ইসলামের ইতিহাসে ২০ রমজান এক অনন্য তাৎপর্য বহন করে। এই দিনে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে আরব উপদ্বীপে ইসলামের শক্ত ভিত প্রতিষ্ঠা করেন। একই সঙ্গে ইতিহাসে এ দিনকে ঘিরে জড়িয়ে আছে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ও স্মৃতি।
মক্কা বিজয়
৮ হিজরি সনের ২০ রমজান, খ্রিষ্টীয় ৬৩০ সালে মহানবী (সা.) প্রায় ১০ হাজার সাহাবিকে নিয়ে মক্কায় প্রবেশ করেন। কুরাইশরা হুদাইবিয়ার সন্ধি ভঙ্গ করায় এই অভিযান পরিচালিত হয়।
মক্কায় প্রবেশের সময় সেনাবাহিনীকে কয়েকটি দলে ভাগ করা হয়েছিল। খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.) দক্ষিণ দিক থেকে বাহিনীর একটি অংশের নেতৃত্ব দেন। জুবায়ের ইবনে আওয়াম (রা.) উত্তর দিক থেকে প্রবেশ করেন। আবু উবাইদা ইবনে জাররাহ (রা.) উত্তর-পশ্চিম দিক দিয়ে মুহাজিরদের নেতৃত্ব দেন এবং সাদ ইবনে উবাদা (রা.) পশ্চিম দিক থেকে আনসারদের নেতৃত্ব দেন।
কাবাঘর থেকে মূর্তি অপসারণ
মক্কায় প্রবেশের সময় মহানবী (সা.) বিনয়ের সঙ্গে সুরা ফাতহ তিলাওয়াত করছিলেন। এরপর তিনি সরাসরি কাবাঘরের দিকে যান। তখন কাবার আঙিনায় ৩৬০টি মূর্তি স্থাপন করা ছিল।
নবীজি তার ধনুক দিয়ে সেগুলো ভেঙে ফেলতে ফেলতে কোরআনের এই আয়াত পাঠ করেন, সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে, নিশ্চয়ই মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল। এর মাধ্যমে তিনি শিরকের সব প্রতীক অপসারণ করেন এবং জাহেলিয়াতের পুনরুত্থানের পথ বন্ধ করে দেন।
মক্কার মানুষের প্রতি ক্ষমা
মক্কা বিজয়ের সময় মহানবী (সা.) ক্ষমাশীলতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। মক্কার মানুষ যখন তার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের ভাগ্য জানতে চাইল, তিনি বললেন, হে কুরাইশ সম্প্রদায়, তোমরা কী মনে কর আমি তোমাদের সঙ্গে কী আচরণ করব?
তারা বলল, আপনি একজন সম্মানিত ভাই এবং সম্মানিত ভাইয়ের সন্তান। তখন নবীজি বললেন, আজ তোমাদের ওপর কোনো অভিযোগ নেই। তোমরা সবাই মুক্ত। এরপর তিনি হজরত বিলাল ইবনে রাবাহ (রা.)-কে কাবাঘরের ছাদে উঠে আজান দিতে নির্দেশ দেন, যা ইসলামের বিজয়ের প্রতীক হয়ে ওঠে।
কাইরোয়ান নগরী ও মসজিদ নির্মাণ
৫০ থেকে ৫৫ হিজরির মধ্যে মুসলিম সেনাপতি উকবা ইবনে নাফি তিউনিসিয়ার কাইরোয়ান নগরী প্রতিষ্ঠা করেন এবং সেখানে বিখ্যাত কাইরোয়ান জামে মসজিদের নির্মাণকাজ সম্পন্ন করেন।
এই শহর শুধু একটি নগরী ছিল না; এটি ছিল উত্তর আফ্রিকায় মুসলিম বাহিনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি। এখান থেকেই পরে মরক্কো ও আন্দালুস বিজয়ের অভিযান পরিচালিত হয়।
কাইরোয়ানের মসজিদটি দ্রুতই জ্ঞানচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়। এখানে শুধু ধর্মীয় শিক্ষাই নয়, বরংউত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে আরবি ভাষা ও ইসলামের শিক্ষা ছড়িয়ে দেওয়া হতো।
কায়রোর মুআয়্যিদ শায়খ মসজিদ
৮২৪ হিজরিতে মিসরের কায়রোয় সুলতান আল-মুআয়্যিদ শায়খ একটি অনন্য মসজিদ নির্মাণ করেন। এর পেছনে একটি ব্যতিক্রমী ইতিহাস রয়েছে।
তিনি একসময় কারাগারে বন্দি ছিলেন। সেখানে চরম কষ্ট ভোগ করার সময় তিনি মানত করেন, যদি কখনো ক্ষমতায় আসতে পারেন, তবে সেই কারাগারকেই মসজিদে রূপান্তর করবেন। পরে সুলতান হওয়ার পর তিনি সেই মানত পূরণ করেন।
এই মসজিদের মিনার নির্মাণে কায়রোর ঐতিহাসিক বাব জুয়াইলা ফটককে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল, যা স্থাপত্যের দৃষ্টিতে একটি অভিনব উদ্ভাবন।
ফখরুদ্দৌলা বুয়াইহির মৃত্যু
৩৮৭ হিজরিতে ২০ রমজানে বুয়াইহি শাসক ফখরুদ্দৌলা আলী ইবনে রুকনুদ্দৌলার মৃত্যু হয়। তার সময়েই বুয়াইহি শাসনের প্রভাব সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।
তবে তার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার নিয়ে পরিবারের মধ্যে বিরোধ শুরু হয় এবং ধীরে ধীরে এই শক্তিশালী শাসনব্যবস্থার পতনের পথ তৈরি হয়। পরে সেলজুকদের উত্থানের মাধ্যমে বুয়াইহি প্রভাব সম্পূর্ণভাবে শেষ হয়ে যায়।
ইবনে সালাহর ইন্তেকাল
৬৪৩ হিজরির ২০ রমজানে প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ইবনে সালাহর ইন্তেকাল হয়। হাদিসবিজ্ঞানের পরিভাষা ও নীতিমালা সুসংগঠিত করার ক্ষেত্রে তার অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি সহিহ, হাসান ও দুর্বল হাদিসের শ্রেণিবিভাগসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষাকে সুস্পষ্টভাবে বিন্যস্ত করেন। পরবর্তী যুগের অনেক বড় আলেম তার গ্রন্থকে ভিত্তি করে হাদিসবিজ্ঞান অধ্যয়ন করেছেন।
মুল্লা সাদরার মৃত্যু
১০৫০ হিজরির ২০ রমজানে বিখ্যাত দার্শনিক সদরুদ্দিন শিরাজি, যিনি মুল্লা সাদরা নামে পরিচিত, ইন্তেকাল করেন। তিনি ইসলামী দর্শনে হিকমতে মুতাআলিয়া নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাধারার সূচনা করেন, যেখানে যুক্তি, ওহি ও আধ্যাত্মিক উপলব্ধির মধ্যে সমন্বয় করার চেষ্টা করা হয়।
জীবনের এক পর্যায়ে তার চিন্তাধারার কারণে তিনি নির্বাসন ও নির্যাতনের শিকার হন। শেষ পর্যন্ত সপ্তমবার হজ পালনের উদ্দেশ্যে যাত্রাপথে তিনি ইন্তেকাল করেন।
সূত্র : আল জাজিরা