২০০৩ সালের ফেব্রুয়ারি। ইরাক সীমান্তে ততক্ষণে মার্কিন সেনা মোতায়েন সম্পন্ন হয়েছে। সাদ্দাম হোসেন তখন চারদিক থেকে কার্যত কোণঠাসা। তবে নিজের অবস্থান তুলে ধরার একটি শেষ সুযোগ তখনও তার হাতে ছিল—কোনো প্রভাবশালী মার্কিন সাংবাদিককে সরাসরি সাক্ষাৎকার দেওয়া।
স্বভাবতই সেই সাক্ষাৎকার পাওয়ার দৌড়ে মার্কিন গণমাধ্যমগুলোর মধ্যে তুমুল প্রতিযোগিতা শুরু হয়। টম ব্রোকাও, পিটার জেনিংস কিংবা বারবারা ওয়াল্টার্স—সবাই আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন। মার্কিন সাংবাদিক ড্যান র্যাদার এই পুরো বিষয়টিকে বর্ণনা করেছিলেন ‘বড় শিকার ধরার অভিযান’ হিসেবে। আর সেই কাঙ্ক্ষিত শিকার তখন ঠিক তার সামনে।
সাদ্দামের এক তরুণ সহযোগীর সঙ্গে র্যাদার বছরের পর বছর ধরে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। সাক্ষাৎকার পাওয়ার এই প্রক্রিয়ায় র্যাদার নিজেকে এমন একজন সাংবাদিক হিসেবে তুলে ধরেন, যিনি স্পষ্ট কথা বলেন, যার বিপুল দর্শকপ্রিয়তা রয়েছে এবং যিনি কঠিন প্রশ্ন করলেও কোনো ধরনের সস্তা কৌশলের আশ্রয় নেন না।
সাদ্দাম সাক্ষাৎকার দিতে রাজি হয়েছেন—এই খবর পাওয়া মাত্রই বাগদাদের হোটেলে সারা রাত জেগে প্রশ্নের খসড়া তৈরি করেন র্যাদার। বারবার সেগুলো ঘষেমেজে চূড়ান্ত করেন। মূল সাক্ষাৎকারে তিনি ছিলেন অত্যন্ত শান্ত ও সংযত।
কফি খেতে খেতে সাদ্দামের দিকে একের পর এক প্রশ্ন ছুড়ে দেন র্যাদার। ওসামা বিন লাদেনের সঙ্গে সাদ্দামের কোনো যোগাযোগ আছে কি না, তিনি ৯/১১ হামলার নিন্দা করেন কি না কিংবা মার্কিন হামলা হলে ইরাকের তেলক্ষেত্রে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হবে কি না—সবই জানতে চান তিনি।
জবাবে সাদ্দাম হোসেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশকে যুদ্ধের যৌক্তিকতা নিয়ে একটি সরাসরি বিতর্কের প্রস্তাব বসেন। তবে বুশ সেই প্রস্তাব সঙ্গে সঙ্গেই প্রত্যাখ্যান করেন। সাক্ষাৎকারে সাদ্দাম আবারও দাবি করেন, তার সরকারের কাছে কোনো গণবিধ্বংসী অস্ত্র নেই।
স্বৈরশাসক যখন 'সেলিব্রিটি'
বিশ্ব রাজনীতিতে স্বৈরশাসকদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার এই সংস্কৃতি মূলত ষাট ও সত্তরের দশকে একটি স্পষ্ট রূপ পায়। সে সময় যেকোনো স্বৈরশাসককে ঘিরে মানুষের ব্যাপক কৌতূহল থাকত, তাদের অনেকটা ‘সেলিব্রিটি’র মতো করে দেখা হতো। ফলে কোনো প্রতিবেদক তাদের সাথে কথা বলার সুযোগ পেয়েছেন—এটাই ছিল এক বিরাট সাফল্য।
ইতালীয় সাংবাদিক ওরিয়ানা ফালাচি তৎকালীন ইরানের মোহাম্মদ রেজা পাহলভী কিংবা দক্ষিণ ভিয়েতনামের নগুয়েন ভ্যান থিউ-সহ অনেক প্রভাবশালী নেতার মুখোমুখি হয়েছিলেন। ১৯৭৯ সালে ইরানি বিপ্লবের পরপরই তিনি আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির এক ঐতিহাসিক সাক্ষাৎকার নেন। সেই সাক্ষাৎকারের এক পর্যায়ে তিনি নিজের মাথার চাদর ছুড়ে ফেলে সেটিকে “মধ্যযুগীয় বোকা পোশাক” বলে অভিহিত করেছিলেন।
অন্যদিকে বারবারা ওয়াল্টার্স হেঁটেছিলেন ভিন্ন পথে। তিনি ফিদেল কাস্ত্রোর মতো নেতাদের ভেতরের মানবিক ও ব্যক্তিগত দিকগুলো ক্যামেরার সামনে তুলে আনার চেষ্টা করতেন। ১৯৭৭ সালে তিনি প্রথম কাস্ত্রোর সাক্ষাৎকার নেন। এর প্রায় এক দশক পর তিনি কথা বলেন মুয়াম্মার গাদ্দাফির সঙ্গেও।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমে এই ধরনের একনায়কদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার নৈতিক দিকটি সবসময়ই বেশ বিতর্কিত। প্রশ্ন ওঠে—যারা নিজেদের দেশে নিষ্ঠুর নির্যাতন চালাচ্ছেন, তাদের কি আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম দেওয়া উচিত? আর যে সাংবাদিকদের জীবন ওই শাসকদের ইশারার ওপর নির্ভর করছে, তারা আদৌ কতটা স্বাধীনভাবে প্রশ্ন করতে পারেন?
