পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বড় ধাক্কা খেয়েছেন রাজ্যটির বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত কলকাতার ভবানীপুর আসনেই এবার পরাজয়ের মুখে পড়েছেন তিনি। অপ্রত্যাশিত এই পরাজয়ের পর ক্ষোভে ফেটে পড়েন মমতা। ফোনালাপে তিনি নির্বাচনকে ‘লুট’ ও ‘অনৈতিক নোংরা খেলা’ বলে অভিযোগ করেছেন। নির্বাচন কমিশন, কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং প্রশাসনের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলে ফল চ্যালেঞ্জ করার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে বলছে, তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্য ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় তার ফেসবুক পেজে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে একটি ফোনালাপ শেয়ার করেছেন। সেখানে পশ্চিমবঙ্গের এই বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী ভবানীপুরের ফলাফলকে ‘চুরি করা রায়’ এবং নির্বাচন কমিশনের ‘অনৈতিক নোংরা খেলা’ বলে অভিহিত করেন।
ফোনালাপে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেন, ভোটগণনার ১৬তম রাউন্ড পর্যন্ত তিনি বিজেপির শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে এগিয়ে ছিলেন এবং তখন আর মাত্র কয়েকটি রাউন্ড বাকি ছিল। তিনি অভিযোগ করেন, ‘গুণ্ডারা’ ভোটগণনা কেন্দ্রে ঢুকে কর্মকর্তা ও এজেন্টদের ভয়ভীতি দেখিয়ে নির্বাচন প্রক্রিয়া প্রভাবিত করেছে।
এছাড়া তিনি নির্বাচন কমিশন, সিআরপিএফ এবং স্থানীয় নির্বাচন কর্মকর্তাদের (ডিইও ও আরও) বিরুদ্ধে দিল্লির নির্দেশে বিজেপির পক্ষে কাজ করার অভিযোগ তোলেন। তার অভিযোগের একটি বড় অংশ ছিল তৃণমূলের কাউন্টিং এজেন্টদের সরিয়ে দেয়া নিয়ে। তার দাবি, তাদের জায়গায় বিরোধী পক্ষের এজেন্ট বসানো হয়।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘শেষের রাউন্ডগুলো ভবানীপুরের, যা পুরোপুরি আমাদের এলাকা। সেই সময় কয়েকজন গুণ্ডা নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কাউন্টিং সেন্টারে ঢুকে আমাকে মারধর করে এবং সিআরপিএফের সহায়তায় আমার এজেন্টদের বের করে দেয়।’
তিনি আরও অভিযোগ করেন, শেষ রাউন্ডগুলোতে কাউন্টিং হলে তার দলের কোনও প্রতিনিধিই ছিল না এবং ইভিএম মেশিন সঠিকভাবে সিল না করেই স্ট্রংরুমে নিয়ে যাওয়া হয়। তার ভাষায়, ‘আমি হলের বাইরে ছিলাম, আমাকে ভেতরে ঢুকতে দেয়া হয়নি’। এই পরিস্থিতিকে ‘নির্যাতন’ আখ্যা দিয়ে তিনি দাবি করেন, আগে এসআইআর-এর মাধ্যমে ভোটারদের নাম বাদ দেয়া হয়েছে এবং পরে বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও বিশৃঙ্খলার মধ্যে জোর করে ভোট ‘লুট’ করা হয়েছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, শেষ রাউন্ডে ইভিএম মেশিন সিল ছাড়াই সরানো হয়েছে এবং পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব ছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, এটি বিজেপির জয় নয়, বরং ‘অনৈতিক খেলা’ এবং নৈতিকভাবে বিরোধীদের পরাজয়। তিনি জানান, সবকিছু নথিভুক্ত করা হয়েছে এবং আইনি লড়াই করা হবে। তিনি আরও বলেন, প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে এবং আইনজীবী হিসেবে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিষয়টি জানানো হচ্ছে।
এদিকে এনডিটিভিকে দেয়া বক্তব্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘লুট, লুট, লুট— আমরা আবার ঘুরে দাঁড়াবো’। চতুর্থবারের মতো ক্ষমতায় ফেরার লক্ষ্য ছিল তার। ফল ঘোষণার পর তিনি নির্বাচন কমিশনকে ‘বিজেপির কমিশন’ বলে মন্তব্য করেন। মমতা বলেন, ‘১০০টির বেশি আসন বিজেপি লুট করেছে। নির্বাচন কমিশন বিজেপির কমিশন। আমি সিও ও মনোজ আগরওয়ালের কাছে অভিযোগ করেছি, কিন্তু তারা কিছু করছে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘এটাকে কি জয় বলা যায়? এটি নৈতিক জয় নয়, এটি অনৈতিক জয়। নির্বাচন কমিশন, কেন্দ্রীয় বাহিনী, প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যা করেছে, তা সম্পূর্ণ বেআইনি। এটি লুট, লুট, লুট। আমরা আবার ঘুরে দাঁড়াবো।’
নিজের শক্ত ঘাঁটি ভবানীপুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তার সাবেক ঘনিষ্ঠ সহযোগী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে ১৫ হাজার ১১৪ ভোটে হেরে যান। ২০২১ সালের নির্বাচনে নন্দীগ্রামেও শুভেন্দুর কাছে পরাজিত হয়েছিলেন তিনি। এবার নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুর— দুই আসন থেকেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন শুভেন্দু অধিকারী।
এদিকে ভোটের আগে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় প্রায় ৯০ লাখ ৮০ হাজার ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়। তৃণমূলসহ বিরোধী দলগুলো এবং গণতন্ত্রপন্থি কর্মীরা অভিযোগ করেন, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে লাখ লাখ ভোটারকে বাদ দেয়া হয়েছে। বাদ পড়া বিপুল সংখ্যক এসব ভোটার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলকে ভোট দিতে পারতেন।
তবে নির্বাচন কমিশন বলেছে, ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া এবং এর মাধ্যমে অযোগ্য বা মৃত ভোটারদের নাম বাদ দেয়া হয়।
শীর্ষনিউজ