যুদ্ধবিরতির শর্ত তোয়াক্কা না করে দক্ষিণ লেবাননে অভিযান আরও জোরদার করেছে ইসরায়েল। গত এপ্রিলে যুদ্ধবিরতির শুরুতে লিতানি নদীর দক্ষিণে অবস্থান নেওয়া ইসরায়েলি বাহিনী সম্প্রতি নদী পেরিয়ে নাবাতিয়েহ শহরের উপকণ্ঠে পৌঁছেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, লেবাননে দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ভিত্তি গড়ে তুলছে ইসরায়েল। খবর আল-জাজিরার।
গত ২৫ বছরের বেশি সময়ের মধ্যে লেবাননের ভেতর এটিই ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় ও গভীরতম অনুপ্রবেশ। দেশটির বাহিনী প্রায় ২ হাজার বর্গকিলোমিটার (৭৭০ বর্গমাইল) এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। যা লেবাননের মোট ভূখণ্ডের প্রায় এক-পঞ্চমাংশের ভাগের সমান।
শুরুতে ইসরায়েল জানিয়েছিল, সীমান্তঘেঁষা লিতানি নদীর দক্ষিণাঞ্চল থেকে হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের সরিয়ে দেওয়াই তাদের মূল লক্ষ্য। এখন তাদের অভিযান সেই সীমা ছাড়িয়ে আরও উত্তরে বিস্তৃত হয়েছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জাহরানি নদী পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় বাসিন্দাদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। লিতানি নদী থেকে জাহরানি প্রায় ১০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত। ফলে ওই অঞ্চলেও ইসরায়েলের সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত মিলছে।
ইসরায়েলি সেনারা ইতোমধ্যে নাবাতিয়েহর উপকণ্ঠের জাওতার আল-শারকিয়াহ ও শৌকিন এলাকায় পৌঁছেছে। অঞ্চলটি হিজবুল্লাহর অন্যতম শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে লেবাননের ন্যাশনাল নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, রোববার ভোরে দেইর এজ-জাহরানিতে ইসরায়েলি হামলায় কয়েকজন নিহত হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে সংঘাতের স্থায়ী অবসান নিয়ে আলোচনার মধ্যেই এমন অভিযান পরিচালনা করছে ইসরায়েল। আলোচনায় হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে ইসরায়েলি হামলার মধ্যে এসব আলোচনার সমালোচনা করেছে হিজবুল্লাহ।
এদিকে ওয়াশিংটন ও তেহরানের যুদ্ধবিরতির সঙ্গেও লেবাননের পরিস্থিতি ক্রমেই জড়িয়ে পড়ছে। ইরানি কর্মকর্তারা বলছেন, দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার না হলে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধ-পরবর্তী আলোচনায় অর্থবহ অগ্রগতি সম্ভব নয়।
কেন গুরুত্বপূর্ণ নাবাতিয়েহ
দক্ষিণ লেবাননে চলমান অভিযানের আগে চলতি সপ্তাহে নাবাতিয়েহ শহর খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। একই ধরনের নির্দেশ জারি করা হয় উপকূলীয় শহর টায়ারেও।
এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী বলেছে, নাবাতিয়েহর কাছে তাদের অভিযান চলছে এবং প্রয়োজন হলে তা আরও বিস্তৃত করা হবে। তাদের ভাষ্য, দক্ষিণ লেবাননে এটি হিজবুল্লাহর একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তিকেন্দ্র।
লেবানিজ আমেরিকান ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমাদ সালামেই আল জাজিরাকে বলেন, নাবাতিয়েহর গুরুত্ব সামরিক বিবেচনার বাইরেও বিস্তৃত।
তার মতে, শহরটি শুধু একটি সামরিক কেন্দ্র নয় বরং লেবাননের শিয়া সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক কেন্দ্র। একই সঙ্গে এটি দক্ষিণ লেবানন, বেকা উপত্যকা ও বৈরুতের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল।
সালামেই বলেন, নাবাতিয়েহর নিয়ন্ত্রণ ইসরায়েলকে লিতানি নদীর উত্তরে আরও কার্যকরভাবে অভিযান পরিচালনার সুযোগ দেবে। এর মাধ্যমে দক্ষিণ লেবাননজুড়ে হিজবুল্লাহর কমান্ড, সরবরাহব্যবস্থা ও সমর্থন নেটওয়ার্কের ওপর চাপ বাড়ানো সম্ভব হবে।
তার মতে, বিষয়টির রাজনৈতিক তাৎপর্য আরও বেশি। নাবাতিয়েহর দিকে অগ্রসর হওয়া থেকে বোঝা যায়, ইসরায়েলের লক্ষ্য শুধু হিজবুল্লাহকে লিতানির উত্তরে সরিয়ে দেওয়া নয় বরং সংগঠনটির আঞ্চলিক ও সামাজিক অবকাঠামো দুর্বল করার বৃহত্তর পরিকল্পনাও এর সঙ্গে জড়িত।
সালামেই আরও বলেন, নাবাতিয়েহ ও টায়ার থেকে মানুষের বাস্তুচ্যুতি হিজবুল্লাহর সামাজিক ভিত্তিকে দুর্বল করতে পারে। এছাড়া দক্ষিণ লেবাননের জনসংখ্যাগত ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিবর্তন আনতে পারে।
লেবানিজ সাংবাদিক ও বিশ্লেষক সুহাইব জাওহারের মতে, ইসরায়েলি বাহিনীর নাবাতিয়েহ পৌঁছে যাওয়া সংঘাতের একটি বড় মোড় নির্দেশ করে।
তার ভাষ্য, শহরটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া বা ঘিরে ফেলা হলে যুদ্ধ সীমান্ত অঞ্চল থেকে দক্ষিণ লেবাননের রাজনৈতিক ও সামাজিক কেন্দ্রভাগে পৌঁছে যাবে।
তিনি বলেন, এর ফলে বাস্তুচ্যুতি বাড়বে, দক্ষিণাঞ্চলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল হবে এবং নিজেদের জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করতে সক্ষম শক্তি হিসেবে হিজবুল্লাহর ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পাশাপাশি দক্ষিণাঞ্চলে ক্ষমতার ভারসাম্যে নতুন বাস্তবতা তৈরি হতে পারে।
বেউফোর্ট দুর্গের গুরুত্ব
ইসরায়েলি বাহিনী লিতানি নদী উপত্যকার পাশের একটি উঁচু পাহাড়ের রাস্তা ধরে উত্তর দিকে এগিয়ে গেছে। একই সঙ্গে তারা পাহাড়ে অবস্থিত ক্রুসেড আমলের ঐতিহাসিক ‘বোফোর্ট দুর্গ’ দখলে নিয়েছে। কৌশলগত কারণে এই দুর্গটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ জানিয়েছেন, গোলানি ব্রিগেডের সদস্যরা লিতানি নদী অতিক্রম করে দুর্গটি দখল করেছেন।
ইসরায়েলি সীমান্ত থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই দুর্গ থেকে দক্ষিণ লেবাননের বিস্তীর্ণ এলাকা পর্যবেক্ষণ করা যায়। ২০০০ সালে লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহারের আগে প্রায় দুই দশক এটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল ইসরায়েল।
সালামেইর মতে, দুর্গটি দখল করে ইসরায়েল সামরিক ও প্রতীকী—দুই ধরনের সুবিধাই পেয়েছে।
তিনি বলেন, বেউফোর্ট দুর্গের উচ্চভূমি থেকে দক্ষিণ লেবাননের বিস্তৃত এলাকা পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। পাশাপাশি সামরিক রসদ সরবরাহের ক্ষেত্রেও এটি সুবিধা দেয়।
তার ভাষ্য, ঐতিহাসিকভাবে এই স্থানটি ইসরায়েলি বাহিনী, ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী এবং পরে হিজবুল্লাহর সঙ্গে সংঘটিত তীব্র লড়াইয়ের স্মারক। ফলে এর প্রতীকী গুরুত্বও কম নয়।
লিতানি নদী ছাড়াল ইসরায়েলের উচ্ছেদ নির্দেশনা
গত সপ্তাহের শেষ দিকে জাহরানি নদীর দক্ষিণাঞ্চলের বাসিন্দাদের অবিলম্বে এলাকা ত্যাগের নির্দেশ দেয় ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জাহরানি নদী লিতানি নদীর অনেক উত্তরে অবস্থিত। অথচ এর আগে হিজবুল্লাহমুক্ত অঞ্চল গঠনের সীমা হিসেবে লিতানিকেই উল্লেখ করেছিল ইসরায়েল।
এক্সে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ইসরায়েলি সামরিক মুখপাত্র এলা ওয়াওইয়া বলেন, অভিযানের লক্ষ্য হচ্ছে সন্ত্রাসী অবকাঠামো ধ্বংস, নাশকতাকারীদের নির্মূল এবং দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা।
তবে সরিয়ে নেওয়ার এলাকা সম্প্রসারণের ফলে ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
সালামেইর মতে, যদি উদ্দেশ্য কেবল লিতানির দক্ষিণাঞ্চল থেকে হিজবুল্লাহর সামরিক উপস্থিতি সরানো, তাহলে অভিযানও সে এলাকাতেই সীমাবদ্ধ থাকত।
তার ভাষ্য, আরও উত্তরে সামরিক তৎপরতা ও সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ হয়তো বৃহত্তর নিরাপত্তা বলয় গঠন, দীর্ঘমেয়াদি ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ কিংবা ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমঝোতায় সুবিধা অর্জনের প্রচেষ্টার ইঙ্গিত বহন করছে।
জাওহারও মনে করেন, এই পদক্ষেপ থেকে বোঝা যায় ইসরায়েলের লক্ষ্য লিতানি নদীর সীমারেখার বাইরে চলে গেছে।
তার মতে, ইসরায়েল শুধু হিজবুল্লাহ যোদ্ধা ও স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রকে সীমান্ত থেকে দূরে সরিয়ে দিতে চাইছে না; বরং দক্ষিণ লেবাননের গভীরে থাকা তাদের সামরিক, রসদ ও কমান্ড কাঠামোকেও লক্ষ্যবস্তু করছে।
তিনি বলেন, বাস্তবে নিরাপত্তা বলয়ের ধারণা লিতানি থেকে জাহরানি পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে বলেই মনে হচ্ছে, যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে তা ঘোষণা করা হয়নি।
লেবাননের জন্য এর অর্থ কী
বিশ্লেষকদের মতে, চলমান সামরিক উত্তেজনা লেবানন সরকারের কর্তৃত্ব সুসংহত করা এবং স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে আলোচনার প্রচেষ্টাকে দুর্বল করে দিতে পারে।
জাওহারের ভাষ্য, ইসরায়েলের লক্ষ্য শুধু লিতানির দক্ষিণাঞ্চল থেকে হিজবুল্লাহকে সরিয়ে দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
তিনি বলেন, যদি সেটিই একমাত্র উদ্দেশ্য হতো, তাহলে লিতানির উত্তরে অগ্রসর হওয়া বা জাহরানি পর্যন্ত সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার প্রয়োজন পড়ত না।
তার মতে, ইসরায়েল হিজবুল্লাহর সামরিক কাঠামো দুর্বল করতে, একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত বা জনশূন্য অঞ্চল তৈরি করতে এবং রাজনৈতিক বা নিরাপত্তা আলোচনার আগে নতুন বাস্তবতা প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।
জাওহার মনে করেন, ১৯৮২ থেকে ২০০০ সালের মতো পূর্ণাঙ্গ দখলদারিত্বে হয়তো ফিরতে চায় না ইসরায়েল। তবে বাফার জোন, নজরদারি এবং প্রয়োজনমতো সামরিক অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার চেষ্টা থাকতে পারে।
ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ফিলিপ্পো ডিওনিজি আল জাজিরাকে বলেন, ইসরায়েলের অব্যাহত হামলা লেবানন সরকারকে দুর্বল করতে পারে এবং উল্টোভাবে হিজবুল্লাহর প্রভাব বাড়িয়ে দিতে পারে।
তার মতে, ইসরায়েল যদি পুরোপুরি যুদ্ধবিরতি মেনে চলত, তাহলে লেবানন সরকার অন্তত দাবি করতে পারত যে আলোচনার মাধ্যমে দেশটির স্বার্থ রক্ষা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে তা দেখা যাচ্ছে না।
ডিওনিজি বলেন, এর ফলে হিজবুল্লাহর দাবিই আরও প্রমাণিত হচ্ছে যে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ এখনো প্রয়োজন।
তার ভাষ্য, ইসরায়েলি হামলা একদিকে লেবানন সরকারের বৈধতা ও আলোচনার প্রক্রিয়াকে দুর্বল। অন্যদিকে হিজবুল্লাহর সামরিক কর্মকাণ্ডের পক্ষে জনসমর্থনের ভিত্তিও জোরদার করছে।