Image description

ওলিউর রহমান

 

মক্কার সভাগৃহ দারুন নদওয়াতে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক চলছে৷ আলোচনার বিষয় মুহাম্মদ (সা.)-এর ব্যাপারে চূড়ান্ত ফায়সালা গ্রহণ করা। শোনা যাচ্ছে, যেকোনো মুহূর্তে তিনি মক্কা ছেড়ে মদিনায় চলে যাবেন। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হলো, মুহাম্মদ (সা.)-কে হত্যা করা হবে। কোরায়শের সকল শাখা গোত্র এই হত্যা মিশনে শামিল হবে৷

সিদ্ধান্ত মোতাবেক এক রাত্রে অস্ত্র হাতে রাসুল (সা.)-এর বাড়ি ঘেরাও করল আরবের উদ্যত যুবকেরা। রাসুল (সা.) সেই ঘেরাও এর মধ্য থেকেই অলৌকিকভাবে বেরিয়ে এলেন সকলের সামনে দিয়ে। শুরু করলেন মদিনার উদ্দেশে হিজরত।

আক্ষরিক অর্থে হিজরত হলো স্থানান্তর হওয়া। তবে ইসলামের ইতিহাসে হিজরত কেবল একটি স্থান পরিবর্তনের ঘটনা নয়, বরং এটি ছিল একটি যুগের পরিবর্তন, এক নতুন সভ্যতার ভিত্তিপ্রস্তর। ইসলামের প্রচার, প্রসার এবং মুসলিম উম্মতের একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশের পেছনে হিজরতের ভূমিকা অপরিসীম। আর এই ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখতেই প্রবর্তিত হয়েছে হিজরি সাল।

আজ নতুন হিজরি বর্ষে দাঁড়িয়ে আমরা প্রকৃতপক্ষে স্মরণ করি সেই রাসূল সা. এর সেই হিজরতকে।

মক্কা ছিল রাসুল (সা.)-এর জন্মভূমি। সেখানে তাঁর শৈশব, কৈশোর, যৌবনের দিনগুলো কেটেছে। সেখানে ছিল পবিত্র কাবা ঘর। পূর্বপুরুষের সমাধি। আত্মীয়স্বজনের বসবাস। কিন্তু কোরাইশদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে এইসব কিছু ছেড়ে তাঁকে পাড়ি জমাতে হয়েছে নতুন এক গন্তব্যে৷

হিজরি সালের প্রবর্তন

রাসুল (সা.)-এর হিজরতের ঘটনাকে কেন্দ্র করেই পরবর্তীতে হিজরি সন বা ইসলামি পঞ্জিকার গণনা শুরু হয়। তবে এই সাল গণনা কিন্তু রাসুল (সা.)-এর জীবদ্দশায় শুরু হয়নি।

ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর খিলাফতকালে রাসুল (সা.)-এর হিজরতের ১৭তম বছরে এই নতুন বর্ষ গণনার আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়।

পদ্ধতি ও প্রেক্ষাপট

ইসলামি সাম্রাজ্য যখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন দাপ্তরিক চিঠিপত্র ও নথিপত্রে সুনির্দিষ্ট তারিখ না থাকায় বেশ জটিলতা তৈরি হতো। এই সমস্যার সমাধানের জন্য হযরত উমর (রা.) সাহাবিদের নিয়ে একটি পরামর্শ সভার আয়োজন করেন।

কেউ কেউ রাসুল (সা.)-এর জন্মের বছর থেকে সাল গণনার প্রস্তাব করেন। কেউ আবার তাঁর নবুয়ত প্রাপ্তির বছরটিকে বেছে নেওয়ার কথা বলেন।

অবশেষে হযরত আলী (রা.) প্রস্তাব করেন, ইসলামের ইতিহাসে হিজরতের ঘটনাটি যেহেতু মুসলিমদের বিজয়ের পথ সুগম করেছিল, তাই হিজরতের বছর থেকেই ইসলামি ক্যালেন্ডার শুরু করা উচিত।

খলিফা হযরত উমরসহ (রা.) সব সাহাবি এই প্রস্তাবে একমত হন এবং ৬২২ খ্রিস্টাব্দকে ১ম হিজরি বছর ধরে ইসলামি সাল গণনা শুরু হয়।

হিজরি সনের কিছু বৈশিষ্ট্য

চন্দ্রভিত্তিক গণনা: হিজরি সাল চাঁদের পরিক্রমার ওপর নির্ভরশীল। চাঁদের ঘূর্ণন চক্রের ওপর ভিত্তি করে হিজরি মাসগুলো ২৯ বা ৩০ দিনে হয়ে থাকে।

বছরের দৈর্ঘ্য: চন্দ্র বছর সাধারণত ৩৫৪ বা ৩৫৫ দিনের হয়। ফলে সৌর বছরের চেয়ে হিজরি বছর ১০ থেকে ১১ দিন কম হয়।

মুসলিম জীবনে হিজরি সালের গুরুত্ব

হিজরি সাল ও আরবি মাস মুসলমানদের ধর্মীয় জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। রমজানের রোজা, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, হজ, শবে কদর, শবে বরাতসহ ইসলামের মূল ইবাদত ও উৎসবগুলোর তারিখ নির্ধারিত হয় এই হিজরি ক্যালেন্ডার অনুসারেই।

হিজরত আমাদের শেখায় সত্য ও ন্যায়ের জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে। আর হিজরি সাল প্রতিবছর আমাদের মনে করিয়ে দেয় সেই মহান ত্যাগের ইতিহাস, যা মানব সভ্যতার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।

  • মাওলানা ওলিউর রহমান: শিক্ষক, মাদরাসাতুল মুত্তাকীন, উত্তরা, ঢাকা