Image description

ফয়সাল আহমেদ

পরিবেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে নদী। এই নদীর ভালো থাকার, না থাকার ওপর নির্ভর করে পরিবেশের ভালো মন্দ। আমাদের পরিবেশের সার্বিক অবস্থা কেমন, তা জানার জন্য নতুন করে কোনো গবেষণার প্রয়োজন নেই, কেবল দেশের নদ-নদীর বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে নিশ্চিত করে বলে দেওয়া যাবে, আমাদের পরিবেশ ভালো নেই। আর গাণিতিক হারে নাম্বারিং করলে দেখা যাবে, পাশ নম্বর নিয়ে টানাটানি লেগেছে। এমন এক পরিবেশের মধ্যেই আমরা আছি, বসবাস করছি। বলা যায়, একরকম বাধ্য হয়েই করছি। এছাড়া উপায় কী!

উপায় আছে, পথও আছে অনেক। কিন্তু আসল প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা নদীকে ভালো রাখতে চাই কি না?, সুরক্ষা দিতে চাই কি না? এর সঙ্গে আছে সরকারের আন্তরিকতা নিয়েও প্রশ্ন। এই প্রশ্ন অগণিত সচেতন মানুষের, পরিবেশকর্মীদের।

‘আমরা চাই না’—এটাই এখন প্রতিষ্ঠিত সত্য বলে প্রচলিত। না হলে দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও আমাদের সামনে নদী সুরক্ষায় কোনো নজির তৈরি হলো না কেন? উপরন্তু অসংখ্য নেতিবাচক উদাহরণ সামনে উপস্থিত।

কয়েক বছর আগে তুরাগ নদকে কেন্দ্র করে এক মামলায় হাইকোর্ট দেশের নদ-নদীগুলোকে ‘জীবন্ত সত্তা (লিভিং এনটিটি)’ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিলেন। এই রায়ের ফলে নদীগুলো মানুষের মতোই আইনি অধিকার পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটল না। আমরা খেয়াল করলাম, এরপরও নদী দখল-দূষণ বন্ধ হলো না।

সন্দেহাতীতভাবেই বলা যায়, কোনো না কোনোভাবে দেশের প্রতিটি নদ-নদী আজ দখল ও দূষণের শিকার। শিল্পকারখানার বর্জ্য, প্লাস্টিক ও পলিথিনের দূষণ এবং পয়োবর্জ্য ও গৃহস্থালির আবর্জনায় নদীর দীর্ঘমেয়াদি দূষণ হচ্ছে। নতুন করে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘পিফাস’ নামের নতুন এক দূষণ। একটি বেসরকারি সংস্থার গবেষণা বলছে, দেশের টেক্সটাইল কারখানাগুলোর আশপাশের ৭৫ শতাংশ কলের পানিতে ও ৮৭ শতাংশ পৃষ্ঠজলে পিফাস পাওয়া গেছে। এছাড়াও ঢাকার অতি নিকটে সাভারের কর্ণতলী নদীতে ডাচ পরামর্শক সংস্থার প্রস্তাবিত সীমার চেয়ে ৫৪ হাজার গুণ বেশি পিফাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে; যা ভয়াবহ উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ এর প্রভাবে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি ক্যান্সার, লিভারের ক্ষতি ও থাইরয়েডের মতো জটিল রোগের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

শুধু কি দূষণ? বর্তমানে দেশের নদীগুলো হয়ে উঠেছে লাশ গুমের নিরাপদ ঠিকানা। গণমাধ্যমসূত্রে আমরা জানতে পারি, ২০২১ থেকে ২০২৫—এই পাঁচ বছরে নৌ পুলিশ দেশের বিভিন্ন নদ-নদী থেকে ২ হাজার ৬৪টি মরদেহ উদ্ধার করেছে। উদ্ধারকৃত লাশগুলোর মধ্যে হত্যাকাণ্ডই বেশি। এছাড়া নদীতে পড়ে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু এবং নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যার ঘটনাও রয়েছে। এছাড়াও চলতি বছরে দেশের বিভিন্ন এলাকার নদ-নদী থেকে এক সপ্তাহে ১৭ জনের মরদেহ উদ্ধার করেছে নৌ পুলিশ। চলতি বছরের ১৫ থেকে ২১ মে পর্যন্ত এসব মরদেহ উদ্ধার করা হয়। যেখানে নদী হয়ে ওঠার কথা মাছের অভয়াশ্রম সেখানে হয়ে ওঠছে লাশের অভয়াশ্রম!

এত হতাশার মধ্যেও আমরা চাই, ভালো থাকুক আমাদের নদীগুলো। আমরা চাইলেই তো হবে না, সরকারকে চাইতে হবে, উদ্যোগী হতে হবে। সাম্প্রতিক বছরে নদী সুরক্ষায় সরকারের পক্ষ থেকে বেশ কিছু উদ্যোগের কথা শুনেছিলাম। যেমন নদীর তালিকা তৈরি করা, জেলা ভিত্তিক যে কোনো একটি নদীকে পুরোপুরি দখলমুক্ত করে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে অবাধ পানি প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং কেন্দ্রীয়ভাবে ঢাকায় একটি নদীকে এই তালিকায় যুক্ত করা। এসব আলোচনা তুমুলভাবে আকাশে-বাতাসে ছড়ালেও বাস্তবে এর মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি।

তবে হ্যাঁ, নদীর তালিকা নিয়ে ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। প্রথমে ২০২৩ সালে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন ১ হাজার ৮টি নদীর চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করে। এরপর অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর নতুন করে নদ-নদীর সংখ্যা নির্ণয়ের কাজে হাত দেয়। সবশেষ এপ্রিল ২০২৫ সালে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো) দেশে নদ-নদীর সংখ্যার নতুন যে তালিকা প্রকাশ করে, তাতে বলা হয় দেশের নদ-নদীর সংখ্যা এখন ১ হাজার ৪১৫।

নদীর উন্নতি না হলেও তালিকার বেশ উন্নতি হয়েছে, যদিও এসব তালিকা নিয়ে দেশের নদী ও পরিবেশকর্মীদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। এর বাইরে নদীর আইনগত অভিভাবক জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে বিগত কয়েক বছর ধরে কার্যত নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছে।

নদী সুরক্ষায় এমনতর উদাহরণ আমাদের আশাবাদের বিপরীতে গভীর হতাশায় নিমজ্জিত করে। তবুও আমরা নদীর প্রশ্নে আশাবাদী থাকতে চাই। কারণ নদী না বাঁচলে দেশের পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত তো দূরের বিষয়, বরং সামগ্রিকভাবে এর প্রভাব পড়বে দেশের কৃষি, মৎস্য, স্বাস্থ্যসহ নানাখাতে। তাই আজকের পরিবেশ দিবসে নদীকে বাঁচানোর অঙ্গীকারকে সবার আগে সামনে নিয়ে আসতে হবে, যেন ভালো থাকে আমার, আমাদের নদী।

  • ফয়সাল আহমেদ: সম্পাদক, রিভার বাংলা