মারুফা কলি
জলবায়ু সংকট মোকাবিলা ও জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নে নবায়নযোগ্য জ্বালানির রূপান্তর এখন বিশ্বজুড়ে নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রবিন্দুতে। বাংলাদেশও সেই পথে হাঁটছে। কিন্তু এই রূপান্তরের আলোচনায় একটি মৌলিক প্রশ্ন প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়—এই রূপান্তর কতটা ন্যায্য, এবং এর সুফল শেষ পর্যন্ত কারা ভোগ করবে?
বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসঙ্গ এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি আলোচিত। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি, আমদানি-নির্ভর জ্বালানির ব্যয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং জীবাশ্ম জ্বালানির সীমাবদ্ধতা আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোও এই রূপান্তরের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিচ্ছে। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন খুব কমই আলোচনায় আসে—নবায়নযোগ্য জ্বালানি কার হাতে থাকবে? এই রূপান্তর কি ন্যায্য ও অংশগ্রহণমূলক হবে, নাকি কেবল প্রযুক্তি ও জ্বালানির উৎস পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে?
নবায়নযোগ্য জ্বালানির পক্ষে থাকা এক বিষয়, আর সেই জ্বালানি ব্যবস্থার মালিকানা, নিয়ন্ত্রণ ও লাভ কার হাতে যাবে—সেটি আরেক বিষয়। সৌর বা বায়ুশক্তি ব্যবহার করলেই যে একটি ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে গণমুখী হয়ে উঠবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। বরং অনেক দেশে দেখা গেছে, জীবাশ্ম জ্বালানি-নির্ভর কর্পোরেট কাঠামোর জায়গায় একই ধরনের কর্পোরেট আধিপত্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির খাতেও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ অবস্থাকে অনেক বিশ্লেষক “সবুজ অলিগার্কি” বলে অভিহিত করেন।
সবুজ অলিগার্কি বলতে এমন একটি পরিস্থিতিকে বোঝায়, যেখানে নবায়নযোগ্য জ্বালানির নামে নতুন একদল প্রভাবশালী কর্পোরেট গোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় সুবিধা, জমি, ঋণ, কর অবকাশ এবং দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির মাধ্যমে বিপুল মুনাফা অর্জন করে, অথচ সাধারণ মানুষ সেই ব্যবস্থার মালিকানা বা সিদ্ধান্ত গ্রহণে কোনো ভূমিকা পায় না। প্রযুক্তির রং বদলায়, কিন্তু ক্ষমতার কাঠামো অপরিবর্তিত থাকে।
বাংলাদেশের জন্য এই সতর্কতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমাদের জ্বালানি খাতের সাম্প্রতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা বেড়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে বেড়েছে অস্বচ্ছ চুক্তি, ক্যাপাসিটি পেমেন্ট, অতিরিক্ত ব্যয় এবং জনস্বার্থবিরোধী নানা বিতর্ক। নবায়নযোগ্য জ্বালানি যদি একই ধরনের ক্ষমতা কাঠামো ও মুনাফাকেন্দ্রিক ব্যবস্থার ওপর দাঁড়ায়, তাহলে প্রযুক্তি বদলাবে ঠিকই, কিন্তু ক্ষমতার বিন্যাস অপরিবর্তিত থেকে যাবে।
বিদ্যুৎ খাতে অস্বচ্ছ ব্যয়, চুক্তিনির্ভর মুনাফা এবং জবাবদিহির ঘাটতির যথাযথ পর্যালোচনা ও সংস্কার ছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানিও বিদ্যমান সমস্যার নতুন রূপে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি বহন করে। অর্থাৎ জ্বালানির উৎস বদলালেও যদি নীতি, মালিকানা ও জবাবদিহির কাঠামো অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে জনগণের জন্য বাস্তব পরিবর্তন খুব সামান্যই হবে।
প্রশ্ন হলো, আমরা কি শুধু কয়লার জায়গায় সৌরবিদ্যুৎ বসাতে চাই, নাকি জ্বালানি ব্যবস্থার চরিত্রও বদলাতে চাই?
বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো জমি। বৃহৎ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য বিপুল পরিমাণ জমির প্রয়োজন হয়। কৃষিজমি, চরাঞ্চল কিংবা স্থানীয় জনগণের ব্যবহারাধীন ভূমি যদি পর্যাপ্ত সামাজিক ও পরিবেশগত মূল্যায়ন ছাড়া জ্বালানি প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ করা হয়, তাহলে জলবায়ুবান্ধব প্রযুক্তিও নতুন ধরনের সামাজিক বৈষম্য তৈরি করতে পারে। ফলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির পরিকল্পনায় শুধু উৎপাদন নয়, ভূমি অধিকার, জীবিকা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
একটি বৃহৎ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প যদি হাজার একর কৃষিজমি দখল করে, বিদেশি ঋণে নির্মিত হয়, গোপন চুক্তির মাধ্যমে পরিচালিত হয় এবং স্থানীয় জনগণ সেখানে মালিকানা, কর্মসংস্থান কিংবা সাশ্রয়ী বিদ্যুতের কোনো সুবিধা না পায়, তাহলে সেটিকে কতটা জনমুখী রূপান্তর বলা যাবে? পরিবেশগত দিক থেকে তা জীবাশ্ম জ্বালানির তুলনায় ভালো হতে পারে, কিন্তু সামাজিক ন্যায়বিচারের দিক থেকে প্রশ্ন থেকেই যায়।
অন্যদিকে, যদি কোনো গ্রামে কৃষক সমবায় সৌরচালিত সেচ ব্যবস্থা পরিচালনা করে, যদি বিদ্যালয়, হাসপাতাল ও সরকারি ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়, যদি স্থানীয় মাইক্রোগ্রিডের মাধ্যমে মানুষ নিজেই বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ব্যবহার করতে পারে, তাহলে জ্বালানি রূপান্তরের অর্থ সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়ে দাঁড়ায়। সেখানে মানুষ শুধু ভোক্তা নয়, অংশীদারও।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় বিকেন্দ্রীভূত নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থার সম্ভাবনা অত্যন্ত বড়। ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, কৃষি-সৌর ব্যবস্থা, সৌরচালিত সেচ পাম্প, স্থানীয় মাইক্রোগ্রিড এবং সমবায়ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুধু বিদ্যুৎ সরবরাহের নতুন উৎস নয়; এগুলো স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী করারও সুযোগ তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ বা নেট মিটারিং ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা দেখায় যে সাধারণ মানুষও জ্বালানি উৎপাদনের অংশীদার হতে পারে। একটি কারখানা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা আবাসিক ভবন নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে পারে। এই মডেল কেবল বিদ্যুতের চাপ কমায় না, বরং জ্বালানি ব্যবস্থাকে আরও গণতান্ত্রিক করে। ভবিষ্যতের জ্বালানি নীতিতে তাই বড় প্রকল্পের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও বিকেন্দ্রীভূত উদ্যোগের জন্যও সমান গুরুত্ব থাকা প্রয়োজন।
এক্ষেত্রে নীতিনির্ধারকদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকে কেবল বিনিয়োগের ক্ষেত্র হিসেবে না দেখে জনকল্যাণমূলক অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করা। রাষ্ট্র যদি শুধু বড় বিনিয়োগকারীদের সুবিধা দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতও ধীরে ধীরে কেন্দ্রীভূত ও একচেটিয়া হয়ে উঠবে।
একই সঙ্গে জ্বালানি রূপান্তরের প্রশ্নকে কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি, বিদ্যুতের অপচয় কমানো, শিল্পখাতে দক্ষ প্রযুক্তির ব্যবহার, স্মার্ট গ্রিড উন্নয়ন এবং চাহিদা ব্যবস্থাপনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের চেয়ে বিদ্যমান ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি বেশি সাশ্রয়ী এবং পরিবেশবান্ধব সমাধান হতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গ্রিড আধুনিকায়ন। সৌর ও বায়ুশক্তির উৎপাদন সবসময় সমান থাকে না। তাই স্মার্ট গ্রিড, বিদ্যুৎ সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং উন্নত ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি ছাড়া বড় পরিসরে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্ভব নয়। কিন্তু প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের পাশাপাশি নীতিগত পরিবর্তনও সমান জরুরি। কারণ প্রযুক্তি নিজে কখনো ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে না; সেটি নির্ভর করে কারা প্রযুক্তির মালিক এবং কারা তার সুবিধা পায়।
জ্বালানি রূপান্তরের সঙ্গে ন্যায়বিচারের প্রশ্ন যুক্ত হওয়ার আরেকটি কারণ হলো ব্যয়ের বণ্টন। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের খরচ, অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা গ্রিড উন্নয়নের ব্যয় শেষ পর্যন্ত কারা বহন করবে? যদি মুনাফা কর্পোরেট গোষ্ঠীর হাতে যায় কিন্তু ব্যয়ের বোঝা সাধারণ ভোক্তার ওপর বর্তায়, তাহলে সেই রূপান্তরকে ন্যায্য বলা কঠিন। ফলে জ্বালানি নীতিতে স্বচ্ছতা, জনশুনানি এবং সামাজিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশে জ্বালানি রূপান্তরের আলোচনায় তাই কেবল মেগাওয়াটের হিসাব যথেষ্ট নয়। প্রশ্ন করতে হবে—কে মালিক হবে? কে সিদ্ধান্ত নেবে? কে লাভ পাবে? আর কে ঝুঁকি বহন করবে?
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখন “জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন” বা ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তরের ধারণা গুরুত্ব পাচ্ছে। এর মূল কথা হলো—জ্বালানির উৎস পরিবর্তনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সুযোগ, সামাজিক সুরক্ষা, স্থানীয় অংশগ্রহণ এবং জনগণের অধিকার নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের জ্বালানি রূপান্তরও যদি সত্যিকার অর্থে টেকসই হতে চায়, তাহলে এই ন্যায়ভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গিকে কেন্দ্রে করেই ভবিষ্যৎ নীতি ও পরিকল্পনা গড়ে তুলতে হবে।
জলবায়ু সংকটের এই সময়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকল্প নেই। কিন্তু সেই রূপান্তর যদি জনগণের অংশগ্রহণ, স্থানীয় মালিকানা, জবাবদিহি এবং সামাজিক ন্যায়ের ভিত্তিতে না হয়, তাহলে আমরা জীবাশ্ম অলিগার্কির পরিবর্তে নতুন এক সবুজ অলিগার্কির জন্ম দিতে পারি।
বাংলাদেশের সামনে তাই দুটি পথ খোলা। একদিকে কর্পোরেট-নিয়ন্ত্রিত সবুজ রূপান্তর, অন্যদিকে জনগণমুখী, বিকেন্দ্রীভূত ও ন্যায়ভিত্তিক জ্বালানি ব্যবস্থা। আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে—আমরা কি শুধু জ্বালানির উৎস বদলাতে চাই, নাকি জ্বালানি ব্যবস্থার চরিত্রও বদলাতে চাই?
কারণ প্রকৃত রূপান্তর কেবল প্রযুক্তির পরিবর্তন নয়; এটি ক্ষমতা, মালিকানা ও ন্যায্যতার পুনর্বিন্যাসের প্রশ্নও। ন্যায়বিচারহীন রূপান্তর শেষ পর্যন্ত শুধু জ্বালানির মোড়ক বদলায়, মানুষের বাস্তবতা নয়।
- মারুফা কলি: প্রকল্প ব্যবস্থাপক, জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন, কনজুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)