মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর ও আশপাশের ফুটপাতের চিত্র এখন অনেকটা ভিন্ন। এসব জায়গাতে দীর্ঘদিনের সেই চেনা জটলা এখন আর নেই, পরিচ্ছন্ন ফুটপাত দিয়ে স্বচ্ছন্দে ও নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারছেন পথচারীরা।
মূলত গত ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) উদ্যোগে মিরপুর ১০ নম্বর এলাকার ফুটপাত দখলমুক্ত করতে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। এতে দীর্ঘদিন পর প্রথমবারের মতো মিরপুর-১০ ও আশপাশের ফুটপাত ও সড়কের জায়গাগুলো হকারমুক্ত রয়েছে। এতেই দেখা গেছে এই ভিন্ন দৃশ্য।
হকারমুক্ত এলাকার মধ্যে রয়েছে মিরপুর-১০ গোলচত্বর, হোপ স্কুল ও আশপাশের এলাকা, মিরপুর বিআরটিএ কার্যালয়, হারম্যান মেইনার স্কুল অ্যান্ড কলেজ এলাকা এবং মিরপুর-১০ ফায়ার সার্ভিস প্রশিক্ষণ কমপ্লেক্সের দিকে যাওয়া প্রধান সড়কের দুই পাশ।
বার্তা সংস্থা ইউএনবির এক বিশেষ প্রতিদবেদনে বলা হয়েছে, আগে এসব এলাকায় টি-শার্ট থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের তৈজসপত্র বিক্রি করতেন অসংখ্য হকার। কিন্তু মঙ্গলবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উচ্ছেদ অভিযানের আগে যেখানে ফুটপাত ও সড়কের জায়গা হকারদের দখলে থাকত, সেখানে এখন একজন হকারও নেই।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, পরিস্থিতি আগের অবস্থায় ফিরে না যাওয়ার পেছনে সিটি করপোরেশন ও পুলিশের নিয়মিত নজরদারি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। হকাররা যাতে আবার ফিরে এসে ফুটপাত দখল করতে না পারেন, সে জন্য এই নজরদারি চালিয়ে যাওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
ইউএনবি বলেছে, মিরপুর-১০ এলাকায় এর আগেও অনেকবার হকার উচ্ছেদে অভিযান চালানো হয়েছে। তবে প্রতিবারই অভিযানের কয়েক দিনের মধ্যে হকাররা আবার ফিরে এসে ফুটপাত ও সড়ক দখল করে বসতেন।
উচ্ছেদ হওয়া মোবাইল বিক্রেতা সোহেল মিয়া জানান, এবার উচ্ছেদ অভিযানের পর হকাররা আর সড়কে বসতে পারছেন না। কারণ নিয়মিত নজরদারি চলছে।
মিরপুর-১০ ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের সামনে বাতাবি লেবু ও আমড়া বিক্রি করতেন রাসেল মিয়া। তিনি জানান, সাম্প্রতিক উচ্ছেদ অভিযানের পর হকাররা সড়কে বসা বন্ধ করেছেন।
তবে এই পরিবর্তনে বেশ খুশি সাধারণ পথচারীরা। একসময় যে ফুটপাতে পা ফেলার জায়গা ছিল না, সেখানে এখন নির্বিঘ্নে হাঁটছেন শিক্ষার্থী, অভিভাবক, চাকরিজীবী, বয়স্ক মানুষসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষ।
মিরপুর-১০ এর সড়ক দিয়ে নিয়মিত চলাচল করেন সামিয়া। তিনি ইউএনবিকে বলেন, “কয়েক সপ্তাহ আগেও ক্রেতাদের ভিড়ে এই রাস্তা দিয়ে হাঁটা খুব কষ্টকর ছিল। হাঁটার সময় কখনো কখনো অন্য পথচারীর সঙ্গে ধাক্কাও লাগত। উচ্ছেদ অভিযানের পর এখন শান্তিতে চলাচল করতে পারছি।”
হকাররা যাতে আবার ফিরে আসতে না পারেন, সে জন্য সিটি করপোরেশন ও পুলিশকে নিয়মিত নজরদারি চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
মিরপুর গার্লস আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থী হাবিবা ইউএনবিকে বলেছে, আগে হকাররা ফুটপাত দখল করে বসায় কলেজের গেটের সামনে ময়লা জমে থাকত। এ কারণে কলেজে ঢোকা ও বের হতে তাদের সমস্যায় পড়তে হতো। কখনো কখনো ভিড় ঠেলে বের হতে হতো বলেও অভিযোগ করে এই শিক্ষার্থী।
হাবিবা জানায়, এখন ফুটপাত পরিষ্কার হওয়ায় কলেজের ফটকের সামনে আর ময়লা জমছে না।
একদিকে যেমন পথচারী সাধারণ মানুষদের এক অংশের মধ্যে স্বস্তি এসেছে। কিছু মানুষ আবার হকারদের কথাও মনে করছেন। শুনতে অবিশ্বাস্য হলেও কয়েকজন এমনই বলেছেন।
তবে ইউএনবির সঙ্গে কথা বলা অধিকাংশ মানুষই হকার উচ্ছেদকে স্বাগত জানিয়েছেন। পল্লবী স্কুল অ্যান্ড কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী হাফসা আহমেদ বৃষ্টির মতো কেউ কেউ মনে করে, হকারদের যেমন সুবিধা আছে, তেমনি অসুবিধাও রয়েছে। এই শিক্ষার্থীর মতে, সুবিধা হলো– কম দামে কাপড় ও প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস কেনা যেত। তবে ফুটপাতে স্বাচ্ছন্দ্যে হাঁটা কঠিন হযে পড়ত।
হাফসা জানায়, হাঁটার সময় কখনো কখনো কেউ ইচ্ছা করে তার গায়ে ধাক্কা দিতেন। এতে সে অস্বস্তি বোধ করত। সে বলেছে, “এখন পরিষ্কার ফুটপাত দিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে হাঁটতে পারছি, ভালো লাগছে। তবে কম দামে কিছু জিনিস কেনার সুযোগটা মিস করছি।”
ইউএনবি জানায়, সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো আশপাশের কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও হকারদের মিস করছে। গ্রিন লিফ স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিপরীতে গত দুই বছর ধরে ‘অল ইজ ওয়েল ফ্যাশন’ নামে একটি দোকান চালাচ্ছেন কুলসুম। সেখানে নারীদের থ্রি-পিস ও অন্যান্য পোশাক বিক্রি করা হয়।
কুলসুম বলেন, হকাররা যখন বিভিন্ন পণ্য নিয়ে ফুটপাত দখল করে বসতেন, তখন এলাকায় মানুষের চলাচলও বেশি ছিল। ব্যবসার দিক থেকে এটিকে ভালো বলেই মনে করা হয়। তার মতে, হকাররা থাকলে তাদের ব্যবসা ভালো হতো এবং দূরের বিভিন্ন এলাকা থেকেও বেশি ক্রেতা আসতেন।
কুলসুম জানান, উচ্ছেদের পর তাদের বিক্রি আগের তুলনায় প্রায় এক-চতুর্থাংশে কমে গেছে। এখন তাদের দোকানের বেশির ভাগ ক্রেতা আশপাশের স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবক।
কুলসুম মনে করেন, হকারদের যদি নির্দিষ্ট জায়গায় সীমিত ও নিয়ম মেনে ব্যবসা করার সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে কম দামে পণ্য কেনার সুযোগ থাকবে। একই সঙ্গে পথচারী ও যানবাহনও সড়ক ও ফুটপাত দিয়ে চলাচল করতে পারবে।
৩০ সেপ্টেম্বরের উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে এলাকায় হকারদের সঙ্গে ডিএনসিসির কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সংঘর্ষ হয়। এ সময় ডিএনসিসির অন্তত দুটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয় এবং তিনটি বুলডোজার ভাঙচুর করা হয়। এ সময় সংবাদ সংগ্রহ করতে যাওয়া কয়েকজন সাংবাদিকও হামলার শিকার হন।
ইউএনবি বলেছে, সেদিনের সহিংসতার মাত্রা দেখে কর্তৃপক্ষ বুঝতে পেরেছিল, হকাররা একটি কঠিন প্রতিপক্ষ। তারা যাতে আবার ফুটপাত ও সড়কে ফিরে আসতে না পারেন, সে জন্য ডিএনসিসি পুলিশ, সিটি করপোরেশনের কর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়ে যে যৌথ নজরদারি দল গঠন করা হয়েছে, তাদের সামনে কঠিন কাজ রয়েছে। এক সপ্তাহ পর মনে হচ্ছে, সেই কঠিন কাজের ফল পাওয়া যাচ্ছে।