নিয়াজ মাহমুদ
বাংলাদেশে একটি পুরনো সত্য বারবার নতুন করে ফিরে আসে। সরকার বদলায়, ক্ষমতার মুখ বদলায়, ভাষণ বদলায়, প্রতিশ্রুতি বদলায়—কিন্তু রাষ্ট্রের ভেতরের চালিকাশক্তি খুব একটা বদলায় না। বাইরে দেখা যায় রাজনীতি, ভেতরে কাজ করে প্রশাসন। সামনে থাকে মন্ত্রী, পেছনে থাকে ফাইল। বক্তৃতায় থাকে গণতন্ত্র, বাস্তবে চলে দাপ্তরিক নিয়ন্ত্রণ। আর সেই কারণেই আজও বাংলাদেশে একটি প্রশ্ন অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক—আসলে দেশ চালায় কে?
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সোমবার যে কথাটি বলেছেন, সেটি নিছক একটি এনজিও-ধর্মী পর্যবেক্ষণ নয়; বরং বাংলাদেশের রাষ্ট্রচরিত্রের একটি নির্মম ও অস্বস্তিকর সারসংক্ষেপ। তাঁর ভাষায়, “আমলাতন্ত্র আগের মতোই মূল নির্ণায়ক বাংলাদেশে।” এই একটি বাক্যই বুঝিয়ে দেয়, আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের কেন্দ্র কোথায়, আর গণতন্ত্রের সীমা কোথায় গিয়ে আটকে আছে।
ড. ইফতেখারুজ্জামান যে অভিযোগ তুলেছেন, তা সরাসরি রাষ্ট্রীয় সংস্কার প্রক্রিয়ার কেন্দ্রকে আঘাত করে। তিনি বলেছেন, কার্যকর মানবাধিকার কমিশন গঠন, গুম প্রতিরোধ এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র কাঠামো তৈরির জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের আনা অধ্যাদেশগুলো দ্রুত পাস না হওয়ার পেছনে রয়েছে ‘রাজনৈতিক’ ও ‘আমলাতান্ত্রিক’ বাধা।
এই কথার গুরুত্ব এখানে যে, তিনি সরকারকে সরাসরি সদিচ্ছাহীন বলেননি। বরং ইঙ্গিত করেছেন, সদিচ্ছা আছে—কিন্তু রাষ্ট্রের ভেতরে সেই সদিচ্ছাকে থামিয়ে দেয়ার শক্তিও আছে।
এটাই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ট্র্যাজেডি।
এই দেশে বহুবার দেখা গেছে—সরকার সংস্কারের ঘোষণা দেয়, বক্তৃতায় সাহসী ভাষা ব্যবহার করে, দলিলে প্রতিশ্রুতি রাখে; কিন্তু বাস্তবে গিয়ে দেখা যায়, সংস্কারের মূল জায়গাগুলোতে এসে হঠাৎ ব্রেক কষা হয়। কেন? কারণ রাষ্ট্রের ভেতরে একটি শক্তিশালী, সুসংগঠিত, স্থায়ী ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট বলয় আছে, যারা ক্ষমতার পুনর্বণ্টন চায় না।
আমরা সাধারণত মনে করি, নির্বাচিত সরকারই সব সিদ্ধান্ত নেয়। বাস্তবে বাংলাদেশে সিদ্ধান্তের বড় অংশ নির্ধারিত হয় ফাইল, নোটশিট, প্রশাসনিক আপত্তি, দাপ্তরিক ব্যাখ্যা, মতামত, পর্যালোচনা, সংশোধনী—এই সবকিছুর ভেতর দিয়ে।
একটি সরকার জনগণের ভোটে আসে। কিন্তু রাষ্ট্রের দৈনন্দিন ক্ষমতা পরিচালিত হয় কারা কী লিখল, কোন ফাইল কোথায় আটকাল, কোন ধারা “আরও একটু ভেবে দেখা দরকার” বলা হলো—এসবের মাধ্যমে অর্থাৎ, ভোটে সরকার আসে, কিন্তু ফাইলে ক্ষমতা আটকে যায়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই জায়গাটিই সবচেয়ে ভয়ংকর। কারণ এখানে অনেক সময় জনপ্রতিনিধিরা দৃশ্যমান ক্ষমতার মালিক, কিন্তু আমলাতন্ত্র বাস্তব ক্ষমতার ব্যবহারকারী। মন্ত্রী নীতির কথা বলেন, কিন্তু সেই নীতির ভাষা কে লিখছে? সংসদ আইন পাস করে, কিন্তু সেই আইনের ভেতরে কোন শব্দ ঢুকবে, কোন ক্ষমতা বাদ যাবে, কোন সংস্থা কতটা স্বাধীন থাকবে—এসব ঠিক করে কে? এই প্রশ্নের উত্তরটাই আজকের বাংলাদেশকে বোঝার চাবিকাঠি।
জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি ইতিমধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি হুবহু আইনে পরিণত করার সুপারিশ করেছে। নিঃসন্দেহে এটি একটি ইতিবাচক দিক। অন্তত অধ্যাদেশগুলোকে বাতাসে ঝুলিয়ে না রেখে আইনগত কাঠামোয় আনার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু এখানেই মূল প্রশ্নটি আসে। কোন ৯৮টি? আর কোনগুলো আটকে গেল?
