কৌশলগত ‘পারমাণবিক অস্ত্র’ খুঁজে পেয়েছে ইরান। এই অস্ত্র পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়েও শক্তিশালী। যার শক্তি ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে যুদ্ধের মোড়। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত সামনে এনেছে এই নতুন বাস্তবতা। যেখানে পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়ে বেশি কার্যকর হয়ে উঠেছে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের শক্তিশালী হাতিয়ার এখন হরমুজ প্রণালি। এটি অনেক ক্ষেত্রেই প্রচলিত পারমাণবিক শক্তির চেয়েও বেশি কার্যকর।
কারণ, ইরানকে দুর্বল করতে দীর্ঘদিন ধরেই দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি কঠোর নজরদারিতে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। তাদের যুক্তি, তেহরানের পারমাণবিক সক্ষমতা পাল্টে দিতে পারে আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য। আরব দেশগুলোর সঙ্গে ক্ষমতার সমীকরণ বদলে দেবে এই বৈশ্বিক বাণিজ্য ও ট্রানজিট কেন্দ্র।
চলতি এবং গত বছর ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনাগুলোর ওপর বিমান হামলার মাধ্যমে দেশটির ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ক্ষমতা এবং দুর্বল করার চেষ্টা করা হয় ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার।
২০২৫ সালের জুনে ইসফাহান, নাতাঞ্জ ও ফোরদোয় পরমাণু স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র বাঙ্কার বাস্টার বোমা দিয়ে চালায় হামলা। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, হামলার কারণে এই তিনটি স্থাপনার হয়েছে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি।
বর্তমানের যুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে চালিয়েছে শত শত হামলা। এতে বহু স্থাপনা মিশে গেছে মাটিতে। তবুও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার ক্ষমতা রয়ে গেছে আগের মতোই।
হরমুজে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টির কৌশল
হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে ট্যাংকার চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে এক ভূরাজনৈতিক শক্তি তৈরি করেছে তেহরান। এটি কাজ করছে একটি ভৌগোলিক পারমাণবিক অস্ত্র হিসেবে। এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয় বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস।
পারমাণবিক অস্ত্র যেমন আত্মরক্ষার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তেমনি অর্থনৈতিক অচলাবস্থার ভয় দেখিয়ে প্রভাব বিস্তার করছে হরমুজ। এতে মৃত্যু বা সরাসরি ধ্বংস নেই, কিন্তু এর প্রভাব তাৎক্ষণিক ও ব্যাপক।
ট্যাংকার চলাচল কমে গেলে বেড়ে যায় বীমা ও পরিবহন খরচ। ফলে ঝুঁকি এড়াতে পিছু হটতে হয় জাহাজ মালিক ও বীমা কোম্পানিগুলোকে। উৎপাদন কমে বা বন্ধ হয়ে সৃষ্টি করে বড় ধরনের জ্বালানি সংকট। তখন বেড়ে যায় তেলের দাম। যার সর্বশেষ নজির আমরা দেখেছি ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধে। যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় মাস দেড়েকে তেলের দাম ছিল ১০০ ডলারের ওপরে। এখনো এ দাম রয়েছে ১০০ ডলারের কাছাকাছি।
বিশ্লেষকদের মতে, এখন তার কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রকে। শুধু ইরানের ইউরেনিয়াম বা পারমাণবিক স্থাপনায় আঘাত হানলে হরমুজের কৌশলগত প্রভাব কমানো সম্ভব নয়। এই প্রভাব মোকাবিলায় প্রণালির নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব কমানো জরুরি।
হরমুজ নিয়ন্ত্রণের একটি ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর নৌ অবরোধ বা উপস্থিতিকে। যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে সামরিক অভিযান থেকে নৌপথ নিয়ন্ত্রণের দিকে অগ্রসর হচ্ছে যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের মাধ্যমে।
বিশ্লেষকের মতে, এটি প্রণালিকে নিয়ন্ত্রণাধীন করিডর হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা, যেখানে নিরাপদ নৌচলাচল নিশ্চিত করার দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বর্তায়। এমনকি ট্যাংকার চলাচলের ওপর শুল্ক আরোপের ধারণাও এই কৌশলের অংশ।
আশঙ্কা করা হচ্ছে, হরমুজ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি রূপ নিতে পারে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত। এতে ছোট নৌযান, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে ইরান প্রণালিতে চাপ সৃষ্টি করতে পারে, যা পরিস্থিতি তৈরি করবে একটি ধারাবাহিক সংঘাতের।
এ ছাড়া বিশ্বজুড়ে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিকল্প পাইপলাইন ও নতুন জ্বালানি রুটে বিনিয়োগ করতে হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রকে, যা সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল।
হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে তৈরি এই ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা যুক্তরাষ্ট্রকে একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত, সামরিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে—যা হয়তো আগামী দশকজুড়েই বিশ্ব রাজনীতিকে প্রভাবিত করবে।
এনডিটিভি থেকে অনূদিত, ভাষান্তর : মাকসুদা রিনা/ আগামীর সময়