Image description

২০২৪ সালের ২৯ জুলাই হাসিনা সরকারের মন্ত্রিপরিষদ সিদ্ধান্ত নেয় ৩০ জুলাই রাষ্ট্রীয় শোক দিবস পালন করবে। তারা (মন্ত্রিপরিষদ) ছাত্র-জনতার ওপর চালানো হত্যাকাণ্ড অস্বীকার করে, উল্টো ছাত্র-জনতার আন্দোলন ‘সহিংসতা’ হিসেবে চিহ্নিত করে।

 

সরকারের শোক দিবস ‘শহীদদের সঙ্গে প্রতারণা’ বলে মন্তব্য করে ‘চোখে-মুখে লাল কাপড় বেঁধে ছবি অনলাইনে প্রচার’ করার ঘোষণা দেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। কর্মসূচির অংশ হিসেবে ফেসবুক ছেয়ে যায় লাল রঙে। অনেকে ছবি না দিয়ে প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের গানের লাইন ‘পুবের আকাশ রাঙা হলো সাথী, ঘুমাইয়ো না আর জাগো রে’ কিংবা ‘যারা স্বর্গগত—তারা এখনও জানে/ স্বর্গের চেয়ে প্রিয় জন্মভূমি’ গানের কলি দিয়ে করেছেন রক্তরাঙা লাল প্রোফাইল পিকচার। শিক্ষক, সংস্কৃতিকর্মী, সাংবাদিক, লেখক, শিক্ষার্থীসহ নানা শ্রেণিপেশার মানুষ নিজেদের প্রোফাইল লাল করে। অন্যদিকে সরকার-সমর্থকদের অনেকে ফেসবুক প্রোফাইলে কালো রঙের ফ্রেম করে সরকারি শোক পালন করে।

 

প্রযুক্তি আমাদের প্রতিবাদের ধরন পাল্টে দিয়েছে। রাজপথের পাশাপাশি সামাজিকমাধ্যম হয়ে উঠেছে শোক ও প্রতিবাদের ভাষা প্রকাশের আশ্রয়স্থল। ৩০ জুলাই দেশে-বিদেশে প্রোফাইল লাল করে সরকারি শোক দিবস প্রত্যাখ্যান করেছিল নানা স্তরের মানুষ। লাল শুধু রঙ ছিল না; ছিল সময়ের স্মৃতি, প্রতিবাদ, শোক, সংহতি ও নাগরিক প্রত্যয়ের দৃশ্যমান ভাষা। ফলে রাজনৈতিক প্রতীকেরও নতুন রূপ তৈরি হয়েছে।

 

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ‘লাল প্রোফাইল’ দৃশ্যমান ঐক্যের ভাষা হয়ে উঠেছিল। অনেকে জানিয়েছেন তাদের সংহতি, অনেকে প্রকাশ করেছেন শোক, আবার অনেকে রাজনৈতিক ও নৈতিক অবস্থান তুলে ধরেছেন। অসংখ্য মানুষ সেদিন প্রোফাইল লাল করেছেন, তারা একধরনের ডিজিটাল সম্প্রদায় গড়ে তুলেছিলেন৷ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ফলে আমরা সামাজিকমাধ্যমে যে দৃশ্যমান ঐক্য দেখেছি, তাতে বিদ্যায়তনিকভাবে বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসনের ‘কল্পিত সম্প্রদায়’ ধারণা নতুনভাবে ভাবার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

 

বিশ্বের প্রতিটি গণআন্দোলনে সাম্প্রতিক সময়ে প্রতীক প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠেছে৷ হংকংয়ের আন্দোলনে ‘ছাতা’ হয়ে উঠেছিল প্রতিবাদের ভাষা; ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলনে কালো বর্গাকার ছবি বিশ্বব্যাপী সংহতির ভাষা হয়েছিল। তেমনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময়ে দেশ ছাড়িয়ে বিদেশে যারা বাংলাদেশের জনগণ রয়েছেন তারাও প্রোফাইল লাল করেছেন৷ লাল প্রোফাইল জনগণের মনে একটা নৈতিক শক্তি দিয়েছিল, মানুষের সঙ্গে মানুষের পারস্পরিক সংযোগ শক্তিশালী করেছে— ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী পিয়ের বুর্দিয়ো যাকে ‘সিম্বলিক পাওয়ার’ বলেছেন।

 

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিতে একটি প্রশ্ন মনে জাগে, সেটা হলো— প্রতিবাদ ও শোকের স্মৃতি হিসেবে ছাত্র-জনতা প্রোফাইল লাল করেছেন, লাল কাপড় বেঁধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন, সেটা কি শুধু সামাজিকমাধ্যমের চলমান প্রবণতা ছিল, নাকি নাগরিক স্মৃতি? যেটা আমরা ইতিহাস হয়ে ওঠার একটা টার্নিং পয়েন্ট বলতে পারি! সেটা বলার জন্য আমাদের জুলাই গণঅভ্যুত্থান যে কারণে হয়েছে, তা ধারণ করার বিকল্প নেই৷ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ফলে জগদ্দল পাথর শেখ হাসিনার পতন হয়েছে, ফ্যাসিস্টের রাজনৈতিক পতন হয়েছে। তবে রাজনৈতিক ফ্যাসিস্টকে শক্তিশালী করার সফট পাওয়ার কালচারাল ফ্যাসিস্ট এখনো বহালতবিয়তে৷

 

তাহলে আমরা স্মৃতি হিসেবে সংরক্ষণ করব কীভাবে? এর উত্তর খুবই সহজ, কালচারালি জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে শক্তিশালী করার বিকল্প নেই৷

 

রাজনৈতিক দল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনকে জুলাইয়ের প্রশ্নে এক হওয়ার বিকল্প নেই৷ আমাদের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সংস্কৃতি জুলাই বাঁচিয়ে রাখবে৷ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় হাসিনার শোককে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যে নৈতিক শক্তিতে বলীয়ান হয়ে আপামর জনতা প্রোফাইল লাল করেছেন, তাদের স্বপ্ন রয়েছে। তারা স্বপ্ন দেখেছিল একটি সুন্দর গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের, যেখানে গুম, খুন, রাহাজানি ও রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড থাকবে না; ইনসাফ থাকবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা গণতান্ত্রিক চর্চা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, জবাবদিহি এবং নাগরিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায়, তবে লাল প্রোফাইল একটি ক্ষণস্থায়ী সিম্বল নয়; বরং ইতিহাসের সিম্বলে পরিণত হবে।

 

প্রতিটি যুগ তার নিজস্ব ভাষায় ইতিহাস লেখে। একসময় সেই ভাষা ছিল মুদ্রিত পোস্টার, দেয়াললিখন, লিফলেট, আর্কাইভ, বই, ম্যাগাজিন, ফটো কিংবা সিনেমা-চলচ্চিত্রে৷ আজ সেই ভাষার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডিজিটাল সিম্বল। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের লাল প্রোফাইল আমাদের মনে করিয়ে দেয়— একটি রঙও কখনো কখনো স্মৃতি বহন করতে পারে, প্রজন্মের নৈতিক অবস্থান প্রকাশ করতে পারে এবং ইতিহাসের নীরব সাক্ষ্য হয়ে উঠতে পারে।

 

লেখক: গবেষক, প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