Image description

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ দীর্ঘ হলেও তাতে বিচলিত নয় ইরান। এমনটিই জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তেহরান থেকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে চলমান যুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধের দৃঢ়প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তেহরান নিজের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর এবং প্রয়োজনে দীর্ঘ সময় ধরে সামরিক অভিযান চালানোর সক্ষমতা তাদের রয়েছে। এদিকে দ্রুত যুদ্ধ শেষ করার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, আগামী ২-৩ সপ্তাহের মধ্যে এই যুদ্ধ শেষ হতে পারে।

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে বেশ বেকায়দায় পড়েছেন তিনি। নিজ দেশেও এই যুদ্ধে তিনি জনসমর্থন পাননি। রয়টার্সের এক জরিপে বলা হয়েছে, লক্ষ্য অর্জন না হলেও দ্রুত যুদ্ধ শেষের পক্ষে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আমেরিকান। এদিকে ট্রাম্পের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও স্বীকার করেছেন, ইরানের কাছে কোনো পারমাণবিক অস্ত্র নেই। যদিও হোয়াইট হাউসের দাবি ইরান তাদের জন্য সামরিকভাবে হুমকি। উত্তর আটলান্টিক চুক্তি বা ন্যাটো থেকে বের হয়ে যাওয়ার হুমকিও দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, ইরান যুদ্ধ শেষে ন্যাটো থেকে বের হয়ে যাওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করবেন ট্রাম্প। কেননা, তারা প্রেসিডেন্টের ডাকে সাড়া দেয়নি।

এর আগে ট্রাম্প তার ন্যাটো ও ইউরোপীয় মিত্রদের ‘কাপুরুষ’ বলে অভিহিত করেন। এই যুদ্ধের ব্যয় ট্রাম্পকে সবচেয়ে বেশি ফেলেছে। এ ছাড়া হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবরোধ থাকায় জ্বালানির বাজারে যে চাপ সৃষ্টি হয়েছে তা নিয়েও বিশ্বের আঙ্গুল ট্রাম্পের দিকে।

আরও ৬ মাস টানা যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে ইরান: আব্বাস আরাগচি বলেন, ইরান পূর্ণমাত্রায় কমপক্ষে আরও ৬ মাস যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে। আল জাজিরাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এ মন্তব্য করেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা হচ্ছে কিনা আরাগচি তা নিয়েও কথা বলেন। তার দাবি, বর্তমানে কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা চলছে না। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিভাষায় আলোচনার অর্থ হচ্ছে দুই পক্ষের সরাসরি বসে সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা, যা এখনো ঘটেনি। তবে দুই দেশের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান হচ্ছে। কখনো সরাসরি, কখনো আঞ্চলিক মিত্রদের মাধ্যমে। কিন্তু এটিকে আলোচনা বলা যায় না। তিনি আরও জানান, এসব বার্তা আদান-প্রদান সরকারি চ্যানেলের মাধ্যমেই হচ্ছে এবং এতে কোনো ভিন্নমত বা আলাদা যোগাযোগ ব্যবস্থা নেই। সবকিছুই ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত ১৫ দফা প্রস্তাব বা ইরানের পাঁচটি শর্তের বিষয়ে আরাগচি বলেন, এসবই ভিত্তিহীন গণমাধ্যমের জল্পনা, এ ধরনের কোনো প্রস্তাবে ইরান এখনো সাড়া দেয়নি। যুদ্ধ বন্ধের শর্ত সম্পর্কে তিনি বলেন, ইরান কেবল যুদ্ধবিরতি নয়, পুরো অঞ্চলে যুদ্ধের সম্পূর্ণ অবসান চায়। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এমন সংঘাত যাতে আর না ঘটে তার নিশ্চয়তা এবং ইরানি জনগণের ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে তেহরান।

চুক্তি ছাড়াই ইরান ছাড়তে প্রস্তুত যুক্তরাষ্ট্র: তেহরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি না হলেও দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শেষ করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। এমন ইঙ্গিত দিয়ে ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলা বন্ধ করতে পারে। এর জন্য তেহরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি বাধ্যতামূলক নয়। আমরা খুব শিগগিরই (যুদ্ধ থেকে) বের হয়ে যাবো। দুই সপ্তাহের মধ্যে, হয়তো দুই সপ্তাহ, হয়তো তিন। যুক্তরাষ্ট্রের ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’- শেষ করতে ইরানের সঙ্গে সফল কূটনৈতিক সমঝোতা প্রয়োজন কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, এটি জরুরি নয়। তিনি বলেন, ইরানকে আমার সঙ্গে কোনো চুক্তি করতে হবে, এমন না। হরমুজ প্রণালি ইস্যুতে ট্রাম্প বলেন, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ খোলা রাখার দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রের নয়, বরং যেসব দেশ এর ওপর নির্ভরশীল তাদের। তিনি বলেন, এটা (উন্মুক্ত) করার কোনো কারণ আমাদের নেই। উল্লেখ্য, এর আগের দিন ট্রাম্পের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট ইঙ্গিত দেন যে, ইরান যুদ্ধের খরচ ইরানের প্রতিবেশী বা যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশগুলোকে দেয়ার চাপ দেবেন ট্রাম্প। তার অবস্থানের এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে মিত্র দেশগুলোর প্রতি ট্রাম্পের হতাশা। তারা যুদ্ধ প্রচেষ্টায় আরও বেশি সহায়তা করতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। এর আগে তিনি বৃটেনসহ ইউরোপীয় মিত্রদের বলেছিলেন, নিজেদের তেল নিজেরাই জোগাড় করো।

ইসরাইলের যুদ্ধ পরিকল্পনা: ট্রাম্পের পরিকল্পনার বিপরীত মন্তব্য করেছেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি জানিয়েছেন, ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাবে এবং ‘সন্ত্রাসী শাসনব্যবস্থাকে গুঁড়িয়ে’ দেবে। ইহুদিদের উৎসব পাসওভারের আগের দিন দেয়া এক টেলিভিশন ভাষণে তিনি বলেন, এই অভিযান শেষ হয়নি। আমরা সন্ত্রাসী শাসনব্যবস্থাকে গুঁড়িয়ে দিতে থাকবো। তিনি আরও বলেন, আমাদের পদক্ষেপ নিতে হয়েছে এবং আমরা তা নিয়েছি। আমরা আমাদের লক্ষ্যে অবিচল থেকেছি এবং মধ্যপ্রাচ্যের চেহারাই বদলে দিয়েছি। তিনি দাবি করেন, চলমান যুদ্ধ সত্ত্বেও ইসরাইল একটি ‘আঞ্চলিক শক্তি’ হিসেবে আরও শক্তিশালী হয়েছে।

যুদ্ধের প্রেক্ষাপট: ২৮শে ফেব্রুয়ারি ডনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে এই যুদ্ধ শুরু হয়। এতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন এবং এর ফলে পুরো অঞ্চলে পাল্টা হামলার ঢেউ শুরু হয়। তবে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের ওপর হামলা চালাতে ট্রাম্পকে রাজি করাতে নেতানিয়াহুর বড় ভূমিকা ছিল। গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এক উত্তেজনাপূর্ণ ফোনালাপে নেতানিয়াহুকে ভর্ৎসনা করেন। অ্যাক্সিওস-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধের আগে বিবি (নেতানিয়াহুর ডাকনাম) প্রেসিডেন্টকে বোঝাতে চেষ্টা করেছিলেন যে, বিষয়টি সহজ হবে এবং শাসন পরিবর্তন খুব সম্ভব-যা বাস্তবে এতটা সহজ ছিল না। ভাইস প্রেসিডেন্ট বিষয়টি পরিষ্কারভাবে বুঝেছিলেন।

দ্রুত শেষ করার পক্ষে অধিকাংশ আমেরিকান: ইরান যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার পক্ষে মত দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ নাগরিক, এমনকি এতে সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণ না হলেও। রয়টার্সের এক সামপ্রতিক জরিপে এই তথ্য উঠে এসেছে। শুক্রবার থেকে রোববার পর্যন্ত পরিচালিত জরিপে দেখা যায়, ৬৬ শতাংশ উত্তরদাতা চান যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত এ সংঘাতে নিজেদের সম্পৃক্ততা শেষ করুক। বিপরীতে ২৭ শতাংশ মনে করেন, লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি সম্পৃক্ততা বজায় রাখা উচিত। বাকি ৬ শতাংশ এ বিষয়ে কোনো মত দেননি। ট্রাম্পের রিপাবলিকান সমর্থকদের মধ্যেও মতভেদ দেখা গেছে। তাদের মধ্যে ৪০ শতাংশ দ্রুত যুদ্ধ শেষ করার পক্ষে, আর ৫৭ শতাংশ দীর্ঘমেয়াদি সম্পৃক্ততার পক্ষে মত দিয়েছেন।

ইরানে লক্ষাধিক বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত: ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যৌথ হামলায় এ পর্যন্ত ১ লাখ ১৫ হাজারেরও বেশি বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। বুধবার ইরানের রেডক্রিসেন্ট সোসাইটি হালনাগাদ এই তথ্য জানিয়েছে। টেলিগ্রামে দেয়া এক পোস্টে ইরানের রেডক্রিসেন্ট জানায়, ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হওয়া অবকাঠামোর মধ্যে আবাসিক ভবন, চিকিৎসা কেন্দ্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ত্রাণকেন্দ্রসহ নানা ধরনের বেসামরিক স্থাপনা রয়েছে। এই স্থাপনাগুলোর ‘উল্লেখযোগ্য অংশ’ তেহরান প্রদেশে অবস্থিত। ধ্বংসস্তূপ থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ৫২৬ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে।

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি নয়- হেগসেথ: ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যৌথ হামলার পর এক মাসের বেশি সময় ধরে যুদ্ধ চলছে। এতদিনে এসে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী খোলাখুলি স্বীকার করেছেন, ইরানের ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডের জন্য কোনো হুমকি নয়। গত ১৯শে মার্চের পর মঙ্গলবার প্রথম কোনো সংবাদ সম্মেলনে হাজির হয়ে হেগসেথ এ কথা বলেন। তার এই বক্তব্য হোয়াইট হাউসের সঙ্গে মেলে না। হোয়াইট হাউস বারবার ইরানকে ‘আসন্ন হুমকি’ বলে বর্ণনা করে আসছে। যদি হুমকি না হয়, তবে কেন ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ- এর কারণ ব্যাখ্যায় হেগসেথ বলেন, ওই অঞ্চলে নিজেদের সম্পদ ও মিত্রদের রক্ষা করতে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে ঝুঁকিতে ফেলেছে। এ কারণে প্রেসিডেন্ট এখন আশা করছেন, ইউরোপীয় মিত্ররাও পাল্টা পদক্ষেপ নেবে।