এ বিষয়ে জানতে আমি এখনকার পঁচানব্বই বছর বয়সী ড্যান র্যাদারের সঙ্গে যোগাযোগ করি, যিনি বর্তমানে টেক্সাসের অস্টিনে বসবাস করছেন। তিনি জানান, একজন সাংবাদিক হিসেবে তিনি সবসময় মনে করেছেন—যার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব, তার মুখোমুখি হওয়াটাই একজন পেশাদারের নৈতিক দায়িত্ব।
র্যাদার বলেন, “আমার মতে, যেকোনো বড় ঘটনার মূল চরিত্রদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলাটা সবসময় গুরুত্বপূর্ণ। আর যুদ্ধরত একটা দেশের চেয়ে বড় ঘটনা আর কী-ই বা হতে পারে?”
সাক্ষাৎকার নিশ্চিত করতে তিনি এমন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন, যারা তাকে ওই শাসকদের কাছাকাছি পৌঁছাতে সাহায্য করতে পারেন। তবে তার একটি কঠোর শর্ত থাকত: কোনো প্রশ্ন আগে থেকে দেওয়া যাবে না এবং সাক্ষাৎকারের ওপর কারও কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না।
সাদ্দামের ওই সাক্ষাৎকার প্রচারের পর মার্কিন প্রশাসনের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন র্যাদার। তবে তিনি মনে করেন, মার্কিন জনগণ ওই সাক্ষাৎকার থেকে প্রকৃত সত্য জানতে পেরেছিল। তার দৃষ্টিতে, ওই সাক্ষাৎকারটি আদতে মার্কিন গণতন্ত্রেরই এক বড় বিজ্ঞাপন ছিল।
র্যাদারের ভাষায়, “এটি আমেরিকা সম্পর্কে একটি বার্তা দেয়। আমরা কেমন দেশ, তা ফুটে ওঠে। কারণ সাদ্দাম হোসেন কিন্তু ইরাকি টেলিভিশনে জর্জ বুশকে কথা বলার এমন সুযোগ কখনোই দিতেন না।”
সাদ্দামের মূল লক্ষ্য ছিল যুদ্ধের বিপক্ষে থাকা মার্কিন জনগণের একাংশের সহানুভূতি পাওয়া। তাই ইরাকি টেলিভিশনে নিয়মিত আমেরিকার যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ দেখানো হতো। মনে হচ্ছিল, সাদ্দাম নিজেই নিজের তৈরি করা প্রচারণায় বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন। তিনি বিশ্বকে জানাতে চেয়েছিলেন যে তার কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র নেই। মার্কিন নাগরিকরা তখন তার কথা বিশ্বাস না করলেও, পরবর্তীতে এটিই সত্য বলে প্রমাণিত হয়। অর্থাৎ, এই নির্দিষ্ট ইস্যুতে স্বৈরশাসক নয়, বরং মিথ্যা বলেছিল খোদ মার্কিন সরকারই।
কিউবার অভিজ্ঞতা ও 'কাস্ত্রো'র সাক্ষাৎকার
বর্তমান যুগে উদীয়মান বা নিষ্ঠুর স্বৈরশাসকরা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে সাধারণত ভয় দেখিয়ে নয়, বরং নিজেদের নিয়ন্ত্রিত ‘অ্যাক্সেস’ বা প্রবেশাধিকার দিয়ে প্রভাবিত করতে চান।
আমার সাংবাদিকতা জীবনের শুরুতেই আমি এমন একটি ঘটনার সাক্ষী হয়েছিলাম। ১৯৯১ সালের জানুয়ারি মাস, প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক আগের কথা। আমি তখন মেক্সিকো সিটিতে একজন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হিসেবে কাজ করি। সে সময় একটি মিডিয়া ট্যুরের অংশ হিসেবে আমাদের কিউবা যাওয়ার সুযোগ হয়।