দেখা যাচ্ছে, যেসব অধ্যাদেশ রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে জবাবদিহির আওতায় আনতে পারত—যেমন মানবাধিকার, গুম প্রতিরোধ, পুলিশ সংস্কার, তথ্য ও নজরদারি, কমিশনের স্বাধীনতা—সেগুলো নিয়েই সবচেয়ে বেশি আপত্তি, টানাপড়েন, সংশোধন, স্থগিতাদেশ, বাতিল বা পুনর্বিবেচনার আলোচনা। এটা কি কাকতালীয়? একেবারেই না।
বরং এটিই প্রমাণ করে, রাষ্ট্রের যে অংশগুলো জবাবদিহির বাইরে থাকতে চায়, তারা এখনো শক্তিশালী।
বাংলাদেশে ক্ষমতার যে পুরনো কাঠামো আছে, সেটি চায় না কেউ তাদের ঘাড়ে হাত রাখুক। তারা চায় প্রতিষ্ঠান থাকুক, কিন্তু দাঁত-নখ না থাকুক। কমিশন থাকুক, কিন্তু তদন্তক্ষমতা না থাকুক। আইন থাকুক, কিন্তু প্রয়োগের জায়গায় ব্যতিক্রম থাকুক। মানবাধিকার থাকুক, কিন্তু রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ওপর পূর্ণ নজরদারি না থাকুক অর্থাৎ, রূপ থাকবে—কিন্তু ক্ষমতা থাকবে না।
বাংলাদেশে আমলাতন্ত্রকে কেবল প্রশাসনিক শ্রেণি হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি শুধু ফাইল চালানো, অফিস পরিচালনা বা নীতি বাস্তবায়নের যন্ত্র নয়। বাস্তবে এটি একটি ক্ষমতাস্বার্থ-সংরক্ষণকারী কাঠামো।
এই কাঠামোর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো—এটি নির্বাচিত নয়, কিন্তু প্রভাবশালী; দৃশ্যমান নয়, কিন্তু কার্যকর; দায়ী নয়, কিন্তু নির্ধারক।
এখানে বড় সমস্যা হলো, আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই কাঠামোর ওপর এতটাই নির্ভরশীল হয়ে গেছে যে, তারা নিজেরাও এক পর্যায়ে এসে প্রশাসনিক ভাষায় কথা বলতে শুরু করে। বিরোধী দলে থাকলে তারা সংস্কারের কথা বলে, কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে একই দলই “প্রশাসনিক জটিলতা”, “প্রক্রিয়াগত সীমাবদ্ধতা”, “আরও যাচাইয়ের প্রয়োজন” ইত্যাদি ভাষা ব্যবহার করে।
অর্থাৎ, রাজনীতি অনেক সময় আমলাতন্ত্রকে প্রতিরোধ করে না; বরং ব্যবহার করে।
এ কারণেই শুধু আমলাদের দিকে আঙুল তুললে পুরো সত্য ধরা পড়ে না। বাস্তবতা হচ্ছে, বাংলাদেশে রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং আমলাতন্ত্রের মধ্যে বহু সময় এক ধরনের নীরব সমঝোতা কাজ করে।
রাজনীতি চায় নিয়ন্ত্রণ, আমলাতন্ত্র চায় স্থায়িত্ব। রাজনীতি চায় ক্ষমতা, আমলাতন্ত্র চায় প্রভাব।
দুই পক্ষের স্বার্থ যখন মিলে যায়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয়—গণতন্ত্র, জবাবদিহি ও নাগরিক অধিকার।
এখানে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্ন হলো—কার্যকর মানবাধিকার কমিশন নিয়ে এত অস্বস্তি কেন?
একটি সত্যিকারের স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন রাষ্ট্রের সবচেয়ে অস্বস্তিকর জায়গাগুলোতে আলো ফেলতে পারে। গুম, হেফাজতে নির্যাতন, বেআইনি আটক, বলপ্রয়োগ, নিরাপত্তা বাহিনীর জবাবদিহি—এসব প্রশ্নে যদি কমিশন বাস্তব ক্ষমতা পায়, তাহলে রাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের “অস্পৃশ্য অঞ্চল”গুলোতে হাত পড়বে। আর সেখানেই ভয়।
কারণ বাংলাদেশে বহু বছর ধরে কিছু ক্ষেত্রকে প্রায় “রাষ্ট্রীয় ব্যতিক্রম অঞ্চল” হিসেবে দেখা হয়েছে—যেখানে আইনের ভাষা আছে, কিন্তু জবাবদিহির চর্চা দুর্বল; প্রতিষ্ঠান আছে, কিন্তু নাগরিকের প্রবেশাধিকার সীমিত; অভিযোগ আছে, কিন্তু প্রতিকার নেই।
এই জায়গায় একটি স্বাধীন কমিশন বা শক্তিশালী গুম প্রতিরোধ আইন কেবল প্রশাসনিক সংস্কার নয়—এটি ক্ষমতার কেন্দ্রে নৈতিক ও আইনি হস্তক্ষেপ। আর সেই কারণেই প্রতিরোধও এত তীব্র।
বাংলাদেশে আজ একটি বড় বাস্তবতা হলো—আমাদের দৃশ্যমান সরকার আছে, কিন্তু তার পাশাপাশি একটি অদৃশ্য সরকারও আছে।
দৃশ্যমান সরকার কথা বলে। অদৃশ্য সরকার সিদ্ধান্ত বিলম্বিত করে। দৃশ্যমান সরকার ঘোষণা দেয়।
অদৃশ্য সরকার নোটশিট লেখে। দৃশ্যমান সরকার প্রতিশ্রুতি দেয়। অদৃশ্য সরকার বলে—“এখনই সম্ভব নয়।”
এই অদৃশ্য সরকারই অনেক সময় প্রকৃত নির্ধারক। এরা নির্বাচন করে না, ভোট চায় না, জনসভা করে না—কিন্তু রাষ্ট্রের ক্ষমতার ভেতরের সুইচবোর্ড অনেকটাই তাদের হাতে থাকে।
এবং সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো—তাদের জবাবদিহি জনতার কাছে নয়, বরং কাঠামোর ভেতরে। এই বাস্তবতা না বুঝলে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের সীমাবদ্ধতা বোঝা যাবে না।
বাংলাদেশে “সংস্কার” শব্দটি বহুবার ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে আমাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো—আমরা রাষ্ট্রের বাহ্যিক রূপ পাল্টাতে চেয়েছি, ভেতরের ক্ষমতার স্থাপত্যে হাত দিতে চাইনি। এখন যদি সত্যিই পরিবর্তন চাই, তাহলে কয়েকটি কঠিন কাজ করতে হবে।
প্রথমত, আইন প্রণয়নের পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে হবে। কোন মন্ত্রণালয় কী আপত্তি তুলেছে, কোন ধারা কে বদলেছে, কোন সংস্থার চাপে কোন ক্ষমতা কমানো হয়েছে—এসব জনগণের জানার অধিকারভুক্ত হতে হবে।
দ্বিতীয়ত, সংসদীয় কমিটিকে ‘সাজসজ্জার প্রতিষ্ঠান’ থেকে বাস্তব ক্ষমতার প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে হবে। তাদের শুনানি, মতভেদ, সুপারিশ—সবকিছু জনগণের সামনে আনতে হবে।
তৃতীয়ত, স্বাধীন কমিশনগুলোকে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণমুক্ত করতে হবে।নিয়োগ, বাজেট, তদন্তক্ষমতা, রিপোর্টিং—সবখানে নির্বাহী হস্তক্ষেপ কমাতে হবে।
চতুর্থত, রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দায় নিতে হবে। সব ব্যর্থতার দায় “ভেতরের বাধা” বলে এড়িয়ে গেলে চলবে না। যদি বাধা থাকে, তবে সেটি অতিক্রম করাই তো রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরীক্ষা। আজকের সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি এখানেই।
আমরা কি এমন একটি রাষ্ট্র চাই, যেখানে মন্ত্রীরা আছেন কিন্তু সিদ্ধান্ত অন্যরা নেয়? আমরা কি এমন একটি সংসদ চাই, যেখানে আইন পাস হয় কিন্তু ক্ষমতার কাঠামো অপরিবর্তিত থাকে? আমরা কি এমন একটি গণতন্ত্র চাই, যেখানে জনগণ ভোট দেয়, কিন্তু রাষ্ট্রের গভীর সিদ্ধান্তে তাদের প্রভাব থাকে না?
ড. ইফতেখারুজ্জামানের বক্তব্যের আসল তাৎপর্য এখানেই। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন—বাংলাদেশে এখনো রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্র আছে। সেই রাষ্ট্রের ভাষা নীরব, পোশাক সাদা-কালো, হাতে ফাইল, মুখে নিয়ম—কিন্তু প্রভাব বিস্তারে সে প্রবল।
গণতন্ত্রের বড় বিপদ সব সময় প্রকাশ্য স্বৈরাচার নয়। অনেক সময় বড় বিপদ আসে দাপ্তরিক ভদ্রতা, প্রশাসনিক বিলম্ব, এবং অদৃশ্য ক্ষমতার নীরব প্রভাব হয়ে।
বাংলাদেশের সামনে এখন প্রশ্ন একটাই—দেশ কি ভোটে চলবে, নাকি নোটশিটে?
“The real problem of humanity is the following: We have Paleolithic emotions, medieval institutions, and god-like technology.”
— Edward O. Wilson
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট