ফ্যাসিবাদ বিরোধী প্রকৃত গণজাগরণের ৬ এপ্রিল আজ
বুধবার ৬ এপ্রিল। ২০১৩ সালের এই দিনে বিশ্ববাসী দেখেছিল বাংলাদেশে প্রতিবাদী মানুষের জনবিস্ফোরণ। এই দিনে শাহবাগের তথাকথিত গণজাগরণের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ফুসে উঠেছিল মানুষ। দেশের ৯০ শতাংশ মানুষের ধর্ম ইসলাম বিদ্বেষী কথিত ব্লগারদের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তায় উত্থান ঘটেছিল ঢাকার শাহাবাগে। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা এবং ভারতীয় সহযোগিতায় গড়ে উঠা জমায়েতের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘সনজাগরণ মঞ্চ’। দেশের মানুষের ধর্মীয় চিন্তা ও ধর্মীয় সংস্কৃতি বিদ্বেষীদের উগ্রতার প্রতিবাদে ৬ এপ্রিল রাজপথে নেমে এসেছিল সব শ্রেনী পেশার মানুষ।
মানুষের পুঞ্জিভুত ক্ষোভ সংগঠিত করে ওলামায়ে কেরামের নেতৃত্বে গঠিত হেফাজতে ইসলাম প্রতিবাদে মাঠে নেমেছিল সেদিন। এর আগে হেফাজতে ইসলামের নাম তেমন এটা শোনা যায়নি। সেদিনই মানুষ জানতে পারে দেশের বরেণ্য উলামায়ে কেরামের নেতৃত্বে হেফাজতে ইসলাম নামের একটি সংগঠন রয়েছে। ‘ফাঁসি চাই’ শ্লোগান দিয়ে সংগঠিত হওয়া ধর্ম বিদ্বেষী ফ্যাসিবাদের ক্রীড়নকদের রুখে দিতে হেফাজতে ইসলাম ১৩ দফা দাবী পেশ করেছিল তখন। এই সংগঠনটির ডাকে সারা দিয়ে সর্বস্থরের সাধারণ মানুষ নেমে এসেছিল রাজপথে। কাপুনি ধরিয়েছিল জালিম শাসকের বুকে।
২০১৩ সালের ৬ এপ্রিল হেফাজতে ইসলামের লংমার্চ কর্মসূচির ডাক দিয়েছিল। এই কর্মসূচি নাড়া জাগিয়েছিল সাধারণ মানুষের মাঝে। সারা দেশের প্রতিবাদি মানুষের গন্তব্য ছিল ঢাকার শাপলাচত্তর। মানুষ যাতে লংমার্চে যোগ দিতে না পারেন, সেজন্য পুলিশ ও ফ্যাসিবাদি আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা একযোগে বাধা দিয়েছিল। কিন্তু কোন বাধাই মানুষকে আটকাতে পারেনি। পুলিশ ও আওয়ামী সন্ত্রাসী আক্রমন মোকাবেলা করেই মানুষ পৌছেছিল ঢাকার শাপলাচত্তরে। নারায়নগঞ্জ, গাজিপুর, মুন্সিগঞ্জসহ আশে পাশের জেলা গুলো থেকে পায়ে হেটে মানুষ উপস্থিত হয়েছিল লংমার্চেরে গন্তব্যে। পথে পথে লংমার্চগামী মানুষদের স্বাগত জানিয়েছে সাধারণ জনতা। ৬ এপ্রিলের লংমার্চে দলমত নির্বিশেষ সাধারণ মানুষের উপস্থিতি ও সমর্থন দেখে দিশেহারা হয়েছিল ফ্যাসিবাদি শাসক গোষ্ঠী।
যুক্তরাজ্য হেফাজতে ইসলাম নেতা ও খেলাফত মজলিস ইউরোপের আমির প্রফেসর মাওলানা আবদুল কাদির সালেহ এ প্রসঙ্গে আমার দেশকে বলেন, বাংলাদেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ। ধর্মীয় চিন্তা ও চেতনার বিরুদ্ধে কোন রকমের অবমাননা দেশের মানুষ অতীতে কখনো সহ্য করেনি। শাহবাগে ইসলাম বিদ্বেষীদের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা দিয়ে দেশে ইসলাম বিদ্বেষ ছড়ানোর অপচেষ্টা হচ্ছিল। তখনই ঈমানদার মুসলমানরা ঘরে না বসে থেকে প্রতিবাদে রাজপথে নেমে এসেছিল। রাজপথে মানুষের গণজোয়ার দেখেছিল বিশ্ববাসী। এটাই বাংলাদেশের মানুষের ধর্মীয় ও সামাজিক চেতনা, এমন বার্তা দিয়েছিল ৬ এপ্রিলের লংমার্চ।
তিনি বলেন, অন্যায়,অবিচার ও জুলুমের বিরুদ্ধে ৬ এপ্রিলের মত ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তোলাই একজন মোমিনের দায়িত্ব। তিনি আরো বলেন, হেফাজতে ইসলামের অনেক নেতা ফ্যাসিবাদি সরকারের রোষানলে পড়ে কারাগারে আছেন। দেরি না করে তাদের মুক্তির আন্দোলন এখনই শুরু করা উচিত।