মার্কিন সাংবাদিকদের জন্য তখন কিউবায় যাওয়া ছিল ভীষণ কঠিন। দূতাবাস খুব কম ভিসা দিত। যারা ভিসা পেতেন, তাদের মেক্সিকো সিটির কিউবান প্রেস অ্যাটাশের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যোগাযোগ বজায় রাখতে হতো, নিয়মিত যেতে হতো দূতাবাসের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে।
তবে যুদ্ধ ঘনিয়ে আসায় কিউবা সরকার হঠাৎ করেই তাদের নিয়ম শিথিল করে এবং মেক্সিকোতে থাকা পুরো মার্কিন সাংবাদিকদের হাভানায় আমন্ত্রণ জানায়।
হাভানায় পৌঁছানোর পর আমাদের প্রায় ২০ জন সাংবাদিকের একটি দলকে কিউবান কর্মকর্তারা ব্রিফ করেন এবং সফরের নিয়মকানুন জানিয়ে দেন। আয়োজকদের কর্মসূচি ছিল বেশ আকর্ষণীয়—আমাদের একটি কৃষি খামার এবং চেরনোবিল পারমাণবিক বিপর্যয়ে বিকিরণের শিকার ইউক্রেনীয় শিশুদের চিকিৎসা করা একটি হাসপাতাল ঘুরিয়ে দেখানো হয়।
তবে আমাদের সাফ জানিয়ে দেওয়া হলো, আমরা যদি সবাই একসঙ্গে থাকি এবং নির্ধারিত কর্মসূচির বাইরে না যাই, তবে সফর শেষে পুরস্কার হিসেবে মিলবে খোদ ফিদেল কাস্ত্রোর (এল কমান্দান্তে এন জেফে) সাক্ষাৎকার।
আমি দ্রুত হিসাব কষে দেখলাম, এই চুক্তি আমার জন্য নয়। কাস্ত্রোর বক্তব্য শোনার আগ্রহ আমার অবশ্যই ছিল, তবে তার মতো দীর্ঘ সময় ধরে কথা বলা রাজনৈতিক নেতা পৃথিবীতে খুব কমই ছিলেন। তিনি নতুন এমন কী বলবেন যা আগে বলেননি? আর যদি নতুন কিছু বলেনও, তবে দলের বড় বড় মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোই তা আগে প্রকাশ করে দেবে। আমার মতো একজন ফ্রিল্যান্সারের জন্য সেখানে বিশেষ কিছু পাওয়ার ছিল না।
তাই আমি দল থেকে আলাদা হয়ে নিজের মতো করে খবরের সন্ধানে নেমে পড়লাম। একদিন কালোবাজারে ডলার এক্সচেঞ্জ করার সময় কিউবান পোশাকে এক ব্যক্তির সঙ্গে আমার দেখা হলো। কথায় কথায় তিনি জানালেন, তিনি আসলে একজন আমেরিকান। পরে জানতে পারলাম, তিনি সাবেক ব্ল্যাক প্যান্থার সদস্য চার্লস হিল।
প্রায় ২০ বছর আগে নিউ মেক্সিকোতে এক পুলিশ কর্মকর্তাকে হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়ার পর তিনি একটি বিমান ছিনতাই করে কিউবায় রাজনৈতিক আশ্রয় নেন। এরপর থেকে কিউবান সরকারের নিরাপত্তায় সেখানেই থাকছিলেন তিনি। তিনি আমাকে তার বাড়িতে আমন্ত্রণ জানান।
আমি এই এক্সক্লুসিভ স্টোরি নিয়ে কাজ করছি জানার পর, আমাদের সফরের অন্য সাংবাদিকরা বেশ ক্ষুব্ধ হলেন। তারা আমাকে তিরস্কার করে বললেন, আমার এই হঠকারিতার কারণে তারা হয়তো কাস্ত্রোর সাক্ষাৎকার পাওয়ার সুযোগটি হারাতে যাচ্ছেন।
অবশ্য শেষ পর্যন্ত কাস্ত্রো এসেছিলেন এবং আমাদের দলের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত কথা বলেছিলেন। তখন মার্কিন সামরিক অভিযান 'অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম' মাত্র শুরু হয়েছে। কাস্ত্রো মূলত বিশ্ববাসীর কাছে নিজের প্রতিক্রিয়া জানাতেই সেখানে এসেছিলেন।
কাস্ত্রো বলেছিলেন, “এই মুহূর্তে পুরো বিশ্ব যে যন্ত্রণা ও তিক্ততা অনুভব করছে, আমিও ঠিক তা-ই অনুভব করছি।”
