রমজানকে পুঁজি করে আবারও বেপরোয়া খেজুর আমদানিকারক সিন্ডিকেট। আমদানিতে ১০ শতাংশ শুল্ক ছাড়ের সুবিধা নিলেও বাজারে তার প্রভাব পড়েনি। পাশাপাশি চাহিদার তুলনায় ১৫ হাজার টন বেশি আমদানি করলেও ওই চক্র রোজা ঘিরে অতি মুনাফা করছে। তদারকির অভাবে কারসাজিতে বাড়াচ্ছে দাম। পরিস্থিতি এমন-মোকাম পর্যায়ে ৫ কেজির প্যাকেটে ৮০০-১০০০ টাকা বাড়িয়ে বিক্রি করছে। ফলে পাইকারি পর্যায়ে হু হু করে বেড়েছে দাম। আর পর্যাপ্ত মজুত থাকা ও শুল্ক ছাড়ের পরও খুচরা বাজারে খেজুর কিনতে ক্রেতাকে গুনতে হচ্ছে বাড়তি মূল্য।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আড়তে পাঁচ কেজি প্যাকেটের মরিয়ম প্রিমিয়াম খেজুর বিক্রি হচ্ছে ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ৫০০ টাকা, যা গত বছর একই সময়ে বিক্রি হয়েছে ৩ হাজার ৫০০ টাকা। মাবরুর খেজুর প্রতি প্যাকেট বিক্রি হচ্ছে ৬ হাজার টাকা, যা আগে ৫ হাজার ৪০০ থেকে ৫ হাজার ৬০০ টাকা ছিল। বড় আকারের ম্যাডজুল খেজুরের পাঁচ কেজির প্যাকেট বিক্রি হচ্ছে ৭ হাজার ৫০০ টাকা, যা আগে ৬ হাজার টাকা ছিল। ছয় কেজি ওজনের আজোয়া খেজুরের প্যাকেট বিক্রি হচ্ছে ৭ হাজার টাকা, যা গত বছর একই সময় ৬ হাজার ২০০ টাকা ছিল। দাবাস ক্রাউন খেজুরের পাঁচ কেজির প্যাকেট বিক্রি হচ্ছে ৪ হাজার ৫০০ টাকা, যা গত বছর একই সময় ৩ হাজার ৪০০ টাকা ছিল।
রোববার রাজধানীর সর্ববৃহৎ ফলের পাইকারি আড়তের একাধিক বিক্রেতা যুগান্তরকে বলেছেন, বাজারে এবার চাহিদার তুলনায় খেজুরের মজুত পর্যাপ্ত। রোজা ঘিরে খেজুরের চাহিদাকে পুঁজি করে এক শ্রেণির আমদানিকারক ও কমিশন এজেন্ট সিন্ডিকেট করে দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। তাদের যুক্তি, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, এলসি খোলার জটিলতা ও পরিবহণ ব্যয় গত বছরের তুলনায় বেশি। কিন্তু অনেক আমদানিকারক উচ্চমূল্যের খেজুর শুল্ক ফাঁকি দিতে কম দাম দেখিয়ে আমদানি করেছে। কিন্তু বাজারে বিক্রি করছে চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি দামে।
ব্যবসায়ীরা জানান, দেশে হাতেগোনা ৪০০ জন আমদানিকারক ফল আমদানি করে। এর মধ্যে খেজুর আনে ১০০ জন। আর এই গুটি কয়েক ব্যবসায়ীর হাতে ক্রেতারা জিম্মি। তারা চিহ্নিত, কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেই। দাম বাড়লেই পাইকারি আড়তে অভিযান পরিচালনা করা হয়।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বছরে খেজুরের চাহিদা ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ ১০ হাজার টন। এর মধ্যে রোজায় চাহিদা ৬৫ হাজার টন। ইতোমধ্যে রোজার চাহিদার তুলনায় ১৫ হাজার টন বেশি খেজুর আমদানি করা হয়েছে। রোজায় খেজুরের মূল্য সহনীয় করতে ২৩ ডিসেম্বর খেজুরের আমদানি শুল্ক ২৫ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়। যা ৩১ মার্চ পর্যন্ত বহাল থাকবে। পাশাপাশি ১ নভেম্বর থেকে ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত খেজুর আমদানি হয়েছে ৪৯ হাজার ৮০৭ টন। গত বছর একই সময়ে আমদানি হয়েছিল ৪৪ হাজার ৭১৬ টন। অর্থাৎ আমদানি বেড়েছে ৫ হাজার ৯১ টন বা ১১ দশমিক ৪ শতাংশ।
বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন সূত্র জানায়, দেশে রমজানের সময়ই খেজুরের চাহিদা থাকে সবচেয়ে বেশি। চাহিদা মাথায় রেখে আমদানি হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরেও কোনো জট ছিল না। সময়মতো জাহাজ ভিড়তে পেরেছে। ফলে বাজারে খেজুরের সংকট নেই। তবে ডিসেম্বরের শেষে শুল্ক ছাড়ের প্রজ্ঞাপন জারি হলেও এর সুবিধা পেতে আরও এক মাস সময় লেগেছে। যেখানে এর আগেই ব্যবসায়ীরা খেজুর কেনার আদেশ দিয়েছেন। যা চড়া শুল্কে খালাস হয়েছে।
এদিকে মোকাম পর্যায়ে দাম বাড়ানোর কারণে রাজধানীর খুচরা বাজারে প্রতি কেজি জাহিদি খেজুর বিক্রি হচ্ছে ২৬০-২৮০ টাকা, যা আগে ১৬০-১৮০ টাকা ছিল। পাশাপাশি দাবাস ১৫০ টাকা বেড়ে প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫৫০ থেকে ৫৭০ টাকা। সঙ্গে বরই খেজুর সর্বোচ্চ ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা আগে ৪০০ টাকা ছিল। কালমি ৭০০-৮০০ টাকা, সুক্কারি ৮০০-১০০০ টাকা, মাবরুম ৮৫০ থেকে ১২০০ টাকা, মরিয়ম ১১০০ থেকে ১৪০০ টাকা এবং মেডজুল ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এসব খেজুর রোজা ঘিরে ১৫০-৩০০ টাকা বাড়তি দরে বিক্রি হচ্ছে।
পল্টন মোড়ে খেজুর কিনতে আসা ইসমাইল হোসেন বলেন, রোজা রেখে ইফতারে খেজুর না থাকলে হয় না। কিন্তু এবার এই প্রয়োজনীয় পণ্যটির দাম বেশি হওয়ায় কিনতে পারছি না। সব জায়গায় কমবেশি অভিযান হচ্ছে, কিন্তু খেজুরের বাজারে অভিযান নেই। যার কারণে যে যেভাবে পারছে খেজুরের দাম বাড়িয়ে বিক্রি করছে। আর আমাদের মতো সাধারণ ক্রেতা বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন যুগান্তরকে বলেন, খেজুর আমদানি করে গুটিকয়েক ব্যবসায়ী। রোজার আগে এলসির পরিমাণ, কত টাকায় আমদানি এবং বিক্রি কত টাকায় করা হয়েছে, তা খতিয়ে দেখলেই কারসাজির আসল চিত্র বের হয়ে আসবে। কোনো অনিময় থাকলে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, সরকার রোজার একদিন আগে দায়িত্ব গ্রহণ করলেও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বাজার তদারকি জোরদার, সরবরাহ শৃঙ্খল স্বাভাবিক রাখা এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কার্যক্রম শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।