গাইবান্ধা সদর থানায় এজাহার দাখিল করতে গিয়ে বিচারহীনতার শিকার অভিযোগ এনে এক নারী বিষপান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে। পরে এই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে আইজিপি বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
ভুক্তভোগীর অভিযোগ, নির্যাতন ও শ্লীলতাহানির শিকার হয়ে থানায় গেলেও ওসি মামলা না নিয়ে উল্টো স্থানীয়ভাবে মীমাংসার পরামর্শ দেন। এই ঘটনায় ন্যায়বিচার না পেয়ে গত সোমবার (৯ মার্চ) গাইবান্ধা সদর উপজেলার উজির ধরনীবাড়ী এলাকার বাসিন্দা এএইচএম জিয়াউর রহমান খান ডাকযোগে পুলিশ সদর দপ্তরে এই লিখিত অভিযোগপত্র পাঠান। অভিযোগের অনুলিপি একইসঙ্গে গাইবান্ধা জেলা পুলিশ সুপার ও রংপুর রেঞ্জের ডিআইজির কাছেও প্রেরণ করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি জিয়াউর রহমান খানের বাড়ির কেয়ারটেকার মোছা. নূরুন নাহার স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তির হাতে শারীরিক নির্যাতন, মারধর, শ্লীলতাহানি এবং জোরপূর্বক আটকে রাখার শিকার হন। ভুক্তভোগী নারী ন্যায়বিচারের আশায় ১৯ ফেব্রুয়ারি গাইবান্ধা সদর থানায় লিখিত এজাহার দিতে গেলেও ওসি আব্দুল্লাহ আল মামুন আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে তাকে স্থানীয়ভাবে বিষয়টি মীমাংসা করার পরামর্শ দিয়ে এজাহার গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান। যদিও ফৌজদারি কার্যবিধির (সিআরপিসি) ১৫৪ ধারা অনুযায়ী, আমলযোগ্য অপরাধের অভিযোগ পেলে তা এজাহার হিসেবে গ্রহণ করা থানার জন্য বাধ্যতামূলক।
থানা থেকে আইনি প্রতিকার না পেয়ে ভুক্তভোগী চরম মানসিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েন। পরবর্তীতে একটি স্থানীয় সালিশ বৈঠকের আয়োজন করা হলেও সেখানে তিনি কোনো ন্যায়সঙ্গত সমাধান পাননি। সামাজিক চাপ এবং বিচারহীনতার হতাশায় গত ২৫ ফেব্রুয়ারি ওই নারী বিষপান করে আত্মহত্যার চেষ্টা চালান। মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে এবং পরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
এই ঘটনার প্রতিবাদে এবং ন্যায়বিচারের দাবিতে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি গাইবান্ধা প্রেসক্লাবে একটি সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করে ভুক্তভোগীর পরিবার। সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা ওসির এই কর্মকাণ্ডকে আইনের চরম লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করেন এবং আইজিপির হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
অভিযোগকারী এএইচএম জিয়াউর রহমান খান বলেন, নূরুন নাহার গুরুতর নির্যাতনের শিকার হয়ে থানায় গেলেও ওসি তার আইনি দায়িত্ব পালন না করে ভুক্তভোগীকে আত্মহত্যার পথে ঠেলে দিয়েছেন। তিনি এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, আসামিদের গ্রেপ্তার এবং ওসির বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
এ বিষয়ে গাইবান্ধা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ঘটনাটি তদন্ত করে আমরা তেমন সত্যতা পায়নি। পরবর্তীতে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসা হয়েছে এবং ৫২ জনের স্বাক্ষরযুক্ত একটি মীমাংসাপত্র আমার কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। তবে ওই মীমাংসাপত্রে অভিযোগকারী জিয়াউর রহমান খানের স্বাক্ষর আছে কি না, সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত নয় বলে জানান তিনি।
এদিকে স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল মজিদ ও রেবেকা সুলতানা এই ঘটনাকে লজ্জাজনক উল্লেখ করে করে বলেন, থানা যদি সাধারণ মানুষের আশ্রয়ের জায়গা না হয় তবে মানুষ কোথায় যাবে।
এখন পর্যন্ত গাইবান্ধা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য না পাওয়া গেলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আইজিপির কাছে অভিযোগের বিষয়টি তারা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন।
রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি কার্যালয় থেকেও বিষয়টি নজরে নেওয়া হয়েছে এবং জেলা পুলিশের কাছে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।