২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনে ভূমিধস পরাজয়ের পর তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) ভেতর থেকে ভেঙে পড়ছে। লোকসভায় তাদের ২৮ এমপির ২০ জন এখন বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটকে সমর্থন করছেন।
পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি এবং বিজেপির মধ্যে এখন আর কোনো সুসম্পর্ক অবশিষ্ট নেই। এমন সময়ে মমতার মতো একজন পোড়খাওয়া রাজনীতিক বিজেপির প্রতি সৌজন্য দেখাবেন ভাবাটা অবাস্তব। দলের এমন অস্তিত্বের সংকটের মুহূর্তে তাঁর পক্ষে সবকিছু করাই স্বাভাবিক।
তবে একটি বিষয়ে কোনো আপস নয়। মমতা বা ভারতের যেকোনো রাজনীতিকের দেশের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করা অনুচিত।
বাংলাদেশের ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান হাদির খুনি এবং ভারত কানেকশন নিয়ে মমতা প্রকাশ্যেই কথা বলেছেন। তাঁর এই পদক্ষেপ বিজেপি সরকারকে বিব্রত করার চেয়ে ভারতকে একটি ভূরাজনৈতিক সংকটে ফেলেছে বেশি। মমতার এই পদক্ষেপ তাঁর দলের কফিনে শেষ পেরেক হতে পারে।
মমতা কী জানেন?
গত মঙ্গলবার (২ জুন) কলকাতার ধর্মতলায় ওয়াই-চ্যানেলে ধরনা কর্মসূচিতে মমতা ব্যানার্জি দাবি করেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ হাদি হত্যা সংক্রান্ত যেকোনো তথ্য প্রকাশ করতে তাঁকে নিষেধ করেছিলেন।
২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বরে ঢাকার পল্টনে রিকশায় যাওয়ার সময় শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করে সন্ত্রাসীরা। পরে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর তিনি মারা যান। তাঁর গুলিবিদ্ধ হওয়ার সময় থেকেই বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়। হাদিকে ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী লড়াইয়ের এক সেনাপতির আসন দেন বাংলাদেশিরা। হাদির মৃত্যুর পর ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের বাইরে বিক্ষোভ হয়।
সংবাদ প্রতিবেদনের মতে, রাজশাহীতে বিক্ষোভকারীরা ভারতীয় আঞ্চলিক কূটনীতিকের কার্যালয়ের দিকে যাওয়ার সময় পুলিশের বাধার মুখে পড়ে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিওতে বিক্ষুব্ধ জনতাকে ভারতীয় সহকারী হাইকমিশন কার্যালয়ের কাছে পাথর নিক্ষেপ করতে দেখা যায়।
ওই বছরের ১৪ ডিসেম্বর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, ভারত কখনোই নিজেদের ভূখণ্ডকে বন্ধুপ্রতিম বাংলাদেশি জনগণের স্বার্থবিরোধী কাজে ব্যবহার করতে দেয়নি। ভারত আশা করে, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
এরপর এই বছরের ৮ মার্চ হাদি হত্যা মামলার দুই প্রধান অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদ এবং আলমগীর হোসেনকে আটক করা হয়। পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার সীমান্ত এলাকা বনগাঁ থেকে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্কফোর্স তাদের আটক করে।
পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ বিবৃতিতে জানায়, অভিযুক্তরা মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করেছিল। ভারতের বিভিন্ন স্থানে ঘোরাঘুরি করে অবশেষে তারা বনগাঁয় পৌঁছায়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের নতুন সরকার দিল্লি এবং ঢাকার সম্পর্ক মেরামতের চেষ্টা করছে। হাদির খুনিদের গ্রেপ্তারের খবর দুই দেশের জন্যই ইতিবাচক ছিল।
অনর্থ মমতা ব্যানার্জির
দৃশ্যপটে প্রবেশের আগে পরিস্থিতি ইতিবাচকই ছিল। হাদির নাম উল্লেখ না করেই মমতা দাবি করেন, বাংলাদেশে একটি বড় হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে তাঁর কাছে তথ্য রয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের পশ্চিমবঙ্গে গ্রেপ্তারের পর অমিত শাহ তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে ফোন করেন। শাহ তাঁকে এই খবর চেপে যেতে বলেন।
মমতা আরও দাবি করেন, এই বিষয়ে এতদিন দেশের কথা ভেবে কিছু বলেননি। এখন বলছেন কারণ অত্যাচার সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘আমি এখনো মূল হোতার নামটা বলছি না, কারণ সেই নাম বললে পুরো বাংলাদেশ উত্তাল হয়ে যাবে। দেশের স্বার্থেই ওই নাম বলব না।’
চেটউড নীতিকে উল্টে দেওয়া
মমতার এই বক্তব্য বাংলাদেশে নতুন করে ভারতবিরোধী মনোভাব উসকে দিচ্ছে। সাংবাদিক সালাহ উদ্দিন শোয়েব চৌধুরী সামাজিক মাধ্যম এক্সে শেয়ার করা ভিডিওর ক্যাপশনে লেখেন, মমতার বক্তব্য ইসলামি গোষ্ঠীগুলোকে আরও সাহসী করে তুলেছে।
গত ৩ জুন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জানান, মমতার বক্তব্যের কোনো জবাব দেবে না ঢাকা। তিনি বলেন, ‘অন্য একটি দেশে নির্বাচন হয়েছে এবং একজন রাজনৈতিক নেতা কিছু মন্তব্য করেছেন। এটি আমাদের আলোচনার বিষয় নয়।’
দ্য টেলিগ্রাফ প্রতিবেদনের মতে, এর তাৎক্ষণিক কূটনৈতিক প্রভাব হয়তো সীমিত। বাংলাদেশ এই বিষয় এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। তবে এই ঘটনা প্রমাণ করে দক্ষিণ এশিয়ায় অমীমাংসিত রাজনৈতিক বিতর্ক কত দ্রুত সীমান্ত অতিক্রম করতে পারে।
ঢাকা এবং দিল্লি সম্পর্ক মেরামতের চেষ্টার প্রধান বিষয় হলো ভারত-বাংলাদেশ গঙ্গা পানি চুক্তি। আগামী ডিসেম্বরে চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে নতুন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশের বিরোধী দলের নেতারাও ভারতবিরোধী মনোভাব উসকে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম প্রতিবেদন করছে, পশ্চিমবঙ্গের মসনদে বসেই বিজেপি সরকারের বুলডোজার অভিযান মূলত মুসলিমবিরোধী।
এমন স্পর্শকাতর ও জটিল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জনপ্রতিনিধির আচরণ দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন। এই জায়গাতেই একজন আদর্শ নেতার জাতীয় কর্তব্য ও নৈতিকতার প্রশ্ন সামনে আসে। সরকারি পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তির জন্য ইন্ডিয়ান মিলিটারি একাডেমির ‘চেটউড নীতি’ পবিত্র বলে গণ্য হওয়া উচিত। চেটউড নীতি অনুযায়ী, দেশের নিরাপত্তা, সম্মান ও কল্যাণ সবার আগে। যেকোনো পরিস্থিতিতেই দেশের স্বার্থ সবার ওপরে।
কিন্তু স্বরাজ্য পত্রিকার সাবেক রাজনৈতিক সম্পাদক জয়দীপ মজুমদারের মতে, মমতা সব সময় চেটউড নীতি উল্টোভাবে অনুসরণ করেছেন। মমতার কাছে নিজের রাজনৈতিক স্বার্থ সবার আগে। এরপর আসে তাঁর পরিবার, তারপর তাঁর দল এবং সবশেষে দেশ।
তিনি আরও বলেন, হাদি হত্যাকাণ্ড নিয়ে মমতার অভিযোগ শুধু বিদ্বেষপূর্ণই নয়, বরং দেশবিরোধী। রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য দেশের স্বার্থকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে তাঁর কোনো দ্বিধা নেই।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্ট থেকে অনূদিত