সারাদেশে সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য আবারও বেড়েছে। চাঁদার দাবিতে গুলি চালানো, ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানো, ইলেকট্রিক শক দেয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে প্রায়ই। এমন পরিস্থিতিতে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তালিকা তৈরি করে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি নিচ্ছে। পাশাপাশি পুলিশ সদর দফতর রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না রেখে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
কোটি টাকা চাঁদা না পেয়ে পুলিশ পাহারায় থাকা চট্টগ্রামের এক ব্যবসায়ীর বাসায় মুহুর্মুহু গুলি চালানোর ঘটনা সম্প্রতি সারাদেশে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। শুধু চট্টগ্রাম নয়, ঢাকাতেও চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের উৎপাত বেড়েছে।
মোহাম্মদপুরে চাঁদাবাজি ও বোরকা পরে এক সমন্বয়ককে কোপানোর ঘটনায় শীর্ষ সন্ত্রাসী কিলার বাদলের নাম এসেছে। ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, বোরকা পরা লোক ছিল। আমি পরবর্তী মুহূর্তে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম।
মূলত জাতীয় নির্বাচনের পর থেকেই মোহাম্মদপুরে চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের কার্যক্রম আবারও বেড়েছে। একের পর এক প্রতিষ্ঠানে গিয়ে চাঁদা দাবি, না পেলে হামলা, কোপানো এবং ইলেকট্রিক শক দেয়ার ঘটনা ঘটছে। টার্গেট কিলিংয়ের চেষ্টাও হয়েছে।
গত ২১ ফেব্রুয়ারি আদাবরে চাঁদা না পেয়ে এমব্রয়ডারি ফ্যাক্টরির তিন কর্মচারীকে কুপিয়ে জখম করে ১০ থেকে ১২ জন। চাঁদা না পেয়ে বসিলার সিটি হাউজিংয়ে দোকান কর্মচারীকে ইলেকট্রিক শক দেয়া হয়। যদিও প্রধান অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়েছে, হুমকি-ধমকি বন্ধ হয়নি। ভুক্তভোগী বলেন, ‘ভয় কাজ করেছে। ওরা তো বাইরে আছে। এখন কোথায় আছে আমরা ঠিক জানি না। রাস্তাঘাটে চলার সময় একেবারে নিরাপদ নই।’
ভুক্তভোগীরা বলছেন, শীর্ষ সন্ত্রাসী কিলার বাদল সিন্ডিকেট আইনের আওতায় আসার পরই তারা নিরাপদ বোধ করবেন।
আর সাধারণ মানুষ বলছেন, পরিস্থিতি সত্যিই ঝুঁকিপূর্ণ। সব সময় ভয়ে ভয়ে থাকতে হচ্ছে। ছেলে-মেয়ে আছে, সবাইকে নিয়ে শান্তিতে থাকতে চাই।
পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে তিন হাজার অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায় ৪০১ জন, যার মধ্যে ১৫ শীর্ষ সন্ত্রাসী। চট্টগ্রামে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৩৩০ জন। এমন পরিস্থিতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজদের তালিকা তৈরি করে অভিযানের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, তালিকা প্রণয়ন করা হচ্ছে, অভিযুক্ত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।
এরইমধ্যে মার্কেট, কাঁচাবাজার, ঘাট, ফুটপাত, ভাসমান দোকানসহ বিভিন্ন জায়গায় নিয়মিত চাঁদাবাজ ও পৃষ্ঠপোষকদের তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছে ডিএমপি। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম বলেন, চাঁদা কারা তুলছে, কারা নেপথ্যে আছে, কারা পৃষ্ঠপোষক-সবই তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে। আমাদের নিজস্ব গোয়েন্দা সংস্থা এমআই-৭৬ এই কাজে নিযুক্ত। এছাড়া ডিজিএফআই, এনএসআইসহ অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থা কাজ করছে। দলমত নির্বিশেষে সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজরা রাজনৈতিক আশ্রয় পান, তাই পরিস্থিতি ভালো হচ্ছে না। সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, চাঁদাবাজিসহ জোরপূর্বক অপরাধে রাজনৈতিক আশ্রয় বন্ধ করলে এ ধরনের অপরাধ কমবে।
এদিকে, চাঁদাবাজি রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জড়িত সদস্যদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও অপরাধ বিশ্লেষকরা।