তার এই বক্তব্য বিশ্বজুড়ে শিরোনাম হয়েছিল। এর অর্থ হলো, কিউবান সরকার যা চেয়েছিল, ঠিক তা-ই পেয়েছিল। বিনিময়ে সংবাদমাধ্যমও কিউবার শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে পাঠকদের কিছুটা ধারণা দিতে পেরেছিল। তবে এই ধরনের আপসকে কি সত্যিই একটি সফল সাংবাদিকতা বলা যায়? এই প্রশ্ন আমার মনে আজও তাড়া করে বেড়ায়।
খেমার রুজের কম্বোডিয়া ও পল পট
১৯৭৮ সালে ওয়াশিংটন পোস্টের সংবাদদাতা এলিজাবেথ বেকার কম্বোডিয়ার কুখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা পল পটের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন।
ভিয়েতনাম যুদ্ধ কাভার করার সুবাদে বেকারের কম্বোডিয়া সম্পর্কে ভালো ধারণা ছিল এবং তিনি তাদের ভাষাও কিছুটা জানতেন। পল পট ক্ষমতায় আসার পর সেখান থেকে নির্বিচার গণহত্যার খবর আসতে শুরু করে, যেখানে পরবর্তীতে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন।
বেকার রাষ্ট্রসংঘে থাকা কম্বোডীয় কর্মকর্তাদের পাশাপাশি মানবিক সহায়তা নিয়ে কাজ করা কোয়েকার কর্মীদের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন।
সে সময় কম্বোডিয়া ছিল বহির্বিশ্ব থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। কিন্তু সোভিয়েত-সমর্থিত ভিয়েতনামী বাহিনী যখন কম্বোডিয়া আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন খেমার রুজ প্রশাসন পশ্চিমাদের নিজেদের পক্ষে টানার প্রয়োজন অনুভব করে। আর এজন্য কয়েকজন নামী আন্তর্জাতিক সাংবাদিককে দেশে আমন্ত্রণ জানানোকেই তারা সেরা পথ হিসেবে বেছে নেয়।
এই সফরে নির্বাচিত হন এলিজাবেথ বেকার, সেন্ট লুইস পোস্ট-ডিসপ্যাচের মার্কিন সাংবাদিক রিচার্ড ডাডম্যান এবং খেমার রুজ সরকারের প্রতি সহানুভূতিশীল ব্রিটিশ শিক্ষাবিদ ম্যালকম ক্যাল্ডওয়েল।
কম্বোডিয়ায় বেকারের সেই দুই সপ্তাহের সফরটি ছিল অত্যন্ত কঠোর নজরদারির মধ্যে। সামান্য কোনো প্রশ্ন করলেই তাকে সিআইএ-র এজেন্ট বলে সন্দেহ করা হতো। সফরের একদম শেষ দিনে বেকার ও ডাডম্যান পল পটের সাক্ষাৎকারের অনুমতি পান।
তবে সেটি আসলে কোনো সাক্ষাৎকার ছিল না; পল পট টানা দুই ঘণ্টা ধরে নিজেই একতরফা বক্তৃতা দিয়ে যান। বেকার কোনোমতে একটিমাত্র প্রশ্ন করার সুযোগ পেয়েছিলেন, তাও কোনো পাল্টা প্রশ্ন বা চ্যালেঞ্জ করার উপায় ছিল না।
রহস্যজনকভাবে, সেই রাতেই এক সশস্ত্র আততায়ী তাদের অতিথিশালায় হামলা চালায়। সে বেকারকে বন্দুক দেখিয়ে হুমকি দেয় এবং ম্যালকম ক্যাল্ডওয়েলকে গুলি করে হত্যা করে। ওই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ আজও জানা যায়নি, তবে ধারণা করা হয় এটি সরকারের কোনো অভ্যন্তরীণ কোন্দল বা অভিযানের অংশ ছিল।
আমি পরবর্তীতে বেকারকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, এত কঠোর নিয়ন্ত্রণ, একতরফা সাক্ষাৎকার এবং সহকর্মীর নির্মম মৃত্যুর পরও কি সেই সফরটি মূল্যবান ছিল?
তিনি জবাবে বলেছিলেন, “হ্যাঁ, ছিল। আমাদের ইতিহাস ও ঘটনার সাক্ষী হতে হবে। যাদের সুযোগ আছে, তাদের উচিত বাস্তব চিত্র তুলে ধরা। আমি কখনই এই দায়িত্ব নিয়ে সন্দেহ করিনি।”
কঠোর নজরদারির মধ্যেও কম্বোডিয়ায় কাটানো সেই দিনগুলো বেকারকে বুঝতে সাহায্য করেছিল যে দেশটির ভেতরে আসলে কী ঘটছে। তিনি দেখেছিলেন, রাস্তায় কোনো মানুষ নেই, কোনো ধর্মীয় উৎসব বা দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক আনন্দ বলতে কিছু অবশিষ্ট নেই।
তিনি হয়তো নিজের চোখে সরাসরি গণহত্যা বা নির্যাতন দেখেননি, তবে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে একটি ভয়াবহ দুর্যোগ চলছে। সেই ট্রমা কাটিয়ে ওঠার পর তিনি খেমার রুজ শাসনব্যবস্থা নিয়ে ব্যাপক অনুসন্ধান চালান এবং পরবর্তীতে ‘হোয়েন দ্য ওয়ার ওয়াজ ওভার’ (When the War Was Over) নামে একটি বিখ্যাত বই লেখেন, যা খেমার রুজের ইতিহাসের অন্যতম আকর গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয়। সম্প্রতি তার এই অভিজ্ঞতা নিয়ে ‘মিটিং উইথ পল পট’ (Meeting with Pol Pot) নামে একটি চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে।
অহংবোধ বনাম সাংবাদিকতার কৌশল
স্বৈরশাসকদের মনস্তত্ত্ব বোঝার ক্ষেত্রে দ্য নিউ ইয়র্কারের জন লি অ্যান্ডারসনকে অন্যতম সেরা মনে করা হয়। গত তিন দশকে তিনি অগুস্তো পিনোশে, মাহমুদ আহমাদিনেজাদ এবং হুগো চাভেজের মতো বিশ্বের বহু বিতর্কিত নেতার মুখোমুখি হয়েছেন।
অ্যান্ডারসনের মতে, স্বৈরশাসকরা যখন সাক্ষাৎকার দিতে রাজি হন, তখন তারা মূলত কৌশলগত ফায়দা খোঁজেন। তবে এর পেছনে তাদের চরম অহংকার, আত্মপ্রেম এবং নিজেদের প্রভাব বিস্তারের এক ধরনের অন্ধ বিশ্বাস কাজ করে।
অ্যান্ডারসন মূলত তাদের এই অহংবোধকেই কাজে লাগাতেন। কোনো নেতার সাক্ষাৎকার নেওয়ার আগে তিনি কয়েক সপ্তাহ ধরে তার সম্পর্কে চুলচেরা বিশ্লেষণ করতেন। তাদের জন্মস্থান ঘুরে দেখতেন, তাদের ছোটবেলার বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলতেন, যাতে তাদের মূল প্রেরণা ও মানসিকতা বোঝা যায়।
অ্যান্ডারসন বলেন, “তারা আসলে কী বলতে চান, তা জানার ব্যাপারে আমার একটা সতত কৌতূহল থাকে। আমি যখন তাদের সঙ্গে থাকি, তখন তাদের অতীতের কর্মকাণ্ড নিয়ে সরাসরি বিচারকের ভূমিকা নিই না। এতে তারা কিছুটা স্বস্তি পান এবং মন খুলে কথা বলেন।”
চিলির স্বৈরশাসক জেনারেল পিনোশে অ্যান্ডারসনকে সাক্ষাৎকার দিতে রাজি হয়েছিলেন মূলত তার মেয়ে লুসিয়ার অনুরোধে। পিনোশে তখন মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে বিচারের মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকিতে ছিলেন এবং তার মেয়ে চাচ্ছিলেন বাবার ভাবমূর্তি কিছুটা পুনরুদ্ধার করতে।
সাক্ষাৎকারের সময় পিনোশে রসিকতা করে অ্যান্ডারসনকে বলেছিলেন, ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে তিনি ভালো করেই জানেন যে, “স্বৈরশাসকদের শেষ পরিণতি কখনোই ভালো হয় না।” কাকতালীয়ভাবে, এই প্রতিবেদনটি প্রকাশের মাত্র কয়েকদিন পর, ১৯৯৮ সালের ১২ অক্টোবর পিনোশে লন্ডনে গণহত্যা ও সন্ত্রাসের অভিযোগে গ্রেপ্তার হন।
অন্যদিকে, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের সাক্ষাৎকার পাওয়ার জন্য অ্যান্ডারসন ২০০৮ সালে কয়েক সপ্তাহ ইরানে অবস্থান করেছিলেন। তিনি তার বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলেন, এমনকি এক জনসভায় আহমাদিনেজাদের কাছাকাছি গিয়ে সাক্ষাৎকারের অনুরোধও জানান। কিন্তু সে যাত্রায় তাকে খালি হাতে ফিরতে হয়।
আহমাদিনেজাদের বক্তব্য ছাড়াই অ্যান্ডারসনের লেখাটি প্রকাশিত হয়। এর প্রায় এক বছর পর, যখন ইরান সরকার সে দেশের 'গ্রিন মুভমেন্ট' বিক্ষোভ কঠোরভাবে দমন করে, তখন হঠাৎ অ্যান্ডারসনের ফোনে একটি কল আসে—আহমাদিনেজাদ কথা বলতে প্রস্তুত।
অ্যান্ডারসন যখন আবার ইরানে যান, তখন গিয়ে দেখেন সেখানে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের ক্যামেরা ও আলো সম্পূর্ণ প্রস্তুত। অর্থাৎ, সাক্ষাৎকারটি সরাসরি ইরানের সরকারি চ্যানেলে সম্প্রচার করা হবে।
