Image description

বহু চ্যালেঞ্জ আর প্রত্যাশার ত্রয়োদশ সংসদের যাত্রা শুরু হচ্ছে আজ। ’২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের পথ ধরে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকার ও বিরোধী দলের আসল পরীক্ষা শুরু হচ্ছে আজ। গণ-অভ্যুত্থানে জীবনবাজি রাখা ছাত্র-জনতার প্রত্যাশিত জবাবদিহিমূলক কার্যকর সংসদ পরিচালনার কঠিন চ্যালেঞ্জ নিয়েই সংসদ নেতা হিসেবে আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব শুরু করছেন  প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

সরকার প্রধান হিসেবে বিরল নজির তৈরি করে যাত্রা শুরু করা তারেক রহমান জাতীয় সংসদের ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য নজির তৈরি করতে চান বলে জানিয়েছেন তার ঘনিষ্ঠজনরা। একইসঙ্গে গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী নির্বাচনে বিপুল সমর্থন নিয়ে বিজয়ী হওয়া সরকারি দল বিএনপি ও সমমনা জোটের এমপিদের সামনেও জনপ্রত্যাশা পূরণের বিশাল এক চ্যালেঞ্জ। 

সরকার এবং সরকারি দলের এমপিদের জবাবদিহিতা নিশ্চিতের বড় চ্যালেঞ্জ নিয়ে প্রথমবারের মতো বিরোধী দলের দায়িত্ব গ্রহণ করছে জামায়াত-এনসিপি নেতৃত্বাধীন জোট। জামায়াতের আমীর হিসেবে প্রথমবার বিরোধী দলের নেতার আসনে কার্যক্রম শুরু করছেন ডা. শফিকুর রহমান। গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে তৈরি জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকারি ও বিরোধী দল যে অঙ্গীকার করেছে তা পূরণের পর্বও শুরু হচ্ছে আজ থেকে। আজ থেকে যাত্রা শুরু হওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের মেয়াদকাল হবে আগামী ২০৩১ সালের মার্চ পর্যন্ত।

২০২৬ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত এবারের সংসদে অনেক কিছুই ব্যতিক্রম। প্রথমবারের মতো এমপি হয়েই সংসদ নেতার দায়িত্বগ্রহণ করেছেন তারেক রহমান। তার এই স্বপ্নযাত্রায় আছে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ। সংসদ নেতা ও বিরোধীদলীয় নেতাসহ এবার যারা সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন তাদের ৭৬ শতাংশই নতুন। তাদের অনেকে তরুণ। যে কারণে ত্রয়োদশ সংসদকে ব্যতিক্রমী সংসদ হিসেবে বিবেচনা করছেন বিশ্লেষকরা।

বাংলাদেশের বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী, এক সংসদের পর পরবর্তী সংসদ শুরু না হওয়া পর্যন্ত স্পিকারের মেয়াদ থাকে। বিদায়ী সংসদের স্পিকারই নতুন সংসদের অধিবেশন আহ্বান করেন। নতুন সংসদে স্পিকার ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত করার পরই তার দায়িত্ব শেষ হওয়ার কথা।

২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের মাধ্যমে দ্বাদশ সংসদ ভেঙে যায়। সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় পদত্যাগ করেন। ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু অভ্যুত্থানে গণহত্যার মামলায় আছেন কারাগারে।

এই অবস্থায় স্পিকার ছাড়াই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জাতীয় সংসদ সূতিকাগার হলেও আওয়ামী লীগের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেয়ায় ৫৮৩ দিন অকার্যকর ছিল জাতীয় সংসদ। দীর্ঘ বিরতির পর যাত্রা শুরু করতে যাওয়া সংসদের আজকের কার্যক্রম শুরু হবে প্রধানমন্ত্রীর সূচনা বক্তব্য দিয়ে। তিনি তার বক্তব্যে সংসদের একজন সিনিয়র এমপিকে অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের অনুরোধ করবেন। এরপর ওই সদস্যের সভাপতিত্বে অধিবেশনে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের কার্যক্রম শুরু হবে।

স্পিকার মনোনয়নের বিষয়ে গতকাল বিএনপি’র সংসদীয় দলের সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দায়িত্ব দিয়েছেন দলের এমপিরা। গুরুত্বপূর্ণ এই মনোনয়নের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তও জানা যাবে আজ। জুলাই সনদ অনুযায়ী বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার মনোনয়ন দেয়ার ঐকমত্য থাকলেও এ পদ নিতে গতকাল পর্যন্ত আগ্রহ প্রকাশ করেনি জামায়াত। বিরোধী জোটকে এই পদ গ্রহণের জন্য বিএনপি ও প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু জুলাই সনদ অনুযায়ী গণপরিষদ সদস্য হিসেবে সরকারি দলের এমপিদের শপথ না নেয়া এবং সনদ বাস্তবায়নে আন্তরিকতা নেই এমন অভিযোগ করে ডেপুটি স্পিকারের পদ নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না বিরোধী জোট। গতকাল বিরোধী দলের নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, খণ্ডিতভাবে ডেপুটি স্পিকার নয় আমরা চাই পুরো প্যাকেজ’। বিরোধী দলের এই প্যাকেজ আদায় নিয়েই নতুন সংসদ উত্তপ্ত থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে নির্বাচিত ২৯৬ জন এমপি গত ১৭ই ফেব্রুয়ারি শপথগ্রহণ করেন। এই সংসদে সরকারি দল, বিরোধী দলসহ যে সব দল নির্বাচনে জয় পেয়েছে তার সবগুলো দলীয় প্রধানই প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছে ৯টি রাজনৈতিক দল। এর বাইরে দল নিরপেক্ষ এমপি আছেন ৭ জন। নির্বাচিত ২৯৬ জনের মধ্যে ২২৭ জনই প্রথমবারের মতো সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছেন। প্রথমবার এমপি হওয়া এই প্রতিনিধিদের প্রয়োজনীয় সংসদীয় রীতি-নীতির ধারণা দিতে বিএনপি ও জামায়াত জোটের পক্ষ থেকে পৃথক কর্মশালাও করা হয়েছে।

