আহসান হাবিব বরুন
মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এবং শেখ মামুন খালেদ—এই দুটি নাম এক অস্বস্তিকর সমান্তরাল রেখায় দাঁড়িয়ে আছে। একজন ‘এক-এগারো’র অন্ধকার অধ্যায়ের বিতর্কিত কুশীলব হিসেবে চিহ্নিত, অন্যজন রাষ্ট্রের অন্যতম শক্তিশালী গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ পদে থেকে ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগে গ্রেপ্তার। দুই ভিন্ন সময়, দুই ভিন্ন প্রেক্ষাপট—কিন্তু অভিযোগের ভাষা এক: রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপপ্রয়োগ, আইনের সীমারেখা লঙ্ঘন এবং নাগরিক অধিকারের প্রতি অবজ্ঞা।
এই দুই ঘটনাপ্রবাহকে পাশাপাশি রাখলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে এটি কোনো বিচ্ছিন্ন বাস্তবতা নয়; বরং একটি দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোগত সংকটের প্রতিফলন।
যে রাষ্ট্রীয় যন্ত্র নাগরিকের নিরাপত্তা, অধিকার এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করার জন্য গড়ে উঠেছিল, সেই ব্যবস্থার ভেতর থেকেই যখন কিছু ব্যক্তি ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থে ব্যবহার করেন, তখন সেটি শুধু একটি অপরাধ নয়—বরং রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তির ওপর আঘাত।
২০০৭ সালের ‘এক-এগারো’ ছিল সেই ধরনেরই এক অন্ধকার সময়, যখন রাষ্ট্র একটি অস্বাভাবিক ক্ষমতার কাঠামোয় প্রবেশ করেছিল। বিপথগামী সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ছায়ায় কিছু ব্যক্তি ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে এসে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমন, ভয় সৃষ্টি এবং আইনকে নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করার অভিযোগে অভিযুক্ত হন।
সেই প্রেক্ষাপটে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর নাম বারবার উঠে এসেছে।
তার কর্মজীবনের পথচলা ছিল দীর্ঘ ও প্রভাবশালী। ১৯৭৫ সালে রক্ষীবাহিনীতে যোগদান, পরবর্তীতে সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্তি, ধাপে ধাপে পদোন্নতি পেয়ে লেফটেন্যান্ট জেনারেল হওয়া—সবই তাকে ক্ষমতার কেন্দ্রের কাছাকাছি নিয়ে যায়। নবম ডিভিশনের জিওসি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি এমন এক সময়ের অংশ ছিলেন, যখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা অস্বাভাবিকভাবে কেন্দ্রীভূত হয়েছিল।
পরবর্তীতে কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন, অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ এবং অবসরের পর রাজনীতিতে প্রবেশ—সব মিলিয়ে তার অবস্থান ছিল বহুমাত্রিক।
জাতীয় পার্টিতে যোগদান, সাজানো নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া এবং প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন—এসবই প্রমাণ করে যে ক্ষমতার পরিধি তার জন্য কখনো সংকুচিত হয়নি।
কিন্তু এই দীর্ঘ যাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে আছে গুরুতর অভিযোগ । রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ, অর্থপাচার, শ্রমবাজারে অনিয়ম—এসব প্রশ্ন তার কর্মকাণ্ডকে গভীরভাবে বিতর্কিত করেছে। ২০২৪ সালের আন্দোলনের সময় সহিংস ঘটনার মামলায় তার নাম উঠে আসা এবং দীর্ঘ সময় গ্রেপ্তার এড়িয়ে যাওয়ার পর অবশেষে আটক হওয়া—এগুলো কেবল আইনি ঘটনা নয়; বরং একটি দীর্ঘদিনের জবাবদিহিতার অভাবের প্রতিফলন।
একইভাবে শেখ মামুন খালেদের ঘটনাও আমাদের সামনে আরেকটি বাস্তবতা তুলে ধরে। রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা একজন ব্যক্তি যখন দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সহিংস ঘটনার অভিযোগে অভিযুক্ত হন, তখন প্রশ্ন ওঠে—রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিতা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর?
তার বিরুদ্ধে জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্পে অর্থ আত্মসাৎ, অবৈধ শেয়ার ব্যবসা, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং একটি হত্যা মামলায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ—এসবই কেবল ব্যক্তিগত অপরাধের প্রশ্ন নয়; বরং এটি একটি বৃহত্তর কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—যারা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও আইন রক্ষার দায়িত্বে ছিলেন, তাদের বিরুদ্ধেই যখন আইন লঙ্ঘন, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং মানবাধিকার ক্ষুণ্ন করার অভিযোগ ওঠে, তখন সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায় দাঁড়ায়? রাষ্ট্র তখন কেবল একটি প্রশাসনিক কাঠামো নয়; বরং একটি অনিশ্চয়তার প্রতীকে পরিণত হয়।
এই বাস্তবতায় তাদের বিচারের আওতায় আনা শুধু আইনি বাধ্যবাধকতা নয়—এটি একটি নৈতিক অপরিহার্যতা। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির কোনো বিকল্প নেই, কারণ বিচারহীনতা নতুন অপরাধের জন্ম দেয়। যদি ক্ষমতার অপব্যবহারকারীরা বারবার রেহাই পায়, তাহলে রাষ্ট্রের ভেতরে একটি বিপজ্জনক বার্তা যায়—ক্ষমতাই শেষ কথা।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকেই যায়—এই বিচার কি কেবল নির্বাচিত কয়েকজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে? নাকি একই ধরনের অপরাধে জড়িত সকলকেই আইনের আওতায় আনা হবে? যদি একই অপরাধে কেউ কেউ বিচারের বাইরে থেকে যায়, তাহলে এই পুরো প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। এতে কোন সন্দেহ নেই।
আইনের শাসনের মূল ভিত্তিই হলো সমতা। যে ব্যক্তি যত শক্তিশালীই হোক না কেন, তার অপরাধের বিচার হতে হবে একই মানদণ্ডে। অন্যথায় এটি ন্যায়বিচার নয়; বরং একটি নিয়ন্ত্রিত বিচার ব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়াবে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, যেখানে রাষ্ট্র অতীতের অন্যায়কে আড়াল করেছে, সেখানে সেই অন্যায় নতুন রূপে ফিরে এসেছে। আর যেখানে সত্য উদঘাটন, দায় স্বীকার এবং নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা হয়েছে, সেখানে গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়েছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন কিংবা লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন অনুসন্ধান প্রক্রিয়া তার প্রমাণ।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই মুহূর্তটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। এটি কেবল দুইজন ব্যক্তির বিচার নয়; বরং একটি ব্যবস্থার আত্মসমালোচনা। যদি সত্যিকার অর্থে সকল অপরাধীর বিচার নিশ্চিত করা যায়, তবে এটি একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে যে, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার আর নিরাপদ থাকবে না।
অন্যথায় এই বাস্তবতা একটি ‘ম্যাজিক্যাল চেয়ারের’ মতো ঘুরে ফিরে আসবে—এক সময় যারা ক্ষমতায় থাকে, তারা অপরাধ করে পার পেয়ে যায়; আর ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে একই চক্র নতুন করে শুরু হয়।
সুতরাং মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এবং শেখ মামুন খালেদের মতো অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচারের মুখোমুখি করা এবং সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা শুধু একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়—এটি একটি রাষ্ট্রীয় বার্তা। সময়ের দাবি। এই বার্তাটি হতে হবে স্পষ্ট: ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের কোনো স্থান এই রাষ্ট্রে নেই।
পরিশেষে বলা যায়, শাস্তি কেবল একটি ধাপ। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সত্যের পূর্ণ উন্মোচন, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং একটি শক্তিশালী জবাবদিহিমূলক কাঠামো গড়ে তোলা।
কারণ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু ন্যায়বিচার ও সত্য চিরস্থায়ী। সুতরাং সবার জন্য যদি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যায়, তবেই রাষ্ট্র জনগণের জন্য নিরাপদ ও আস্থার প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা