্ববোধ অনুভব করতে পারেন না। তারা যেন ওই আশি হাজার টাকার গরু এক লক্ষ টাকায় কেনার পর, ক্ষোভে ও অপমানে নিজের কেনা গরুটিকেই পুরোপুরি বর্জন বা ত্যাগ করতে চান। ঠিক এই ক্ষতিকর ও নেতিবাচক মানসিকতার কারণেই আমাদের আলেম সমাজের একটি বড় অংশ ১৯৪৭ সালের ঐতিহাসিক প্রসঙ্গটিকে জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বের সাথে ধারণ করতে চান না। আর সাতচল্লিশের এই গৌরবময় ইতিহাসের প্রতি উদাসীন মনস্তত্ত্ব ও মানসিক দুর্বলতার ধারাবাহিকতাই শেষ পর্যন্ত এসে ঠেকেছে ২০২৪ সালের এই ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে।

এই দীর্ঘস্থায়ী মনস্তাত্ত্বিক সংকটের কারণেই আজ আমাদের ভেতরের কিছু মানুষ এবং কিছু ঐতিহ্যবাহী আলেম চব্বিশের বিপ্লবের অর্জিত স্বত্ত, নিজেদের নায্য রাজনৈতিক অধিকার, রাষ্ট্রের হিস্যা ও জাতীয় মালিকানা দাবি করার ক্ষেত্রে চরম হীনমন্যতা ও এক প্রকার আত্মঘাতী দুর্বলতা প্রদর্শন করছেন। আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই—আমি এই হীনমন্য রাজনৈতিক দর্শনের সাথে অতীতেও ছিলাম না, বর্তমানেও নেই। চব্বিশের ৩৬শে জুলাইয়ের (৫ই আগস্ট) পর থেকেই আমার ব্যক্তিগত ও আমাদের সামষ্টিক অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট; আর তা হলো- এই জুলাই বিপ্লব আমাদের, এই জুলাইয়ের রাজপথ রাঙানো বীরত্বগাথা রক্ত আমাদের ভাইদের এবং এর সফলতার জন্য দীর্ঘ এক যুগ ধরে বড় মূল্য চুকিয়েছি আমরা। সুতরাং, এই জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা, স্পিরিট ও জুলাই সনদের চেতনাকে রাষ্ট্রে বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে সর্বাগ্রে এবং সবচেয়ে অগ্রণী ভূমিকাও থাকবে আমাদেরই।

আজ পর্যন্ত জাতীয় পর্যায়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, জুলাই বিপ্লবের চেতনা রক্ষা এবং একটি নতুন ভারসাম্যপূর্ণ রাজনৈতিক বন্দোবস্তের আলোকে আগামীর বাংলাদেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে যেসকল পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে আমরা দৃঢ়ভাবে মনে করি, সেখানে আমাদের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। এই রাষ্ট্র বিনির্মাণের প্রক্রিয়ায় আমরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছি।

জুলাই সনদ বাস্তবায়নে আমাদের ভূমিকা

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, আমরা আসলে কী ভূমিকা রেখেছি? হ্যাঁ, এটি ঐতিহাসিক সত্য যে, জুলাই সনদের প্রাথমিক আওয়াজ ও দাবি সর্বপ্রথম তুলেছিলেন জুলাই বিপ্লবের রাজপথের অগ্রগামী যোদ্ধারা এবং এনসিপির তরুণ নেতৃত্ব। কিন্তু সেই কাঙ্ক্ষিত সনদ যখন দীর্ঘ আলোচনার পর একটি পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা লাভ করল, তখন তার ভিত্তিতে আগামী দিনের নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে মাঠ পর্যায়ে একটি সুনির্দিষ্ট ও ধারাবাহিক রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রয়োজন ছিল; যেন কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহলের চাপে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াটি মাঝপথে থমকে না যায়। শুরু থেকেই আমার রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণে মনে হয়েছে যে—জুলাই সনদের এই পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন ঘটুক এবং এর ভিত্তিতে দেশে একটি নতুন রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক বন্দোবস্ত গড়ে উঠুক, তা বিএনপি আন্তরিকভাবে চায় না। বিএনপির নিজস্ব দলীয় রাজনৈতিক অবস্থান, ক্ষমতার সমীকরণ ও কৌশলগত কারণেই তারা এটি চায় না।

সরকারী দল কেন জুলাই চায় না?

জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এই নতুন বন্দোবস্ত বিএনপি কেন চাইবে না এবং তাদের দলীয় জায়গা থেকে এটি না চাওয়াটা কেন স্বাভাবিক—তার পেছনে দুটি রাজনৈতিক যুক্তি আছে, যা আমাদের গভীরভাবে অনুধাবন করা প্রয়োজন।

প্রথম কারণটি হল এই যে, ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসে দেশে যে অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থান ঘটে গেল, তার প্রত্যক্ষ নেতৃত্ব কিন্তু তৎকালীন সর্ববৃহৎ বিরোধী শক্তি হওয়া সত্ত্বেও বিএনপি দিতে পারেনি। এত বড় এবং দেশব্যাপী বিস্তৃত একটি ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল মাঠে থাকা সত্ত্বেও, সম্পূর্ণ অচেনা, অজানা এবং তরুণ এক ছাত্র-নেতৃত্বের অধীনে এই ঐতিহাসিক অভ্যুত্থান সফলভাবে সংগঠিত ও পরিচালিত হলো। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে এই ঘটনাটি বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ব্যর্থতার একটি দলিল।

তবে এই ঐতিহাসিক সত্য স্বীকার করতে কোনো দ্বিধা থাকা উচিত নয় যে, স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদ বিরোধী দীর্ঘ আন্দোলনের প্রতিটি ধাপে এবং জুলাইয়ের রাজপথে বিএনপির মাঠপর্যায়ের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা বিরাট ভূমিকা পালন করেছে। দেশে তাদের সমর্থক ও জনশক্তি বেশি হওয়ার কারণে রাজপথে তাদের ত্যাগ-তিতিক্ষা, কারাবরণ ও জানমালের ক্ষয়ক্ষতিও সংখ্যাগত দিক থেকে অনেক বেশি ছিল। কিন্তু মাঠপর্যায়ের এই বিশাল ত্যাগ সত্ত্বেও, দলটির কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্তহীনতা ও নেতৃত্বের দুর্বলতার দরুন দল হিসেবে বিএনপি এই অভ্যুত্থানের চূড়ান্ত রূপ দিতে বা স্বৈরাচারের পতন ঘটাতে ব্যর্থ হয়। আর নেতৃত্বের সেই চরম শূন্যতার জায়গা থেকেই প্রাকৃতিকভাবে নতুন ছাত্র-নেতৃত্বের উত্থান ঘটে, যারা সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে এই সফল অভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক নেতৃত্ব প্রদান করে। ফলে নতুন এই বাস্তবতায় জুলাই বিপ্লবের বুনিয়াদের ওপর যদি নতুন রাষ্ট্রীয় বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে তাকে স্বীকৃতি দিতে বিএনপির রাজনৈতিক সমীকরণে বাধে। কারণ, জুলাইয়ের সেই নতুন বন্দোবস্তকে চূড়ান্ত স্বীকৃতি দেওয়ার অর্থই হল, পরোক্ষভাবে নিজেদের নেতৃত্বের ব্যর্থতাকে মেনে নেওয়া।

এর পেছনের দ্বিতীয় কারণটি হল, জুলাই সনদের ওপর ভিত্তি করে যদি রাষ্ট্রে একটি নতুন রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়, তবে স্বাভাবিক নিয়মেই বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে সেই তরুণ নেতৃত্বের গুরুত্ব বৃদ্ধি পাবে, যারা এই সফল অভ্যুত্থানের প্রত্যক্ষ নেতৃত্ব দিয়েছেন। আর ইতিহাসের চিরন্তন নিয়ম হলো, পৃথিবীর কোনো কায়েমী গোষ্ঠী সহজে এটি মেনে নিতে পারে না যে, তাদের উপস্থিতিতে সমাজ বা রাষ্ট্রে নতুন এবং বিকল্প নেতৃত্ব গড়ে উঠুক।

মূলত এই দুটি মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত কারণেই বিএনপি মন থেকে চায় না যে, জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে এ দেশে নতুন কোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্ত গড়ে উঠুক। আর ঠিক এই কারণেই, জুলাই বিপ্লবকে "দ্বিতীয় স্বাধীনতা" হিসেবে অভিহিত করা কিংবা জুলাই-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশকে "সেকেন্ড রিপাবলিক" হিসেবে আখ্যায়িত করার মতো শব্দবন্ধগুলো বিএনপির তীব্র গাত্রদাহ ও রাজনৈতিক অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই জাতীয় ঐতিহাসিক বয়ান বা শব্দাবলি বিএনপি কোনোভাবেই সহ্য করতে পারছে না।

এমতাবস্থায়, জুলাই সনদের সেই নতুন বন্দোবস্তের মাধ্যমে যদি একটি বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়, তবে বিদ্যমান সমীকরণে বিএনপি তার প্রবল বিরোধিতা করবে—এটিই স্বাভাবিক। কারণ, অতীতের বাংলাদেশের দ্বিদলীয় ক্ষমতার মেরুকরণে থাকা দুই প্রধান রাজনৈতিক শক্তির অন্যতম প্রধান দল ‘আওয়ামী লীগ’ ইতিমধ্যে গণ-আন্দোলনের মুখে দেশ থেকে বিতাড়িত ও রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। ফলে ক্ষমতার মাঠে এখন একমাত্র বড় শক্তি হিসেবে বিএনপিই অবশিষ্ট রয়েছে। সেই প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল বিএনপি যখন জুলাই বিপ্লবের মূল অর্জন ও সনদকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে দিতে চাচ্ছে না, তখন তাদের এই তীব্র বিরোধিতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে জুলাই সনদের মূল দাবিগুলো রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠা করা মোটেও সহজসাধ্য কাজ নয়। আর ঠিক এই কঠিন রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণেই, কেবল আলোচনার টেবিলে সীমাবদ্ধ না থেকে আমাদের রাজপথে নেমে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একটি শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তুলতে হচ্ছে।

জুলাই সনদ বাস্তবায়নে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের সূচনা

এটি সত্য যে, আমাদের দলের একক শক্তি-সামার্থ্য বা সাংগঠনিক সক্ষমতা এই পর্যায়ের না যে, আমরা এককভাবে আন্দোলন পরিচালনা করে রাষ্ট্রকে বা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বাধ্য করতে পারি। এই সীমাবদ্ধতার কারণে তৎকালীন পরিস্থিতিতে স্বৈরাচার ও আধিপত্যবাদ বিরোধী ‘জাতীয় ঐক্যের’ প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছিল। ব্যক্তিগতভাবে আমি এই এজেন্ডা নিয়ে কাজ শুরু করি। সেই ক্রান্তিলগ্নে জামায়াতে ইসলামীর আমীর শারীরিকভাবে অত্যন্ত অসুস্থ ছিলেন।

হার্টের অপারেশনের পর তিনি চিকিৎসকদের পরামর্শে সম্পূর্ণ বিশ্রামে ছিলেন। তা সত্ত্বেও, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিরি গুরুত্ব বিবেচনা করে আমি স্বশরীরে তার সাথে সাক্ষাৎ করি এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একটি সম্মিলিত আন্দোলন গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করি। বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে তিনি তার দলের নায়েবে আমীরকে নির্দেশ প্রদান করেন। এরপর আমি এই বৃহত্তর ঐক্য প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এনসিপির শীর্ষ নেতৃত্বের সাথেও আলোচনা করি।

আমাদের এই রাজনৈতিক যোগাযোগের ধারাবাহিকতায় এনসিপির আহবায়ক নাহিদ ইসলামের বাসায় সাতটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত বৈঠকে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ তাহের, ইসলামী আন্দোলনের আমির পীর সাহেব চরমোনাই, এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, গণঅধিকার পরিষদের নূরুল হক নূর, এবি পার্টির মুজিবুর রহমান মঞ্জু, খেলাফত মজলিসের মুস্তাফিজুর রহমান ফয়সাল ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমি মামুনুল হকসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ অংশগ্রহণ করে। আলোচনার পর সেই বৈঠকেই জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

প্রাথমিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আন্দোলনের প্রথম ধাপে দেশের এই প্রধান সাতটি রাজনৈতিক দল নিজ নিজ প্ল্যাটফর্ম থেকে কর্মসূচিতে নামার বিষয়ে একমত হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে আন্দোলন ও রাজনীতির কৌশল বিষয়ে দলগুলোর মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা দেখা দেয়। এর ফলে এনসিপি, এবি পার্টি এবং গণঅধিকার পরিষদ আন্দোলনের সেই প্রাথমিক পর্যায়টিতে সরাসরি কর্মসূচিতে না নামার কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

এমতাবস্থায় আমরা আমাদের আন্দোলন স্তিমিত হতে দেইনি; বরং ইসলামী আন্দোলন, জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলন এবং নেজামে ইসলাম পার্টি- এই ৬টি দল একত্রে রাজপথের আন্দোলন শুরু করি। আমরা ধাপে ধাপে আমাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি ও গণসংযোগ এগিয়ে নিয়ে যাই এবং শেষ পর্যন্ত আমাদের সম্মিলিত আন্দোলনের চাপের মুখে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আমাদের ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবি’ মেনে নিতে বাধ্য হয়। এর প্রেক্ষিতে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পথ ও পদ্ধতি নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত হয়। আগেই আলোচনা করেছি যে, সনদ বাস্তবায়নের রূপরেখা বিষয়ে একেক দলের একেক রকম দৃষ্টিভঙ্গী ছিল। এনসিপির অবস্থান ছিল সবচেয়ে কঠোর। তারা গণপরিষদ গঠন করে সংবিধান পুনর্লিখনের মাধ্যমে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে ছিল। আর বিএনপির অবস্থান ছিল এক্ষেত্রে সবচেয়ে দুর্বল প্রক্রিয়ার পক্ষে। অর্থাৎ গতানুগতিক সংশোধনীর মাধ্যমে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গীর আলোকে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন। অন্যান্য দলের অবস্থান ছিল মাঝামাঝি। বিষয়টি আলোচনার টেবিলে গড়ালে পক্ষগুলোর মধ্যে পারস্পরিক নেগোসিয়েশন হয়। পাশাপাশি আইনগত প্রক্রিয়া নিয়েও পর্যালোচনা হয়। সবশেষে এনসিপিও তার অনড় অবস্থান থেকে ছাড় দিতে সম্মত হয়। বিএনপিও নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসে। এবং সংবিধানের গতানুগতিক সংশোধনী ও সংবিধান পুনর্লিখন এতদুভয়ের মাঝামাঝি সংবিধান সংস্কারের ব্যাপারে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এবং প্রক্রিয়া হিসেবে গণভোটের মাধ্যমে গাঠনিক ক্ষমতাসম্পন্ন একটি ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠনের ব্যাপারে সবাই একমত হয়। এভাবে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আন্দোলন একটি সফল পরিণতি পায়।

চলবে...