হেফাজতে ইসলামের আরেক নেতা মুফতি শাহ সদর উদ্দিন। যাকে ২০১৩ সালে যুক্তরাজ্যে সরব প্রতিবাদে দেখা গেছে সব সময়। সভা-সমাবেশে নেতৃত্ব দিয়ে জালাময়ী বক্তব্য রেখেছেন বাংলাদেশের ইসলাম বিদ্বেষী শাহাবাগীদের বিরুদ্ধে। মুফতি শাহ সদর উদ্দিন আমার দেশকে বলেন, হেফাজতে ইসলামের আন্দোলন ছিল দেশের মানুষের ঈমান ও ধর্মীয় সংস্কৃতিকে সুরক্ষার দাবীতে। এই দাবীতে হেফাজতে ইসলাম এখনো অটল আছে। যেখানেই ধর্মীয় সংস্কৃতিতে আঘাত আসে হেফাজতে ইসলাম সেখানেই প্রতিবাদ জানাচ্ছে। ৬ এপ্রিল হেফাজতের প্রতিবাদী আন্দোলনে প্রেরণার উৎস উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই গণজোয়ার ইসলাম বিদ্বেষীদের সতর্ক বার্তা দিয়েছিল। হেফাজতের উত্থানের মাধ্যমেই ইসলাম বিদ্বেষী শাহবাগীদের পতন ঘটেছিল। একই ধারায় কারাগারে আটক হেফাজত নেতাদের মুক্তির আন্দোলনকে অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতিও ব্যক্ত করেন তিনি।
উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল নামে গঠিত আদালতে ১৯৭১ সালের মানবতা বিরোধী অপরাধের সাথে জড়িত দাবী করে কথিত বিচার চলছিল। এই বিচারটি যে সাজানো নাটক ছিল সেটা উম্মোচন করেছিল আমার দেশ স্কাইপ স্ক্যাণ্ডাল প্রকাশের মাধ্যমে।
ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান নিজামুল হক নাসিম ও তাঁর বন্ধু আহমদ জিয়াউদ্দিনের স্কাইপ কথোপকথনে উঠে এসিছিল বিচারের নামে সাজানো নাটকের পুরো চিত্র। এই ট্রাইব্যুনালে প্রথম রায়ের পর ফাঁসির দাবীতে শাহবাগে জড়ো হয় কথিত ব্লগাররা। তাদের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা দিয়ে বিরিয়ানি খাইয়ে শাহবাগে জমায়েত করিয়ে টানা ‘ফাঁসি চাই’ শ্লোগান দেয়ার ব্যবস্থায় করা হয়েছিল। ভারতীয় মদদে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তায় গড়ে উঠা কথিত ব্লগাররা ফাঁসি চাই শ্লোগানের পাশাপাশি দেশের মানুষের আবহমান কালের ধর্মীয় সংস্কৃতির বিরুদ্ধেও নানা শ্লোগান দিয়েছিল তখন। এতেই তাদের মুখোশ উম্মোচিত হয়ে পড়ে জাতির সামনে। আসল মতলব ধরা পড়ে সাধারণ মানুষের চোখে।
শাহবাগের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা গড়ে উঠা তথাকথিত গণজাগরণ মঞ্চের নেতৃত্বে যারা ছিলেন তাদের নিজেদের ব্লগ গুলো ঘেটে পাওয়া যায় ইসলাম বিদ্বেষী লেখা। ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাতের অভিযোগে আওয়ামী হাইকোর্ট ব্লগ গুলো বন্ধ করে দিতে নির্দেশনাও দিয়েছিল অনেক আগেই। তারপরও ফ্যাসিবাদি সরকার এ গুলোর বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি। বরং শাহবাগের কথিত গণজাগরণকে দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ বলে আখ্যায়িত করেছিল ফ্যাসিবাদী সরকারের মন্ত্রিরা।
শাহবাগের কথিত গণজাগরণের মুখোশ উম্মোচন করেছিল আমার দেশ প্রতিবেদন ও সম্পাদকীয় লেখনির মাধ্যমে। গণজাগরণের আয়োজকদের ব্লগে ইসলাম বিদ্বেষী লেখা গুলো উঠিয়ে আনার পাশাপাশি আমার দেশ ‘শাহবাগে ফ্যাসিবাদের পদধ্বনী’ শিরোনামে প্রধান নিউজ প্রকাশ করেছিল । প্রতিবেদন ও সম্পাদকীয় লেখনির মাধ্যমে তথাকথিত গণজাগরণ মঞ্চের আয়োজকদের ব্লগ প্রকাশ এবং শাহবাগে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তায় গড়ে উঠা জমায়েতের মূল উদ্দেশ্য আমার দেশ উম্মোচন করে দিয়েছিল জাতির সামনে। এরপরই প্রতিবাদে জেগে উঠেছিল হেফাজতে ইসলামের নেতৃত্বে সব শ্রেনী পেশার মানুষ। এতে তাসের ঘরের মত ভেঙ্গে পড়েছিল রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তায় গড়ে উঠা শাহবাগের তথাকথিত গণজাগারণ মঞ্চ। সেই গণজাগরণ মঞ্চ অল্প দিনেই হারিয়ে গেছে। বিপরীতে পকৃত গণজাগরণ দেখেছিল ৬ এপ্রিল শাপালাচত্তরে। পরের দিন আমার দেশ পত্রিকায় ‘প্রকৃত গণজাগরণ এরকমই’ শিরোণামে বিশেষ মন্তব্য প্রতিবেদন লিখেছিলেন পত্রিকাটির মজলুম সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। সেই প্রকৃত গণজাগরণের দিনটির স্মরণেই আমার দেশ-এর আজকের এই আয়োজন।[img]https://amardesh.co.uk/wp-content/uploads/2022/04/IMG_20220405_110133_resized_20220405_010331516-1-225x300.jpg[/img]