দেশের একমাত্র শতভাগ সরকারি মালিকানাধীন বোতলজাত পানির ব্র্যান্ড ‘মুক্তা’। গাজীপুরের টঙ্গীতে এর
কারখানায় কাজ করেন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষে। সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা
রিজওয়ানা হাসানের এক সিদ্ধান্তে এখনও ধুঁকছে প্রতিষ্ঠানটি। সরকারি দপ্তরে একবার ব্যবহার্যপ্লাস্টিক বন্ধের
নির্দেশনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রতিবন্ধীদের দ্বারা উৎপাদিত মুক্তা। অথচ একই সময়ে ব্যবসা বেড়েছে
বেসরকারি বোতলজাত পানি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় সরকারি দপ্তরগুলোকে একবার ব্যবহার্যপ্লাস্টিক থেকে সরিয়ে আনার উদ্যোগ
নেন পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। সচিবালয় থেকে শুরু করে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ
ইউনূসের সরকারি বাসভবন যমুনা পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায় প্লাস্টিকের বোতলজাত পানি সরবরাহ।
প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানান, পরিবেশ উপদেষ্টার এ সংক্রান্ত উদ্যোগে অনুমোদন দিয়েছেন প্রধান
উপদেষ্টা। পরে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে পৌঁছে যায় সরকারের এই নির্দেশনা।
গত অক্টোবরে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ নিয়ে কথা বলেন সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তিনি
জানিয়েছিলেন, সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক আইনত নিষিদ্ধ না হলেও সরকার এটিকে নিরুৎসাহিত করছে। এরই মধ্যে
বিভিন্ন দূতাবাস ও বিশ্ববিদ্যালয় তাদের ক্যাম্পাসকে প্লাস্টিকমুক্ত ঘোষণা করেছে।
সরকারের এমন পদক্ষেপে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খায় মুক্তা। প্রতিষ্ঠানটির বেশিরভাগ গ্রাহক ছিল সরকারি
দপ্তরগুলো। তারা মুক্তা পানি নেওয়া বন্ধ করে দেয়। মুক্তা নিজেও সরকারি প্রতিষ্ঠান হওয়ায় সরকারি সিদ্ধান্তের
বাইরে যাওয়ার সুযোগ ছিল না তাদের।
নাম প্রকাশ না করার শর্তেগাজীপুর ডিসি অফিসের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘সরকারিভাবে প্লাস্টিকের বোতলজাত
পানি ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত হয়। ফলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ওই সময়ে মুক্তা ব্যবহার করা হয়নি। এখন
মুক্তা ব্র্যান্ডের পানি ব্যবহার হচ্ছে।’
উৎপাদন কমে যাওয়ায় শ্রমিকদের বেতনে টান পড়ে। কয়েক মাস ধরে তারা নিয়মিত বেতন পাননি। তখন বিকল্প
পণ্য বিক্রি বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে প্রতিষ্ঠানটি।
কারখানার শ্রমিক ফজলুল হক বলেন, ‘আমাদের তৈরি পানি সবচেয়ে ভালো। উৎপাদন কমে গিয়েছিল, বর্তমান
সরকার আসার পর বেড়েছে। বেতনও বন্ধ ছিল, নতুন স্যার এসে বেতন দিয়েছেন।’
এদিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে মুক্তা ব্র্যান্ডের পানির পড়ে
যাওয়া বাজার দখলে নেয় বেসরকারি কোম্পানিগুলো। বিভিন্ন
সরকারি দপ্তরে প্লাস্টিকের বোতলে পানি সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ না
হওয়ায় সেসব স্থানে মুক্তার বদলে জায়গা করে নেয় অন্য ব্র্যান্ডের পানি।
কালিয়াকৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা র কার্যালয়ে কর্মরত রাকিবুল
হাসান বলেন, ‘আমাদের অফিসে মুক্তা পানি আসে সমাজসেবা
অফিসের মাধ্যমে। মাঝে কিছুদিন বন্ধ ছিল, এখন আবারও পাচ্ছি।’
যেভাবে তৈরি হয় মুক্তা
মুক্তার কারখানা পরিচালনা করে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের কল্যাণে গঠিত প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট। ২০০৪
সালের ২৬ অক্টোবর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এই কারখানার উদ্বোধন করেন। বর্তমানে এখানে
কর্মরত আছেন ১৬০ জন, যাদের বেশিরভাগই বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন। তাদের কেউ বেতনভুক্ত নন। প্রতিষ্ঠানের
আয় থেকে তারা সম্মানী পান।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন মৈত্রী শিল্পের উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন প্রকল্পের আওতায় ‘মুক্তা ড্রিংকিং ওয়াটার’
কারখানায় স্বয়ংক্রিয় প্লান্ট স্থাপন করা হয়েছে। এই প্লান্টে হাতের স্পর্শছাড়াই ভূগর্ভস্থ পানি ১১টি ধাপে রিভার্স
অসমোসিস পদ্ধতিতে পরিশোধন করে বোতলজাত করা হয়।
ঘণ্টায় কয়েক হাজার লিটার পানি উৎপাদন সম্ভব। প্রতিটি ব্যাচ ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে গুণমান নিশ্চিত করা
হয়। পানির পাশাপাশি বালতি, বোল, জগ, মগসহ ৭০ ধরনের প্লাস্টিক পণ্য তৈরি হয় এখানে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মুক্তার মিনারেল কম্পোজিশন বাজারের অন্যান্য বোতলজাত পানির তুলনায় ভারসাম্যপূর্ণ
এবং মানবদেহের জন্য অপেক্ষাকৃত নিরাপদ।
২০২৫ সালে উৎপাদনে ধস
২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে মুক্তা ড্রিংকিং ওয়াটারের উৎপাদন ছিল ৫০ লাখ লিটার। জাতীয় সংসদ, সচিবালয়,
সরকারি-বেসরকারি অফিস, বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন, ওয়েস্টিন, শেরাটন, ইন্টারকন্টিনেন্টালসহ প্রায় সব
পাঁচতারকা হোটেল এবং বিভিন্ন করপোরেট অফিসে মুক্তা পানি সরবরাহ হতো।
২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে মুক্তা পানি উৎপাদন হয়েছে ২৫ লাখ ১
হাজার ৮৬৩ লিটার, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরের অর্ধেক। সূত্র বলছে,
২০২৫-২৬ অর্থবছরে উৎপাদনের পরিমাণ আরও কমে যেতে পারে।
শারীরিক প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্টের কারখানার ব্যবস্থাপক মো. মহসীন
আলী বলেন, ‘আমাদের সরকারি প্রতিষ্ঠান, সরকারি সব সিদ্ধান্ত
মানতে বাধ্য। মাঝে বোতলজাত পানি ব্য বহারে সরকার নিরুৎসাহিত
করে, এটার প্রভাব পড়ে প্রতিষ্ঠানে। বিভিন্ন উপায়ে অন্যান্য পণ্য
বিক্রি বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়েছে।’
ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা
চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে
মুক্তা। নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে ফের সরবরাহ শুরু হয় মুক্তার।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও এই পানি ব্যবহার করতে দেখা গেছে।
শারীরিক প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্টের নির্বাহী পরিচালক (উপসচিব) মো. বরকাতুর রহমান বলেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন
সরকারের সময়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। প্রায় তিন মাস উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটে। এর মধ্যে সরকারিভাবে
একবার ব্যবহার্যপ্লাস্টিক থেকে সরে আসার একটা সিদ্ধান্ত এসেছিল। ফলে প্রতিষ্ঠান সমস্যার মুখে পড়ে।’
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে দায়িত্ব নিয়ে এই কর্মকর্তা দেখতে পান কর্মীদের তিন মাসের বকেয়া। পরে সেই
বকেয়া পরিশোধ করা হয়।
বর্তমানে চাহিদা অনুযায়ী পানি সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে বলে জানান বরকাতুর রহমান। তিনি বলেন, ‘উৎপাদনে
যে ঘাটতি ছিল, তা আমরা আগের চেয়ে অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছি। প্রচারের জন্য বেশকিছুপদক্ষেপ নিয়েছি।
মেট্রোরেল স্টেশনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণজায়গায় প্রচারের উদ্যোগ নিয়েছি।’