ইতিকাফ একটি ইবাদত, যার আভিধানিক অর্থ হলো কোনো স্থানে অবস্থান করা বা নিজেকে আবদ্ধ রাখা। ইসলামি পরিভাষায়, মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে দুনিয়াবি কাজ ও ব্যস্ততা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সুনির্দিষ্ট নিয়তে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মসজিদে অবস্থান করাকে ইতিকাফ বলা হয়। ইতিকাফের মূল লক্ষ্য হলো পার্থিব কোলাহল থেকে দূরে থেকে আল্লাহর ইবাদতে মশগুল হওয়া এবং বিশেষ করে রমজানের শেষ দশদিনে শবে কদর তালাশ করা। নিজেকে বিশ্লেষণ ও আত্মপর্যলোচনার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি অর্জনই ইতিকাফের প্রধান উদ্দেশ্য।
মসজিদে ইতিকাফ:
রমজানের শেষ দশ দিনের ইতিকাফ অর্থাৎ ২০ রমজানের সূর্য ডোবার আগ মুহূর্ত থেকে ঈদের চাঁদ দেখা পর্যন্ত মসজিদে অবস্থান করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদা কেফায়া- অর্থাৎ এলাকার পক্ষ থেকে কয়েকজন এটি আদায় করলে পুরো মহল্লাবাসীর পক্ষ থেকে তা আদায় হয়ে যায়।
وَلَا تُبَاشِرُوهُنَّ وَأَنتُمْ عَاكِفُونَ فِي الْمَسَاجِدِ
অর্থ: আর তোমরা মসজিদে ইতিকাফ অবস্থায় স্ত্রীদের সাথে সহবাস করো না। আল্লাহ তা’আলা সুরা বাকারার ১৮৭ নাম্বার আয়াতে ইতিকাফের নিয়ম এবং মসজিদে অবস্থান করার বিষয় নিশ্চিত করেছেন।
আয়েশা রা: বলেন, عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا زَوْجِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيه وَسَلَّمَ كَانَ يَعْتَكِفُ الْعَشْرَ الْأَوَاخِرَ مِنْ رَمَضَانَ حَتَّى تَوَفَّاهُ اللَّهُ ثُمَّ اعْتَكَفَ أَزْوَاجُهُ مِنْ بَعْدِهِ.
নবী করীম (সা.) ইন্তেকাল পর্যন্ত রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন। তাঁর ইন্তেকালের পর তাঁর স্ত্রীগণও ইতিকাফ করেছেন। (সহিহ বুখারী: ২০২৬, সহিহ মুসলিম: ১১৭২)।
ইতিকাফের উদ্দেশ্য:
হুজুর সা: বলেছেন, إِنِّي اعْتَكَفْتُ الْعَشْرَ الْأَوَّلَ، أَلْتَمِسُ هَذِهِ اللَّيْلَةَ، ثُمَّ اعْتَكَفْتُ الْعَشْرَ الأَوْسَطَ، ثُمَّ أُتِيتُ، فَقِيلَ لِي: إِنَّهَا فِي الْعَشْرِ الأَوَاخِرِ، فَمَنْ أَحَبَّ مِنْكُمْ أَنْ يَعْتَكِفَ فَلْيَعْتَكِفْ.
"আমি (লাইলাতুল কদরের) সন্ধানে প্রথম দশদিন ইতিকাফ করলাম, এরপর মাঝের দশদিন ইতিকাফ করলাম। এরপর আমার কাছে (ফেরেশতা) এসে বললেন যে, তা শেষ দশদিনে। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে ইতিকাফ করতে চায় সে যেন ইতিকাফ করে।" (সহিহ মুসলিম: ১১৬৭)।
হুজুর সা: রমজানের শেষে ১০ দিন ইতিকাফ করেছেন। শবে ক্বদর যেহেতু রমজানের শেষ ১০ দিনের বিজোড় রাতে সেহেতু ইতিকাফের মাধ্যমে প্রতি রাতে ইবাদত করলে শবে ক্বদর পাওয়া এক প্রকার নিশ্চিত হয়ে যায়। তবে যদি কেউ বাড়িতে রমজানের শেষ ১০ দিনের বিজোড় রাতে ইবাদত করে সে ক্ষেত্রেও শবে ক্বদর পাওয়া সম্ভব।
ইতিকাফের শর্তাবলী:
পুরুষদের ইতিকাফের জন্য অপরিহার্য শর্ত হলো মসজিদে অবস্থান করা। ‘ইতিকাফ একটি ইবাদত, আর ইবাদতের জন্য নিয়ত আবশ্যক। নিয়ত ছাড়া শুধু মসজিদে অবস্থান করলে তা ইতিকাফ হিসেবে গণ্য হবে না। মনে মনে নিয়ত করাই যথেষ্ট যে, "আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইতিকাফ করছি’ (সহিহ বুখারী: ১)। ইতিকাফ অবস্থায় বড় নাপাকি (গোসল ফরজ হওয়া) থেকে পবিত্র থাকতে হবে। তবে ইতিকাফ অবস্থায় স্বপ্নদোষ হলে ইতিকাফ ভেঙে যায় না, দ্রুত গোসল করে পবিত্র হয়ে নিতে হয়।
যে সব কারণ ছাড়া মসজিদ থেকে বের হওয়া যাবে না:
ইতিকাফ অবস্থায় কোনো শরয়ি (ইসলামি বিধানমতে প্রয়োজনীয়) বা মানবিক (অপরিহার্য) কারণ ছাড়া মসজিদের সীমানার বাইরে যাওয়া সম্পূর্ণ নিষেধ। যদি কেউ ইচ্ছাকৃত-ভাবে এক মুহূর্তের জন্যও কারণ ছাড়া মসজিদের বাইরে যায়, তবে তার ইতিকাফ ভেঙে যাবে।
কিছু কারণে মসজিদের বাইরে যাওয়া যাবে:
প্রাকৃতিক প্রয়োজন: প্রস্রাব-পায়খানা বা ফরজ গোসলের জন্য বাইরে যাওয়া। তবে কাজ শেষ হওয়া মাত্রই ফিরে আসতে হবে।
খাবার আনা: যদি মসজিদে খাবার পৌঁছে দেওয়ার মতো কেউ না থাকে, তবে খাবার আনার জন্য বের হওয়া জায়েজ।
জুমার নামাজ: যদি ইতিকাফের মসজিদে জুমার নামাজ না হয়, তবে জুমার নামাজ আদায়ের জন্য অন্য মসজিদে যাওয়া জায়েজ। এক্ষেত্রে খুৎবা ও নামাজের প্রয়োজনীয় সময়টুকু সেখানে অবস্থান করবেন।
আজান দেওয়া: মুয়াজ্জিন হলে আজান দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট জায়গায় যাওয়া যাবে।
হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, "সুন্নত হলো, ইতিকাফকারী কোনো অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যাবে না, জানাজায় শরিক হবে না, স্ত্রীকে স্পর্শ করবে না এবং তার সাথে মেলামেশা করবে না এবং অপরিহার্য প্রয়োজন ছাড়া মসজিদের বাইরে যাবে না।" (সূত্র: সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ২৪৭৩)।
ইতিকাফ অবস্থায় পা অন্তত মসজিদের সীমানার ভেতরে থাকতে হবে। মসজিদের সীমানা বলতে মসজিদের মূল দেয়াল বা মসজিদ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নির্ধারিত সীমানাকে বোঝায়।
নারীদের জন্য ইতিকাফ:
নারীদেরও ইতিকাফ রয়েছে। নবী করীম (সা.)-এর পবিত্র স্ত্রীদের (আম্মাজান) আমল দ্বারা প্রমাণিত যে, নারীদের জন্যও ইতিকাফ করা একটি সওয়াবের কাজ। তবে নারীদের ইতিকাফের ক্ষেত্রে স্থান ও পরিবেশের বিষয়ে কিছু নির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَعْتَكِفُ الْعَشْرَ الْأَوَاخِرَ مِنْ رَمَضَانَ حَتَّى تَوَفَّاهُ اللَّهُ ثُمَّ اعْتَكَفَ أَزْوَاجُهُ مِنْ بَعْدِهِ.
আয়েশা রা: থেকে বর্ণিত হাদিস ‘নবী করীম (সা.) ইন্তেকাল পর্যন্ত রমজানের শেষ দশ দিন ইতিকাফ করতেন। তাঁর ইন্তেকালের পর তাঁর স্ত্রীগণও ইতিকাফ করেছেন।’
বাসার নির্দিষ্ট স্থান: অধিকাংশ হানাফী ফকিহদের মতে, মহিলারা নিজ ঘরে নামাজের জন্য নির্ধারিত স্থানে (যেখানে তিনি নিয়মিত নামাজ পড়েন) ইতিকাফ করবেন। যদি নির্দিষ্ট জায়গা না থাকে, তবে ইতিকাফের জন্য একটি রুম বা কর্নার নির্দিষ্ট করে নেবেন।
মসজিদে ইতিকাফ: যদি মসজিদে নারীদের জন্য পর্দা ও নিরাপত্তার পরিপূর্ণ ব্যবস্থা থাকে, তবে সেখানে ইতিকাফ করা জায়েজ। তবে নবী পত্নীগণের আমল এবং পরবর্তী ফিকহী ব্যাখ্যা অনুযায়ী নারীদের জন্য নিজ ঘরে ইতিকাফ করাই অধিকতর নিরাপদ ও উত্তম।
ইতিকাফের শর্তাবলী:
বিবাহিত মহিলার জন্য ইতিকাফ করতে হলে স্বামীর অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। ইতিকাফের জন্য হায়েজ (মাসিক) ও নেফাস (সন্তান জন্মদান পরবর্তী অবস্থা) থেকে পবিত্র থাকা শর্ত। ইতিকাফ অবস্থায় মাসিক শুরু হয়ে গেলে ইতিকাফ ভেঙে যাবে এবং পরবর্তীতে শুধু ওই দিনের কাজা করতে হবে। ইতিকাফে বসার পর একান্ত মানবিক প্রয়োজন (যেমন: টয়লেট বা ওজু) ছাড়া নির্ধারিত স্থানের বাইরে যাওয়া যাবে না। ঘরের অন্যান্য কাজ বা গল্পগুজব করার জন্য বের হওয়া যাবে না।
নারীদের কিছু কারণ ব্যতীত নির্দিষ্ট স্থান ত্যাগ করা যাবে না:
প্রাকৃতিক প্রয়োজন: প্রস্রাব-পায়খানা বা ওজু-গোসলের জন্য নির্ধারিত স্থানের বাইরে যাওয়া যাবে। তবে কাজ শেষ হওয়া মাত্রই আবার নিজ স্থানে ফিরে আসতে হবে।
খাবার গ্রহণ: যদি নির্ধারিত স্থানে খাবার পৌঁছে দেওয়ার মতো কেউ না থাকে, তবে খাবার আনতে বা রান্নাঘর থেকে খাবার নিয়ে আসতে তিনি ওই স্থান ত্যাগ করতে পারবেন। কিন্তু রান্না করা বা ঘরের অন্য কাজে সময় ব্যয় করা যাবে না।
অসুস্থতা ও অন্যান্য: যদি ইতিকাফকারী নারী বা তার পরিবারের কেউ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং ঘরে সেবা করার মতো কেউ না থাকে, তবে ইতিকাফ ছেড়ে দেওয়া জায়েজ। তবে এক্ষেত্রে তার ইতিকাফ ভেঙে যাবে এবং পরবর্তীতে একদিনের কাজা করতে হবে।
শরয়ি নিষেধ (হায়েজ বা মাসিক): ইতিকাফ অবস্থায় যদি নারীর মাসিক (হায়েজ) শুরু হয়, তবে তাকে অবশ্যই ইতিকাফের স্থান ত্যাগ করতে হবে। কারণ অপবিত্র অবস্থায় ইতিকাফ সহিহ নয়। এক্ষেত্রে ওই দিনের ইতিকাফ ভেঙে যাবে এবং পবিত্র হওয়ার পর একদিনের রোজা ও ইতিকাফ কাজা করতে হবে। (বাদায়েউস সানায়ে)।
হাদিসের নির্দেশনা:
ইতিকাফ হলো নিজেকে আল্লাহর জন্য উৎসর্গ করা। নবী কারীম (সা.)-এর স্ত্রীগণ যখন ইতিকাফ করতেন, তারা নিজেদের তাঁবু বা নির্ধারিত স্থানের ভেতরেই অবস্থান করতেন। প্রয়োজন ছাড়া সেখান থেকে বের হতেন না।ইতিকাফ অবস্থায় ঘরের অন্যান্য সদস্যদের সাথে গল্প করা বা ঘরোয়া কাজে অংশ নেওয়ার জন্য স্থান ত্যাগ করা ইতিকাফের মূল উদ্দেশ্যের পরিপন্থী।