অ্যান্ডারসন সেখানে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, আহমাদিনেজাদের ‘হলোকস্ট’ অস্বীকারের বিতর্ক এবং আমেরিকার সঙ্গে যুদ্ধের আশঙ্কা নিয়ে একের পর এক তীক্ষ্ণ প্রশ্ন করেন। আহমাদিনেজাদ অবশ্য মোটেও বিচলিত হননি; তিনি অত্যন্ত শান্তভাবে সব উত্তর দিয়েছিলেন।
অ্যান্ডারসন তাকে স্মরণ করে বলেন, “তিনি এমন একজন মানুষ ছিলেন, যিনি নিজের প্রতিটি কথা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন। এক ধরনের কট্টরপন্থী (Zealot) বলা যায় তাকে। তিনি আমাকে আদর্শিক শত্রু মনে করলেও, আমার সঙ্গে এই তাত্ত্বিক লড়াইটি তিনি বেশ উপভোগ করছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন তিনি আমাকে উনার যুক্তি বুঝিয়ে ছাড়বেন।”
তবে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজ অ্যান্ডারসনের কাছ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু আশা করেছিলেন—সেটি হলো এক ধরণের ব্যক্তিগত স্বীকৃতি। যেহেতু অ্যান্ডারসন কিউবান বিপ্লবী চে গুয়েভারার একটি বিখ্যাত জীবনীগ্রন্থ লিখেছিলেন, আর চাভেজ চেকে নিজের আদর্শ মানতেন, তাই অ্যান্ডারসনের প্রতি তার আলাদা খাতির ছিল।
অ্যান্ডারসন সেই স্মৃতির কথা মনে করে বলেন, “এক রাতে প্রাসাদের বাইরে একটি গাছের নিচে বসে আমরা টানা তিন ঘণ্টা কথা বলেছিলাম।” চাভেজ তাকে চে গুয়েভারার জীবন এবং বলিভিয়ার জঙ্গলে চে-র মৃত্যুর পর তার মরদেহ খুঁজে পাওয়ার অবিশ্বাস্য গল্প নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন করেছিলেন। এর ফলে চাভেজের দরবারে অ্যান্ডারসনের একটি স্থায়ী প্রবেশাধিকার তৈরি হয়।
কঠিন প্রশ্ন করার সাহস ও পোডিয়ামের লড়াই
এই ধরনের হাই-প্রোফাইল সাক্ষাৎকারে সবসময়ই এক অদৃশ্য ক্ষমতার লড়াই চলে। অ্যান্ডারসনের মতে, সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী যদি ড্যান র্যাদার বা ক্রিশ্চিয়ান আমানপুরের মতো বিশ্বখ্যাত কেউ হন, তবে ওই শাসকরা মনে করেন তাদের সাক্ষাৎকার দেওয়ার মাধ্যমে তারা আন্তর্জাতিকভাবে এক ধরণের বৈধতা বা স্বীকৃতি পাচ্ছেন।
সিএনএনের প্রধান আন্তর্জাতিক উপস্থাপক ক্রিশ্চিয়ান আমানপুর অবশ্য মনে করেন, শুধু ‘অ্যাক্সেস’ বা সুযোগ পাওয়ার জন্য তিনি কখনও সাংবাদিকতার শর্তের সঙ্গে আপস করেন না। শর্ত পছন্দ না হলে তিনি সাক্ষাৎকার ছেড়ে চলে আসতেও দ্বিধা করেন না।
২০২২ সালের একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করে আমানপুর জানান, ইরানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির একটি বিশেষ সাক্ষাৎকার নেওয়ার কথা ছিল তার। সে সময় হিজাব ঠিকমতো না পরার অভিযোগে নীতি পুলিশের হেফাজতে কুর্দি তরুণী মাহসা আমিনীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে পুরো ইরানে তুমুল বিক্ষোভ চলছিল।
আমানপুর বলেন, “স্বাভাবিকভাবেই আমার প্রথম প্রশ্ন থাকত মাহসা আমিনীর মৃত্যু এবং ইরানের কঠোর হিজাব আইন নিয়ে। কিন্তু সাক্ষাৎকারের ঠিক আগ মুহূর্তে রাইসির কর্মকর্তারা দাবি করেন, আমাকে হিজাব পরে ক্যামেরার সামনে বসতে হবে। আমি তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করি। ফলে রাইসিও সাক্ষাৎকারে আসেননি। জবাবে আমি স্টুডিওতে রাইসির জন্য বরাদ্দ রাখা খালি চেয়ারটির সামনে দাঁড়িয়ে একটি ছবি পোস্ট করি, যা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলে।”
এদিকে দীর্ঘ ক্যারিয়ার শেষে ২০২৪ সালের শেষের দিকে ইউনিভিশনের উপস্থাপকের পদ থেকে অবসর নেওয়া হোর্হে রামোস মনে করেন, স্বৈরশাসকদের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ জীবনে খুব কমই আসে, তাই সেই সুযোগে সাংবাদিকের দায়িত্বও অনেক বেড়ে যায়।
রামোসের দুটি মূল নীতি রয়েছে: প্রথমত, ধরে নিতে হবে এই ব্যক্তির সঙ্গে জীবনে আর কখনও কথা হবে না। দ্বিতীয়ত, আমি যদি আজ এই কঠিন প্রশ্নটা না করি, তবে দুনিয়ার আর কেউ তা করবে না।
রামোস বলেন, “একজন সাংবাদিকের জন্য এর চেয়ে বড় গ্লানি আর নেই, যখন তিনি কোনো ক্ষমতাধর ব্যক্তির সাক্ষাৎকার শেষ করে রুম থেকে বের হয়ে ভাবেন—ইশ, আমি কেন তাকে ওই কঠিন প্রশ্নটা করার সাহস দেখালাম না!”
