মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের জেরে দেশের তেলের বাজারের কয়দিন ধরেই অস্থিরতা চলছে। তেল ফুরিয়ে যাওয়ার শঙ্কায় অনেকেই প্রয়োজনের অধিক তেল নেয়ার চেষ্টা করছেন। ফলে তেল নিয়ে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সরকার রেশনিং পদ্ধতিতে তেল কেনা-বেচার নিয়ম করে দিলেও এখনো পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। সরকারের রেশনিংয়ের আওতায় আছে দূরপাল্লার যানবাহনে ডিজেলচালিত ভারী যানবাহনও। অভিযোগ আসছে সরকার ঘোষিত পরিমাণের চেয়েও কম জ্বালানি পাওয়ায় চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। ডিজেল না পাওয়ায় দূরপাল্লার বাসের ট্রিপ সংখ্যা কমিয়ে দেয়া হয়েছে, ঈদযাত্রায় যার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সায়েদাবাদ, মহাখালী ও গাবতলী রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ বাসস্ট্যান্ড। এখান থেকে দেশের নানা দূরত্বে যানবাহনগুলো ছেড়ে যায়। সরজমিন মহাখালী ও সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ড ঘুরে দেখা গেছে, আগের তুলনায় বাসস্ট্যান্ডগুলোতে বাস ও যাত্রীদের সংখ্যা কম। কল্যাণপুর ও গাবতলীর বিভিন্ন বাস কাউন্টারেও দূরপাল্লার রুটগুলো স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বেশি ব্যবধানে ছেড়ে যাচ্ছে। ঈদের ৭ দিন বাকি থাকলেও তার চাপ পড়েনি বাসস্ট্যান্ডে। তবে, সংকটের ফলে পাম্পে জ্বালানি সংগ্রহের চাপে রাজধানীর ফিলিং স্টেশনগুলোয় যানবাহনের দীর্ঘ সারি লেগে ছিল। ফিলিং স্টেশনসংলগ্ন রাস্তাগুলোতেও দিনভর ছিল তীব্র যানজট। এতে জ্বালানি নিতে বাড়তি দুই-তিন ঘণ্টা সময় লাগছে বাসগুলোর। এই সময়ের যাত্রীদেরও আগের চেয়ে বেশি অপেক্ষা করা লাগছে। তবে ঈদযাত্রকে সামনে রেখে গণপরিবহনের আজ থেকে পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হবে না। ফলে জ্বালানি সংকটের কারণ দেখিয়ে গণপরিবহনে ভাড়া বাড়ার কোনো আশঙ্কা নেই।
বাস কোম্পানিগুলো বলছে, তেলের সংকটে কমিয়ে দেয়া হয়েছে বাসের ট্রিপ। পাম্পগুলো থেকে চাহিদার চারভাগের একভাগ তেলও পাওয়া যাচ্ছে না। আগের তুলনায় কমিয়ে দেয়া হয়েছে বাসের সংখ্যা। এ কারণে শুধু যাত্রীদের ভোগান্তি নয়, বাসের শিডিউলও এলোমেলো হচ্ছে। তারা বলছেন, দূরপাল্লার বাসের জন্য সরকারিভাবে ২০০ থেকে ২২০ লিটার জ্বালানি তেল নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু ফিলিং স্টেশনগুলো এ পরিমাণ জ্বালানি তেল সরবরাহ করছে না। প্রয়োজনের চেয়ে কম তেল পাওয়ায় ট্রিপের সংখ্যা কমিয়ে দিতে হচ্ছে। ঈদ যতো ঘনিয়ে আসছে গাড়ির চাপও ততো বাড়বে। তখন যানজটও বাড়বে। ফলে যাত্রীদের ভোগান্তি বেড়ে যেতে পারে কয়েকগুণ।
ময়মনসিংহ রুটের একজন চালক বলেন, আমাদের বাসে দিনে ৩ ট্রিপে ১১০ থেকে ১১৫ লিটার তেল লাগে। সেখানে গতকাল দুই পাম্প মিলিয়ে মাত্র ৮০ লিটার তেল নিতে পেরেছি। এখন ট্রিপ সংখ্যা কমানো ছাড়া কোনো উপায় নেই। মো. শফিক নামের নামের বিনিময় বাসের একজন কর্মচারী বলেন, যেখানে ৫০ লিটার তেল দরকার, সেখানে হয়তো ২০ লিটার দেয়া হচ্ছে। তাও সব বাসে দেয়া হচ্ছে না। প্রায় সবগুলা পাম্পেই একই পরিস্থিতি। তাই চাইলেই বাসগুলো রাস্তায় নামানো যাচ্ছে না।
মহাখালী ইউনাইটেড বাস কাউন্টারের টিকিট বিক্রেতা রাসেল বলেন, আগে ইউনাইটেডে ১০ থেকে ১৫ মিনিট অন্তর বাস ছাড়া হতো। এখন দেড় ঘণ্টা পর পর এখন বাস ছাড়তে হচ্ছে। পর্যাপ্ত তেল পাওয়া যাচ্ছে না। সবগুলো কাউন্টারে পাম্পে সরকার নির্ধারিত যে পরিমাপ ওই পরিমাপের তেল দেয়া হচ্ছে। তাই এখন আগের মতো ওই পরিমাণ ট্রিপ দেয়া যাচ্ছে না। তিনি বলেন, যেমন কিছুক্ষণ আগে স্ট্যান্ডে কোনো বাসই ছিল না, কিন্তু এখন সবগুলা বাস লাইনে লাগানো হয়েছে, তেল জোগাড় করা বাসগুলো এখানে আছে এখন। আগে সারাদিন যদি ১০০টা বাস চলতো, এখন ৪০-৫০টা চালানো যাচ্ছে।
অনন্যা ক্লাসিকের টিকিট বিক্রেতা মো. মনোয়ার হোসেন বলেন, অনন্যার বাসগুলো আগে সাধারণত ১৫ মিনিট পরপর ছাড়তো; এখন ২০ থেকে ৫০ মিনিট পর পর ছাড়তে হচ্ছে। আগের তিনটি বাস ছাড়ার সময়ে এখন একটি বাস ছাড়া যাচ্ছে। ঈদযাত্রায় এটা অবশ্যই যাত্রীদের জন্য ভোগান্তির। কিন্তু সরকার ডিজেলের পরিমাণ নির্ধারণ করে দিয়েছে, কিছু করার নেই।
কাজী পরিবহনের মো. আল আমিন বলেন, ডিজেল সংকটের কারণে আমাদের বাস চাহিদামাফিক চলতে পারছে না। যেখানে আগে আমরা ২০টি বাস চালাতাম; সেখানে এখন একই রুটে ১০ থেকে ১৫টি বাস চালানো হচ্ছে। দূরপাল্লার যে সমস্ত যায়, বাসগুলোতে একই পরিমাণ ডিজেল দেয়া হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু কমসংখ্যক বাসে দেয়া হচ্ছে। ফলে ঈদের সময়ও ঠিকমতো বাস চালানো যাচ্ছে না।
ঢাকা ময়মনসিংহ রোডের সৌখিন এক্সপ্রেসের কাউন্টারে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে অনেক যাত্রী অপেক্ষা করছেন। কিন্তু কোনো বাস ছিল না। বাস কাউন্টারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তেলের সংকটের কারণে অনেকগুলো গাড়ি তেল নেয়ার জন্য পাম্পে দীর্ঘ লাইন ধরে অপেক্ষা করছে। তাই স্ট্যান্ডে কোনো বাস নেই। সেজন্য যাত্রীদের দীর্ঘক্ষণ ধরে অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
ভিড় কমছে না পাম্পে, মুহূর্তেই ফুরিয়ে যাচ্ছে তেল: শনিবার রাজধানীর অন্তত ৪ থেকে ৫টি তেলের পাম্প ঘুরে দেখা গেছে, কিছু পাম্পে অকটেন না থাকায় সেখানে মোটরসাইকেল নিয়ে তেল কিনতে আসলে তাদের ফেরত দেয়া হচ্ছে। যে সমস্ত পাম্পে তেল আছে, সেখানে দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। তেজগাঁও সাউদার্ন অটো মোবাইলস লিমিটেডে তেল নিতে অন্তত ১ কিলোমিটার লাইন দেখা গেছে। তেজগাঁও এলাকার সততা অ্যান্ড কোম্পানি ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। মহাখালী এলাকার শিকদার ফিলিং স্টেশনে বাইকারদের তেল নিতে তড়িঘড়ি দেখা গেছে। তবে, মগবাজার এলাকার মইন মোটরসে অকটেন নেই কয়েকদিন ধরেই। পাম্প কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রেশনিং পদ্ধতির আওতায় এখন একদিন বা দুইদিন পরপর ৯ হাজার লিটার করে তেল সরবরাহ করা হচ্ছে ডিপো থেকে। কিন্তু চাহিদা অন্তত ৩০ হাজার লিটার। তাই, ৯ হাজার লিটার তেল আসলেই হুলুস্থূল করেই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। তাই দিনের বাকি সময় পাম্প বন্ধ রাখতে হচ্ছে কিংবা তেল নেই বলে চালকদের ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে।
মহাখালী এলাকার সিকদার ফিলিং স্টেশনের মিজানুর রহমান বলেন, আমাদের চাহিদা অন্তত ২৫ হাজার লিটার। আমাদের বিক্রি শেষ হয়ে গেলেই আমাদের আবার বন্ধ রাখা হচ্ছে। যেমন গতকাল (শুক্রবার) ৯ হাজার লিটার দিয়েছে, শেষ হয়ে যাওয়ার ফলে আমাদের পাম্প বন্ধ রাখতে হয়। অনেকে এসে ঘুরে যান। সরবরাহ কমে গেছে; সরবরাহ কমে গেলে অল্প পরিমাণ সরবরাহ দিলে সেটা খুব তাড়াতাড়িও শেষ হয়ে যাচ্ছে।
তেজগাঁও সাউদার্ন অটো মোবাইলস লিমিটেডের ম্যানেজার আরিফ বলেন, আমাদের ২৮ হাজার লিটার দরকার, সেখানে আমরা পাচ্ছি মাত্র নয় হাজার লিটার। এটা দিয়ে আমরা খুব অল্প সময়ে দিতে পারছি। চালকদের যতো কম করে তেল দিতে পারি ততো বেশি সময় ধরে পাম্প চালানো যাচ্ছে। যেমন কারে ১০ লিটারের বেশি করে তেল দিচ্ছি না; মোটরসাইকেল ৫ লিটার করে দিচ্ছি। গতকালকে শুক্রবার সারাদিন আমাদের পাম্প বন্ধ ছিল, আমরা তেল পাইনি। এলপিজি ছিল। অকটেন ও ডিজেল কিছুই ছিল না। আজকে আবার সর্বোচ্চ রাত দশটা পর্যন্ত চলবে, এরপর আমরা আবার বন্ধ করে দিবো। একই এলাকার সততা অ্যান্ড কোম্পানির কর্মচারী ওয়াসিম বলেন, আমাদের ৩৫ লিটার তেল দরকার তেল পাচ্ছি ৯ লিটার। এক সপ্তাহ ধরে এভাবেই চলছে। এখন তেল দিচ্ছি রাত ৮/৯টার মধ্যে এটাও শেষ হয়ে যাবে। প্রতিদিন এভাবে করে আমরা তেল দিচ্ছি। শেষ হয়ে যায় বন্ধ রাখা হয়। সারাদিন বন্ধ থাকে বিকাল থেকে আবার শুরু করি।