Image description

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) ৩১ কোটি পাঠ্যবই ছাপানোর দরপত্রে বিপুল দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। দরপত্র আহ্বানের পর দর ফাঁস করে একটি শিন্ডিকেট ২৫০ কোটি টাকা গায়েব করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়, এনসিটিবি ও প্রেস মালিকদের সমন্বয়ে ত্রিপক্ষীয় একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলে এই দুর্নীতি করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। দরপত্রের একাধিক সিডিউল বিক্রি হলেও জমা পড়েছে মাত্র এক-দুটি করে। প্রতিযোগিতাহীন উচ্চমূল্যের এই দরপত্র মূল্যায়ন ও অনুমোদনে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর) ২০২৫ মানা হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এরইমধ্যে তথ্য সংগ্রহে এনসিটিবিতে অভিযান চালিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

এনসিটিবি সূত্র জানায়, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য ৩০ কোটি ৬১ লাখ ৯৮ হাজার ১০১ কপি বই ছাপা হচ্ছে। এর মধ্যে প্রাক-প্রাথমিকের জন্য ৫৭ লাখ ৩০ হাজার ৬৪০ কপি, প্রাথমিক স্তরের জন্য সাত কোটি ৯৪ লাখ ২৪ হাজার ৫৩৮ কপি এবং মাধ্যমিক স্তরের জন্য ২২ কোটি ১০ লাখ ৪২ হাজার ৯২৩ কপি বই ছাপা হবে। এসব বই ছাপাতে সরকারের ব্যয় হচ্ছে প্রায় দুই হাজার ১০০ কোটি টাকা।

সূত্র জানায়, এনসিটিবির আগের চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক পাটওয়ারীর সময় প্রি-প্রাইমারি, প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি, ইবতেদায়ি, ষষ্ঠ শ্রেণি ও সপ্তম শ্রেণির বই ছাপানোর দরপত্র লাইভ করা হয়।

তখন ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির বই ছাপানোর প্রাক্কলিত দর নির্ধারণ করা হয় ৩.২৬ টাকা, ষষ্ঠ শ্রেণি ২.৮০ টাকা, সপ্তম শ্রেণি ২.৮১ টাকা ও অষ্টম শ্রেণি ২.৯০ টাকা। তিনি হোপ (হেড অব প্রকিউরিং এনটিটি) হিসেবে যাচাই-বাছাই করে এর অনুমোদন দেন।

কিন্তু চলতি বছরের গত ১০ জুন নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা ওই পদে যোগদান করেন। এই সুযোগে তাঁকে ফাঁকি দিয়ে কৌশলে এনসিটিবির এক সদস্য প্রেস মালিকদের প্রাক্কলিত দর সরবরাহ করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২১ জুন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন এনসিটিবি পরিদর্শনে যান।

বিষয়টি নিয়ে ওই দিন চেয়ারম্যানের কক্ষে আলোচনায় বসেন শিক্ষামন্ত্রী। পরে এনসিটিবির ৪২৩তম বোর্ড সভায় দরপত্রের প্রাক্কলন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি ৩.৬১ টাকা, ষষ্ঠ শ্রেণির জন্য ৩.৩০ টাকা, সপ্তম শ্রেণি ৩.৩১, অষ্টম শ্রেণি ৩.৩৫, নবম-দশম শ্রেণি ৩.৪০ (এক রং), নবম থেকে দশম শ্রেণি ৩.৫৫ টাকা (চার রং)।

তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দরপত্র লাইভে থাকা অবস্থায় প্রাক্কলিত দর বাড়ানো বা কমানোর সুযোগ নেই। কারণ প্রাক্কলন কমিটি বাজার যাচাই সাপেক্ষে দর প্রস্তুত করে হোপ-এর অনুমোদন নিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে প্রথমত দরপত্র উন্মুক্ত হওয়ার পর কোনো দরদাতা না পাওয়া গেলে পুনরায় দাপ্তরিক প্রাক্কলন প্রণয়ন করিয়ে পুনঃ দরপত্র দিতে হবে। দ্বিতীয়ত দরদাতারা প্রাক্কলিত মূল্যের অধিক দর প্রস্তাব করলে বাজেটপ্রাপ্তি সাপেক্ষে পুনরায় বাজার যাচাই করে ১০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি দরে কার্যাদেশ দিতে পারেন। কিন্তু এই দুটি প্রক্রিয়ার কোনোটিই অনুসরণ করা হয়নি, যা পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর)-২০২৫-এর লঙ্ঘন।

পিপিআর-এর বিধি ৪৪(২)-এ বলা হয়েছে, ‘সকল দরপত্র, প্রস্তাব বা কোটেশন বাতিল করা যাইবে, যদি-(ক) দাপ্তরিক প্রাক্কলিত ব্যয় বাস্তবসম্মত হওয়া সত্ত্বেও সর্বনিম্ন মূল্যায়িত দরপত্র বা কোটেশন উক্ত প্রাক্কলিত ব্যয় অপেক্ষা অধিক হয়; বা (খ) ক্রয় প্রক্রিয়ায় কার্যকর প্রতিযোগিতার অভাব থাকার প্রমাণ পাওয়া যায় (যথা—সম্ভাব্য কতিপয় দরপত্রদাতা কর্তৃক অংশগ্রহণ না করা)।’

দরপত্রে অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় গত মঙ্গলবার এনসিটিবিতে অভিযান চালায় দুদক। তারা দরপত্রের বেশ কিছু কাগজপত্র করেন। এ পরিস্থিতিতে গতকাল বুধবার এনসিটিবি অনানুষ্ঠানিক অধিকাংশ প্রেস মালিককে ডেকে এনে তাঁদের কাছ থেকে প্রথম পর্যায়ের প্রাক্কলিত দর যে বাজার উপযোগী ছিল না, সে ব্যাপারে প্যাডে ব্যাকডেটে লিখিত নেয়।

বিষয়টির সত্যতা জানতে গতকাল রাতে এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফখরুল মাওলাকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি। আর অন্য কর্মকর্তারা ফোন ধরলেও এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।

সূত্র জানায়, প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির আটটি, ষষ্ঠ শ্রেণির ১২টি, সপ্তম শ্রেণির ১০টি, অষ্টম শ্রেণির চারটি ও নবম-দশম শ্রেণির ১১টিসহ মোট ৪৫টি দরপত্রের মধ্যে একক দরপত্র জমা পড়েছে ৩০টি (৬৬.৬৬ শতাংশ), দুটি করে দরপত্র জমা পড়েছে ১৩টি (২৮.৮৮ শতাংশ) তিনটি করে দরপত্র জমা পড়েছে দুটি (৪.৪৪ শতাংশ)। মূলত প্রেস মালিকরা সমঝোতা করে এসব দরপত্র জমা দেন।

তবে প্রতিটি দরপত্রের বিপরীতে একাধিক সিডিউল বিক্রি হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির ৩৪১ নম্বর লটে ২৪টি দরপত্র বিক্রি হলেও জমা পড়েছে দুটি, ৩৫৯ নম্বর লটে ২২টি দরপত্র বিক্রি হলেও জমা পড়েছে দুটি, ৩৮৮ নম্বর লটে ১৭টি দরপত্র বিক্রি হলেও জমা পড়েছে একটি। ষষ্ঠ শ্রেণির ৬৫২ নম্বর লটে ১৯টি দরপত্র বিক্রি হলেও জমা পড়েছে একটি, ৬২১ নম্বর লটে ১৮টি দরপত্র বিক্রি হলেও জমা পড়েছে একটি ও ৬৩৪ নম্বর লটে ১৭টি দরপত্র বিক্রি হলেও জমা পড়েছে মাত্র একটি।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে মাধ্যমিকের ফর্মাপ্রতি গড় দর পড়েছে ৩.৩২ টাকা এবং প্রাথমিকের ফর্মাপ্রতি গড় দর ৩.৫৪ টাকা। অথচ ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের বই মুদ্রণে কোনো একক দরপত্র জমা পড়েনি। ওই বছর মাধ্যমিকে ফর্মাপ্রতি গড় দর ছিল ২.৩১ টাকা এবং প্রাথমিকে ফর্মাপ্রতি গড় দর ছিল ৩.৪৪ টাকা। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রায় ৮৫ হাজার মেট্রিক টন কাগজে বই ছাপা হচ্ছে। সেই হিসাবে দরপত্র লাইভে থাকা অবস্থায় দর পরিবর্তন করে ২৫০ কোটি টাকার বেশি গায়েব করা হয়েছে। 

জানা গেছে, ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে মাধ্যমিক স্তরের প্রতি ফর্মা প্রাক্কলিত দর ৩.১৭ টাকা হলেও প্রেস মালিকরা প্রতিযোগিতামূলক দরে গড়ে ফর্মাপ্রতি ২.৩১ টাকায় কাজ করেছেন। এর অন্যতম কারণ এনসিটিবির প্রাক্কলিত দর তাঁরা জানতে পারেননি এবং নিজেদের মধ্যে সিন্ডিকেট করতে পারেননি। আবার গত বছর প্রতিটি দরপত্রের বিপরীতে ১০ থেকে ২৫টি দরপত্র জমা পড়েছে। 

বাংলাদেশ মুদ্রণশিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দরপত্রে লাইভে চলে আসার পর নতুন করে দরপত্র প্রাক্কলনের কোনো সুযোগ নেই। অথচ এত বড় একটা অনিয়ম এনসিটিবি করল। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও সব জেনেশুনে চুপ থাকল। আমরা এই অনিয়মের প্রতিকার চাই।’

তিনি বলেন, ‘দুদক এনসিটিবিতে অভিযান চালিয়েছে। তারা তদন্ত করলেই আসল সত্যটা বেরিয়ে আসবে। আমরা চাই, শিক্ষার্থীরা বছরের প্রথম দিন যেন ভালো মানের বই পায়। সরকারকেও এই মহৎ কাজে যেন অতিরিক্ত টাকা গচ্চা দিতে না হয়।’