Image description

কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে ঝিনাইদহের মহেশপুর সীমান্তে বেড়েছে ভারতীয় গরু পাচার। রাত নামলেই কাঁটাতারারের বেড়া পেরিয়ে ঢুকছে ভারতীয় গরুর চালান। সীমান্তের বিভিন্ন রুট ব্যবহার করে এসব গরু এনে দেশের হাটেগুলোতে সরবরাহ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে সীমান্তের এসব রুট ব্যবহার করে মাদক ও অবৈধ অস্ত্রও দেশে প্রবেশ করছে বলে দাবি স্থানীয়দের। যদিও অভিযানে মাদক ও অস্ত্র জব্দ হচ্ছে, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পাচারকারী চক্রের মূল হোতারা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মহেশপুর উপজেলার লড়াইঘাট, বাঘাডাঙ্গা, পলিয়ানপুর, মাটিলা, রাজাপুর, কুসুমপুর ও বেনীপুর সীমান্তকে ঘিরে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী চোরাচালান সিন্ডিকেট। গভীর রাতে সীমান্তের নির্দিষ্ট পয়েন্ট ব্যবহার করে ভারতীয় গরু বাংলাদেশে প্রবেশ করানো হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, বিএসএফের কিছু অসাধু সদস্যের সহযোগিতায় এই অবৈধ পারাপার চলছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভারতের নদীয়া ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিভিন্ন এলাকা থেকে গরু এনে মহেশপুর সীমান্তের লড়াইঘাট ও হাড়িঘাটা সংলগ্ন পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করানো হয়। পরে এসব গরু কুমিল্লা, চুয়াডাঙ্গার শিয়ালমারি হাটসহ দেশের বিভিন্ন পশুর হাটে বিক্রি করা হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, ভারতের নদীয়া জেলার পান্ডুয়া বাজারের গরুই সবচেয়ে বেশি আসছে।

স্থানীয়রা জানান, ঈদকে সামনে রেখে ভারতে গরুর চাহিদা কমে যাওয়ায় বাংলাদেশমুখী পাচার বেড়েছে। একই সঙ্গে সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা, ফেনসিডিল ও ভারতীয় মদের চালানও বাড়ছে।

বিজিবির তথ্যমতে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত বিভিন্ন মাদকদ্রব্য জব্দের ঘটনায় ৪৫টি মামলা হয়েছে। এ সময়ে উদ্ধার করা হয়েছে ২১ হাজার ৬১৩ বোতল ফেনসিডিল, ১৪ হাজার ২২২ বোতল মদ, ১৬৭ দশমিক ৮৫৩ কেজি গাঁজা, ৮৮ হাজার ৪১৩ পিস ইয়াবা ট্যাবলেটসহ বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য। উদ্ধারকৃত মাদকের মোট সিজার মূল্য ধরা হয়েছে ১০ কোটি ৮ লাখ ৩৪ হাজার ৫৮৬ টাকা।

শুধু মাদক নয়, সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অস্ত্র প্রবেশের ঘটনাও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। গত বছরের ১১ সেপ্টেম্বর মহেশপুরের বাঘাডাঙ্গা গ্রামে খড়ের গাদা থেকে একটি আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করে বিজিবি। এছাড়া মাটিলা বিওপি এলাকায় বিদেশি পিস্তল, ওয়ানশুটার গান ও গুলি উদ্ধার করা হয়। চলতি বছরের জানুয়ারিতেও সীমান্ত এলাকা থেকে দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হলেও কোনো ঘটনায় কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, চোরাচালান সিন্ডিকেটের সদস্যদের পরিচয় সীমান্ত এলাকায় অনেকেরই জানা থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মূল হোতারা আইনের আওতার বাইরে থেকে যায়। দুর্বল মামলার সুযোগে অভিযুক্তরা দ্রুত জামিনে বেরিয়ে এসে পুনরায় একই কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, সীমান্তের অন্তত ৮টি ঘাটকে কেন্দ্র করে কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য গড়ে উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ভারত সীমান্তের অভ্যন্তরে ওমরপুর এলাকার বিএসএফ সদস্য সেলিম এবং মহেশপুর উপজেলার শ্যামকুড় ইউনিয়নের মোমিনুর নামে এক ব্যক্তির সহযোগিতায় গরু, মাদক ও অস্ত্রের নিরাপদ পারাপার হচ্ছে।

গরু পাচারের কারণে ক্ষতির মুখে পড়েছেন স্থানীয় খামারিরা। তাদের অভিযোগ, চোরাই পথে কম দামে ভারতীয় গরু প্রবেশ করায় দেশীয় গরুর বাজারে ধস নেমেছে। এতে ঝিনাইদহ অঞ্চলের হাজারো খামারি আর্থিক চাপে পড়েছেন।

এ বিষয়ে মহেশপুর ৫৮ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রফিকুল আলম বলেন, সীমান্ত দিয়ে মাদক, গরু, জাল নোট ও অন্যান্য চোরাচালান রোধে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সীমান্তে টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি আগের তুলনায় বৃদ্ধি করা হয়েছে। পাশাপাশি জনসচেতনতামূলক সভার মাধ্যমে সীমান্তবর্তী জনগণকে সচেতন করা হচ্ছে।

তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, নিয়মিত বিপুল পরিমাণ মাদক ও চোরাই মালামাল জব্দ হলেও মূল সিন্ডিকেট সদস্য ও গডফাদাররা কেন বারবার আইনের আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে।