Image description

বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি অ্যাডভোকেট হাসনাত কাইয়ূম। ছিলেন বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের প্রতিষ্ঠাকালীন সহসভাপতি এবং বাংলাদেশ লেখক শিবিরের সাংগঠনিক সম্পাদক। বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী। হাওরাঞ্চলের জেলে এবং কৃষকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন করতে গিয়ে একাধিকবার কারাবরণ করেছেন। গড়ে তুলেছিলেন গণতন্ত্র মঞ্চ নামক জোট। রাষ্ট্র ও সংবিধান সংস্কারের দাবিতে রাজনৈতিক মঞ্চে কথা বলেন তিনি। সম্প্রতি অতিথি হয়ে এসেছিলেন এশিয়া পোস্টের ধারাবাহিক অনুষ্ঠান আলাপনে। রাষ্ট্র সংস্কারের, সংবিধান পরিবর্তন এবং আগামী দিনের বাংলাদেশ নিয়ে তার ভাবনা জানিয়েছেন। সঞ্চালনা করেছেন রাহাত রূপান্তর।

এশিয়া পোস্ট: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে গেছে। সেই উত্তাল সময় পেরিয়ে ৫ আগস্টের পর আমরা যখন রাষ্ট্র সংস্কার ও ‘জুলাই সনদ’ নিয়ে আলোচনা করছি, তখন সামগ্রিকভাবে আপনি কেমন আছেন?

হাসনাত কাইয়ূম: শারীরিকভাবে বলতে গেলে ভালো আছি। তবে মানসিকভাবে বা রাজনৈতিকভাবে বললে এক ধরনের আশাবাদ ও অনিশ্চয়তার দোলাচলে আছি। আমি ব্যক্তিগতভাবে নিজেকে আশাবাদী মানুষ হিসেবে পরিচয় দিতে পছন্দ করি। আমি সবসময় ইতিবাচক থাকতে চাই। কিন্তু এবারের অভ্যুত্থানের পরে এখন পর্যন্ত যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে সেই আশাবাদ ধরে রাখা খুব কঠিন মনে হচ্ছে।

এশিয়া পোস্ট: ছাত্র ফেডারেশনের প্রতিষ্ঠাকালীন লড়াই থেকে শুরু করে এখন আপনি রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। এই রাজনৈতিক পথচলার গল্পটা জানতে চাই।

হাসনাত কাইয়ূম: রাজনীতিতে আমার আসা মূলত পারিবারিকভাবে। আমার বাবা নিজে বামপন্থি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং একজন বীরমুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তার রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয় এবং তিনি দীর্ঘদিন আন্ডারগ্রাউন্ড পলিটিক্স বা গোপন রাজনীতি করেছেন। ফলে আমাদের বাড়িতে শৈশব থেকেই একটা রাজনৈতিক বাতাবরণ ছিল। সেই পরিবেশেই আমি জেনে না-জেনেই বামপন্থি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলাম। ছাত্র ইউনিয়নের মাধ্যমে আমার ছাত্ররাজনীতি শুরু হয়। তবে ছাত্র ইউনিয়ন যখন আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সঙ্গে খুব বেশি ঘনিষ্ঠ হতে শুরু করল, তখন পারিবারিক ও আদর্শিক কারণেই আমরা তাদের বিরোধী অবস্থানে চলে যাই। এটা যে খুব সচেতন কোনো সিদ্ধান্ত ছিল তা নয়, বরং সেই সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা আমাদের ওই দিকে ঠেলে দিয়েছিল। একসময় বাবা যখন রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়লেন, তখন আমি সক্রিয় হলাম। আমার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে মামলার শিকার হয়ে বাবাকেও জেলে যেতে হয়েছিল, তিনি আসামি হয়েছিলেন। বাবা হিসেবে তিনি কখনো অভিযোগ করেননি যে আমার ভুলের কারণে তাকে জেলে যেতে হচ্ছে। কিশোরগঞ্জ রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সক্রিয় এলাকা। সেখানে নকশালদের বড় প্রভাব ছিল। আমার বাবার ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা যেমন সাম্যবাদী দলের সেক্রেটারি ইয়াকুব আলী সাহেব কিংবা হক ভাইদের গ্রুপের আনিস কাকা—যিনি বড় কৃষক নেতা ছিলেন, তাদের সান্নিধ্যে আমি বড় হয়েছি। এমনকি স্বদেশি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত অভিজিৎ রায়ের মতো মানুষের প্রভাবও ছিল আমাদের পরিমণ্ডলে। আমরা কখনো ভুল পক্ষে যাইনি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিলাম, ৭৫ পরবর্তী আওয়ামী শাসনের বিরুদ্ধে ছিলাম, এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ছিলাম। সবশেষ কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু করে ভূমিহীনদের লড়াই এবং হাসিনাবিরোধী প্রতিটি লড়াইয়ে আমরা সামনের কাতারে ছিলাম। এখনকার যে সরকার, তাদের সঙ্গেও আমরা যুগপৎ আন্দোলনে ছিলাম। আমাদের জন্য অনেক জোটে যাওয়ার সুযোগ থাকলেও আমরা আদর্শের প্রশ্নে আপস করিনি।

এশিয়া পোস্ট: এই রাজনৈতিক পথচলায় আপনার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী ছিল?

হাসনাত কাইয়ূম: চ্যালেঞ্জের ধরন একেক সময় একেক রকম ছিল। একসময় মনে হতো একটি বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তোলাই বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু অভিজ্ঞতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উপলব্ধি প্রগাঢ় হয়েছে যে, আমরা যে পথে বিপ্লব করতে চেয়েছিলাম বা যে ধরনের রাজনীতি করতে চেয়েছিলাম, তা বাংলাদেশের জন্য হয়তো সেভাবে প্রযোজ্য ছিল না। তখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াল—বাংলাদেশের জন্য নতুন রাজনীতিটা আসলে কী হবে? আমরা সংস্কারের রাজনীতিটাকে কীভাবে ফর্মুলেট করতে পারি, সেটিই ছিল প্রধান ভাবনা। এটা কেবল ক্ষমতার বদল বা প্রচলিত নির্বাচনি রাজনীতি নয়, বরং তাত্ত্বিকভাবে এবং ব্যবহারিকভাবে একটি টেকসই রাজনৈতিক দাবি-দাওয়া হাজির করা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে আমি যে চ্যালেঞ্জের মধ্যে আছি তা হলো—এই সংস্কারের দাবির সঙ্গে সংহতি রেখে একটি আদর্শিক রাজনৈতিক সংগঠন কীভাবে চলবে? দলের ভেতরে নেতাকর্মীদের সম্পর্ক কেমন হবে এবং দলের ওপর সদস্যদের মালিকানা কীভাবে নিশ্চিত করা যাবে—এই কাঠামোগত চ্যালেঞ্জটাই আমি এখন মোকাবিলা করছি।

এশিয়া পোস্ট: একজন আইনজীবী হিসেবে আইন, রাষ্ট্র ও সংবিধান নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করেন। কিন্তু আমাদের দেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এই মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে তেমন আলোচনা দেখা যায় না। তারা মূলত ক্ষমতাকেন্দ্রিক কথা বলতেই পছন্দ করে। এর কারণ কী বলে আপনি মনে করেন?

হাসনাত কাইয়ূম: আমার মনে হয় এর পেছনে মূল কারণ আমাদের ‘কলোনিয়াল মাইন্ডসেট’ বা ঔপনিবেশিক মানসিকতা। আমাদের দেশে রাজনৈতিক দল গড়ে ওঠার ইতিহাসটা দেখুন। ১৮৮৫ সালে যখন কংগ্রেস গঠিত হয়, তার প্রথম সভাপতি ছিলেন একজন ব্রিটিশ নাগরিক। মুসলিম লীগও অনেকটা ব্রিটিশদের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে উঠেছিল। অন্যদিকে কমিউনিস্ট দলগুলো গঠিত হয়েছে সোভিয়েত ইউনিয়ন বা চীনের আদলে। বাংলাদেশের নিজস্ব ভূগোল, মানুষের মনস্তত্ত্ব এবং জাতীয় স্বার্থকে মাথায় রেখে রাষ্ট্র ও শাসনব্যবস্থা কেমন হওয়া উচিত, তা নিয়ে ভাবার কোনো পরম্পরা আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গড়ে ওঠেনি। এ কারণে যারা কমিউনিস্ট রাজনীতি করেন তারা সোভিয়েত বা চীনা স্টাইলে কথা বলেন, যারা ইসলামী দল করেন তারা খেলাফত বা ফারায়েজী আন্দোলনের আদলে চিন্তা করেন, আর আওয়ামী লীগ বা বিএনপির মতো দলগুলো সেই কংগ্রেস-মুসলিম লীগের ধাঁচেই রাজনীতি চালায়। এমনকি আমাদের বুদ্ধিজীবীরাও এই জায়গাটিতে কাজ করার খুব একটা সুযোগ পাননি। ব্রিটিশদের অনুকরণে তৈরি হওয়া এই চিন্তাচেতনা আমাদের রাজনীতির একটি বড় দুর্ভাগ্য।

এশিয়া পোস্ট: তার মানে কি রাজনীতি এখন কেবল ক্ষমতা দখলের জন্য করা হয়?

হাসনাত কাইয়ূম: তারা রাজনীতি বলতে এটাই বোঝেন। তারা মনে করেন রাজনীতি মানেই হচ্ছে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করা এবং সেখান থেকে টাকা-পয়সা ও প্রভাব-প্রতিপত্তি বাড়ানো। ক্ষমতা হারানোর পর যেন সেই টাকা দিয়ে আবার ক্ষমতায় ফিরে আসা যায়, এটাই তাদের চক্র। ব্রিটিশরা এখানে এসেছিল ব্যবসার জন্য, খাজনা তোলার দেওয়ানি নেওয়ার জন্য। তারা তো মানুষের উপকারের জন্য আসেনি। আমাদের দেশের রাজনীতিবিদরা তাদের কাছ থেকেই রাজনীতি শিখেছেন। ফলে অন্য যে কোনো পেশার চেয়ে রাজনীতি এখানে অধিক লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করা কোনো দোষের নয়, কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে ক্ষমতার জন্য তারা আদর্শ থেকে শুরু করে সবকিছু বিসর্জন দিতে পারেন। আমরাও ক্ষমতায় যেতে চাই, কিন্তু আমাদের লক্ষ্য হলো স্বাধীনতার সুফল যেন প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছায়। আমাদের দেশের মানুষ স্বাধীনতার জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছে, তাদের অধিকার অনেক বেশি। আমরা মানুষের জন্য ক্ষমতা চাই, আর তারা চায় নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধির জন্য।

এশিয়া পোস্ট: আপনি ৯০-এর দশকে ‘গণমুক্তি’ নামে একটি দল করেছিলেন, যা শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। পরে ২০২১ সালে ‘রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন’ নামে নতুন দল করলেন। আগের দলটি কেন সফল হলো না এবং এই নতুন দলের নিবন্ধনের জন্য আপনাকে কেন আদালতের দ্বারস্থ হতে হলো?

হাসনাত কাইয়ূম: শেষের প্রশ্নটি থেকে শুরু করি। আদালতের হস্তক্ষেপের পরেও আমরা নিবন্ধন পাইনি। আমাদের দুর্ভাগ্য হলো যে, আমরা ২০১৩ সাল থেকেই রাষ্ট্রের ও সংবিধানের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলাপ শুরু করি। ২০১৮ সালে আমরা বিস্তারিত কর্মসূচি সাজাই যে সংবিধানের কোন অংশের পরিবর্তে আমরা কী চাই। আমরা একটি ভিন্ন ধারার রাজনীতি করতে চেয়েছিলাম এবং সেই চিন্তা জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে আমরা ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’ গড়ে তুলি। বিএনপি যখন আমাদের সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনের আলাপ শুরু করল, তখন তাদের ৩১ দফায় সংস্কারের যে বিষয়গুলো এসেছে, সেটির ড্রাফট কমিটিতে আমরা দীর্ঘ সাত-আট মাস কাজ করেছি। কিন্তু অভ্যুত্থানের পর যখন এই সংস্কারই প্রধান রাজনৈতিক কাজ হয়ে দাঁড়াল, তখন বড় দলগুলো এবং নির্বাচন কমিশন আমাদের কৃতিত্ব দিতে চায়নি। তারা আমাদের এস্টাবলিশড হতে দিতে চায়নি, কারণ আমরা ক্ষমতার চেয়ে আদর্শিক সংস্কারকে বেশি গুরুত্ব দিই। ৯৬ সালে যখন ‘গণমুক্তি’ আন্দোলন করেছিলাম, তখন আমি মূলত বাম ধারার চিন্তা করতাম। সেই প্রচেষ্টা সফল হয়নি বলেই হয়তো আমি আজকের এই নতুন রাজনৈতিক উপলব্ধিতে আসতে পেরেছি। আগে আমি বাম ধারার সমালোচনা করলেও তার বাইরে আসিনি। কিন্তু এখন রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনে আমরা বাম-ডানের বাইরে গিয়ে একটি কল্যাণ রাষ্ট্র এবং টেকসই গণতান্ত্রিক কাঠামো গড়ার কথা বলছি। প্রথমে আমরা কেবল চিন্তা ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ করতে চেয়েছিলাম, ভেবেছিলাম কেউ না কেউ এটা বাস্তবায়ন করবে। কিন্তু যখন দেখলাম বড় দলগুলো কেবল সুন্দর কথা বলে কিন্তু রাজপথে সংস্কারের কার্যকর উদ্যোগ নেয় না, তখন আমরা নিজেরাই দায়িত্ব নিতে বাধ্য হলাম।

এশিয়া পোস্ট: আপনি দীর্ঘসময় বাম রাজনীতি করেছেন। এখন সেখান থেকে বেরিয়ে এসে কি মনে করেন যে বাম রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক চর্চা সম্ভব নয়?

হাসনাত কাইয়ূম: প্রচলিত বাম দলগুলো যেভাবে চিন্তা করে, সেখানে অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। তারা অনেক দূরবর্তী বিপ্লবের স্বপ্ন দেখে। আমি মজা করে বলি, তারা ইহলৌকিক সমস্যার পারলৌকিক সমাধান খোঁজেন। বর্তমান বাংলাদেশের প্রয়োজন সংস্কার। আমাদের নির্বাচন ব্যবস্থা, চিকিৎসা ব্যবস্থা, শিক্ষা ও বিচার ব্যবস্থা কোনোটিই কাজ করছে না। বামপন্থিরা যদি তাদের এই চিন্তা পরিবর্তনের পথে না হাঁটে, তবে মানুষ তাদের গ্রহণ করবে না। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় মানুষ একটি মানবিক, জ্ঞাননির্ভর এবং বৈষম্যহীন সমাজ চায়। বিপ্লব মানে শুধু সব ভেঙে ফেলা নয়, বরং বিদ্যমান অকার্যকর প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করা।

এশিয়া পোস্ট: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? এটি কি কেবল ছাত্রদের আন্দোলন ছিল নাকি কোনো সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ছিল?

হাসনাত কাইয়ূম: জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ছিল একটি অনিবার্য বিষয়। ১৭ বছর ধরে বিএনপি ও অন্যান্য দলগুলো আন্দোলন করছিল। আওয়ামী লীগ শাসন ব্যবস্থাকে একটি জুলুমের রাজত্বে পরিণত করেছিল। সাধারণ মানুষ কোনো রাজনৈতিক দলের ওপর পুরোপুরি ভরসা করতে পারছিল না, কারণ তারা পরীক্ষিত ছিল। মানুষ একটি নতুন নেতৃত্বের অপেক্ষা করছিল। ছাত্ররা যখন রাজপথে নেমে বন্দুকের সামনে বুক পেতে দেওয়ার সাহস দেখাল, তখন সাধারণ মানুষ তাদের সন্তানদের রক্ষা করতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাঠে নেমে এলো। এই অভ্যুত্থান কেবল ৩৬ দিনের নয়, এটি ১৭ বছরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। এর লক্ষ্য ছিল সুনির্দিষ্ট—কেবল সরকার বদল নয়, বরং শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন। গণতন্ত্র মঞ্চ যে স্লোগান দিয়েছিল যে ‘হাসিনাকে যেতে হবে এবং এমন ব্যবস্থা করতে হবে যেন আর কোনো হাসিনার জন্ম না হয়’, সেটিই ছিল এই অভ্যুত্থানের মূল স্পিরিট।

এশিয়া পোস্ট: সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারে কতটুকু সফল? আপনি তাদের কর্মকাণ্ডে কতটুকু সন্তুষ্ট?

হাসনাত কাইয়ূম: সত্যি বলতে, আমাদের প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান দায়িত্বে যারা ছিলেন, তাদের কোনো সুনির্দিষ্ট ‘হোমওয়ার্ক’ ছিল না। রাষ্ট্র সংস্কার কীভাবে করতে হয় বা কোন পদ্ধতিতে করলে এটি টেকসই হবে, সে সম্পর্কে তাদের ধারণা কম ছিল। যারা এ বিষয়ে দীর্ঘ ১০-১২ বছর কাজ করেছেন, তারা তাদের পরামর্শ নিতে চাননি। উল্টো আমাদের উপেক্ষা করার চেষ্টা করেছেন। আমাদের প্রধান দুটি দাবি ছিল—একটি ‘কমন মিনিমাম’ সংস্কার কর্মসূচি এবং ভবিষ্যতের জন্য রক্তপাতহীন পরিবর্তনের একটি স্থায়ী পদ্ধতি। আমরা একটি ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিলাম। সরকার পরে সেটি মেনে নিলেও বিএনপি তা পুরোপুরি গ্রহণ করেনি। আমাদের লক্ষ্য ছিল ছয় মাসের মধ্যে মৌলিক সংস্কারগুলো শেষ করা, কিন্তু তারা সময়ক্ষেপণ করেছে। এখন সব মিলিয়ে আমরা এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি।

এশিয়া পোস্ট: বাংলাদেশে ক্ষমতার পটপরিবর্তন হলেও দেখা যায় যারাই ক্ষমতায় যান, তারাই আবার স্বৈরাচারী হয়ে ওঠেন। এই প্রবণতা কেন?

হাসনাত কাইয়ূম: এটি মূলত আমাদের রাষ্ট্র কাঠামোর সমস্যা। আমাদের ক্ষমতার কাঠামো এমন যে, সেখানে যে কেউ বসলে সে স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে বাধ্য হয়। ক্ষমতায় গেলে সবাই সেই নিরঙ্কুশ ক্ষমতা ধরে রাখতে চায়। এই কাঠামোর কারণেই এর আগে খালেদা জিয়ার জন্য যেমন বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, হাসিনার জন্য হয়েছে, এবং ভবিষ্যতে বিএনপির জন্যও হতে পারে যদি না কাঠামো বদলানো হয়। এই কারণেই আমরা সংস্কারের ওপর জোর দিচ্ছি।

এশিয়া পোস্ট: আপনি গত বছর প্রায়ই বলতেন, ‘এইবার যদি সংস্কার না হয় তবে আর কোনোদিনই হবে না’। এইবারকেই কেন আপনি শেষ সুযোগ হিসেবে দেখেছিলেন?

হাসনাত কাইয়ূম: এটি হয়তো আমি আন্দোলনের ওপর জোর দেওয়ার জন্য কিছুটা রাজনৈতিক ভাষায় বলেছিলাম। তবে বাস্তব সত্য হলো, এবারের অভ্যুত্থানে যত মানুষ রক্ত দিয়েছে এবং যত বড় পরিসরে মানুষ সম্পৃক্ত হয়েছে, সংস্কারের জন্য এটিই ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। এই সুযোগ যদি নস্যাৎ হয়ে যায়, তবে মানুষের মধ্যে চরম হতাশা তৈরি হবে। মানুষ মনে করবে কাউকেই আর বিশ্বাস করা যায় না।

এশিয়া পোস্ট: জুলাইয়ের প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ার যে সংশয় প্রকাশ করেন, এর জন্য কাকে দায়ী করেন?

হাসনাত কাইয়ূম: দায়ী কম-বেশি সবাই। আমি তিনটি পক্ষকে প্রধানত দায়ী করব—বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি এবং সেই সঙ্গে তথাকথিত বুদ্ধিজীবী সমাজ। আমরা নিজেদেরও এর বাইরে ধরছি না। তবে প্রধান দায় বিএনপির, কারণ ক্ষমতা এখন তাদের হাতে। জনগণ তাদের ম্যান্ডেট দিয়েছে। তারা চাইলে একা এই সংস্কার করতে পারে। কিন্তু বিএনপি যাতে এটা না করে তার জন্য অনেকে বাড়াবাড়ি ও বিভাজন তৈরি করছে। জিয়াউর রহমান যেমন বহুদলীয় গণতন্ত্রের জন্য একটি ভিত্তি তৈরি করেছিলেন, বিএনপির সামনে এখন সুযোগ ছিল আগামী ৫০ বছরের জন্য বাংলাদেশে একটি টেকসই গণতন্ত্রের ভিত্তি গড়া। কেন তারা এই সুযোগ হারাচ্ছে, তা বোঝা মুশকিল।

এশিয়া পোস্ট: জুলাইয়ের চেতনা রক্ষায় ছাত্রদের ভূমিকা কেমন ছিল?

হাসনাত কাইয়ূম: জুলাই স্পিরিট কেবল বিএনপি নষ্ট করেনি, ছাত্রদের ওই অংশটিও দায়ী যারা ক্ষমতার খুব কাছাকাছি চলে গিয়েছিল। জামায়াতে ইসলামীও সবসময় তাদের দলীয় স্বার্থে ভালো জিনিসগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। আর এনসিপির ছেলেরা—যাদের জনগণ জাতি-ধর্মের ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছিল—তারা সামান্য খ্যাতি বা ক্ষমতার লোভে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে। তারা একটি বিশেষ গ্রুপের নেতা হতে গিয়ে গোটা জাতির নেতা হওয়ার সুযোগ হারিয়েছে। ১৮ কোটি মানুষের ভালোবাসা তারা বুঝতে পারেনি। এটি একটি বিশাল বড় ক্ষতি।

এশিয়া পোস্ট: সংবিধানে সুনির্দিষ্টভাবে কোন পরিবর্তনগুলো জরুরি বলে আপনি মনে করেন?

হাসনাত কাইয়ূম: আমাদের বর্তমান সংবিধানে সমস্ত ক্ষমতা একজন ব্যক্তির কাছে কেন্দ্রীভূত—তিনি প্রধানমন্ত্রী হোন বা রাষ্ট্রপতি। এই ক্ষমতার ভারসাম্য বা ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ করা জরুরি। মৌলিক অধিকার বা ফান্ডামেন্টাল রাইটসকে নিরঙ্কুশ করতে হবে, সেখানে কোনো ‘যদি-কিন্তু’ রাখা যাবে না। বিচার বিভাগ, আইন বিভাগ, মানবাধিকার কমিশন ও নির্বাচন কমিশনকে সত্যিকার অর্থে স্বাধীন করার ব্যবস্থা করতে হবে।

এশিয়া পোস্ট: বর্তমান পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের ফেরার সম্ভাবনা কেমন দেখছেন?

হাসনাত কাইয়ূম: আওয়ামী লীগ বর্তমানে যেভাবে আছে, তাতে ফেরার কোনো পথ নেই। তাদের প্রথম কাজ হওয়া উচিত তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া বা তওবা করা। তারা যেভাবে মানুষ খুন, গুম, মিথ্যা মামলা এবং অর্থ পাচার করেছে, তার জন্য অনুতপ্ত হওয়া দরকার। যারা অপরাধী তাদের বিচারে সহযোগিতা করে একটি রাজনৈতিক সমঝোতায় আসার চেষ্টা করা উচিত। কিন্তু তারা সেই পথে হাঁটছে না।

এশিয়া পোস্ট: বাম দলগুলো আওয়ামী লীগ বা ভারতের প্রক্সি হিসেবে কাজ করে—এমন একটি অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। একজন প্রাক্তন বাম হিসেবে বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখেন?

হাসনাত কাইয়ূম: এর পেছনে দুটি কারণ আছে—সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক। আমাদের দেশের বামেরা দুই ভাগে বিভক্ত। এক অংশ আওয়ামী লীগকে সার্ভ করে, অন্য অংশ বিএনপিকে। একটি অংশের কাছে প্রগতিশীলতা মানেই হলো ইউরোপীয় বা পশ্চিমবঙ্গকেন্দ্রিক সংস্কৃতি, যা অনেকটা আওয়ামী লীগের সঙ্গে মিলে যায়। ফলে তারা অজান্তেই আওয়ামী লীগের পকেটে চলে যায়। অন্যদিকে চীনপন্থিরা ভারতের বিরোধিতার নামে অনেক সময় মৌলবাদীদের সঙ্গেও আপস করে ফেলে। যেহেতু তাদের নিজস্ব কোনো তাৎক্ষণিক ক্ষমতায় যাওয়ার পরিকল্পনা থাকে না, তাই তাদের কর্মকাণ্ড অন্য কোনো বড় দলের রাজনৈতিক প্রকল্পে সুবিধা দেয়।

এশিয়া পোস্ট: আগামীর বাংলাদেশ নিয়ে আপনার স্বপ্ন বা প্রত্যাশা কী?

হাসনাত কাইয়ূম: আমি আশা করি বাংলাদেশ একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক পথে হাঁটবে। তরুণরা মোহমুক্তি থেকে বের হয়ে এসে তাদের স্বপ্ন আঁকড়ে ধরবে। আমরা ১৯৭১ বা ৯০ এর সুযোগ হাতছাড়া করেছি, ২০২৪ যেন কোনোভাবেই বেহাত না হয়। আমার বাবা যে রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা আমার ওপর রেখে গেছেন, আমি চাই না সেই একই বোঝা পরবর্তী প্রজন্মের ওপর রেখে যেতে। একটি সঠিক ধারার বাংলাদেশ দেখার অপেক্ষায় আছি।