Image description

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর জাতীয় নির্বাচন নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা ছিল। নির্বাচন হবে কী হবে না, এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়েই তফসিল ঘোষণা করে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার।

অবশেষে চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। আর প্রথমবারের মতো বিরোধী আসনে বসতে যাচ্ছে তাদেরই সাবেক মিত্র বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সকালে প্রথমে শপথ নেন সংসদ সদস্যরা। ওই দিন বিকালে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠন হয় মন্ত্রিসভা।

কার্যত ২০০৮ সালে নবম জাতীয় নির্বাচন থেকে ১৪ সাল পর্যন্ত তখনকার ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোটের বিরোধী অবস্থানের কারণে সংসদ ছিল প্রাণবন্ত।

এরপর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি বিএনপি জামায়াতের বর্জনের মধ্য দিয়ে জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণে দশম সংসদ গঠন হয়।

তবে জাতীয় পার্টি সরকারের মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করায় তাদের রাজনৈতিক অবস্থান ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। আর শেখ হাসিনার অধীনে ১৮ ও ২৪ সালের নির্বাচন নিয়েও নানা অভিযোগ ছিল।

সর্বশেষ চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের পর এক ধরনের নতুন বন্দোবস্তের কথা বলে আসছিলেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। মূলত এর মাধ্যমে রাষ্ট্র কাঠামোর আমূল পরিবর্তন বা নতুন সরকারের রূপরেখাকেই বুঝাতেন তারা। সেই ধারাবাহিকতায় ১২ মার্চ যে সংসদ বসছে, তা নিয়ে এক ধরনের প্রত্যাশা করছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। তারা মনে করেন, এই সংসদ হতে হবে জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের অন্যতম প্ল্যাটফর্ম। শুধু তাই নয়, এর মাধ্যমে মহান মুক্তিযুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় মানবিক বাংলাদেশ চান তারা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এবারের নির্বাচন নিয়ে নানা কথা থাকলেও আমরা মনে করি, অনির্বাচিতদের চেয়ে এটা মোটামুটি সমর্থনযোগ্য। কারণ অন্তর্বর্তী সরকারের মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধীরা যে মেটিকুলাস ডিজাইন করছিল, নির্বাচনের মাধ্যমে তা নস্যাৎ হয়ে গেছে। তবে তারা এখনও ষড়যন্ত্র করছে। আর জুলাই সনদের নামে তথাকথিত যে ঐক্যবদ্ধ দলিলের কথা বলা হচ্ছে, তা ঠিক নয়। বিএনপির উচিত এ ধরনের ফাঁদে পা না দেওয়া। ব্যক্তিগতভাবে আমার প্রত্যাশা— জুলাইয়ের দাবি অনুযায়ী অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংবিধানিক ব্যবস্থায় কোথায় কোথায় গলদ আছে, তা সংস্কারে যেন এই সংসদ কার্যকর উদ্যোগ নেয়।

অতীতের দুই মিত্রই যখন প্রধান প্রতিপক্ষ, কেমন হবে সেই সংসদ

এবারের নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করে সংসদের ট্রেজারি বেঞ্চে বসতে যাচ্ছে। আর প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে বিরোধী আসনে বসতে যাচ্ছে তাদেরই এক সময়ের মিত্র বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। তবে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র চালুর পর একমাত্র ১৯৯৬ সালের সপ্তম সংসদ নির্বাচন ছাড়া সব সময়ই ঘুরেফিরে তাদের মধ্যে এক ধরনের রসায়ন ছিল।

একসঙ্গে আন্দোলন ও সরকার গঠন সব অভিজ্ঞতাই তাদের আছে। তবে প্রায় আড়াই দশক পর এবারের নির্বাচনে তাদের সেই গাঁটছড়া ছিন্ন হয়।

নির্বাচনে ২৯৯ আসনের মধ্যে এককভাবে ২০৯টি আসনে নির্বাচিত হয় বিএনপি। আর জোট শরিকসহ ২১২ আসনে জয় পায় তারা। অপরদিকে জামায়াত এককভাবে ৬৮টি আর জোট শরিক এনসিপির ৬টিসহ ৭৭টি আসন লাভ করে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালে প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচনে ১৪০টি আসন পায় বিএনপি। তখন জামায়াতের ১৮টি আসনের সমর্থনে সরকার গঠন করে তারা। ৯৬ সালের নির্বাচনের আগে কেয়ারটেকার সরকারের দাবিতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলন করে জামায়াত। সেবার বিএনপিও হারে। আর জামায়াতেরও ভরাডুবি হয়। ক্ষমতায় যায় আওয়ামী লীগ।

পরবর্তীকালে ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে বিএনপি ও জামায়াতের নেতৃত্বে গঠন হয় চার দলীয় জোট। তখন সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করে তারা। আবার ২০০৮ সালেও ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচন করে হেরে যায় এ জোট। পরবর্তী সময়ে ২০১৪ সালে শেখ হাসিনার অধীনে একসঙ্গে নির্বাচন বর্জন করে। ১৮ সালে শেখ হাসিনার অধীনে ভোটে গেলেও দুই দলেরই ভরাডুবি হয়। আবার ২৪-এর নির্বাচনও তারা একসঙ্গে বর্জন করে। তবে ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগ মাঠে না থাকায় সংসদ রাজপথ দুই দিকেই সেই দুই মিত্রই এবার প্রধান প্রতিপক্ষ।

এ বিষয়ে বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বিএনপি  ও জামায়াত অতীতে দীর্ঘ সময় একসঙ্গে ছিল। এ নিয়ে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বিএনপিকে অনেক কথা শুনতে হয়েছে। তারা বলতো, জামায়াত ছাড়া বিএনপির সক্ষমতা নেই। তাই বিএনপি জামায়াতকে ছাড়ার কৌশল খুঁজছিল। ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে দুই দলকে আলাদা হওয়ার সুযোগ এনে দিয়েছে। আমি মনে করি, দুই সাবেক মিত্রের যে সংসদ হতে যাচ্ছে, তা কেমন হবে— তা নির্ভর করবে দুই পক্ষের আচরণের ওপর। তবে ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ হলো, বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জামায়াত প্রধান বিরোধী দল হিসেবে যে সুযোগ পেয়েছে, তা তারা কাজে লাগাবে। আর  বিএনপিও অতীতের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সংসদ কার্যকর করবে।

এনসিপি কী প্রতিশ্রুতি রাখবে

জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের রাজনৈতিক দল শুরু থেকেই শহীদ ও আহতদের স্বার্থ রক্ষার কথা বলে আসছে। তাদের প্রতিটি কর্মসূচিতে জুলাইয়ের আলোকে সন্ত্রাস, দুর্নীতি, পরিবারতন্ত্রের বিপক্ষে বক্তব্য রেখে আসছেন। পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রাখার কথাও বলে আসছেন।

নির্বাচনে প্রথমবারের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেই বড় চমক দেখিয়ে ৬টি আসন লাভ করেছে। তাদের প্রধান জোট শরিক জামায়াতের সঙ্গে বসতে যাচ্ছে বিরোধী আসনে। তারুণ্যের শক্তি হিসেবে তারা কতটুকুই ভূমিকা রাখতে পারবে, এ নিয়েও আলোচনা হচ্ছে।

তবে এ বিষয়ে দলটির সদস্য সচিব ও রংপুর-৪ আসনের এমপি আখতার হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমাদের দল আন্দোলন ও রক্তের সিঁড়ি বেয়ে প্রতিষ্ঠিত। জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রাখতে আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

কী ভাবছেন রাজনীতিবিদরা

নতুন সংসদকে কার্যকর ও অর্থবহ দেখতে চান সরকার ও বিরোধী দলসহ রাজনৈতিক নেতারা। তারা মনে করেন, ভিন্নমত থাকলেও দেশের প্রশ্ন সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকা উচিত।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি ড. হামিদুর রহমান আযাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমরা অতীতে সরকারও বিরোধী দল সব জায়গায় নিয়মতান্ত্রিক ভূমিকা পালন করেছি। এবারের সংসদে সরকার বিরোধী শক্তির সঙ্গে কতটুকু ভূমিকা পালন করে, তার ওপরই সব কিছু নির্ভর করছে। তবে আমরা একটি প্রাণবন্ত সংসদ দেখতে চাই।

অপরদিকে ক্ষমতাসীন বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা এমরান সালেহ প্রিন্স বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বিএনপি যখনই ক্ষমতায় এসেছে, দেশ ও জাতির পক্ষে দায়িত্বশীল আচরণ করেছে। জুলাই আন্দোলনের পর মানুষের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, আশা করি এই সংসদ তা পূরণ করতে পারবে। সেক্ষেত্রে বিরোধী দলেরও গঠনমূলক ভূমিকা পালন করা জরুরি।

এ বিষয়ে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ বলেন, দীর্ঘদিন পর গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সংসদের যাত্রা করছে। আমরা মনে করি, ফ্যাসিবাদী ও অন্তর্বর্তী সরকারের অনেক নেতিবাচক উপাদান এখনও বিদ্যমান। আমরা চাই, এ সংসদের মাধ্যমে এগুলোর বিলোপ করা হবে। জুলাই সনদে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ ছাড়া যেসব সিদ্ধান্তে দলগুলো একমত হয়েছে, তা পূরণ করা হবে। গণতন্ত্র, মানবাধিকার কমিশন ও দুদককে কার্যকর করাসহ আইনের শাসন নিশ্চিতে এ সংসদ অর্থবহ ভূমিকা রাখবে সে প্রত্যাশা।