Image description

আমীন আল রশীদ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক আন্দোলনে নাগরিকের নিহত হওয়া ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলে। এমনটা ঘটলে আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি বদলে যায়। জুলাই অভ্যুত্থানে আবু সাঈদ আর মুগ্ধর নিহত হওয়ার ঘটনাও আন্দোলনের গতিপথ বদলে দিয়ে সাধারণ মানুষকে রাস্তায় নামিয়ে এনেছিল।

২০১৫ সালে রাজনীতিক মাহমুদুর রহমান মান্না এবং প্রয়াত বিএনপি নেতা সাদেক হোসেন খোকার একটি ফোনালাপ ফাঁস হয়েছিল। যেখানে মান্নাকে বলতে শোনা যায়— ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বড় ধরনের সংঘর্ষ হলে বা সেখানে একটা-দুইটা লাশ পড়লেও তা সরকারবিরোধী আন্দোলনকে বেগবান করবে। একই সময়ে ফাঁস হওয়া আরেকটি অডিওতে তাঁকে সেনাবাহিনীর কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ বা বৈঠকের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করতে শোনা যায়। এসব অডিও প্রকাশের পর রাষ্ট্রদ্রোহ ও সেনাবাহিনীকে উসকানি দেওয়ার অভিযোগে করা মামলায় জনাব মান্না গ্রেপ্তার হন। তিনি তখন দাবি করেছিলেন, কথোপকথনগুলোকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং তিনি কোনো সহিংসতা বা ষড়যন্ত্রের পক্ষে ছিলেন না।

২০১৩ সালের ৫ ও ৬ মে রাজধানীর শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে নিহতের সঠিক সংখ্যাটি এখনও অজানা। ওই সময় হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে শাপলা চত্বরে গণহত্যা চালানোর অভিযোগ করে শত শত মানুষ নিহত হওয়ার দাবি করা হয়েছিল। তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এই সংখ্যাকে ‘অতিরঞ্জিত’ বলে দাবি করে বলেছিল যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভকারীদের উচ্ছেদ করেছে; এতে কেউ নিহত হয়নি। ওই ঘটনা নিয়ে মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’-এর প্রতিবেদন তৎকালীন শাসকবর্গকে ক্ষুব্ধ করে। অধিকারের সম্পাদক আদিলুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। মামলায় তাঁর শাস্তিও হয়।

জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পরে শাপলা চত্বরের ঘটনাটি নতুন করে সামনে আসে। সবশেষ গত ৫ মে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম এক ব্রিফিংয়ে জানান, শাপলা চত্বরের ঘটনা ঘিরে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে এখন পর্যন্ত ৫৮ জন নিহতের প্রমাণ পেয়েছে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। আগামী ১০ আগস্ট তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।

২০১৩ সালে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ এবং ২০২৪ সালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগে দায়ের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার চলছে। সেই দলটিই এখন আবার তাদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালানোর অভিযোগ আনছে।

সম্প্রতি ঢাকার অদূরে তুরাগ নদীতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ৭ নেতাকর্মীর লাশ পাওয়া গেছে—এমন অভিযোগে সোশ্যাল মিডিয়ায় তোলপাড় চলছে। বিপুল ফলোয়ার আছে, এমন আওয়ামীপন্থী ও তাদের অনুসারীদের অনেকেই এই ঘটনা শেয়ার দিয়েছেন। তুরাগ নদীর পানি লাল করে দিয়ে প্রতীক বানিয়ে লিখেছেন—রক্তাক্ত তুরাগ। কিন্তু পুলিশের তরফে বলা হচ্ছে, এটা গুজব। তবে গত ২২ জুন আশুলিয়া বাজারের কাছে ছাত্রলীগের মিছিল থেকে সাতজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। এর মধ্যে ২৪ ও ২৫ জুন তুরাগ থেকে তিনটি লাশ উদ্ধারের তথ্য দিয়ে পুলিশ দাবি করেছে, এদের সঙ্গে মিছিলের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

 

যে কারণেই ওই সাতজন কিংবা তিনজনের মৃত্যু হোক, সেটির নির্মোহ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। রাজনৈতিক কর্মী মারা গেলেই সেটি হত্যাকাণ্ড—এমন উপসংহারে পৌঁছানোরও সুযোগ নেই। অনেক সময় ব্যক্তিগত বিরোধেও খুনোখুনি হয়। কোন মৃত্যুর পেছনে কী কারণ, সেটি নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া জানা সম্ভব নয়।

 

প্রত্যক্ষদর্শীদের কেউ কেউ সাংবাদিকদের বলেছেন, পুলিশ ধাওয়া দিলে ৮-১০ জন ট্রলার থেকে ঝাঁপ দিয়ে নদীতে পড়েন। কিন্তু তারা রাজনৈতিক কর্মী কি না, তা নিশ্চিত নয়। এখানে লক্ষ্য করবার মতো ব্যপার হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সাধারণ নাগরিক, বিশেষ করে রাজনৈতিক কর্মীদের সম্পর্কের বৈরীতা। পুলিশ ধাওয়া দিলেই নদীতে ঝাঁপ দিতে হয় কেন? পুলিশ তো নিজেদের জনগণের বন্ধু বলে দাবি করে!

পুলিশের ধাওয়া খেয়ে ট্রলার থেকে যারা ঝাঁপ দিয়েছিলেন, তাদের সবাই কি নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কর্মী? তাদের সবাই কি সাঁতরে উঠতে পেরেছেন? সবাই সাঁতার জানতেন? এটা তো ঠিক, কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী হলেও কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না থাকলে কিংবা আদালতে অপরাধ প্রমাণের আগে কাউকে অপরাধী বলার সুযোগ নেই। পুলিশের ধাওয়ার মুখে তার মৃত্যুও কারও কাম্য নয়।

যে কারণেই ওই সাতজন কিংবা তিনজনের মৃত্যু হোক, সেটির নির্মোহ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। রাজনৈতিক কর্মী মারা গেলেই সেটি হত্যাকাণ্ড—এমন উপসংহারে পৌঁছানোরও সুযোগ নেই। অনেক সময় ব্যক্তিগত বিরোধেও খুনোখুনি হয়। কোন মৃত্যুর পেছনে কী কারণ, সেটি নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া জানা সম্ভব নয়। এজন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে যেরকম দক্ষ ও নির্মোহ হতে হয়। সেদিক থেকে বাংলাদেশে এখনও ব্যাপক ঘাটতি আছে, তাতে দ্বিমতের সুযোগ কম।

গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বেপরোয়া ব্যবহার করেছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নির্মূলে সর্বশক্তি প্রয়োগ করেছিল তারা। তবে গণঅভ্যুত্থানের পর জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় আসা বর্তমান সরকারকে প্রমাণ করতে হবে যে তারা সেই অতীত থেকে বের হয়ে এসেছে।

দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে ক্ষমতায় আসা সরকারের প্রধানমন্ত্রী শুরু থেকে যে অহিংস রাজনীতির বার্তা দিচ্ছেন, তা ব্যক্তি পর্যায় থেকে রাষ্ট্রের সকল পর্যায়ে প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। আওয়ামী লীগের পতনের পরপরই বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও ভিডিও বার্তায় সুস্পষ্টভাবে দলের নেতা-কর্মীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, যেন ক্ষমতাচ্যুত দলের নেতাকর্মী বা সমর্থকদের ওপর কোনো প্রতিহিংসামূলক আচরণ করা না হয়।

গত ২১ জুন মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘ওয়ান ইলেভেনের পরে এবং তার পরেও বিভিন্ন সময় কতগুলো ঘটনা ঘটছিল আমার সঙ্গে, কতগুলো ঘটনা ঘটেছে আমার মায়ের সঙ্গে, কতগুলো ঘটনা ঘটছে আমার ভাইয়ের সঙ্গে, বিভিন্ন ঘটনা ঘটেছে। আপনারা হয়তো ভুলে গেছেন, সেই সময় হয়তো অনেকেই দেখেছেন, কিন্তু এখন ভুলে গেছেন। আজকে এই মুহূর্তে বিএনপি দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আছে, আমি প্রাইম মিনিস্টার, আমি চাইলে ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে হয়তো প্রতিশোধ নিতে পারি, কিন্তু আমি যদি নেই– তাতে বেনিফিট কী হবে বলতে পারেন? কোনো বেনিফিট হবে কারো? কোনো বেনিফিট হবে না।’

যে সরকারের প্রধানমন্ত্রী রাজনৈতিক সহনশীলতার এমন বার্তা দেন, সেখানে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতিহিংসার কারণে হত্যার অভিযোগ ওঠাটাও অনাকাঙ্ক্ষিত। সরকারকে তথ্যপ্রমাণসহ সুস্পষ্টভাবে জানাতে হবে যে ক্ষমতাচ্যুত দলের তরফে যে অভিযোগ আনা হচ্ছে, তাতে সত্যতা কতটুকু। আবার জুলাই গণহত্যার অভিযোগে দায়ের মামলায় যাদের বিচার চলছে, তারা এখন সরকারের বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ তুলে নিজেদের অপরাধ হালকা করতে চাচ্ছে কি না; তারা নিজেরাই এখন জুলুমের শিকার—এমন দাবি করে জনগণের সহানুভূতি লাভের চেষ্টা করছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার।

এটাও মনে রাখতে হবে, প্রতিহিংসা দিয়ে সাময়িক সময়ের জন্য বিরোধী দল-মত দমন করে রাখা যায় কিংবা কিছু লোকের কণ্ঠ স্তব্ধ করে দেওয়া যায়; কিন্তু শেষ বিচারে তা বিরোধী কণ্ঠস্বরকে আরও শক্তিশালীই করে। রাষ্ট্র যখন যে দলের ওপর নিপীড়ন চালায়, সেই দলের প্রতি মানুষের সহানুভূতি বাড়ে। দলটি একসময় গণবিরোধী কাজ করলেও মানুষ তা ভুলে যায়। অর্থাৎ জালিম যখন মজলুমে পরিণত হয়, তখন মানুষ জালিমের জুলুম ভুলে গিয়ে তার প্রতি সহানুভূতিশীল হয়। সুতরাং জুলুমের দায়ে যাদের পতন হয়েছে, তাদের বিচার হতে হবে প্রচলিত আইনি কাঠামোয়। প্রতিহিংসা কোনো সমাধান নয়।

একজন নিকৃষ্ট অপরাধীর বিচারও হতে হয় সঠিক নিয়মে। তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হয়। একটি সভ্য রাষ্ট্র চাইলেই কোনো অপরাধীকে ধরে এনে বিনা বিচারে ফাঁসিতে ঝুলাতে বা ফায়ারিং স্কোয়াডে দিতে পারে না। কিন্তু যখনই এর ব্যত্যয় ঘটে; অপরাধীর প্রতি অবিচার করা হয়, তখন মানুষ মনে মনে ওই অপরাধীর প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে পড়ে। অর্থাৎ রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং সেটা যে ন্যায়বিচার হয়েছে, সে বিষয়ে জনমনে প্রতীতি জন্মানো জরুরি। কাজটি কঠিনও বটে।

  • আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক