Image description

দেশে গত পাঁচ বছরে (২০২১-২৫) বিভিন্ন দুর্যোগে ৪৩ হাজার ৮২৯ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। একই সময়ে দুর্যোগে প্রাণ হারিয়েছেন ২ হাজার ৬৪০ জন। এর মধ্যে বজ্রপাতেই মৃত্যু হয়েছে ১ হাজার ৫৩০ জনের। এ ছাড়া অগ্নিকাণ্ডে ৬৫৪ জন, বন্যায় ১৯৭, পাহাড়ধসে ৯০ ও ঘূর্ণিঝড়ে ৫২ জনের প্রাণহানি হয়েছে। সম্প্রতি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের উপস্থাপিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়। কমিটির সভাপতি মুন্সী রফিকুল আলমের সভাপতিত্বে বৈঠকে দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছানো, আশ্রয়কেন্দ্রের তালিকা তৈরি, উদ্ধার কার্যক্রমের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ভূমিকম্প মোকাবিলায় প্রস্তুতি জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাঁচ বছরে সবচেয়ে বেশি আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বন্যায়। এ খাতে ক্ষতির পরিমাণ ২৯ হাজার ৮৬০ কোটি টাকা। একই সময়ে ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতি হয়েছে ১১ হাজার ৭৩৬ কোটি টাকা। এ ছাড়া অগ্নিকাণ্ডে ২ হাজার ২০ কোটি, ভূমিকম্পে ১০৮ কোটি ও বজ্রপাতে ১০৫ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

প্রাণহানির বড় কারণ বজ্রপাত: দুর্যোগে প্রাণহানির পরিসংখ্যানে সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র বজ্রপাতে। পাঁচ বছরে বজ্রপাতে মারা গেছেন ১ হাজার ৫৩০ জন। অর্থাৎ এ সময়ে বিভিন্ন দুর্যোগে মোট প্রাণহানির অর্ধেকেরও বেশি ঘটেছে বজ্রপাতে।

অগ্নিকাণ্ডেও প্রাণহানির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। পাঁচ বছরে ১ লাখ ২৪ হাজার ৪৮৬ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মারা গেছেন ৬৫৪ জন। এ সময়ে বন্যার ৯টি বড় ঘটনায় ১৯৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। পাহাড়ধসে প্রাণ হারিয়েছেন ৯০ জন।

পাঁচ বছরে ছয়টি বড় ঘূর্ণিঝড়ের ঘটনায় মারা গেছেন ৫২ জন। এ ছাড়া দেশে ১৬৭টি ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়েছে। ভূমিকম্পে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ১০৮ কোটি টাকা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বছরভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২১ সালে বিভিন্ন দুর্যোগে ৬০৩ জন, ২০২২ সালে ৫৯১, ২০২৩ সালে ৫০৯, ২০২৪ সালে ৫৩৯ এবং ২০২৫ সালে ৩৯৮ জন মারা গেছেন।

বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ে আর্থিক ক্ষতি বেশি: দুর্যোগে আর্থিক ক্ষতির প্রধান উৎস বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়। এ দুই দুর্যোগে পাঁচ বছরে মোট ক্ষতি হয়েছে ৪১ হাজার ৫৯৬ কোটি টাকা। এতে বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়প্রবণ এলাকায় অবকাঠামো নির্মাণ, আগাম সতর্কবার্তা, আশ্রয়কেন্দ্র এবং দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রমের গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

এসব বিষয়ে কথা হলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারা কালবেলাকে বলেন, দুর্যোগ মোকাবিলায় জনগণকে নিয়ে প্রস্তুতি নিতে হবে। সরকার একা পারবে না। এজন্য স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে হবে। তাদের এসব কাজে সম্পৃক্ত করতে হবে। তাহলে আমরা ক্ষতির পরিমাণটা কমাতে পারব।

মন্ত্রণালয়ের উপস্থাপনায় বন্যাকবলিত এলাকায় উঁচু রাস্তা, আশ্রয়কেন্দ্র, সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ এবং আধুনিক সতর্কীকরণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ তুলে ধরা হয়। সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের অর্জন হিসেবে ৫৩৫টি বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ সম্পন্ন করার তথ্য জানানো হয়েছে। এ সময়ে ৮৬৬টি সেতু ও কালভার্ট নির্মাণের মাধ্যমে ৩৮ হাজার ১৯ মিটার অবকাঠামো গড়ে তোলার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

আগামী দুই বছরের কর্মপরিকল্পনায় ১০৭টি বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র, ৫০টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র এবং ১২২টি দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ৪৩টি অগভীর পানিতে চলাচল উপযোগী উদ্ধার নৌযান কেনা, ১০০ কিলোমিটার রাস্তা মেরামত, ৪৬ হাজার ৪৩৯ মিটার সেতু-কালভার্ট এবং ২ হাজার ২৫৯ দশমিক ৫০ কিলোমিটার এইচবিবি রাস্তা নির্মাণের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে।

পাঁচ বছরের কর্মপরিকল্পনায় ১৩ হাজার ২৩৪টি সেতু ও কালভার্ট নির্মাণের লক্ষ্যমাত্রার কথাও উপস্থাপনায় বলা হয়েছে। এসব উদ্যোগের বাস্তবায়ন অগ্রগতি ও নির্ধারিত সময়সীমা অনুযায়ী কাজ শেষ করা দুর্যোগপ্রবণ এলাকার মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ হবে বলে উল্লেখ করা হয়।

উদ্ধার সরঞ্জাম ও স্বেচ্ছাসেবক বাড়ানোর উদ্যোগ: বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় ও ভূমিকম্প মোকাবিলায় আধুনিক উদ্ধার সরঞ্জাম সংগ্রহ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের। উপস্থাপনায় বলা হয়েছে, সরকারের প্রথম ১৮০ দিনে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগকে ছয়টি চেইন এক্সক্যাভেটর দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিকে ২২ হাজার ৬৭৬টি, ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচিকে ৩৮ হাজার এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরকে ৩১ হাজার ৮০০টি উদ্ধার সরঞ্জাম দেওয়ার তথ্য তুলে ধরা হয়।

নগর দুর্যোগ মোকাবিলায় ৪৮ হাজার ৯৪৬ স্বেচ্ছাসেবকের তথ্যভান্ডার তৈরির কথাও উপস্থাপনায় উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ২১ হাজার ৬০০ স্বেচ্ছাসেবকের তথ্য দেওয়া হয়। প্রথম পর্যায়ে পাঁচ হাজার স্বেচ্ছাসেবক গড়ে তোলার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ৩০০ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।

আগামী দুই বছরে ঢাকা মহানগর ও আশপাশের এলাকার জন্য ১ লাখ স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত এবং তাদের তথ্যভান্ডার তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া ২৫ হাজার স্বেচ্ছাসেবকের প্রশিক্ষণের জন্য উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব প্রণয়নসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

আগাম সতর্কবার্তা ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনায় জোর: দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় দ্রুত আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংসদীয় কমিটি। একই সঙ্গে জেলাভিত্তিক আশ্রয়কেন্দ্র ও স্বেচ্ছাসেবকদের তালিকা পরবর্তী বৈঠকে উপস্থাপন এবং তা স্থানীয় সংসদ সদস্যদের কাছে পাঠানোর সুপারিশ করা হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনায় ২০২৬-৩০ সময়কালে ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণের বিষয়টি রয়েছে। এর মধ্যে অনলাইনে বরাদ্দ ব্যবস্থাপনা, উপকারভোগীদের তথ্যভান্ডার, দুর্যোগের সতর্কবার্তা, মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি প্রতিবেদন এবং সম্পদের চাহিদা ও অনুমোদন পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এলাকাভিত্তিক খুদে বার্তা ও অ্যাপের মাধ্যমে সতর্কবার্তা পাঠানোর পরিকল্পনাও তুলে ধরা হয়।

মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনায় ২০৩১-৩৫ সময়কালে জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলা কমান্ড ও জাতীয় জরুরি পরিচালনাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে কমান্ড এবং জরুরি পরিচালনাকেন্দ্র গঠন, মাঠপর্যায়ে ঘটনা ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি চালু এবং উদ্ধার কার্যক্রমে পরিচালনা, পরিকল্পনা, রসদ, অর্থ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

ভূমিকম্প মোকাবিলায় প্রস্তুতি যাচাইয়ের সুপারিশ: রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে ভূমিকম্প মোকাবিলায় বিদ্যমান প্রস্তুতি সম্পর্কে পরবর্তী বৈঠকে কমিটিকে অবহিত করার সুপারিশ করা হয়েছে। পাঁচ বছরে ১৬৭টি ভূমিকম্প রেকর্ড হওয়ার তথ্য তুলে ধরে এ ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতি অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।

বৈঠকে প্রকল্প কর্মকর্তাদের সততা, নিষ্ঠা ও জবাবদিহির সঙ্গে দায়িত্ব পালনের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। বিভিন্ন ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা ও বরাদ্দ যথাযথভাবে বিতরণ, আশ্রয়কেন্দ্র পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও ব্যবহারোপযোগী রাখা এবং নির্মাণকাজে ঠিকাদারদের নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার ঠেকাতে নজরদারি নিশ্চিত করার সুপারিশও করা হয়।