Image description

রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যান-এ মাদকবিরোধী অভিযানের সময় ‘ছোটভাই আর্গুমেন্ট বেশি করতেছো’ মন্তব্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) এক শিক্ষার্থী ও ছাত্রনেতাকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে।

সোমবার রাতে সংঘটিত এ ঘটনায় কয়েকজন সাংবাদিকও আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

ঘটনার পর শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতারা এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তুলেছেন।

প্রত্যক্ষদর্শী ও শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অভিযানের সময় ঢাবির নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ও বামপন্থী ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নাঈম উদ্দিন পুলিশের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুললে একপর্যায়ে তাকে ‘ছোটভাই আর্গুমেন্ট বেশি করতেছো’ বলে লাঠিপেটা করা হয়। এ সময় তার মোবাইল ফোনও কেড়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।

ঘটনাটির একাধিক ভিডিও ফুটেজ ও ছবি আমার দেশের হাতে এসেছে।

অভিযানটি ঢাকা মহানগর পুলিশের এক কর্মকর্তার নেতৃত্বে পরিচালিত হয়। শিক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযানের নেতৃত্বে থাকা ডিসি মাসুদের সামনেই এ ঘটনা ঘটে।

অভিযোগের যদিও ব্যাপারে জানতে শাহবাগ থানার অফিসার ইনচার্জকে (ওসি) একাধিক বার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও সাড়া মেলেনি।

মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকেও তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ঘটনার পর ঢাবির ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আশিকুর রহমান বলেন, “ডিসি মাসুদকে তার কনস্টেবলরা ২ টাকার বেল দেয় না। তার অধস্তনদের উপর তার কোনো কন্ট্রোলই নাই। অতিউৎসাহী হয়ে লজিক্যাল আলাপ চলাকালীন ‘ছোটভাই আর্গুমেন্ট বেশি করতেছো’ বলে পিটানো কোনোভাবেই জাস্টিফাইড না। থামতে বলে আবার ফোনও কেড়ে নেয়া হয়েছিল। গুড কপ-ব্যাড কপ খেলা হচ্ছিল নাকি?”

তিনি আরও বলেন, এ ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে।

বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের ঢাবি সভাপতি শিমুল কুম্ভকার বলেন, আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা পুলিশ যদি নিজেই আইন অমান্য করে তবে তা আইনের শাসনের পরিপন্থি।

তিনি বলেন, “কোনো পাবলিক প্লেসে পূর্বঘোষণা ছাড়া নাগরিকের চলাচলে বাধা দেওয়া যায় না। কেউ অপরাধী হলেও তার বিচার আদালতে হবে- পুলিশ রাস্তায় বিচার করতে পারে না।"

ডাকসু সদস্য তাজিনুর রহমান অভিযোগ করে বলেন, অভিযানের নামে সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের ওপর ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস’ চালানো হয়েছে। তার ভাষায়, “অভিযোগ থাকলে গ্রেপ্তার ও আদালত আছে। রাস্তায় বিচার চালানোর অধিকার কারও নেই।”

সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের ঢাবি শাখার সভাপতি মুজাম্মেল হক বলেন, মাদকবিরোধী অভিযানের নামে নির্দোষ শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের ওপর এলোপাথাড়ি লাঠিচার্জ মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

তিনি বলেন, নাঈম উদ্দিনসহ কয়েকজনকে কোনো প্রমাণ ছাড়াই মারধর করা হয়েছে।

নাঈম যদি রাষ্ট্রীয় আইনে কোনো অপরাধ করে থাকে, তার শাস্তি আইন অনুযায়ী হবে। রাস্তায় ফেলে প্রহার করে বিচার করা যায় না।

বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের ঢাবি সভাপতি আরমানুল হক বলেন, “নাগরিক অধিকার হিসেবে প্রশ্ন তোলায় নাঈমের গায়ে হাত দেওয়া ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে দেখছি।”

তিনি অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

অন্যদিকে একই অভিযানে আটক এক ব্যক্তি নিজেকে ঢাবির শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন।

পুলিশ সূত্র বলছে, তার কাছ থেকে মাদকসামগ্রী উদ্ধার করা হয়েছে এবং ছুরি দিয়ে আঘাতের অভিযোগও রয়েছে।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এলাকায় মাদকসংক্রান্ত কার্যক্রম ও সিন্ডিকেটের উপস্থিতি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে আকস্মিক ও স্বল্পমেয়াদি অভিযান দিয়ে উদ্যানকে স্থায়ীভাবে মাদকমুক্ত করা সম্ভব নয়। টেকসই পরিকল্পনা ও চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর জোর জানান তারা।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কী পদক্ষেপ নিচ্ছে জানতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সাইফুদ্দিন আহমেদকে একাধিকবার ফোন করা হলে তার কোনো সাড়া মেলেনি।

ঘটনার পর শিক্ষার্থীদের একটি অংশ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তারা শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত ও ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

মারধরের শিকার সাংবাদিকও:

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের এ ঘটনায় পুলিশের মারধরে তোফায়েল আহমেদ (২৫) নামে বাংলানিউজ টোয়েন্টিফোরের এক সাংবাদিক গুরুতর আহত হয়েছেন। আহত অবস্থায় ওই সাংবাদিককে ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ পরিদর্শক মো. ফারুক বলেন, ‘মারধরে আহত হয়ে এক সাংবাদিক হাসপাতালে এসেছেন। জরুরি বিভাগে তার চিকিৎসা চলছে।’

হসপাতালে আহত সাংবাদিক তোফায়েল আমার দেশকে জানান, তিনি বাংলা নিউজের মাল্টিমিডিয়াতে কাজ করেন। সন্ধ্যায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পুলিশের মাদকবিরোধী অভিযান চলছিল। সেখানে তিনিসহ আরও সাংবাদিক ভিডিও করছিলেন। কিন্তু পুলিশ তাকে ভিডিও করতে নিষেধ করেন।

তিনি জানান, পরে ভিডিও করতে গেলে পুলিশের সঙ্গে তার কথা কাটাকাটি শুরু হয়। এক পর্যায়ে চার/পাঁচ জন পুলিশ কনস্টেবল তাকে পিটিয়ে আহত করে। পরে সহকর্মীরা তাকে সেখান থেকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে আসেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, লাইভ চলাকালীন কোনো উসকানি ছাড়াই একদল পুলিশ সদস্য এসে তোফায়েলকে লক্ষ্য করে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু করে। তিনি নিজেকে সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দিলে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে পুলিশ। এ সময় তার মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে এবং একের পর এক লাঠি দিয়ে আঘাত করে।

এ ঘটনার তদন্ত সাপেক্ষে বিচার দাবি করেছেন গণমাধ্যমকর্মীরা।