Image description

জাতীয় পত্রিকায় কোনো বিজ্ঞপ্তি নেই, লিখিত পরীক্ষা নেই, অনেক ক্ষেত্রে নেই মৌখিক পরীক্ষাও—তবু নিয়োগ পেয়েছেন হাজার হাজার কর্মকর্তা। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এস.আলমের নিয়ন্ত্রণে থাকা সাত বছরে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশে এভাবেই জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা দেশের ব্যাংকিং খাতের সুশাসন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। 

বাংলাদেশ ব্যাংক ও চারটি অডিট প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন অনুসারে, ২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপ ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ১০ হাজার ৮৩২ জন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৮ হাজার ৫৪২ জনকে জাতীয় দৈনিকে কোনো বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই নিয়োগ দেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়াকে বৈধতা দিতে ব্যাংকের নিয়োগ নীতিমালায়ও পরিবর্তন আনা হয়েছিল।

এস আলম গ্রুপ যখন নিয়ন্ত্রণ নেয়, তখন ব্যাংকটির জনবল ছিল ১৩ হাজার ৫১৫ জন। সাত বছরে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২১ হাজার ৭০৬ জনে। এই সময়ে প্রায় ২ হাজার কর্মকর্তা অবসরে গেলেও মোট নিয়োগ দেওয়া হয় ১২ হাজার ৩৮৬ জনকে। এর মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশ নিয়োগ হয়েছে কোনো ধরনের পাবলিক বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই। 

অডিট-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই নিয়োগ প্রক্রিয়া শুধু অস্বচ্ছই নয়, বরং দেশের প্রচলিত নিয়োগ ব্যবস্থাকে পাশ কাটানোর একটি সুসংগঠিত প্যাটার্ন নির্দেশ করে।

ইসলামি ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম কামাল উদ্দিন জসিম বলেন, তদন্তে এস আলম আমলের নিয়োগ প্রক্রিয়ার গুরুতর ত্রুটিগুলো বেরিয়ে এসেছে।

তিনি টিবিএসকে বলেন, 'ওই সময়ে কোনো বিজ্ঞাপ্তি, লিখিত বা মৌখিক পরীক্ষা ছাড়াই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।'

কামাল উদ্দিন আরও বলেন, 'কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে পরামর্শ করে আমরা ওই সময়ে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জন্য দক্ষতা যাচাই পরীক্ষার আয়োজন করেছিলাম। কিন্তু তারা পরীক্ষায় না বসে রিট পিটিশন দায়ের করেন। আদালত ব্যাংকের পক্ষে রায় দিলে পরীক্ষার পথ সুগম হয়। তা সত্ত্বেও অনেকে পরীক্ষায় অংশ নিতে অস্বীকার করেন এবং চট্টগ্রামের একটি বড় গ্রুপ পরীক্ষা দিতে ইচ্ছুক কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি দেখায়।'

তিনি জানান, পরে এইচআর নীতিমালা অনুযায়ী ইসলামী ব্যাংক তাদের চাকরিচ্যুত করে। 'এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক পুনরায় খতিয়ে দেখছে, নিয়োগ প্রক্রিয়াটি আসলে কতটা ত্রুটিপূর্ণ ছিল।'

এদিকে এস আলমের নিয়ন্ত্রণে থাকাকালে ইসলামী ব্যাংকসহ ছয়টি ইসলামি ধারার ব্যাংকে নিয়ম না মেনে নিয়োগের অভিযোগ তদন্তে সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই কমিটি ওই সময়ে করা ছাঁটাই ও অন্যান্য নিয়োগ-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের বিষয়গুলোও পর্যালোচনা করবে।

অনিয়মের দুয়ার খুলে দেওয়া সেই নীতিমালা

অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিয়োগ প্রক্রিয়াকে বৈধতা দিতে ব্যাংকটি তাদের মানবসম্পদ নীতিমালা সংশোধন করেছিল। নীতিমালার ৭.০৪ ধারায় বলা হয়, 'জরুরি প্রয়োজনে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা... ওপরের নিয়োগ-সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা শিথিল করে জনবল নিয়োগ দিতে পারবেন।'

এই ধারাটি ব্যবহার করে নিয়মিত নিয়োগ পদ্ধতি—যেমন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, লিখিত পরীক্ষা ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন—পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়।

এর বদলে প্রার্থীদের জীবনবৃত্তান্ত (সিভি) সংগ্রহের জন্য একটি অনানুষ্ঠানিক পদ্ধতি চালু করা হয়। চট্টগ্রামের পটিয়ায় গ্রুপের চেয়ারম্যানের বাসভবন ও আসাদগঞ্জের একটি অফিসে বিভিন্ন ক্যাটাগরির লেবেল লাগানো বক্স রাখা হতো—'জেনারেল', 'ক্যাশ', 'পুরুষ', 'নারী', 'ডিপ্লোমা' ইত্যাদি।

প্রার্থীরা এসব বক্সে সিভি জমা দিতেন। সেখান থেকে বাছাই করা আবেদনগুলো ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হতো। পরে তালিকা অনুযায়ী সরাসরি নিয়োগপত্র ইস্যু করা হতো, কোনো উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা ছাড়াই। 

অডিট-সংশ্লিষ্টদের মতে, এই পদ্ধতি একটি 'বদ্ধ নিয়োগ প্রক্রিয়া' তৈরি করে, যেখানে বাইরের প্রার্থীদের অংশগ্রহণ কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে।

আঞ্চলিক বৈষম্য: একটি জেলারই একচ্ছত্র আধিপত্য

নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বিতর্কিত দিকগুলোর একটি হলো আঞ্চলিক বৈষম্য। অডিট প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মোট নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে প্রায় ৮ হাজার ১০৪ জনই চট্টগ্রাম জেলার বাসিন্দা। এর মধ্যে শুধু পটিয়া উপজেলারই রয়েছেন ৫ হাজার ১৪৮ জন। 

২০১৭ সালে চট্টগ্রামে ব্যাংকটির জনবল ছিল ৮১১ জন। ২০২৪ সাল নাগাদ সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৭ হাজার ৮৫৮ জনে—প্রায় ৮৭০ শতাংশ বৃদ্ধি।

অন্যদিকে পটিয়ায় জনবল মাত্র ৪২ জন থেকে বেড়ে ৪ হাজার ৩৩১ জনে পৌঁছেছে—যা ১০ হাজার শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, এ ধরনের নিয়োগের ফলে ব্যাংকের আন্তঃজেলা ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের প্রার্থীরা কার্যত প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়েছেন। 

এছাড়া ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতেও এস আলম গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠান—যেমন ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, রিলায়েন্স ফাইন্যান্স এবং পদ্মা লাইফ ইন্স্যুরেন্স থেকে ৪৩৯ জনকে নিয়ে আসা হয়। এর মধ্যে ১৯৩ জন নিয়োগ পান কোনো বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই। 

বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু নিয়োগে পক্ষপাতই নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট নেটওয়ার্কভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর ইঙ্গিত দেয়।

নিয়োগ পরীক্ষায় যোগ্যতার মানদণ্ড হ্রাস

প্রবেশনারি অফিসার নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও বড় ধরনের অনিয়ম ধরা পড়েছে। 

২০১৯ সালের ২৪তম ব্যাচে কোনো বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই ৮৪০টি সিভি সংগ্রহ করা হয়। লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেন ৭৬৩ জন, যেখানে পাশ নম্বর ছিল ৫০ শতাংশ। কিন্তু মাত্র ৩৬ জন এই মানদণ্ড পূরণ করেন। 

এরপর মানদণ্ড শিথিল করে মাত্র ২০ শতাংশ নম্বর পাওয়া ৫৫২ জনকে মৌখিক পরীক্ষায় ডাকা হয়। এমনকি ১২ জনকে লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই সরাসরি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই ব্যাচের প্রার্থীদের ১০০ শতাংশই চট্টগ্রাম অঞ্চলের ছিলেন। 

২০২১ সালের ২৫তম ব্যাচের ক্ষেত্রে অডিট প্রতিবেদন বলছে, চট্টগ্রামের ১১৭ জন প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়ার জন্য মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ২৫ থেকে বাড়িয়ে ৫০ করা হয়। ফলে চূড়ান্তভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত ১৫০ জনের মধ্যে ১১০ জনই চট্টগ্রামের—অর্থাৎ ৭৩ শতাংশ। 

একইভাবে ট্রেইনি অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার (জেনারেল) ও (ক্যাশ) পদেও প্রচলিত নিয়ম ভেঙে নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে টিএও (জেনারেল) পদে ২ হাজার ২৩২ জন ও টিএও (ক্যাশ) পদে ২ হাজার ৮২৮ জন নিয়োগ পান—যাদের অধিকাংশ বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই নির্বাচিত। 

অডিট কর্মকর্তারা বলছেন, এই ধরনের নিয়োগে মেধা যাচাইয়ের প্রক্রিয়া কার্যত ভেঙে পড়ে। 

পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা ছাড়াই ডিএমডি হিসেবে পদোন্নতি

বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) হিসেবে নিয়োগ পেতে ২০ বছরের অভিজ্ঞতা প্রয়োজন, যার মধ্যে ব্যাংকিং খাতে মোট ২১ বছরের কাজের অভিজ্ঞতা এবং পূর্ববর্তী পদে সহকারী ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা থাকা আবশ্যক।

কিন্তু এস আলম ইসলামী ব্যাংক দখলের পর তার পার্সোনাল সেক্রেটারি (পিএস) আকিজ উদ্দিন মাত্র আট বছরের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা নিয়ে ডিএমডি পদে পদোন্নতি পান। পূর্বের পদে ২ বছরের অভিজ্ঞতা থাকার শর্ত থাকলেও মাত্র ১ বছর চার মাসের অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই ডিএমডি হয়ে যান তিনি। 

ইসলামী ব্যাংকের আরেক ডিএমডি মিফতাহ উদ্দিন বিশ বছরের বিপরীতে মাত্র ১৭ বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে ডিএমডি হয়ে যান। একইসঙ্গে ডিএমডি হওয়ার পূর্বের পদে দুই বছরের শর্তের বিপরীতে মাত্র ১ বছরের অভিজ্ঞতা ছিল তার।

অস্বাভাবিক পদোন্নতি পেয়েছেন ৮৩ কর্মকর্তা

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে দেখা যায়, ২০১৭ সাল থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের এমন ৮৩ কর্মকর্তা অস্বাভাবিক পদোন্নতি পেয়েছেন। 

তাদের মধ্যে ডিএমডি মুহাম্মদ কায়সার আলি নির্ধারিত সময়ের আগেই অতিরিক্ত ৩টি পদোন্নতি পান। ডিএমডি মিফতাহ উদ্দিন নির্ধারিত সমেয় আগেই ৭টি পদোন্নতি পান। ডিএমডি মোহাম্মদ সাব্বির সময়ের আগেই ৪টি পদোন্নতি পান, ইভিপি মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান নির্ধারিত সময়ের আগে ৪টি পদোন্নতি পান, এহসানুল ইসলাম সময়ের আগে ৩টি পদোন্নতি ও এসভিপি নজরুল ইসলাম সময়ের আগে দুটি পদোন্নতি পান। 

২০১৭ সালের পদোন্নতি নীতিমালা মোতাবেক ডিএমডি পর্যন্ত পদোন্নতির জন্য প্রতিটি ক্ষেত্রেই অন্তত ৩ বছর কাজ করার বাধ্যকতা রয়েছে। একইসঙ্গে নীতিমালা মোতাবেক পদোন্নতির ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত, ব্যবসায়িক ও শরিয়াহর প্রতিটি ক্ষেত্রে অন্তত ৭৫ শতাংশ স্কোর পেতে হবে। ত্বরিত পদোন্নতির ক্ষেত্রে প্রতিটি ক্ষেত্রেই ৯০ শতাংশ স্কোর থাকা বাধ্যকতামূলক। 

কিন্তু অনুসন্ধানে তাদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে চাকুরি সময়কাল বা সাক্ষাৎকারের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। 

অনুমোদিত জনবলের বাইরে প্রায় ২ হাজার ৯০০ অতিরিক্ত নিয়োগ 

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংকের কর্মপরিধি অনুযায়ী নির্ধারিত লোকবলের বাইরে প্রায় ৩ হাজার অতিরিক্ত লোকবল নিয়েগ করে শুধু চার পদের অতিরিক্ত কর্মকর্তাদের জন্য বছরে প্রায় ১০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত খরচ করা হয়েছে। 

এভাবে এস আলমের নিয়ন্ত্রণে থাকা সাত বছরে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত খরচ হয়েছে ব্যাংকের। 

এর মধ্যে টিএও (ক্যাশ) নিয়োগ দেওয়া ২ হাজার ৮৬৬ জন্সের মধ্যে অতিরিক্ত নিয়োগ ৯৯১ জন, টিএও পদে নিয়োগ দেওয়া ২ হাজার ৩৪০ জনের মধ্যে অতিরিক্ত নিয়োগ ৮০৯ জন, মেসেঞ্জার-কাম-গার্ড  নিয়োগ দেওয়া ১ হাজার ৬১৭ জনের মধ্যে অতিরিক্ত নিয়োগ ৫৫৯ জন ও রুরাল ডেভেলপমেন্ট স্কিম পদে নিয়োগ দেওয়া ১ হাজার ৫২৫ জন এর মধ্যে অতরিক্ত নিয়োগ দিয়েছে ৫২৭ জন। 

অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা যা বলছেন

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, একটি ব্যাংকের দীর্ঘ সাত বছরে নিয়োগপ্রাপ্তদের প্রায় সবাই একটি নির্দিষ্ট জেলা থেকে আসা চরম স্বজনপ্রীতির প্রতিফলন।

তিনি বলেন, এখানে মেধার চেয়ে আজ্ঞাবাহী লোক নিয়োগ দেওয়াকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, যা ব্যাংকিং খাতের পেশাদারিত্ব নষ্ট করেছে এবং ব্যাংকটিকে আরও দুর্বল করে তুলেছে। 

এই অর্থনীতিবিদ আরও বলেন, এত বড় সংখ্যক নিয়োগে রেগুলেটরি গাইডলাইন মানা না হলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নীরব থাকাটা তাদের 'গাফিলতি'। ব্যাংকিং খাত জনগণের আমানত ও আস্থার ওপর চলে, কিন্তু এমন 'নন-কমপ্লায়েন্ট' নিয়োগ সেই আস্থার মূলে আঘাত করে। 

তিনি বলেন, নিয়ম ভাঙা এই প্রক্রিয়াকে এখন বৈধতা দেওয়া হলে তা ভবিষ্যতে অন্যান্য ব্যাংকের স্পন্সরদেরও নিয়ম লঙ্ঘনে উৎসাহিত করবে এবং অত্যন্ত খারাপ নজির তৈরি করবে। 

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, প্রত্যেকটি ব্যাংকের প্রবেশ পর্যায়ে সাধারণত লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ পেতে হয়। 

'দক্ষ কর্মকর্তা পেতে হলে এই জায়গায় কোনো ধরনের আপস করা উচিত নয়। তবে ইসলামী ব্যাংকের ব্যাপক সংখ্যক নিয়োগ যেভাবে বিজ্ঞপ্তি ও পরীক্ষা ছাড়াই হয়েছে, তা খুবই খারপ দিক,' বলেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, ব্যাংকের কাজ হচ্ছে আমানতকারীদের আমানতের নিরাপত্তা দেওয়া। যখন নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে নিয়োগ দেওয়া হয়, তখন ব্যাংকের সুশাসন বলেতে কিছু থাকে না। 

এস আলম নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর ব্যবস্থা

৫ আগস্টের পর ইসলামী ব্যাংক এস আলমের নিয়ন্ত্রণমূক্ত হলে বাংলাদেশ ব্যাংক ও এক্সটারনাল অডিট প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংকটি ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জন্য একটি বিশেষ দক্ষতা যাচাই পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। 

তবে এই পরীক্ষা স্থগিতের দাবিতে দুইজন কর্মী হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেন। পরে বিষয়টি নিষ্পত্তি হয় এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্পষ্টভাবে জানায় যে পরীক্ষা আয়োজনের ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই। 

এরপর ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউট অভ বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেনের (আইবিএ) মাধ্যমে ২০২৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর পরীক্ষার আয়োজন করে। 

ব্যাংকের তথ্যমতে, মোট ৫ হাজার ৩৭৪ জন কর্মকর্তার মধ্যে মাত্র ৪০২ জন পরীক্ষায় অংশ নেন। অংশগ্রহণকারী সবাই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং চাকরিতে বহাল আছেন। 

একই সময়ে ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে নিয়মিত প্রক্রিয়ায় নিয়োগপ্রাপ্ত ২৬১ জন কর্মকর্তাকে এই মূল্যায়ন পরীক্ষা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। 

অন্যদিকে, ৪ হাজার ৯৭২ জন কর্মকর্তা ব্যবস্থাপনার এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকেন। এদের মধ্যে কিছু কর্মী পরীক্ষায় অংশ নিতে আগ্রহীদের শারীরিকভাবে হেনস্তার পাশাপাশি ভয়ভীতি দেখান ও হুমকি দেন। পাশাপাশি তারা কর্মবিরতি পালন, সড়কে বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ব্যাংকের বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাংকের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার অভিযোগ আনা হয়। 

ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এসব কর্মকাণ্ডকে শৃঙ্খলাভঙ্গ ও নীতিমালাবিরোধী হিসেবে উল্লেখ করে। বোর্ডের পরামর্শক্রমে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। পরে মানবসম্পদ নীতিমালার ৯ম অধ্যায়ের ১.০২ ধারা অনুযায়ী তাদের চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।