Image description

সফলভাবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর নবনির্বাচিত সরকার ও নির্বাচন কমিশনের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। এই নির্বাচন সিটি করপোরেশন দিয়ে শুরু, শেষ হতে পারে ইউনিয়ন পরিষদ দিয়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচন শুধু রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ নয়, এটি সরাসরি জনগণের সেবার সঙ্গে সম্পৃক্ত।

এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) শুরুতে স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে ভাবছে।

দলটির শীর্ষ নেতারা মনে করছেন, মাঠ পর্যায়ে জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘদিন ধরে স্থবির হয়ে থাকা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে সক্রিয় করতে দ্রুত নির্বাচন প্রয়োজন। তাঁদের মতে, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা কার্যকর না হলে তৃণমূল পর্যায়ে উন্নয়ন ও সেবামূলক কার্যক্রম ব্যাহত হয়।

বর্তমানে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় পাঁচটি স্তর রয়েছে। এর মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ চার হাজার ৫৮১টি।

এ ছাড়া ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ, ৬৪টি জেলা পরিষদ (তিন পার্বত্য জেলাসহ), ৩৩০টি পৌরসভা এবং ১২টি সিটি করপোরেশন রয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দাবি তুলেছিল জাতীয় নাগরিক কমিটি ও জামায়াতে ইসলামী। অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পক্ষে মত দেয়নি। বিএনপিও আগে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পক্ষে ছিল।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দায়িত্ব গ্রহণের পর বুধবার প্রথম কর্মদিবসেই জানিয়েছেন, যত দ্রুত সম্ভব স্থানীয় সরকারগুলোতে নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে। একই দিনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকেও দ্রুততম সময়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন করার বিষয়টি আলোচনায় আসে বলে জানান অর্থ প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি। 

নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ গত বুধবার সাংবাদিকদের বলেন, সামনে একের পর এক স্থানীয় নির্বাচন করতে হবে ইসিকে। সংসদের দুটি আসনের ভোটগ্রহণের পর সিটি করপোরেশন দিয়ে স্থানীয় নির্বাচন শুরু হতে পারে। পর্যায়ক্রমে সব স্থানীয় নির্বাচন সেরে ফেলতে হবে। আমরা সব নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে প্রস্তুত হচ্ছি।

স্থানীয় সরকার বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকারের সিদ্ধান্ত পেলে বছরজুড়েই বিভিন্ন স্তরের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। বর্তমান সরকার স্থানীয় সরকার আইন সংশোধন করবে কি না, এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত জানা যায়নি।

সংসদ নির্বাচনের ডামাডোলের মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্থানীয় সরকার বিভাগ ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ ও চট্টগ্রামএই তিন সিটি করপোরেশনের নির্বাচন আয়োজনের জন্য নির্বাচন কমিশনে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেয়। 

প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার সারা দেশের ১২টি সিটি করপোরেশন, ৬০টি জেলা পরিষদ, ৪৯৩টি উপজেলা পরিষদ এবং ৩২৩টি পৌরসভার মেয়র, চেয়ারম্যান ও কাউন্সিলরদের অপসারণ করে। এর পর থেকেই এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান প্রশাসক দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। দেশের চার হাজার ৫৭৫টি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বারদের অপসারণ না করা হলেও আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেড় হাজারের বেশি চেয়ারম্যান ও মেম্বার পলাতক বা অনুপস্থিত। এঁদের মধ্যে প্রায় ৯০০ ইউনিয়নে প্যানেল চেয়ারম্যান এবং ৫০০টির বেশি ইউনিয়নে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। ২০২১ সালের জুন থেকে ২০২২ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ছয় ধাপে অনুষ্ঠিত ইউপি নির্বাচনগুলোর মেয়াদ চলতি বছরের জুন থেকে শেষ হতে শুরু করবে। ফলে উন্নয়নকাজ থমকে যাওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২০ সালের ২ জুন। সেই হিসাবে গত বছরের ১ জুন এই সিটির পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ হয়েছে। অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রথম সভা হয়েছিল ২০২০ সালের ৩ জুন, যার মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৫ সালের ২ জুনে। এই দুই সিটি করপোরেশনও প্রশাসক দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) চিত্র কিছুটা ভিন্ন। ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত প্রথম সভার তারিখ অনুযায়ী এই সিটির মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ২২ ফেব্রুয়ারি। আইনি লড়াইয়ের পর আদালতের আদেশে বর্তমানে চসিকের মেয়রের দায়িত্ব পালন করছেন ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি গত রবিবার এক অনুষ্ঠানে বলেন, ২০২১ সালের নির্বাচনে জালিয়াতির মাধ্যমে আমাকে হারিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আদালতের রায়ে আমি দায়িত্ব পেলেও বাকি সিটিগুলোতে নির্বাচিত প্রতিনিধি নেই। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। তিনি দ্রুত সময়ের মধ্যে এসব নির্বাচনের দাবি জানান। পরবর্তী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আশাও প্রকাশ করেন এই মেয়র।

বিদ্যমান স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন অনুযায়ী, মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্ববর্তী ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকার স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে দলীয় প্রতীক না রাখার ব্যবস্থা করে চারটি পৃথক অধ্যাদেশ জারি করে যায়। এই অবস্থায় জাতীয় সংসদে ওই অধ্যাদেশ অনুমোদন পেলে এবার দলীয় প্রতীক ছাড়াই স্থানীয় সরকার নির্বাচন হতে পারে। ২০১৫ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে করার আইন প্রণয়ন করা হয়। সেই সময় থেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহারের বিরোধিতা করে আসছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক বাদ দেওয়ার সুপারিশ করে।

স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের আরো একটি প্রস্তাব ছিল, সব স্থানীয় সরকারের জন্য অভিন্ন একটি একটি বিধান করা হলে এক দিনেই চারটি নির্বাচন করা সম্ভব। আলাদা নির্বাচনের দরকার নেই। কিন্তু সেই প্রস্তাব অন্তর্বর্তী সরকার বিবেচনায় নেয়নি। 

স্থানীয় সরকার নিয়ে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির প্রতিশ্রুতি : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির পক্ষ থেকে রাষ্ট্র মেরামতের যে ৩১ দফা প্রস্তাব ঘোষণা করা হয়েছিল তার ২০ দফাতে বলা আছে, ক্ষমতার ব্যাপক বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে অধিকতর স্বাধীন, শক্তিশালী ও ক্ষমতাবান করা হবে। এই সব প্রতিষ্ঠানকে এমনভাবে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে যেন তারা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন পরিষেবা প্রদান ও উন্নয়ন কার্যক্রমে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। স্থানীয় প্রশাসন ও অন্য কোনো জনপ্রতিনিধির খবরদারিমুক্ত স্বাধীন স্থানীয় সরকার নিশ্চিত করা হবে। মৃত্যুজনিত কারণ কিংবা আদালতের আদেশে পদ শূন্য না হলে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে সরকারি প্রশাসক নিয়োগ করা হবে না। আদালত কর্তৃক দণ্ডপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নির্বাহী আদেশবলে সাসপেন্ড/বরখাস্ত/অপসারণ করা হবে না।

বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারেও বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনের সরাসরি তত্ত্বাবধানে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা হবে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কার্যকর স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এরূপ প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও তহবিল ব্যবস্থাপনার জন্য যথাযথ আইন প্রণয়ন করা হবে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কাজে নিয়োজিত সরকারি কর্মকর্তা/কর্মচারীদের সঙ্গে এরূপ প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক যথাযথ আইন দ্বারা নির্ধারিত হবে।