Image description

ইরানকে ঘিরে যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় শেয়ারবাজারে বড় পতন দেখা গেছে। বিনিয়োগকারীরা মুদ্রাস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কায় নিরাপদ বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকতে থাকেন। এতে ডলারের দামও বেড়েছে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম প্রায় ৯ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। আর ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম টানা দ্বিতীয় দিনের মতো দ্রুত বৃদ্ধি পায়। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি রপ্তানি বিঘ্নিত হওয়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।

আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ব্রেন্ট নর্থ সি ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮৫ ডলারের বেশি হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের পর প্রথমবার এটা সর্বোচ্চ দাম। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরানের ওপর হামলা এবং তার পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় আঞ্চলিক জ্বালানি সরবরাহ ভয়াবহভাবে ব্যাহত হয়েছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি সরবরাহ করা হয়। এখান দিয়ে কোনো জাহাজ অতিক্রমের চেষ্টা করলে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়ার হুমকি দিয়েছে ইরান। এই যুদ্ধ বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট তৈরি করছে। এতে মুদ্রাস্ফীতি আরও বেড়ে যেতে পারে। ব্রিফিং ডটকমের বিশ্লেষক প্যাট্রিক ও’হেয়ার বলেন, উচ্চ জ্বালানি মূল্য মুদ্রাস্ফীতির উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ফলে কোথাও সুদের হার কমানোর সম্ভাবনা পিছিয়ে যাচ্ছে। আবার কোথাও সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি উৎপাদন খরচ বাড়ায় কোম্পানির মুনাফা কমে যাওয়া এবং ভোক্তা ব্যয় কমার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

ইউরোপীয় শেয়ারবাজারে ক্ষতি বেশি হয়েছে। সেখানে ৩ শতাংশ বা তার বেশি পতন দেখা গেছে মঙ্গলবার। স্কোপ মার্কেটসের প্রধান বাজার বিশ্লেষক জোশুয়া মাহোনি বলেন, ইরান যুদ্ধের পূর্ণ মুদ্রাস্ফীতিমূলক প্রভাব এখন ইউরোপীয় বাজারে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। তথ্য অনুযায়ী, ইউরোজোনে মূল মুদ্রাস্ফীতি অপ্রত্যাশিতভাবে বেড়েছে। এতে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। ফোরেক্স ডটকমের বিশ্লেষক ফাওয়াদ রাজাকজাদা বলেন, এই পরিস্থিতিতে ইউরোজোনে সুদের হার কমানোর সম্ভাবনা কমে গেছে। তার ভাষায়, এ কারণেই এখন আমরা শেয়ারবাজারে বড় পতন দেখছি। ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ফিলিপ লেন ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং জ্বালানি সরবরাহ কমে যায়, তাহলে ইউরোজোনে মুদ্রাস্ফীতি হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

মঙ্গলবার মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে নতুন হামলার খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে লেবাননে ইসরাইলি বোমা হামলা এবং সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে মার্কিন দূতাবাসে ইরানের ড্রোন হামলা। হামলা-পাল্টা হামলা চতুর্থ দিনে গিয়েও থামার কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে সৌদি আরব, কাতার এবং দুবাইও রয়েছে। একই সঙ্গে তারা বিশ্ব জ্বালানি দামের ওপর চাপ বাড়ানোর হুমকিও দিয়েছে। ইরানের রেভ্যুলুশনারি গার্ডের এক জেনারেল হুমকি দিয়েছেন যে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করা যেকোনো জাহাজ পুড়িয়ে দেয়া হতে পারে। ইউরোপের মান সম্পন্ন হিসেবে বিবেচিত ডাচ্‌ টিটিএফ প্রাকৃতিক গ্যাস চুক্তির দাম মঙ্গলবার ৪০ শতাংশের বেশি বেড়ে ৬০ ইউরোর উপরে উঠে যায়। যা ২০২৩ সালের জানুয়ারির পর সর্বোচ্চ। সোমবারই ইউরোপে গ্যাসের দাম ৫০ শতাংশ বেড়েছে। কারণ কাতারের রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি কোম্পানি হামলার কারণে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন বন্ধ করে দেয়।

জ্বালানি খরচ বাড়ার কারণে বিশ্ব জুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে পারে। কারণ তাদের একদিকে মুদ্রাস্ফীতি কমাতে হবে এবং অন্যদিকে অর্থনীতিকে সহায়তা দিতে সুদের হারও কমাতে হতে পারে। ন্যাশনাল অস্ট্রেলিয়া ব্যাংকের অর্থনীতিবিদ রডরিগো ক্যাট্রিল বলেন, জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো বড় দ্বিধায় পড়ে যায়। তিনি বলেন, স্ট্যাগফ্লেশন (উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও কম প্রবৃদ্ধি) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য খুবই অস্বস্তিকর পরিস্থিতি। দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি ধাক্কা একদিকে মুদ্রাস্ফীতি বাড়ায়, অন্যদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমিয়ে দেয়।