সৈয়দ মিসবাহ উদ্দিন আহমদ
কৈশোরে বাংলা ব্যাকরণ পড়তে গিয়ে আমরা অনেকেই কারক, বিভক্তি, সমাস আর সন্ধির জটিল জগতে প্রবেশ করেছি। তখন হয়তো পরীক্ষার খাতায় নম্বর পাওয়ার জন্যই এসব মুখস্থ করতাম। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উপলব্ধি হয়েছে, বাংলা ব্যাকরণ শুধু ভাষা শেখায় না, জীবন ও সমাজ বোঝারও একটি চমৎকার হাতিয়ার। ‘রাজনীতি’ শব্দটিও তেমনই একটি শব্দ।
অনেকে মনে করেন, রাজনীতি মানে ‘রাজার নীতি’—অর্থাৎ ক্ষমতাসীন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ইচ্ছা ও পরিকল্পনার সমষ্টি। কিন্তু শব্দটির গভীরে প্রবেশ করলে ভিন্ন একটি অর্থের সন্ধান পাওয়া যায়। ব্যাকরণের আলোকে বলা যায়, রাজনীতি আসলে ‘নীতির রাজা’। অর্থাৎ এমন নীতি, যা অন্যান্য নীতির মধ্যে শ্রেষ্ঠ; এমন আদর্শ, যা ব্যক্তিগত স্বার্থ, দলীয় সংকীর্ণতা কিংবা ক্ষণস্থায়ী সুবিধার ঊর্ধ্বে অবস্থান করে সমাজ ও রাষ্ট্রের সামগ্রিক কল্যাণ নিশ্চিত করে।
এই কারণেই প্রকৃত রাষ্ট্রনায়ক ও সাধারণ রাজনীতিকের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, যেসব নেতা যুগ অতিক্রম করে মানুষের স্মৃতিতে অমর হয়ে আছেন, তারা কেবল ক্ষমতা অর্জনের জন্য রাজনীতি করেননি; বরং রাজনীতিকে নৈতিকতার সর্বোচ্চ প্রকাশের রূপ দিয়েছিলেন। তাদের সিদ্ধান্ত, কর্মসূচি ও রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতি এমন এক নৈতিক উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত ছিল, যা সমসাময়িকদের তুলনায় অনন্য হয়ে উঠেছিল। তাদের অনুসৃত নীতিগুলো ছিল সত্যিকার অর্থেই ‘নীতির রাজা’।
প্রাচীন প্রবাদ আছে, ‘গাছের পরিচয় ফলে, মানুষের পরিচয় কর্মে।’ রাষ্ট্রনায়কদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই। বক্তৃতা, স্লোগান বা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নয়; বরং সংকটের সময় নেওয়া সিদ্ধান্তই একজন নেতার প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ করে। ক্ষমতায় থাকাকালে তিনি নিজের জন্য কী অর্জন করলেন, তা ইতিহাস খুব বেশি মনে রাখে না; কিন্তু জাতির জন্য কী রেখে গেলেন, ইতিহাস সেটিই লিপিবদ্ধ করে।
রাজনীতির এই নৈতিক ভিত্তি হারিয়ে গেলে কী ঘটে?
তখন রাজনীতি ‘নীতির রাজা’ থেকে ‘রাজার নীতি’-তে পরিণত হয়। অর্থাৎ নীতি আর উদ্দেশ্য নয়; বরং ক্ষমতা রক্ষার একটি যন্ত্রে রূপান্তরিত হয়। তখন নৈতিকতা পরিস্থিতি অনুযায়ী বদলায়, আদর্শ সুবিধা অনুযায়ী রঙ পরিবর্তন করে, আর জনকল্যাণ পরিণত হয় রাজনৈতিক স্লোগানে।
ইংরেজি একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ আছে- ‘পাওয়ার টেন্ডস টু কারাপ্ট, অ্যান্ড অ্যাবসোলিউট পাওয়ার কারাপ্টস অ্যাবসোলিউটলি’-অর্থাৎ, ক্ষমতা মানুষকে দুর্নীতিগ্রস্ত করার প্রবণতা সৃষ্টি করে, আর সীমাহীন ক্ষমতা সেই প্রবণতাকে পূর্ণতা দেয়। কিন্তু ইতিহাস একই সঙ্গে এটাও দেখিয়েছে যে নৈতিকতার শক্তি ক্ষমতার শক্তির চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী।
সিংহাসন টিকে থাকে কয়েক বছর, আদর্শ টিকে থাকে কয়েক প্রজন্ম।
এই কারণেই সফল রাষ্ট্রনায়কদের জীবনী পড়া জরুরি। তাদের সাফল্যের পেছনে কৌশল, অর্থনীতি বা সামরিক শক্তির ভূমিকা অবশ্যই ছিল; কিন্তু তারও আগে ছিল একটি স্পষ্ট নৈতিক কম্পাস। তারা জানতেন কোথায় আপস করা যায়, আর কোথায় আপস করা যায় না। কারণ যে নীতি সবকিছুর সঙ্গে আপস করে, সে আর নীতি থাকে না; সে কেবল সুবিধাবাদের অন্য নাম হয়ে যায়।
বাংলা ভাষায় আরেকটি কথা আছে—‘নদী নিজের জন্য জল বহন করে না, বৃক্ষ নিজের জন্য ফল দেয় না।’ রাষ্ট্রনায়কের ক্ষেত্রেও একই সত্য প্রযোজ্য। তিনি যদি কেবল নিজের ক্ষমতা, পরিবার বা দলের স্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন, তবে তিনি শাসক হতে পারেন, কিন্তু রাষ্ট্রনায়ক হতে পারেন না। রাষ্ট্রনায়ক সেই ব্যক্তি, যার দৃষ্টি নিজের সময়কে অতিক্রম করে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পর্যন্ত পৌঁছায়।
আজকের বিশ্বে রাজনীতির সংকট মূলত নেতৃত্বের সংকট নয়; বরং নীতির সংকট। কৌশল আছে, পরিকল্পনা আছে, প্রচার আছে, প্রযুক্তি আছে—কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই নৈতিক উচ্চতার ঘাটতি রয়েছে। ফলে মানুষ রাজনীতির প্রতি আস্থা হারায়, প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয় এবং সমাজ বিভক্ত হয়ে পড়ে।
এখানেই ‘রাজনীতি’ শব্দটির ব্যাকরণিক পাঠ নতুন তাৎপর্য নিয়ে ফিরে আসে।
যদি রাজনীতি সত্যিই নীতির রাজা হয়, তবে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হবে সত্য, ন্যায়, জবাবদিহি ও জনকল্যাণ। আর যদি রাজনীতি রাজার নীতিতে পরিণত হয়, তবে ক্ষমতাই হয়ে উঠবে একমাত্র সত্য।
একজন শিক্ষক যেমন ব্যাকরণের ভুল সংশোধন করেন, তেমনি জনগণও সময়ে সময়ে রাজনীতির ভুল সংশোধন করে।
সুতরাং রাজনীতিকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার প্রয়োজন নেই; বরং এর প্রকৃত অর্থটি স্মরণ করার প্রয়োজন আছে। রাজনীতি ক্ষমতার খেলা নয়, নীতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার শিল্প। রাজনীতি কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর একচ্ছত্র সম্পত্তি নয়; এটি জাতির সম্মিলিত নৈতিক যাত্রার নাম।
সমাপ্তি টানি একবিংশ শতাব্দীর এক অমোঘ সত্যে—ক্ষমতা মানুষকে মহিমান্বিত করে না, বরং নীতিই ক্ষমতাকে অর্থবহ করে তোলে। যখন নীতি ক্ষমতার ঊর্ধ্বে স্থান পায়, তখন জন্ম নেন একজন 'রাষ্ট্রনায়ক'; আর নীতি যখন ক্ষমতার নিচে চাপা পড়ে, তখন কেবল একজন 'শাসক'-এরই দম্ভ প্রকাশ পায়।