ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ দ্রুত শেষ হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তবে একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন, ইরান যদি মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল পরিবহন ব্যাহত করার চেষ্টা করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র আরও ব্যাপক সামরিক হামলা চালাবে। সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে ইরানের বিমান ও নৌবাহিনীর ওপর বড় ধরনের আঘাত হেনেছে।
তার দাবি, সংঘাতটি তিনি আগে যে চার সপ্তাহের সম্ভাব্য সময়সীমার কথা বলেছিলেন, তার আগেই শেষ হতে পারে। ট্রাম্পের এই বক্তব্যের জবাবে ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা অব্যাহত থাকলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ‘এক লিটার তেলও’ বাইরে যেতে দেয়া হবে না। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত এক বিবৃতিতে বাহিনীর একজন মুখপাত্র বলেন, যুদ্ধ কখন শেষ হবে- সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে তেহরান। আইআরসিজি স্পষ্ট জানিয়েছে, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সুতরাং যুদ্ধ কখন শেষ হবে- সে বিষয়ে তারাই সিদ্ধান্ত নেবে।
চীন, ফ্রান্স, রাশিয়ার যুদ্ধবিরতির আলোচনা নাকচ ইরানের: চীন, ফ্রান্স ও রাশিয়া যুদ্ধবিরতি নিয়ে ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। কিন্তু এই আলোচনা নাকচ করেছে তেহরান। যোগাযোগের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী তখত-রাভানচি। জবাবে তিনি বলেছেন, ইরান কোনোভাবেই আলোচনার টেবিলে ফিরবে না, যতক্ষণ না তারা এমন নিশ্চয়তা পায় যে, এখন আমরা যা দেখছি এবং জুনে যা দেখেছি, সেই ধরনের আগ্রাসন আর হবে না। সুতরাং, এগুলোই ইরানের প্রধান শর্ত এবং তার মন্তব্যে আলোচনায় ফেরার কোনো আগ্রহের ইঙ্গিত পাওয়া যায় না। অন্যদিকে, ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী তাদের পাল্টা হামলা আরও জোরদার করেছে। তারা জানিয়েছে, তারা ‘অপারেশন প্রমিজ-৪’ এর ৩৩তম ধাপ শুরু করেছে। তারা ঘোষণা দিয়েছে, এখন থেকে ইসরাইল ও অন্যান্য লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে তারা শুধু তাদের সবচেয়ে ভারী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করবে। এগুলোর ওজন এক টন বা তারও বেশি।
বাজারে অস্থিরতা: এই পাল্টাপাল্টি হুমকির প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানির বাজারে। বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগে আন্তর্জাতিক শেয়ারবাজারে বড় ধরনের ওঠানামা দেখা গেছে। একই সঙ্গে তেলের দামও দ্রুত বাড়া-কমার মধ্যে পড়ে। সংঘাতের কারণে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে পড়েছে। এই পথ দিয়ে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন করা হয়। এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল বন্ধ থাকায় অনেক উৎপাদক দেশ তেল উত্তোলন কমাতে বাধ্য হয়েছে, কারণ সংরক্ষণাগার দ্রুত পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। দিনের এক পর্যায়ে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম প্রায় ২৯ শতাংশ পর্যন্ত লাফিয়ে ওঠে। পরে দিন শেষে তা প্রায় ৭ শতাংশ বাড়তি দামে লেনদেন শেষ করে, যা ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ। তবে পরবর্তী লেনদেনে কিছুটা কমে আসে। ট্রাম্প যুদ্ধ শেষ হতে পারে বলে মন্তব্য করায় মঙ্গলবার তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের নিচে নেমে আসে।
আরামকো’র সতর্কবার্তা: বিশ্বের শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান সৌদি আরবের আরামকো মঙ্গলবার জানিয়েছে, যদি ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলকে এভাবেই ব্যাহত করতে থাকে, তবে বিশ্ব তেলের বাজারে এর ‘বিপর্যয়কর পরিণতি’ হতে পারে। আরামকো’র সিইও আমিন নাসের সাংবাদিকদের বলেন, এই অচলাবস্থা কেবল জাহাজ চলাচল এবং বীমা খাতকেই ওলটপালট করে দেয়নি, বরং এটি বিমান চলাচল, কৃষি, অটোমোবাইল এবং অন্যান্য শিল্পেও ভয়াবহ ‘ডমিনো ইফেক্ট’ বা ধারাবাহিক নেতিবাচক প্রভাব ফেলার ইঙ্গিত দিচ্ছে। নাসের উল্লেখ করেন, বর্তমানে বিশ্ব জুড়ে তেলের মজুত গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই সংকটের ফলে মজুত তেলের পরিমাণ আরও দ্রুত হারে কমতে থাকবে। তাই হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়া এখন অত্যন্ত জরুরি।
নতুন নেতৃত্ব ঘিরে উত্তেজনা: এদিকে ইরানে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মোজতবা খামেনিকে সামনে আনার খবর পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে। তিনি নিহত সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির ছেলে। যুদ্ধের প্রথম দিন ইসরাইলি হামলায় আলি খামেনি নিহত হন। ট্রাম্প ইতিমধ্যে মোজতবা খামেনিকে অগ্রহণযোগ্য ঘোষণা করেছেন এবং ইরানের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ দাবি করেছেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দেশটির বিভিন্ন শহরে নতুন নেতার প্রতি সমর্থন জানিয়ে জনসমাবেশের খবর দেখানো হয়েছে। সমাবেশে অংশ নেয়া মানুষজন হাতে ইরানের পতাকা এবং আলি ও মোজতবা খামেনির ছবি প্রদর্শন করেন। ইসফাহানের ঐতিহাসিক ইমাম স্কয়ারে এক সমাবেশ চলাকালে আশপাশে বিমান হামলার শব্দ শোনা যায় বলে জানায় রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন। সেখানে উপস্থিত সমর্থকেরা ‘আল্লাহু আকবার’ স্লোগান দিতে থাকেন।
হামলা ও ক্ষয়ক্ষতি: সংঘাতের মধ্যেই ইরানের একটি তেল শোধনাগারে হামলার পর রাজধানী তেহরানের আকাশ কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক সতর্ক করে বলেছেন, এই আগুনের কারণে খাদ্য, পানি ও বায়ু দূষণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এদিকে তুরস্ক জানিয়েছে, ইরান থেকে ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তাদের আকাশসীমায় ঢুকে পড়লে ন্যাটোর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সেটি ভূপাতিত করে। যুদ্ধ শুরুর পর এটি দ্বিতীয় এমন ঘটনা। ইসরাইলের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা ইরানের মধ্যাঞ্চলে নতুন করে হামলা চালিয়েছে এবং লেবাননের রাজধানী বৈরুতেও আঘাত হেনেছে। ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ সীমান্ত থেকে হামলা চালানোর পর ইসরাইল সেখানে অভিযান বিস্তৃত করেছে। ইরানের জাতিসংঘ রাষ্ট্রদূতের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ৩৩২ জন ইরানি বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। লেবাননে ৪০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং প্রায় সাত লাখ মানুষ ঘরছাড়া হয়েছেন। অন্যদিকে ইসরাইলে ইরানের পাল্টা হামলায় তেল আবিবের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে একটি নির্মাণস্থলে শার্পনেল পড়ে একজন নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে জরুরি সেবাকর্মীরা। এতে ইসরাইলে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ জনে।
তেলের ঘাটতি মোকাবিলার উদ্যোগ: এদিকে তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে কথা বলেছেন ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, সরবরাহ সংকট কমাতে যুক্তরাষ্ট্র কিছু দেশের ওপর আরোপিত তেলসংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে পারে। একাধিক সূত্রের মতে, এর মধ্যে রাশিয়ান তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আংশিক শিথিল করার সম্ভাবনাও রয়েছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত মজুত থেকে তেল ছাড়া কিংবা দেশটির তেল রপ্তানি সীমিত করার মতো পদক্ষেপও বিবেচনায় রয়েছে।
বেশির ভাগ আমেরিকানই ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা সমর্থন করেন না: ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলা নিয়ে মার্কিন জনমত স্পষ্টভাবে বিভক্ত। এমনটাই উঠে এসেছে রয়টার্স/ইপসোসের সামপ্রতিক এক জরিপে। জরিপ অনুযায়ী, অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক এই হামলার বিরোধিতা করছেন এবং অনেকেই মনে করছেন না যে যুক্তরাষ্ট্রের এই যুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রকাশিত জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে মাত্র ২৯ শতাংশ ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক হামলাকে সমর্থন করেছেন। বিপরীতে ৪৩ শতাংশ সরাসরি এর বিরোধিতা করেছেন। আর ২৮ শতাংশ এ বিষয়ে নিশ্চিত মত দেননি বা প্রশ্নটি এড়িয়ে গেছেন। দলীয় অবস্থানের ভিত্তিতে মতামতে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা গেছে। জরিপে অংশ নেয়া রিপাবলিকানদের মধ্যে ৬৬ শতাংশ ইরানে হামলার পক্ষে মত দিয়েছেন। বিপরীতে ডেমোক্রেটদের বড় অংশ-৭৬ শতাংশ এই সামরিক পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছেন।
এদিকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা দ্রুত শেষ হবে কিনা- এ প্রশ্নেও মার্কিনদের মধ্যে সংশয় দেখা গেছে। জরিপ অনুযায়ী, সব প্রাপ্তবয়স্ক উত্তরদাতার মধ্যে ৬০ শতাংশ মনে করেন না যে, এই সম্পৃক্ততা দ্রুত শেষ হবে। মাত্র ৩৬ শতাংশ মনে করেন এটি দ্রুত শেষ হতে পারে। দলভিত্তিক মতামতেও একই ধারা দেখা গেছে। রিপাবলিকানদের মধ্যে ৬২ শতাংশ বিশ্বাস করেন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা দ্রুত শেষ হতে পারে। কিন্তু ডেমোক্রেটদের মধ্যে ৭৭ শতাংশ মনে করেন এই সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এই জরিপটি ৬ থেকে ৯ই মার্চের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে ১ হাজার ২১ জন প্রাপ্তবয়স্কের ওপর পরিচালিত হয়। জরিপটির সম্ভাব্য ত্রুটির সীমা প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে প্লাস বা মাইনাস ৩ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।