Image description

একটি দেশ কী চাইলেই তার জনসংখ্যার জন্য একটা কোটা সীমা নির্ধারণ করে দিতে পারে? শুনতে অনেকটা অস্বাভাবিক মনে হলেও জনসংখ্যার সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারন করে দিতে যাচ্ছে আলপাইন রাষ্ট্র সুইজারল্যান্ড। রবিবার (১৪ জুন) দেশটির কট্টর ডানপন্থি পিপলস পার্টি কতৃক উত্থাপিত জনসংখ্যা ১০ মিলিয়নের কোটায় রাখার প্রস্তাবে ভোট দিবেন দেশটির নাগরিকেরা। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাবটি যদি শেষ পর্যন্ত ভোটারদের সমর্থনে পাস হয়ে যায়, তবে দেশটির অর্থনীতির ওপর এর বিধ্বংসী ও মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে বলে সতর্ক করেছেন অর্থনীতিবিদ ও সরকারের নীতিনির্ধারকেরা। খবর গার্ডিয়ানের

সুইজারল্যান্ডের প্রত্যক্ষ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার নিয়ম অনুযায়ী, ১৮ মাসের মধ্যে ১ লাখ মানুষের স্বাক্ষর বা সমর্থন পাওয়া গেলে যেকোনো নাগরিক প্রস্তাবের ওপর দেশব্যাপী গণভোট আয়োজন করা যায়। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়েই অভিবাসনবিরোধী এবং দেশটির সংসদের বৃহত্তম দল এসভিপি এই পপুলিস্ট প্রস্তাবটি সামনে আনে।

যদি গণভোটে এই প্রস্তাবের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হয়, তবে সুইস সরকারকে ২০৫০ সালের মধ্যে দেশের জনসংখ্যা কঠোরভাবে ১ কোটির নিচে ধরে রাখার জন্য আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। নতুন এই প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০৫০ সালের আগেই যদি সুইজারল্যান্ডের জনসংখ্যা ৯৫ লাখে পৌঁছে যায়, তবে সরকার অবিলম্বে অভিবাসীদের পারিবারিক পুনর্মিলন, নতুন রেসিডেন্সি পারমিট বা বসবাসের অনুমতি এবং রাজনৈতিক আশ্রয় বা অ্যাসাইলাম দেওয়ার ক্ষেত্রে চরম কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করতে বাধ্য থাকবে। 

এমনকি এরপরেও যদি জনসংখ্যা ১ কোটির সীমা ছাড়িয়ে যায়, তবে এসভিপির এই প্রস্তাব অনুযায়ী সুইজারল্যান্ড ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে করা মুক্ত চলাচল চুক্তি থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হবে। যার অর্থ দাঁড়াবে, ইইউ-এর একক বাজারে সুইস পণ্যের প্রবেশাধিকার সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়া।

উল্লেখ্য, ২০০২ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত চলাচল চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর থেকে সুইজারল্যান্ডের জনসংখ্যা তার প্রতিবেশী অন্যান্য ইইউ দেশগুলোর তুলনায় অনেক দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত দুই দশকে দেশটির জনসংখ্যা বেড়েছে প্রায় ২৩ শতাংশ, যার সমান্তরালে দেশের অর্থনৈতিক উৎপাদনও বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ২৪ শতাংশ। বর্তমানে সুইজারল্যান্ডের মোট বাসিন্দাদের মধ্যে প্রায় ২৭ শতাংশই সে দেশের নাগরিক নন, যাদের একটি বড় অংশ ইইউ ভুক্ত বিভিন্ন দেশ থেকে আসা কর্মী।

জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের পক্ষে প্রচার চালানো দল এসভিপি-এর দাবি, ‘অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসনের কারণে সুইজারল্যান্ড অত্যন্ত দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার নেতিবাচক প্রভাব আবাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণপরিবহন এবং জনকল্যাণমূলক খাতসহ নাগরিক জীবনের সব ক্ষেত্রে স্পষ্ট অনুমেয়।’ তবে এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেছে সুইজারল্যান্ডের চার দলের সমন্বয়ে গঠিত সরকারের সাত সদস্যের মন্ত্রিসভা। 

তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, কৃত্রিম উপায়ে জনসংখ্যা বেঁধে দেওয়ার এই চেষ্টা জাতীয় স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলবে এবং দেশের সমৃদ্ধি ও অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেবে। দেশটির সংসদের উভয় কক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য, সুইস ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন, সুইস এমপ্লয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন এবং প্রধান ব্যবসায়িক সংগঠন ‘ইকোনমিসুইস’ যৌথভাবে এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার জন্য ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

জেনেভা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংখ্যা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ফিলিপ ওয়ানার জানান, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ অভিবাসন সীমিত করলেও, কোনো দেশ সরাসরি গণভোটের মাধ্যমে নিজেদের জনসংখ্যা নির্দিষ্ট সংখ্যায় আটকে দেওয়ার প্রস্তাব এর আগে কখনো আনেনি। অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের মতোই সুইজারল্যান্ডে বর্তমানে জন্মহার হ্রাস পাচ্ছে এবং কর্মক্ষম মানুষের তুলনায় বয়স্ক মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। 

প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০৫৫ সালের মধ্যে দেশটির মোট জনসংখ্যার ২৫ শতাংশের বেশি মানুষের বয়স ৬৫ বছরের ওপরে হবে, যার ফলে শ্রমবাজার সচল রাখতে সুইজারল্যান্ডের জন্য বিদেশি কর্মীদের আগমন অত্যন্ত জরুরি।

সাম্প্রতিক ওপেনিয়ন পোল বা জনমত জরিপগুলোতে দেখা যাচ্ছে যে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে এই গণভোটের ঘোষণার পর থেকে এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ‘না’ ভোটের প্রচারণাকারীরা কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, ‘না’ পক্ষ প্রায় ৫২ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হতে পারে বলে আভাস দেওয়া হচ্ছে, যা একটি তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লড়াইয়ের ইঙ্গিত দেয়। 

সাধারণত সুইজারল্যান্ডের প্রায় ৯০ শতাংশ ভোটার ডাকযোগের মাধ্যমে আগেভাগেই ভোট দিয়ে থাকেন, তবে মূল ভোটকেন্দ্রগুলো আগামীকাল রবিবার সাময়িকভাবে খোলা থাকবে। প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হতে হলে কেবল জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পেলেই হবে না, বরং সুইজারল্যান্ডের ২৩টি পূর্ণ ক্যান্টন এবং ৬টি হাফ-ক্যান্টনের (প্রাদেশিক প্রশাসনিক অঞ্চল) মধ্যেও সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলের সমর্থন পেতে হবে। সব ঠিক থাকলে আগামীকাল রোববার বিকেল নাগাদ এই ঐতিহাসিক গণভোটের চূড়ান্ত ফলাফল জানা যাবে।