মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের দামামা বাজতেই বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার মূলে রয়েছে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক আতঙ্ক। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ব্যক্তিগত যানবহনের প্রধান জ্বালানি পেট্রোল নিয়ে এই দুশ্চিন্তার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। গাণিতিক হিসাব ও উৎপাদন সক্ষমতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ পেট্রোল উৎপাদনে কেবল স্বাবলম্বীই নয়, বরং চাহিদার তুলনায় উদ্বৃত্ত রাখার সক্ষমতাও রাখে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বাংলাদেশের পেট্রোল আমদানিনির্ভর কোনো পণ্য নয়। দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উপজাত হিসেবে পাওয়া কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করেই মূলত পেট্রোল উৎপাদন করা হয়। সরকারি প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) এবং বেশ কিছু বেসরকারি রিফাইনারি এই কনডেনসেট থেকে পেট্রোল, অকটেনসহ প্রায় ৪০ ধরনের পেট্রোলিয়াম পণ্য তৈরি করে। অর্থাৎ, সমুদ্রপথে আমদানিতে বিঘ্ন ঘটলেও দেশের অভ্যন্তরীণ পেট্রোল সরবরাহ সচল রাখা সম্ভব।
পরিসংখ্যান বলছে, দেশে পেট্রোল ও অকটেনের বার্ষিক সম্মিলিত চাহিদা প্রায় ৮ থেকে ৮.৫ লাখ টন। বিপরীতে, দেশের রিফাইনারিগুলোর সম্মিলিত উৎপাদন ক্ষমতা বছরে প্রায় ১৬ লাখ টন। এই বিশাল উৎপাদন সক্ষমতা প্রমাণ করে যে, বিদেশি তেলের জাহাজের ওপর পেট্রোলের জন্য আমাদের নির্ভর করতে হয় না। এমনকি অনেক সময় দেশীয় উৎপাদন চাহিদাকে ছাড়িয়ে যায়, যা মজুত ব্যবস্থাপনার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
অনেকের ধারণা অকটেন সম্পূর্ণভাবে বিদেশ থেকে আনতে হয়, যা একটি ভুল ধারণা। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশে উৎপাদিত পেট্রোলের সঙ্গে আমদানিকৃত অকটেন বুস্টার মিশিয়েই উচ্চমানের অকটেন তৈরি করা হয়। ফলে অকটেনের ক্ষেত্রেও আমদানিনির্ভরতা অত্যন্ত সীমিত। যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে অস্থিরতা থাকলেও দেশীয় এই উৎপাদন প্রক্রিয়ার কারণে মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির জ্বালানি সংকটে পড়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।
বাজারে বর্তমানে যে দীর্ঘ লাইন এবং হাহাকার দেখা যাচ্ছে, তার প্রধান কারণ হিসেবে ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কিত হয়ে কেনাকাটাকে চিহ্নিত করেছেন সংশ্লিষ্টরা। যুদ্ধের খবরে সাধারণ গ্রাহকরা প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল সংগ্রহ করছেন। অন্যদিকে, এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী বেশি মুনাফার আশায় কৃত্রিম সংকট তৈরি করে তেলের অবৈধ মজুত গড়ে তুলেছে। সরবরাহ স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও এই মনস্তাত্ত্বিক ও অসাধু তৎপরতাই বাজারে অস্থিরতা উসকে দিয়েছে।
জ্বালানি বিভাগ ও বিপিসির তথ্যমতে, শুধু পেট্রোল নয়, আমদানিনির্ভর ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলের সরবরাহও নিশ্চিত করা হয়েছে। বর্তমানে বন্দরে জাহাজ খালাস চলছে এবং আগামী মাসগুলোতে পর্যাপ্ত পরিমাণ কার্গো আসার শিডিউল চূড়ান্ত রয়েছে। এমনকি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য প্রায় ৫০ দিনের ফার্নেস অয়েলের মজুত হাতে রয়েছে। চীনা জাহাজের ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা না থাকায় আন্তর্জাতিক নৌ-পথে তেল পরিবহনেও বড় ধরনের কোনো বাধার আশঙ্কা দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের পেট্রোল খাত মূলত দেশীয় সম্পদের ওপর দাঁড়িয়ে। সরবরাহ ব্যবস্থা নিরবচ্ছিন্ন থাকায় এবং উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদার দ্বিগুণ হওয়ায় সাধারণ মানুষের আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। বাজার নিয়ন্ত্রণ ও গুজব প্রতিরোধ করা সম্ভব হলে দ্রুতই পাম্পগুলোর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে।