Image description
মোট সংযুক্ত প্রায় পৌনে দুইশ বিচারক

সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মোসাম্মৎ কামরুন্নাহার। আলোচিত রেইনট্রি হোটেলে দুই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের অভিযোগে করা মামলার বিচারক ছিলেন। ওই ঘটনায় ২০২১ সালে দেওয়া রায়ে ধর্ষণে অভিযুক্ত আপন জুয়েলার্সের মালিকের ছেলেসহ পাঁচ আসামির সবাইকে খালাস দেন তিনি। রায়ের পর্যবেক্ষণে ধর্ষণের ঘটনার ৭২ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলে মামলা না নিতে পুলিশকে পরামর্শ দেন।

রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক কামরুন্নাহার লেখেন, ‘ঘটনার ৩৮ দিন পর মামলা হলো, চিকিৎসক মেডিকেল রিপোর্টে ধর্ষণের আলামত পাননি মর্মে মতামত দিলেন; ভুক্তভোগীদের পরিধেয় কাপড়ে কোনো পুরুষের সিমেন্সের কণা পাওয়া যায়নি। তারপরও তদন্ত, চার্জশিট দাখিল করে আদালতের পাবলিক টাইম নষ্ট করেছেন।’ তার এমন রায় ও পর্যবেক্ষণের পর বিষয়টি নিয়ে দেশব্যাপী তুমুল সমালোচনা হয়।

রায় ঘোষণার পরের দিন একই বছরের ১২ নভেম্বর মোসাম্মৎ কামরুন্নাহারের বিচারিক ক্ষমতা প্রত্যাহার করা হয়। একই সঙ্গে ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৭ থেকে সরিয়ে তাকে আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়। এর পর থেকে ওই বিচারকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত চলমান রয়েছে। তাকে সাময়িক বরখাস্তও করা হয়নি। সম্পূর্ণ বেতন-ভাতা নিচ্ছেন বসে বসে। পাশাপাশি গাড়ি, বাড়ি, গানম্যানসহ সব সুযোগ-সুবিধা বহাল রয়েছে। একদিকে বছরের পর বছর তার বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত শেষ হচ্ছে না, অন্যদিকে সম্পূর্ণ বেতন-ভাতাসহ সব সুযোগ-সুবিধা নিচ্ছেন। এতে করে রাষ্ট্রের অর্থের অপচয় হচ্ছে।

এভাবে বিভাগীয় ব্যবস্থা চলমান থাকায় বিভিন্ন পদমর্যাদার ২৩ জন বিচারককে মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করে রাখা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে। তাদের মধ্যে হাতেগোনা চার-পাঁচজন সাময়িক বরখাস্ত আছেন। অন্যদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত চলমান থাকলেও সবাই পদে বহাল রয়েছেন। ২০১৭ সাল থেকে একজন সিনিয়র সহকারী জজ মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত রয়েছেন। তবে তিনি বরখাস্ত আছেন বলে জানা গেছে।

এভাবে কতজন বিচারককে অযৌক্তিকভাবে মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা আছে, সে ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট তথ্য চাইলেও তা দিতে রাজি হননি সুপ্রিম কোর্ট বা আইন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কেউ। তথ্য ও মতামত জানতে চাইলে আইন সচিব মো. লিয়াকত আলী মোল্লা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন।

অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্টের স্পেশাল অফিসার ও তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা মো. মাজহারুল হকের কাছে অধস্তন আদালতে মোট কতজন বিচারক আছেন; তাদের মধ্যে মাঠে কতজন কর্মরত এবং মন্ত্রণালয়ে কতজন সংযুক্ত আছেন, তা জানতে চাওয়া হয়। তিনি অধস্তন আদালতে মোট ২ হাজার ২৩৩ জন বিচারক কর্মরত আছেন বলে জানালেও কতজন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত আছেন, সেই তথ্য দেননি। সংযুক্ত কর্মকর্তাদের ব্যাপারে তথ্য নেওয়ার জন্য তিনি আইন মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করতে বলেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত কর্মকর্তার (বিচারকের) সংখ্যা প্রায় পৌনে দুইশ। এসব সংযুক্ত কর্মকর্তার মধ্যে প্রায় অর্ধশত জেলা ও দায়রা জজ রয়েছেন। অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ সংযুক্ত আছেন ৪০ জনের মতো। যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ সংযুক্ত আছেন অর্ধশতের বেশি। এ ছাড়া সিনিয়র সিভিল জজ সংযুক্ত আছেন ৪০ জনের মতো। তাদের মধ্যে শিক্ষা ছুটি ও অসুস্থতাজনিত কারণে সংযুক্ত রয়েছেন ৫০ জনের মতো। বাকিরা সংযুক্ত আছেন বিভাগীয় শৃঙ্খলাজনিত, পদোন্নতিজনিতসহ অন্যান্য কারণে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেক বিচারক তিন থেকে চার বছর ধরে সংযুক্ত আছেন। এর মধ্যে কোনো কারণ ছাড়াই সংযুক্ত রয়েছেন শতাধিক বিচারক। অসুস্থতাজনিত এবং শিক্ষা ছুটিতে যারা রয়েছেন, তাদের বাইরে বেশিরভাগ বিচারকই অযৌক্তিকভাবে সংযুক্ত রয়েছেন। অনেকে স্বেচ্ছায়ও সংযুক্ত হয়ে আছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ভালো কর্মস্থলে পদায়ন না হওয়ায় সংযুক্ত হওয়ার এমন একাধিক ঘটনা আছে।

জানা গেছে, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের আশীবার্দপুষ্ট সিনিয়র সিভিল জজ শাকিল আহমেদকে বদলি করা হয় হবিগঞ্জে। কিন্তু কর্মস্থল পছন্দ না হওয়ায় সেখানে এক মাস অফিস করার পর অসুস্থতা দেখিয়ে তিনি ছুটির আবেদন করেন। পরে তাকে মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়। এরপর এক মাসের ছুটি নিয়ে চলে যান যুক্তরাষ্ট্রে। তিন-চার মাস পার হলেও ওই জজ আর দেশে ফেরেননি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মন্ত্রণালয়ে এভাবে বিচারকদের সংযুক্ত করে রাখার কোনো আইনগত বিধান নেই। ফলে বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে। রাষ্ট্রের অর্থ অপচয়ের পাশাপাশি বিচারকাজে এর প্রভাব পড়ছে। বর্তমান আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান অল্প কিছুদিন হলো দায়িত্ব নিয়েছেন। সবাই আশা করছেন, তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেবেন।

সুপ্রিম কোর্টের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, ‘সম্প্রতি অনেক বিচারকের পদোন্নতি হয়েছে। তাদের পদায়ন চলছে। এ কারণে সংযুক্ত বিচারকের সংখ্যা বেশি হতে পারে। তবে সংযুক্ত কর্মকর্তাদেরও পদায়নের ব্যাপারে কাজ চলছে।’ কর্মস্থল পছন্দ না হওয়ায় সংযুক্ত হয়ে আছেন, এমন ঘটনা স্বীকার করেন তিনি।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক মহাসচিব মো. শাহজাহান সাজু কালবেলাকে বলেন, ‘কোনো বিচারকের বিরদ্ধে চার-পাঁচ বছর ধরে বিভাগীয় তদন্ত চলমান থাকার ঘটনা জাতির জন্য দুর্ভাগ্যের। আইনে আছে সম্ভবত ৬০ দিনের মধ্যে বিভাগীয় তদন্ত শেষ করতে হবে। তা না হলে বিভাগীয় প্রসিডিং অকার্যকর হয়ে যাবে। তা ছাড়া একজন বিচারক বিভাগীয় ব্যবস্থা চলাকালীন সম্পূর্ণ বেতন-ভাতাসহ সব সুযোগ-সুবিধা নিচ্ছেন, গানম্যান নিয়ে ঘুরছেন। অথচ জাতি কোনো সেবা পাচ্ছে না। এতে রাষ্ট্রীয় অর্থের চরম অপচয় হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘অভিযোগ উঠলে তা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নিতে হবে। আর খালাস পেলে দ্রুত তাকে পদায়ন দিতে হবে। অভিযোগ নিষ্পত্তি না করে বছরের পর বছর যারা ঝুলিয়ে রাখছেন, সেই দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনা উচিত।’ এক প্রশ্নের জবাবে শাহজাহান সাজু বলেন, ‘কর্তৃপক্ষ কোনো বিচারককে যখন যেখানে পদায়ন দেবে, সেখানে যোগদান করতে হবে। তা না হলে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। নইলে বিচারিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়বে।’

জানা গেছে, অধস্তন আদালতে কর্মরত ২ হাজার ২৩৩ বিচারকের মধ্যে সংযুক্ত আর প্রেষণে রয়েছেন তিন শতাধিক বিচারক। প্রায় দুই হাজার বিচারক মাঠে কর্মরত রয়েছেন। এ ছাড়া শতাধিক বিচারকের পদ শূন্য রয়েছে। দেশে বিচারাধীন মামলা ৫০ লাখের কাছাকাছি। এই বিপুল সংখ্যক মামলার তুলনায় বিচারকের সংখ্যা খুবই কম। আবার জনসংখ্যা অনুপাতেও দেশে বিচারকের সংখ্যা কম। দেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি। এই সংখ্যাকে বর্তমানে বাংলাদেশের জেলা ও দায়রা জজ আদালতসহ অন্যান্য আদালতে বিদ্যমান বিচারকের সংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে দেখা যায়, প্রায় ৯০ হাজার মানুষের বিপরীতে একজন বিচারক রয়েছেন, যা বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় নিতান্তই কম। যুক্তরাজ্যে আনুমানিক ৩ হাজার ১৮৬ জনের বিপরীতে একজন বিচারক; যুক্তরাষ্ট্রে এটি প্রতি দশ হাজারে একজন; ভারতে ৪৭ হাজার ৬১৯ জনে একজন এবং পাকিস্তানে প্রায় ৫০ হাজারে একজন বিচারক রয়েছেন।

বিচারকের স্বল্পতার দিক বিবেচনায় অনেক আগেই আইন কমিশন দ্রুত আরও ২ হাজার ৪০০ বিচারক নিয়োগের সুপারিশ করেছিল। কিন্তু সে সুপারিশ তখনকার সরকার আমলে নেয়নি। ফলে বিচার বিভাগে একদিকে বিচারক সংকট রয়ে গেছে, অন্যদিকে শতাধিক বিচারককে অযৌক্তিকভাবে মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করে রাখা হয়েছে। দ্রুত তাদের পদায়নের ব্যবস্থা নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন আইনজ্ঞরা।