‘সময়টা আমি তখন ষষ্ঠ বা সপ্তম শ্রেণিতে পড়ি। আমাদের জেলায় প্রথম নারী জেলা প্রশাসক (ডিসি) এসেছিলেন। তার হাত থেকে পুরস্কার নেওয়ার পরই মনে হয়েছিল, আমিও একদিন ডিসি হব।’
নিজের সেই স্বপ্নযাত্রার গল্প বলতে গিয়ে এমনটাই জানান চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাহমিনা আক্তার। আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, শুধু সন্তান লালন-পালনে সীমাবদ্ধ না থেকে নারীদের স্বাবলম্বী হতে হবে এবং কর্মজীবনে যুক্ত হতে হবে।
তাহমিনা আক্তার জানান, তার পরিবার চেয়েছিল তিনি চিকিৎসক হোন। সে কারণে শুরুতে মেডিকেলে ভর্তির প্রস্তুতিও নিয়েছিলেন। তবে নিজের ইচ্ছা ছিল প্রশাসনে কাজ করার। মেডিকেলে সুযোগ না পাওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দেওয়ার লক্ষ্যেই প্রস্তুতি নিতে থাকেন।
বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতির অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘বিসিএস পরীক্ষার কথা ভাবলেই শুরুতে ভয় লাগত। এত পরীক্ষার্থীর মধ্যে সুযোগ পাওয়া কঠিন মনে হতো। প্রথমবার সফল হইনি। কিন্তু হতাশ না হয়ে আবার চেষ্টা করেছি। পরে ৩৫তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে সুযোগ পাই।’
কর্মজীবনের শুরুতে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। প্রথম কর্মস্থলের অভিজ্ঞতা স্মরণ করে তাহমিনা আক্তার বলেন, শুরুটা ছিল বেশ কঠিন। অনেক সময় ছুটির দিনেও কাজ করতে হয়েছে। কখনো কখনো মনে হয়েছে এই চাকরি হয়তো করা সম্ভব হবে না। তবে সময়ের সঙ্গে সেই চ্যালেঞ্জগুলোই অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়েছে।
প্রশাসনে নারীদের জন্য কিছু আলাদা চ্যালেঞ্জও রয়েছে বলে মনে করেন এই কর্মকর্তা। তার ভাষ্য, অনেক সময় সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রচলিত মানসিকতার কারণে নারীদের নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণে অতিরিক্ত চাপ নিতে হয়। মাঠপর্যায়ে কাজের সময় নিরাপত্তা ও দীর্ঘ কর্মঘণ্টাও চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। পাশাপাশি পরিবার ও কর্মজীবনের ভারসাম্য রক্ষা করাও অনেকের জন্য কঠিন হয়ে ওঠে।
মাঠ প্রশাসনে কাজ করার সময় মানুষের আচরণেও কিছু ভিন্নতা লক্ষ্য করেছেন বলে জানান তিনি। তাহমিনা আক্তার বলেন, এখনো অনেকের ধারণা প্রশাসনিক পদে পুরুষ কর্মকর্তাই থাকবেন। কখনো কখনো কেউ এসে জিজ্ঞেস করেন—“স্যার নেই?” যা সমাজে নারীর গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টি এখনো পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি বলেই ইঙ্গিত করে।
আনোয়ারা উপজেলায় দায়িত্ব গ্রহণের পর নারীদের উন্নয়নে নেওয়া উদ্যোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আনোয়ারা বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য বিশ্রাম কক্ষ, স্যানিটারি ন্যাপকিন ও প্রাথমিক চিকিৎসা সরঞ্জামের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া নারী ইউপি সদস্যদের বিভিন্ন প্রকল্পে অগ্রাধিকার দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মানসিক চাপ সামাল দেওয়ার উপায়
কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ বা স্ট্রেস কীভাবে সামাল দেন এমন প্রশ্নের জবাবে তাহমিনা আক্তার বলেন, ‘স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট যার যত ভালো, সে সেভাবেই ওই সময়টা কাটিয়ে উঠতে পারে। এ ক্ষেত্রে পরিবারের সমর্থন খুব গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি সরকারের উচিত কর্মকর্তাদের মানসিকভাবে সহায়তা দেওয়া, কাউন্সেলিংয়ের জন্য চিকিৎসকের ব্যবস্থা করা এবং কিছুদিন পরপর ছুটির সুযোগ রাখা।’
প্রশাসনে নারীদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সরকারের আরও কী উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘প্রশাসনে কর্মরত নারীদের মাতৃত্বকালীন সময়টাতে অনেক কিছু পরিকল্পনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। যদিও সরকার নির্ধারিত ছুটি রয়েছে, তবুও আমার মনে হয় এ বিষয়টিতে সরকারের আরও নজর দেওয়া দরকার।’
তরুণীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, প্রশাসনে আসতে চাইলে আগে নিজের বিষয়ভিত্তিক পড়াশোনা ভালোভাবে শেষ করতে হবে। অনেকেই আগে থেকেই বিসিএস প্রস্তুতিতে ঝুঁকে পড়েন, যা তিনি সমর্থন করেন না।
আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে দেশের নারীদের উদ্দেশ্যে তাহমিনা আক্তার বলেন, ‘নারীদের স্বাবলম্বী হতে হবে। পড়াশোনা করতে হবে, চাকরি করতে হবে কিংবা উদ্যোক্তা হতে হবে। নিজের জীবিকা নিজে নির্বাহ করতে পারে, এমন অবস্থানে পৌঁছানোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’
উল্লেখ্য, তাহমিনা আক্তার ২০১৭ সালের ২ মে সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যোগ দেন। পরে ২০২৪ সালের ২৮ নভেম্বর তিনি আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ৩৫তম বিসিএসের এই কর্মকর্তা শেরপুর জেলার বাসিন্দা।