২০১৯ সালে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় রামোস ঠিক এই নীতিই প্রয়োগ করেছিলেন। সাক্ষাৎকারের শুরুতে মাদুরো পরিবেশ হালকা করার জন্য রামোসের স্ত্রীর খোঁজখবর নিচ্ছিলেন (যার আদি বাড়ি ভেনেজুয়েলায়)।
কিন্তু রামোস সেই ফাঁদে পা না দিয়ে সরাসরি মূল বিষয়ে চলে যান। প্রথম প্রশ্নই করেন—তিনি মাদুরোকে ‘প্রেসিডেন্ট’ নাকি ‘স্বৈরশাসক’ বলে সম্বোধন করবেন? কারণ তার মতে, মাদুরো কারচুপির নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেছেন।
মাদুরো যখন সংবিধানের ফিরিস্তি দিয়ে দীর্ঘ উত্তর দেওয়া শুরু করেন, রামোস তাকে মাঝপথেই থামিয়ে দেন এবং নিজের প্রশ্নে অনড় থাকেন। এক পর্যায়ে রামোস তার আইপ্যাডটি বের করে মাদুরোকে একটি ভিডিও দেখান, যেখানে দেখা যাচ্ছিল ক্ষুধার্ত ভেনেজুয়েলানরা ডাস্টবিন থেকে খাবার কুড়িয়ে খাচ্ছে।
ভিডিওটি দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে মাদুরো সাক্ষাৎকার বন্ধ করে উঠে দাঁড়ান এবং রামোসের আইপ্যাডটি কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। সঙ্গে সঙ্গে মাদুরোর নিরাপত্তাকর্মীরা রামোস ও তার পুরো টিমকে আটকে রাখে এবং তাদের সমস্ত ক্যামেরা ও ফুটেজ জব্দ করে দেশ থেকে বের করে দেয়।
মাদুরো সরকার ভেবেছিল সেই ফুটেজ আর কেউ দেখবে না। কিন্তু এর কয়েক মাস পর, মাদুরো প্রশাসনেরই এক কর্মকর্তা গোপনে সেই সাক্ষাৎকারের একটি কপি বাইরে পাচার (Leak) করে দেন।
রামোস বলেন, “আপনি যখন কোনো স্বৈরশাসকের মুখোমুখি হবেন, তখন আপনার লক্ষ্য হওয়া উচিত তার আসল চেহারাটা দুনিয়ার সামনে উন্মোচন করা।”
নতুন প্রযুক্তি ও পডকাস্টের যুগ
বর্তমান ডিজিটাল প্রযুক্তি সাংবাদিক ও রাষ্ট্রনেতাদের এই চিরাচরিত সমীকরণটি অনেকটাই বদলে দিয়েছে। জন লি অ্যান্ডারসন মনে করেন, এখনকার শাসকদের নিজেদের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট আছে, নিজস্ব প্রচারযন্ত্র আছে। ফলে নিজেদের ভাবমূর্তি তৈরির জন্য এখন আর তাদের প্রথাগত সাংবাদিকদের ওপর নির্ভর করতে হয় না।
এর ফলে শাসকরা এখন সাক্ষাৎকারে বসার ক্ষেত্রে আগের চেয়ে অনেক বেশি শর্ত চাপানোর সুযোগ পান। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন উপস্থাপক টাকার কার্লসনের সঙ্গে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বহুল আলোচিত সাক্ষাৎকারে ঠিক এটিই দেখা গিয়েছিল।
সেটিকে আদৌ সাক্ষাৎকার বলা যায় কি না, তা নিয়ে বিস্তর বিতর্ক রয়েছে। পুতিন সেখানে প্রায় আধঘণ্টা ধরে রাশিয়ার একতরফা ইতিহাস নিয়ে দীর্ঘ বক্তৃতা দেন, আর কার্লসন মাঝখানে কথা বলতে গেলেই পুতিন বিরক্ত হচ্ছিলেন।
পুতিন এক পর্যায়ে কার্লসনকে খোঁচা দিয়ে বলেন, “আমরা কি এখানে কোনো সিরিয়াস আলোচনা করতে এসেছি, নাকি কোনো তামাশার শো করতে এসেছি?” কার্লসন পুতিনকে কোনো পাল্টা চ্যালেঞ্জ করতে না পারলেও, ওই আলাপচারিতা থেকে পুতিনের পশ্চিমা-বিরোধী ক্ষোভের গভীরতা স্পষ্ট হয়েছিল।
বর্তমান সময়ে প্রথাগত সাংবাদিকদের কাছে স্বৈরশাসকদের ইন্টারভিউ দেওয়ার প্রবণতা অনেকটাই কমে গেছে। কারণ তারা এখন আর ক্রিশ্চিয়ান আমানপুর বা হোর্হে রামোসের মতো আক্রমণাত্মক সাংবাদিকদের মুখোমুখি হতে চান না, যারা তাদের অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখে ফেলবেন। তার চেয়ে টাকার কার্লসন বা লেক্স ফ্রিডম্যানের মতো স্বাধীন পডকাস্টারদের বেছে নেওয়া তাদের জন্য অনেক নিরাপদ, যারা মাঝপথে কথা কেটে দেন না বা তীব্র জেরা করেন না।
তাছাড়া এই ধরনের পডকাস্টগুলোর দর্শকসংখ্যা বিপুল হওয়ায় তা খুব সহজেই মার্কিন বা আন্তর্জাতিক জনমতকে প্রভাবিত করতে পারে। লেক্স ফ্রিডম্যানের পডকাস্টে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই কিংবা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দীর্ঘ সাক্ষাৎকার এর বড় উদাহরণ। সাক্ষাৎকারে মোদী ফ্রিডম্যানের প্রশংসা করে বলেছিলেন, “আপনি শুধু আমার সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন না, বরং ভারতকে গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করছেন। আপনার এই সততা প্রশংসনীয়।”
টাকার কার্লসনের পর পুতিন আর কোনো মার্কিন সাংবাদিককে সাক্ষাৎকার দেননি। তেমনি হোর্হে রামোসের সেই ঘটনার পর মাদুরোও পশ্চিমা মূলধারার গণমাধ্যম থেকে দূরত্ব বজায় রাখছেন।
একই চিত্র ইরানেও। দেশটির বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি রাষ্ট্রীয় চ্যানেল বা নিজের এক্স (টুইটার) হ্যান্ডেলে বিবৃতি দিলেও, সাংবাদিকদের প্রশ্ন এড়িয়ে চলেন। (ধারণা করা হয়, যে ইসরায়েলি বিমান হামলায় তার পিতা নিহত হয়েছিলেন, সেখানে তিনিও গুরুতর আহত হন)।
ইরানি নেতৃত্বের সাক্ষাৎকার নেওয়ার চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে ক্রিশ্চিয়ান আমানপুর বলেন, “প্রথমত, তারা সবাই এখন প্রতিপক্ষের মূল টার্গেট এবং তাদের অবস্থান সম্পর্কে ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের তথ্য অত্যন্ত নিখুঁত। তাই তারা সচরাচর সামনে আসেন না। তবে তারা যখন আন্তর্জাতিক মহলে সুনির্দিষ্ট কোনো বার্তা পৌঁছাতে চান, কেবল তখনই বেছে বেছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে সাক্ষাৎকার দেন।”
আসলে স্বৈরশাসক, একনায়ক বা কর্তৃত্ববাদী নেতার মধ্যকার সীমারেখা সবসময় সুনির্দিষ্ট হয় না। একইভাবে একটি নিরপেক্ষ ‘সাক্ষাৎকার’ এবং সাধারণ ‘আলাপচারিতা’র মধ্যকার পার্থক্যটুকুও অনেক সময় ধোঁয়াটে হয়ে যায়।
হোর্হে রামোসকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তিনি তার ক্যারিয়ারে কোন কোন কর্তৃত্ববাদী নেতার মুখোমুখি হয়েছেন—তিনি হুগো চাভেজ, নিকারাগুয়ার দানিয়েল ওর্তেগা, মেক্সিকোর সাবেক প্রেসিডেন্ট কার্লোস সালিনাস এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম উল্লেখ করেন, যাকে ২০১৫ সালের এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি অভিবাসন ইস্যুতে কড়া প্রশ্নের মুখোমুখি করেছিলেন।
ট্রাম্পকে সেই প্রশ্ন করার সিদ্ধান্ত নিয়ে রামোস আজও বলেন, “আমি সেদিনও ধরে নিয়েছিলাম, এই ব্যক্তির সঙ্গে হয়তো আমার জীবনে আর কোনোদিন কথা হবে না। আর বাস্তবে ঠিক তা-ই হয়েছে।”
(লেখাটি প্রথম কলাম্বিয়া জার্নালিজম রিভিউতে প্রকাশিত হয়। লেখক জোয়েল সাইমন কলাম্বিয়া জার্নালিজম স্কুলের একজন ফেলো এবং কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টসের সাবেক নির্বাহী পরিচালক।)