Image description

ব্যারিস্টার নাজির আহমদ

স্বাধীন বাংলাদেশের ৫৫ বছরের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় যে, রাষ্ট্রের একেবারে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় লোক বসাতে বিএনপি বারবার ভুল করেছে। আশা করি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এমন ভুল আর করবেন না। বর্তমান সরকারের একজন শুভানুধ্যায়ী ও শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবেই লিখছি, যাতে এই ধরনের ভুলের পুনরাবৃত্তি না ঘটে। কেননা এমন ভুলে তাদের দল ও সরকার তো বটেই, দেশ ও জাতির অপূরণীয় ক্ষতি হয়।

 

তবে হ্যাঁ, যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে গেলে ভুল হতেই পারে। মানুষের সিদ্ধান্তে ভুল থাকা স্বাভাবিক। আর ভুল হলে সমালোচনা হবে, হতে বাধ্য। গঠনমূলক সমালোচনা সংশ্লিষ্টদের জন্য কল্যাণকর, কেননা এটি ভবিষ্যতে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়ক হয়, হয় নিয়ামক শক্তি। জনৈক মনীষীর ভাষায় ‘The only way to avoid criticism is doing nothing and sitting idly’ (অর্থাৎ ‘সমালোচনা এড়ানোর একমাত্র উপায় হলো কিছুই না করে অলসভাবে বসে থাকা’)। রাষ্ট্র পরিচালনায় তো সিদ্ধান্ত না নিয়ে অলসভাবে বসে থাকার কোনো সুযোগ নেই। সমাজেও অলসভাবে বসে থাকলে সমালোচনা এড়ানো যায় না, কেননা তখন সমালোচকরা বলেন ‘দেখছো, কোনো কাজ না করে শুধু শুধুই অলসভাবে বসে আছে!’এটা ঠিক, রাষ্ট্র পরিচালনায় অনেককে বা কাউকে না কাউকে তো বিশ্বাস করতে হয়, আস্থা রাখতে হয়। তবে বিশ্বাস করে ও আস্থা রেখে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো ব্যক্তিরা যখন বিশ্বাস ঘাতক হয় বা বেঈমানি করে তখনই সরকার বা রাষ্ট্র পড়ে বিপদে। ফলে জাতির হয় অপূরণীয় ক্ষতি। তবে শুধু মাত্র নির্দিষ্ট এলাকা বা অঞ্চল বিবেচনা না করে বা শুধুই কারও কথায় প্রভাবিত (influenced) হয়ে সিদ্ধান্ত না নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মেধা, দক্ষতা, যোগ্যতা ও অতীত ট্র‍্যাক রেকর্ড পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই ও পরীক্ষা করে গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নের সিদ্ধান্ত নিলে ভুল না হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আর হলেও ভুলের মাত্রা একেবারে কম থাকে।

চলুন ৫৫ বছরের ইতিহাস থেকে কয়েকটা উদাহরণ দেখে আসি।

উদাহরণ এক:

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান কত না বিশ্বাস করে চটপট্ দু’টি প্রমোশন (ব্রিগেডিয়ার জেনারেল থেকে মেজর জেনারেল, এরপর মেজর জেনারেল থেকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল) দিয়ে জেনারেল এরশাদকে সেনাপ্রধান বানিয়েছিলেন। এটা অনেকে বিশ্বাস করেন যে, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে চট্টগ্রামে হত্যার পেছনে এরশাদের প্রচ্ছন্ন হাত ছিল। জেনারেল মঞ্জুর বেঁচে থাকলে বা মঞ্জুর হত‍্যায় এরশাদের বিচার হলে অনেক থলের বিড়াল হয়তো বেরিয়ে আসতো। কেন মঞ্জুরকে জীবিত রাখা হলো না বা এরশাদ জীবিত থাকার ৪০ বছরেও কেন মঞ্জুর হত্যার বিচার হলো না—তা আজও রহস্যে ঘেরা। অনেকে মনে করেন, এরশাদের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে আবহাওয়ার মতো পরিবর্তন হওয়া রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কারণ ছিল পতিত সরকার কর্তৃক মঞ্জুর হত্যা মামলাকে সুতার টান হিসেবে ব্যবহার করা।

তাছাড়া দুই-তৃতীয়াংশ পাওয়া প্রেসিডেন্ট বিচারপতি সাত্তারের নেতৃত্বাধীন একটি নির্বাচিত সরকারকে মাত্র তিন মাসের মাথায় ঠুনকো অজুহাত ও মামুলি ব‍্যাপারগুলোকে উপলক্ষ করে রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে হঠিয়ে ক্ষমতা দখল করে আশির দশকে দীর্ঘ ৯ বছর স্বৈরাচারী শাসন চালিয়েছিলেন জেনারেল এরশাদ। নির্বাচনকে পাঠিয়েছিলেন একেবারে নির্বাসনে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, জেনারেল এরশাদকে সেনাপ্রধান না বানিয়ে অন্য প্রায় অর্ধ ডজন জেনারেলদের মধ্য থেকে কাউকে সেনাপ্রধান বানালে ইতিহাস হয়তো ভিন্ন হতো।

 

প্রফেসর ড. ইয়াজউদ্দিন আহমেদের মতো একজন দৃশ্যমান মেরুদণ্ডহীন ও অসুস্থ ব্যক্তিকে প্রেসিডেন্ট বানানো। অথচ দক্ষ, সাহসী ও স্মার্ট, বিশেষ করে অন্তত সাবেক প্রেসিডেন্ট আব্দুর রহমান বিশ্বাসের মতো একজন সাহসী, দৃঢ়চেতা ও পরিস্থিতি মোকাবিলায় দক্ষ কোনো ব‍্যক্তিকে প্রেসিডেন্ট বানালে জেনারেল নাসিমের ১৯৯৬-এর ক‍্যু নস্যাতের মতো ১/১১ কেও নস্যাৎ করতে পারতেন।

সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) এম এ মতিনের ‘আমার দেখা ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থান ৯৬’ বইটি পড়লে সাবেক প্রেসিডেন্ট আব্দুর রহমান বিশ্বাসের সাহস ও দক্ষতার প্রমাণ পাওয়া যায়। জেনারেল মতিন লিখেছেন যে, উত্তরবঙ্গের একটি সেনানিবাস থেকে সেনাসদস্যরা জেনারেল নাসিমের সমর্থনে ঢাকায় মার্চ করে আসতে শুরু করলে সাভারের নবম ডিভিশনের সেনাসদস্যদের দিয়ে আরিচা ঘাট থেকে নদী পার হওয়ার সব বাহন সরিয়ে ফেলা হয়। এমন উত্তেজনাকর মুহূর্তে আরেকটি সেনানিবাসের জিওসিকে সরাসরি ফোন করে প্রেসিডেন্ট আব্দুর রহমান বিশ্বাস নির্দেশ দিলেন ট্রুপ মুভ না করতে। ওই সেনানিবাসের জিওসি তখনও ছিলেন জেনারেল নাসিমের সমর্থক। প্রেসিডেন্ট আব্দুর রহমান বিশ্বাস ওই জিওসিকে নির্দেশ দিলে জিওসি বলেন, ‘You cannot order me directly. You have to come through the Chief of Army.’ এ কথা শুনে প্রেসিডেন্ট আব্দুর রহমান বিশ্বাস ব্যাঘ্রের মতো গর্জে উঠে বলেন ‘I am the Supreme Commander of the Armed Forces. You must obey my order. Otherwise you will be sacked straightway.’ ওই জিওসি আর তার অধীনে থাকা ট্রুপ আর মুভ করেননি। এখন স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন, প্রফেসর ড. ইয়াজউদ্দিন আহমেদ কি প্রেসিডেন্ট আব্দুর রহমান বিশ্বাসের মতো জাতির ক্রান্তিকালে সাহসের সঙ্গে তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি মোকাবিলা করার মতো দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তি ছিলেন?

উদাহরণ তিন:

অনেককে ডিঙিয়ে, শোনা যায় প্রায় অর্ধ ডজন জেনারেলদের ডিঙিয়ে এলাকা বিবেচনায় বা কারও কথায় প্রভাবিত (influenced) প্রণোদিত (convinced) হয়ে জেনারেল মইন ইউ আহমদের মতো একজন উচ্চাকাঙ্ক্ষী (ambitious) ব‍্যক্তিকে সেনাপ্রধান বানানো হয়। অথচ নাম ধরে ১-২ জন জেনারেলের কথা বলা যাবে, যাদেরকে সেনাপ্রধান বানালে ইতিহাস হয়তো সম্পূর্ণ ভিন্ন হতো, দেশ ও জাতি পড়তো না ১/১১ নামক এক জগদ্দল পাথরের যাঁতাকলে দুই দুইটি বছর। ১/১১-এর পরিণাম ও ধারাবাহিকতায় জাতির ঘাড়ে জেঁকে বসেছিল দেড় যুগের ফ্যাসিবাদী শাসন।

উদাহরণ চার:

ড. কামাল সিদ্দিকীর মতো ব‍্যক্তিকে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানে। এই লোককে আমি চিনতাম না। তার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা মরহুম আরাফাত রহমান কোকোর লন্ডনের আলতাব আলী পার্কে অনুষ্ঠিত গায়েবানা জানাজার পর স্থানীয় একটি রেস্টুরেন্টে। লোকটি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অকথ‍্য ভাষায় গালিগালাজ করতেছিলেন, যা এখানে পুনরুল্লেখ করা পর্যন্ত যাবে না। দু’জন সিনিয়র সাংবাদিক এটার প্রত্যক্ষ সাক্ষী। এগুলো শুনে তার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলি, নিজেই কেটে পড়ি। আর ভাবতে থাকি-আহারে এই লোককে বেগম খালেদা জিয়া কত না বিশ্বাস করে প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তরে বসিয়েছিলেন। এমন চরিত্রের লোক মুখ্য সচিবের মতো এতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকতে না জানি সরকারের কত ক্ষতি করেছেন। এই যার আচরণ, তিনি তো সরকারের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও দলিল অন্য জায়গায় অতি সহজেই পাচার করে দিতে পারেন।

এভাবে আরও বেশ কিছু উদাহরণ দেয়া যাবে। এগুলো লেখা নিছক সমালোচনার জন্য নয়, বরং উল্লেখ করছি যাতে সরকার সতর্কতার সঙ্গে আগামীতে পা ফেলেন। সম্প্রতি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদতবার্ষিকীর আলোচনায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যথার্থই বলেছেন, ‘সামনে অত্যন্ত কঠিন এবং গুরুত্বপূর্ণ সময় অপেক্ষা করছে’। তাই আগামীর কঠিন ও গুরুত্বপূর্ণ সময়ে অত্যন্ত সাবধানে পা ফেলতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় যেন ভুল ব্যক্তিদের (wrong persons) বসানো না হয়। নতুবা ইতিহাস পুনরাবৃত্তি করবে (History will repeat itself)। যেকোনো ভুলের মাশুল দিতে হয়। আর রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ভুলের মাশুল হয় কঠিন, দিতে হয় এমনকি জীবন পর্যন্ত।

লেখক: বিশিষ্ট আইনজীবী, রাষ্ট্রচিন্তক, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী এবং ইংল্যান্ডের প্র্যাকটিসিং ব্যারিস্টার।