লক্ষ্মীপুরের রামগতি ও কমলনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি ও ল্যাবরেটরি সুবিধা থাকা সত্ত্বেও রোগীদের জোরপূর্বক বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠানোর গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি আমলে নিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও হুইপ আশরাফ উদ্দিন নিজান হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে কড়া নির্দেশনা দিয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন।
চিঠিটি শুক্রবার (২৬ জুন) সন্ধ্যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। চিঠিটি ইতোমধ্যে সাধারণ মানুষের আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। জনগণ হুইপ নিজানের এ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন।
হুইপের পাঠানো চিঠিতে রামগতি উপজেলার ৩১ শয্যাবিশিষ্ট ও কমলনগর উপজেলার ৫০ শয্যাবিশিষ্ট সরকারি এই দুটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ল্যাব সার্বক্ষণিক সচল রাখা, দালালচক্রের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা, আউটসোর্সিং কর্মচারীদের মাধ্যমে হাসপাতালের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা এবং চিকিৎসকদের নিয়মিত উপস্থিতি বজায় রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
চিঠি সূত্রে জানা যায়, রামগতি ও কমলনগরের বাসিন্দা এবং স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স দুটির অব্যবস্থাপনা নিয়ে হুইপ নিজানের কাছে অভিযোগ করে আসছিলেন। বিশেষ করে এক্স-রে, রক্ত পরীক্ষা ও সাধারণ ইসিজির মতো সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রেও হাসপাতালের একটি চক্র রোগীদের বাইরের নির্দিষ্ট ক্লিনিকে যেতে বাধ্য করত। এতে দরিদ্র রোগীরা চরম আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা।
পরবর্তীতে সরেজমিনে অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং নিজস্ব পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে এসব অনিয়ম বন্ধে জনস্বার্থে সরকারি হাসপাতাল দুটির নিজস্ব ল্যাব সচল রাখা, অনৈতিক রেফারেল বন্ধ করা, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রশাসনিক তদারকি জোরদারসহ ছয়টি বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দেন হুইপ নিজান।
রামগতি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কামনা শীষ মজুমদার বলেন, সরকারি হাসপাতালে যে ইউরিন টেস্ট মাত্র ২০ টাকায় করা সম্ভব, বাইরের বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়ে একজন দরিদ্র রোগীকে একই পরীক্ষার জন্য ১৮০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হচ্ছে এবং তারা একপ্রকার বাণিজ্যের শিকার হচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর পরীক্ষা-নিরীক্ষার মান কতটা নির্ভরযোগ্য ও কার্যকর, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। আমরা নিয়মিত এসব প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করি। কিন্তু পরিদর্শনের সময় সবকিছু ঠিকঠাক দেখালেও পরে তারা আগের অবস্থায় ফিরে যায়। তাই এই সিন্ডিকেট ভাঙতে রোগীদেরও সচেতন হতে হবে।
কমলনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মাহবুবুর রহমান বলেন, আমরা চিঠির কপি পেয়েছি এবং সে অনুযায়ী ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছি। হাসপাতালের বিদ্যমান যন্ত্রপাতি ও ল্যাব সুবিধাগুলো সচল রাখতে কারিগরি বিভিন্ন বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকারি হাসপাতালের সুনাম ক্ষুণ্ন করে এমন কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার সুযোগ কাউকে দেওয়া হবে না। চিকিৎসকদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে আমরা বদ্ধপরিকর।
এ বিষয়ে হুইপ আশরাফ উদ্দিন নিজান বলেন, জনগণের ট্যাক্সের টাকায় সরকারি হাসপাতালে কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে। অথচ একটি চক্র দরিদ্র রোগীদের পকেট কাটতে তাদের জোর করে বাইরের ক্লিনিকে পাঠাচ্ছে। এটি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। রাজনীতি বা দলীয় স্বার্থের চেয়ে আমার কাছে রামগতি ও কমলনগরের সাত লাখ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি আরও বলেন, কোনো চিকিৎসক বা কর্মচারী যদি এই বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত থাকেন, তাহলে দল-মত নির্বিশেষে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারি হাসপাতালেই সাধারণ মানুষের শতভাগ চিকিৎসাসেবা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।