Image description

গত এক বছরে দেশে ধর্ষণের মামলার সংখ্যা ২৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। তাদের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে দায়ের করা মোট মামলার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার ৯৩৯টি। এর মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশই ধর্ষণের অভিযোগ।

এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মধ্যে রোববার (৮ মার্চ) দেশে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এবারে দিবসটির প্রতিপাদ্য, ‘আজকের পদক্ষেপ, আগামীর ন্যায়বিচার: সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার’।

সম্প্রতি ঢাকার চারটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলোতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভুক্তভোগী নারীদের মানসিক কষ্ট চোখে পড়ার মতো। কক্ষে জায়গার অভাব, মামলার নাম্বার ডাকা, মাইক্রোফোন না থাকা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। অনেক নারী বারান্দার বেঞ্চে বসে বিচার প্রক্রিয়ার অংশ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলেন।

এক তরুণী বাদী জানান, তিনি সাবেক প্রেমিকের বিরুদ্ধে প্রতারণামূলক ধর্ষণের মামলা করেছেন। আদালতে দাঁড়াতে গিয়ে তিনি চোখ ঢেকে কেঁদে ফেলেন। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা বেড়ে ২৫ শতাংশ।

দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে। পাবনায় কিশোরীকে হত্যা করে ধর্ষণ করা হয়েছে, নরসিংদীতে দলবদ্ধ ধর্ষণ ঘটেছে এবং সীতাকুণ্ডে সাত বছরের শিশুর ওপর শারীরিক সহিংসতার পর হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার অনেকটিতেই মামলা হয়েছে, কিছুতে হয়নি।

নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়, এটা সবার দায়িত্ব। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় সামাজিক, প্রশাসনিক ও গণমাধ্যমের অংশগ্রহণ অপরিহার্য।

উচ্চ আদালতের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৯৯টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ১ লাখ ৩২ হাজার ১০৭টি মামলা বিচারাধীন ছিল। এর মধ্যে ৫ বছরের বেশি সময় ধরে বিচারাধীন মামলা ৩০ হাজার ৩৬৫টি।

নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন পারভীন হক জানান, নারীর ওপর সহিংসতা যেন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে গেছে। তিনি বলছেন, নারীকে মানুষ হিসেবে চিনতে, সম্মান করতে এবং জাতীয় সমস্যার হিসেবে মানতে হবে। এছাড়া সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে সহিংসতা বন্ধে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

গত পাঁচ বছরে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে দুবার সংশোধন আনা হয়েছে। ধর্ষণের মামলায় সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড। ডিএনএ পরীক্ষার বাধ্যবাধকতা কিছু ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হয়েছে এবং বিচার প্রক্রিয়ার সময় কমিয়ে আনা হয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন বলেন, নারী নির্যাতনের মামলা তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া সঠিকভাবে হচ্ছে কি না তা নজরে রাখা জরুরি। ভুক্তভোগীর আর্থিক, আইনগত ও স্বাস্থ্যগত সহায়তা নিশ্চিত করা, সাক্ষী সুরক্ষা এবং তদন্ত প্রক্রিয়ার তদারকি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

তিনি মনে করেন, নিরাপদ ও সম্মানজনক সমাজ গঠনের জন্য, শুধু আইন নয়, সামাজিক সচেতনতা ও সক্রিয় অংশগ্রহণই পারে নারী ও কন্যাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে।