Image description

তেল নিয়ে বাংলা সাহিত্যে অনেক মজার চর্চা রয়েছে। তেলচর্চা  নিয়ে সবচেয়ে বেশী আলোচিত হয় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর বিখ্যাত রম্যরচনা 'তৈল'। যদিও এটি চাটুকারিতা বা তেলবাজির ওপর একটি তীক্ষ্ণ সামাজিক ব্যঙ্গরস, তথাপি এটাই চলমান বাস্তবতা। এখানে লেখক তেলকে 'শক্তিমান' হিসেবে তুলে ধরেছেন, তার মতে তেল এতটাই  শক্তশালী যে এই পদার্থকে ব্যবহার করে যেমন তরতর করে উপরে ওঠা যায় তেমনি  এটিকে ব্যবহার করে কারও চলার পথকে কষ্টসংকুল করে তোলা যায় যেমনটি আমরা  বিদ্যালয়বেলায় গনিত পাঠ্যে দেখেছি তৈলাক্ত বাঁশের চূড়ায় উঠতে বানরকে কত কষ্ট পেতে হয়েছে, বেশি সময় ব্যয় করতে হয়েছে। 

তেল ছাড়া যেখানে নির্জীব যন্ত্র চলেনা সেখানে  জ্ঞান-বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ কীভাবে চলবে। কিন্তু, তেল  তো বিড়ম্বনার সৃষ্টিও করছে কমনা। বক্তৃতার মঞ্চে পাতি নেতা তেল দিতে গিয়ে  সন্মানসূচক মনে করে বড় নেতার নামের আগে ‘মরহুম’ শব্দটি বসিয়ে দিলেন অতঃপর অবস্থা অনুমেয়। আরেকবার তো এক রাজনৈতিক জনসভায়  শুনলাম  মঞ্চে এক ছোট নেতা তাঁর বড় নেতাকে  খুশী করতে তাঁর প্রতিপক্ষ দলকে উদ্দেশ্য করে বলছেন, ‘শহিদ’ শুধু আপনাদের দলের নেতাই না,  মঞ্চে বসা নেতাকে ইঙ্গিত কর বললেন,আমাদের দলের নেতা আরও বড় ‘শহিদ’। জীবিত নেতা মঞ্চে বসে ‘শহিদ’ হয়ে গেছেন এর চেয়ে বিড়ম্বনার তেল কী হতে পারে? অফিসের বড় সাহেব কাজে নতুন যোগ দিয়েই ঘোষণা দেন, তিনি কোনো ধরণের তেলবাজি পছন্দ করেননা। কয়েকদিন যেতেই দেখা যায় অধঃস্তন তাকে তোষামোদ না করায়, স্তুতি বন্দনা না করে কথা বলায়,তেলমর্দন না করায় বিরাগভাজন হতে হয়েছে, পড়তে হয়েছে রোষাণলে। 

আগুনের আবিস্কার যেমন একসময় শিল্পবিপ্লবের সূচনা করেছিল  তেমনি  এই শিল্পবিপ্লবকে গতি দিয়েছে তেল, তেল ছাড়া শিল্প অচল। একারণে যার কাছে তেল আছে  তার অনেক ক্ষমতা আছে।  তবে তেল নিয়ে বিপদও দিন দিন বাড়ছে বৈ কমছেনা। তেল নিয়ে বিড়ম্বনার বড় সাক্ষী হয়ে আছে মধ্যপ্রাচ্য। তাদের তেল সম্পদের দখল নেওয়ার জন্য বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশ আমেরিকা আজ ইরান, ইরাকসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্য তছনছ করে দিচ্ছে, অবশ্য সেখানে আবার তেল নিয়ে কিছু তেলবাজও বসে আছেন বিশ্ব মোড়লকে খুশী করতে। ভেনেজুয়েলার মাদুরো সাহেব বিশ্ব মোড়লকে তেল না দিয়ে কেবল নিজের কাছে জমা রেখেছেন  আর সেই তেলের জোরে গরম গরম কথা বলায় বিশ্বমোড়ল আমেরিকা তাকে যেভাবে তথাকথিত সভ্য দুনিয়ায় টেনে হিঁচড়ে সিংহাসন থেকে উঠিয়ে নিয়ে গেল তাতে শরীরের তেল কিংবা মজুদ তেলের খনিও আতঙ্কিত। 

তেল রাজনীতি কিংবা পেট্রোলিয়াম রাজনীতি যে নামেই ডাকি না কেন এটি মূলত আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশাল কৌশলগত হাতিয়ার।সম্পর্কের এই কৌশল নির্ধারনে রয়েছে রাজনীতি আর এই রাজনীতি পরিচালনায় তেল উৎপাদন, তেলের মূল্য নির্ধারণ এবং সরবরাহের নিয়ন্ত্রণ বিশ্ব ক্ষমতার গতিপ্রকৃতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তার করে। ইসরায়েল-আমেরিকার ইরানে হামলা থেকে উদ্ভূত যুদ্ধ আমাদের দেখিয়ে দিচ্ছে কীভাবে এই তেল ধীরে ধীরে বিশ্ব রাজনীতিতে যুদ্ধাস্ত্র হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে। 

তেলের পাইপ লাইন কূটনীতিও দেখেছে বিশ্ব, যেমন কাস্পিয়ান সাগর অঞ্চলে ‘পাইপলাইন কূটনীতি’। এই কূটনীতি অনেকটা এমন যে ‘তোর রাস্তায় হাটবনা, আমি নতুন রাস্তা বানিয়ে নেব এবং তোর রাস্তা অকেজো করে দেব’। যেমন ধরুন রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণমুক্ত হতে  কাস্পিয়ান সাগরের পশ্চিম দিক (আজারবাইজানীয় অংশ) থেকে ভূমধ্যসাগরে রাশিয়ান পাইপলাইনকে পাশ কাটিয়ে বাকু-তিবিলিসি-জেহান পাইপলাইনটি অপরিশোধিত তেল পরিবহনের জন্য এবং বাকু-তিবিলিসি-এরজুরুম পাইপলাইনটি প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের জন্য নির্মিত হয়েছিল। পাইপলাইনগুলো নির্মাণের পর, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন কাস্পিয়ান সাগরের নীচ দিয়ে প্রস্তাবিত ট্রান্স-কাস্পিয়ান তেল পাইপলাইন এবং ট্রান্স-কাস্পিয়ান গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে এগুলোকে কাস্পিয়ান সাগরের পূর্ব দিকের (কাজাখস্তান এবং তুর্কমেনিস্তান অংশ) তেল ও গ্যাস ক্ষেত্র পর্যন্ত সম্প্রসারণের প্রস্তাব দেয়। এই প্রেক্ষাপটে  রাশিয়া নিজের নিয়ন্ত্রন বহাল রাখার জন্য ২০০৭ সালে, তুর্কমেনিস্তান এবং কাজাখস্তানের সাথে তাদের তেল ও গ্যাস ক্ষেত্রগুলোকে রাশিয়ান পাইপলাইন ব্যবস্থার সাথে সংযুক্ত করার জন্য চুক্তি স্বাক্ষর করে, ফলস্বরূপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাস্পিয়ান সাগরের তলদেশের পাইপলাইনটি মুখথুবরে পড়ে। এ যেন দাবা খেলায় চালের বিপরীতে চাল, যখনই প্রশ্ন তখনই উত্তর।

অতএব, তেল ব্যবহার করে রাজনীতি এবং তেল নিয়ে রাজনীতি যেমনি জটিল তেমনি কুটিল। ইসরায়েল আমেরিকার চাপিয়ে দেয়া চলমান  ইরান যুদ্ধেও তেল যেন চাল এবং ঢাল দুই ভূমিকায়ই অবতীর্ন। তাই বলি কী, তেল দিয়ে রাজনীতি করা এবং তেল নিয়ে রাজনীতি দুটোতেই কৌশলী হতে হবে নাহলে  প্রাপ্তির পরিবর্তে বিপর্যয়ও নেমে আসতে পারে।

ড. এ এস এম সাইফুল্লাহ: অধ্যাপক, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]