সংসদ অধিবেশনের শুরুর দিনেই রেওয়াজ অনুযায়ী ভাষণ দেবেন প্রেসিডেন্ট মো. সাহাবুদ্দিন। আওয়ামী লীগ সরকারের নির্বাচিত এই প্রেসিডেন্টকে নিয়ে বিরোধী দলগুলোতে আপত্তি রয়েছে। নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনে তার ভাষণ দেয়ার ক্ষেত্রে অনাস্থা জানিয়েছে জামায়াত-এনসিপি জোট। আজ সংসদের শুরুর সময়ে বিরোধী দল অংশ নিলেও প্রেসিডেন্টের ভাষণের সময় ওয়াকআউট করতে পারে- এমন ইঙ্গিত মিলেছে গতকাল। যদিও এ নিয়ে আগাম কোনো ঘোষণা দেয়া হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী অধিবেশন শুরুর পর স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন হলে অধিবেশন বিরতি দিয়ে নবনির্বাচিত স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের শপথ পাঠ করাবেন প্রেসিডেন্ট। এরপর নতুন স্পিকারের সভাপতিত্বে আবার অধিবেশন বসবে। এবার প্রথম দিন শুধু স্পিকার নির্বাচিত হতে পারেন বলে ইঙ্গিত মিলেছে।

রেওয়াজ অনুযায়ী নবনির্বাচিত স্পিকার স্বাগত বক্তব্য রাখবেন। পরে দিনের কার্যসূচি অনুযায়ী সভাপতিমণ্ডলী মনোনয়ন, শোকপ্রস্তাব, নবনির্বাচিত স্পিকারের ধন্যবাদ জ্ঞাপনের পর ফের অধিবেশনের বিরতি হতে পারে।

এরপরই প্রেসিডেন্টের ভাষণের প্রক্রিয়া শুরু হবে। প্রেসিডেন্ট সংসদ কক্ষে প্রবেশ করলে সংসদের স্পিকার ও সদস্যরা দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করেন এবং একই সময়ে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হবে। পরে স্পিকার ও প্রেসিডেন্ট আসন গ্রহণ করবেন এবং সংবিধানের ৭৩নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্পিকার প্রেসিডেন্টকে ভাষণ দেওয়ার জন্য আহ্বান জানাবেন। সংসদের প্রথম অধিবেশনে প্রেসিডেন্ট লিখিত ভাষণ দেবেন তা আগেই মন্ত্রিসভায় অনুমোদন হয়েছে।

প্রেসিডেন্টের ভাষণ শেষে পুনরায় জাতীয় সংগীত পরিবেশিত হবে, তখন স্পিকার এবং সংসদ সদস্যরা দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করবেন। প্রেসিডেন্ট সংসদ কক্ষ ত্যাগ করার পর সংসদের বৈঠক মুলতবি ঘোষণা করা হবে এবং এর মধ্য দিয়ে প্রথম বৈঠকের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হবে।

জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন নিয়ে গতকাল বিস্তারিত জানিয়েছেন চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন হবে ঐতিহাসিক। অধিবেশনে অতিথি হিসেবে গণ-অভ্যুত্থানে আহত কয়েকজন ব্যক্তিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এছাড়া শহীদ গোলাম নাফিসকে ঘটনাস্থল থেকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া রিকশা চালক নুর মোহাম্মদকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে অধিবেশনের কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করতে।

ওদিকে এবারের সংসদের নানা ব্যতিক্রমের মধ্য এমপিদের শপথ অনুষ্ঠান ও ছিল বিরল ঘটনা। স্পিকার-ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে গত ১৭ই ফেব্রুয়ারি প্রধান নির্বাচন কমিশনার সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদ অনুসরণ করে সংসদ সদস্যদের শপথ পাঠ করান। বিএনপি-জামায়াত-এনসিপিসহ অন্যান্য নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ বাক্য পাঠ করেন। ওইদিন বিকেলে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে মন্ত্রিসভার শপথগ্রহণ হয়।

গত ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের অন্যতম দিক ছিল জুলাই সনদ বাস্তবায়ন বিষয়ে গণভোট। এই ভোটের চূড়ান্ত ফলে দেখা যায় বৈধ ভোটের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ছয় কোটি ৯১ লাখ ৮৬ হাজার ২১১টি। এর মধ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোটের সংখ্যা চার কোটি ৭২ লাখ ২৫ হাজার ৯৮০টি এবং ‘না’ ভোটের সংখ্যা দুই কোটি ১৯ লাখ ৬০ হাজার ২৩১টি।

এছাড়া ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে দু’টি আসনের নির্বাচনের ফলাফল স্থগিত রয়েছে এবং প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে একটি আসনের নির্বাচন বাতিল হয়েছে। বাকি ২৯৭টি আসনের মধ্যে বিএনপি ২০৯টি, জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৬টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২টি আসন পেয়েছে। এছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, গণঅধিকার পরিষদ, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), গণসংহতি আন্দোলন ও খেলাফত মজলিস একটি করে আসন পেয়েছে। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জিতেছেন ৭টি আসনে।