Image description

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির ‘আর্ট অব বাংলাদেশ’ সিরিজের ‘দেবদাস চক্রবর্তী’ বইটির প্রকাশকাল ২০০৩ সালের জুন। সেই সময়ের হিসাবে বইটির বাজারদর হওয়ার কথা ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। পুনর্মুদ্রণ না হলেও ২০২৬ সালে পুরোনো সেই বইয়ে ৪০০ টাকার ট্যাগ সাঁটিয়ে বিক্রি করছে সরকারি প্রতিষ্ঠানটি।

প্রকাশনার এত বছর পর বইয়ে নতুন ট্যাগ সাঁটিয়ে বিক্রির এমন ঘটনায় ক্ষোভ জানিয়েছেন পাঠকরা। সাহিত্য ও প্রকাশনা শিল্প সংশ্লিষ্টরা তো একে ‘অনৈতিক’ ও ‘অসততা’ আখ্যা দিয়েছেন।

বইমেলায় শিল্পকলার স্টলে গিয়ে প্রখ্যাত শিল্পী মুর্তজা বশীরকে নিয়ে ২০০৪ সালে প্রকাশিত বইয়ের ক্ষেত্রেও দেখা যায় একই অবস্থা। মুর্তজা বশীর নামে বইটির দাম ১৫০ থেকে ২০০ টাকার মধ্যে। তবে পুরোনো দাম ঢেকে তার উপর ৪০০ টাকার ট্যাগ সাঁটানো হয়েছে।

শিল্প-সাহিত্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দশকের বেশি পুরোনো একাধিক বইতে এভাবে বেশি দামের ট্যাগ সাঁটিয়ে বিক্রি করছে শিল্পকলা একাডেমি। অথচ এসব বই পুনর্মুদ্রণ বা নতুন সংস্করণ প্রকাশ হয়নি। এরপরও প্রিন্টার্স লাইনে পুরোনো দামের ওপর নতুন ট্যাগ সাঁটিয়ে দ্বিগুণ বা তারও বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে। সরকারি একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের এমন কাণ্ড বিস্ময় ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

‘এমনিতেই দাম বেশি হওয়ায় মানুষ বই কিনতে চায় না। তার ওপর সরকারি প্রতিষ্ঠানের এমন আচরণ বইয়ের প্রতি মানুষের অনীহা আরও বাড়াবে। এর বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।’

এ বিষয়ে কথাসাহিত্যিক ও কবি কাজল শাহনেওয়াজ বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা ছাড়া বইয়ের আগের মূল্যের ওপরে এভাবে স্টিকার মেরে দাম বাড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়। বাংলা একাডেমি থেকে তো এখনও অনেক পুরোনো বই ১০০ টাকা বা তার চেয়েও কমে কিনতে পারি। যদি দাম বাড়াতেই হয়, তবে কেন বাড়ানো হচ্ছে তা স্টিকারে বা অন্য কোনোভাবে স্পষ্ট করে লিখে দেওয়া উচিত ছিল।’

কথাসাহিত্যিক জিয়া হাসানের মতে, সরকারি প্রতিষ্ঠানে এমন কাজ সম্পূর্ণ অনৈতিক। তিনি বলেন, ‘এমনিতেই দাম বেশি হওয়ায় মানুষ বই কিনতে চায় না। তার ওপর সরকারি প্রতিষ্ঠানের এমন আচরণ বইয়ের প্রতি মানুষের অনীহা আরও বাড়াবে। নতুন প্রোডাকশন হলে দাম যা খুশি হতে পারত, কিন্তু পুরোনো বইয়ের ক্ষেত্রে মূল দামে বিক্রি করাই উচিত। এর বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।’

‘সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে বছরের হিসাব বছরেই ক্লোজ করা হয়। ওই পুরোনো বইয়ের হিসাব তো অনেক আগেই শেষ। এখন যে স্টিকার সাঁটিয়ে দাম বাড়ানো হলো, এই বাড়তি টাকার হিসাব তারা কীভাবে মেলাবেন?’

প্রকাশনা সংস্থা ‘গ্রন্থিক’-এর প্রকাশক রাজ্জাক রুবেল একে অসততা হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ‘বইটি পুনর্মুদ্রণ করলে দাম বাড়ানোর বিষয়টি মেনে নেওয়া যেত। কিন্তু এত পুরোনো বই এভাবে স্টিকার বসিয়ে বিক্রি করা যায় না। বাংলা একাডেমি থেকে আমরা এখনও ৩০ বা ৪০ টাকা দিয়ে অনেক পুরোনো বই কিনি।’

এর পেছনে প্রশাসনিক ও আর্থিক অস্বচ্ছতার বিষয়টি সামনে এনে অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক কেয়া বোস স্ট্রিমকে বলেন, ‘২০০৩ বা ২০০৪ সালের বইয়ের গায়ের মূল্যে স্টিকার লাগিয়ে বিক্রি করা পাঠকের সঙ্গে এক রকম বিশ্বাসঘাতকতা। তা ছাড়া সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে বছরের হিসাব বছরেই ক্লোজ করা হয়। ওই পুরোনো বইয়ের হিসাব তো অনেক আগেই শেষ। এখন যে স্টিকার সাঁটিয়ে দাম বাড়ানো হলো, এই বাড়তি টাকার হিসাব তারা কীভাবে মেলাবেন?’

বিষয়টি শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদের নজরে আনলে তিনি জানেন না বলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। স্ট্রিমকে বলেন, ‘এটি তো আমার দায়িত্ব নেওয়ার আগের ঘটনা। সঠিক জানি না, খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে।’

তবে শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদ শিল্পকলার মহাপরিচালকের দায়িত্ব নেন ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫।

পরে শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আগের বইগুলোতে তারা কীভাবে কী করেছে, ওই বিভাগের কোনো অনুমতি ছিল কি না—সব আমাকে জানতে হবে। অনুমতি ছাড়া তো স্টিকার লাগাতে পারবে না। আমি অন্যদের বিষয়টি অবহিত করছি এবং জেনে বিস্তারিত জানাব।’

এ বিষয়ে শিল্পকলা একাডেমির আর কারও বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। একাডেমির গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের উপপরিচালক (চলতি দায়িত্ব) এস এম শামীম আকতার এবং সহকারী পরিচালক (গবেষণা) রিফাত ফারহানার মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও তারা সাড়া দেননি।