Image description

ইরানের বড় ধরনের বাঁকবদলের সময়গুলোতে হাসান রুহানির নাম প্রায়ই ফিরে আসে—এমনকি যখন তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রে থাকেন না তখনও। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর ইসলামি প্রজাতন্ত্রটি এখন এক স্পর্শকাতর রূপান্তরকালীন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। এমন অবস্থায় অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি শান্ত করতে বা রাষ্ট্রব্যবস্থার ভেতরে ক্ষমতার ভারসাম্য ফেরাতে কোন নেতাদের কাজে লাগানো হতে পারে, সেই প্রশ্নটিই এখন আলোচনার কেন্দ্রে।

ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট (২০১৩-২০২১) এবং আইনে ডক্টরেট ডিগ্রিধারী মুসলিম নেতা হাসান রুহানি সেই রাষ্ট্রব্যবস্থার কাছে বাইরের কেউ নন, যে ব্যবস্থাকে তিনি একসময় 'সংস্কার' করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। মূলত তিনি এই ব্যবস্থারই একটি ফসল: তিনি দীর্ঘদিনের একজন সংসদ সদস্য, জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোর একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব এবং সাবেক প্রধান পরমাণু আলোচক, যিনি কূটনীতির মাধ্যমে অর্থনৈতিক স্বস্তি আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে একজন বাস্তববাদী নেতা হিসেবে ২০১৩ সালে প্রেসিডেন্ট পদে আসীন হয়েছিলেন।

পার্লামেন্টের দীর্ঘ পথচলা

রুহানি ১৯৪৮ সালে ইরানের সেমনান প্রদেশের সোরখেহ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি 'হাওজা' ব্যবস্থায় (ইসলামি ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র) ধর্মীয় প্রশিক্ষণ নেন, এরপর তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেন এবং ১৯৯৯ সালে গ্লাসগো ক্যালেডোনিয়ান ইউনিভার্সিটি থেকে আইনে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে তিনি পার্লামেন্টের মাধ্যমেই নিজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার গড়ে তোলেন। ১৯৮০ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে তিনি টানা পাঁচ মেয়াদে মজলিস (ইরানের আইনসভা)-এর সদস্য নির্বাচিত হন, যা তাকে ব্যবহারিক রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং অভিজাত শ্রেণির মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ করে দেয়।

তার এই অতীত অভিজ্ঞতাই ব্যাখ্যা করে কেন পরবর্তীকালে তিনি একজন আদর্শিক সংঘাতময় নেতার চেয়ে বরং 'ঐকমত্যের মানুষ' বা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি হিসেবে পরিচিতি পান: এমন একজন মানুষ, যিনি নিয়মের বাইরে গিয়ে নয়, বরং নিয়মের গণ্ডির ভেতরে থেকেই কাজ করেন।

বিপ্লব-পরবর্তী ইরানের রাজনীতিতে 'তৃতীয় পথ'

রুহানির রাজনৈতিক সত্তাকে বুঝতে হলে ১৯৭৯-পরবর্তী ইসলামি প্রজাতন্ত্রের আদর্শিক স্রোতের দীর্ঘ ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে তাকে বিচার করা প্রয়োজন। ইরানের রাজনৈতিক আলোচনায় একে প্রায়ই বিভিন্ন 'আদর্শের' প্রতিযোগিতামূলক ধারাবাহিকতা হিসেবে বর্ণনা করা হয়, তবে তা সর্বদা বিপ্লব এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার ধর্মীয়-সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।

ইরান এমন কয়েকটি পর্যায় পার করেছে যেখানে ভিন্ন ভিন্ন বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে: এসব স্রোতকে কখনও 'ইসলামি বামপন্থা', কখনও 'ইসলামি উদারনীতিবাদ' এবং সাবেক নেতা হাশেমি রাফসানজানির আমলে বাজারমুখী অর্থনীতি হিসেবে দেখা গেছে। এরপর মোহাম্মদ খাতামির সময়ে 'ইসলামি গণতন্ত্র' এবং 'সুশীল সমাজ'-এর যুগ আসে; যার পর মাহমুদ আহমাদিনেজাদের অধীনে সামাজিক ন্যায়বিচার ও জনতুষ্টিবাদের (পপুলিজম) উত্থান ঘটে।

ঠিক এমন একটি সময়েই 'এতেদাল' বা 'মধ্যপন্থা'-র বুলি নিয়ে রুহানির আবির্ভাব ঘটে।

এই কাঠামোর মধ্যে 'মধ্যপন্থা' হলো সেই দুই স্তম্ভের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা, যাকে সমর্থকরা ব্যবস্থার ভিত্তি মনে করেন: একটি হলো 'প্রজাতন্ত্র' (বাস্তববাদ, সুশাসন, জবাবদিহিতা) এবং অন্যটি 'ইসলামি' (আদর্শ, ধর্মীয় পণ্ডিতদের কর্তৃত্ব, বৈপ্লবিক পরিচয়)। এই ভারসাম্য রক্ষা করাই ২০১৩ সালে রুহানির নির্বাচনী প্রচারণার মূল বিষয় হয়ে ওঠে: তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে, তিনি ইরানের নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা সেই চূড়ান্ত ক্ষমতার কাঠামোকে কোনো ধরনের চ্যালেঞ্জ না করেই বহির্বিশ্বের চাপ কমাবেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পুনরায় শুরু করবেন এবং অভ্যন্তরীণ মেরুকরণ কমিয়ে আনবেন।

আলোচক এবং প্রেসিডেন্ট

২০০৩ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে 'ইউরোপীয় ত্রয়ী' (ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং জার্মানি)-এর সাথে পরমাণু আলোচনায় রুহানি ইরানের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন। পশ্চিমা কূটনীতিকদের কাছে তিনি একজন 'বাস্তববাদী' নেতা হিসেবে সুখ্যাতি অর্জন করেন, অন্যদিকে ইরানের কট্টরপন্থিরা তার বিরুদ্ধে অতিরিক্ত ছাড় দেওয়ার অভিযোগ তোলেন। পরবর্তীকালে, তার এই অভিজ্ঞতাই ২০১৩ সালের নির্বাচনী প্রচারণার প্রধান হাতিয়ার হয়ে ওঠে: সংঘাত সৃষ্টিকারীর বদলে একজন আলোচক হিসেবে।

সেই বছরের জুনে ব্যাপক ভোটাধিকার প্রয়োগের এক নির্বাচনে রুহানি ৫০ শতাংশেরও বেশি ভোট পেয়ে প্রথম ধাপেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং রান-অফ (দ্বিতীয় দফার ভোট) এড়াতে সক্ষম হন। রুহানির সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তি বা 'জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন' (জেসিপিওএ), যা ইরান এবং পি৫+১ (যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন)-এর মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়।

এই চুক্তির অধীনে, যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররা ইরানের ওপর আরোপিত বেশিরভাগ নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় এবং তেহরানকে ১০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি আটকে থাকা সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সুযোগ দেয়। এর বিনিময়ে, ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচিতে বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা আনতে রাজি হয়। দেশের অভ্যন্তরে, অর্থনীতিকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের উপায় হিসেবে এই চুক্তিকে সবার সামনে তুলে ধরেন রুহানি।

২০১৭: দ্বিতীয় মেয়াদ—এবং ট্রাম্পের সাথে প্রথম সংঘাত

২০১৭ সালের মে মাসে প্রায় ৫৭ শতাংশ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় মেয়াদে জয়লাভ করেন রুহানি। ইরানের ভেতরের অনেকেই এই ফলাফলকে দেশটির জনগণের অব্যাহত 'উন্মুক্তকরণ' এবং বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্নতা কমানোর পক্ষের রায় হিসেবে দেখেছেন। কিন্তু ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার সমীকরণে কোনো পরিবর্তন আসেনি। প্রেসিডেন্ট কেবল দৈনন্দিন শাসনকাজ পরিচালনা করেন, কিন্তু নিরাপত্তা বাহিনী, বিচার বিভাগ, রেভল্যুশনারি গার্ড বা মূল মিডিয়া কাঠামোর বিষয়ে তিনি একাই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না।

কূটনীতির এই সুবাতাস দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ২০১৮ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে জেসিপিওএ (পরমাণু চুক্তি) থেকে ওয়াশিংটনকে সরিয়ে নেন এবং নতুন করে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন, যা রুহানির প্রতিশ্রুত অর্থনৈতিক অর্জনকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করে। এই পটপরিবর্তন ইরানের বাস্তববাদী ও সংস্কারপন্থিদের দুর্বল করে দেয়, যারা বিচ্ছিন্নতা থেকে বেরিয়ে আসার সেরা পথ হিসেবে চুক্তিটিকে রক্ষায় নিজেদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার বাজি রেখেছিলেন। অন্যদিকে এটি কট্টরপন্থিদের হাতে নতুন অস্ত্র তুলে দেয়, যারা দাবি করতে থাকেন যে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনা করে কখনোই দীর্ঘস্থায়ী স্বস্তি পাওয়া সম্ভব নয়।

প্রেসিডেন্ট-পরবর্তী সময়—এবং রাজনৈতিক নির্বাসন থেকে প্রত্যাবর্তন?

২০২১ সালে রুহানির প্রেসিডেন্সির মেয়াদ শেষ হয় এবং ইরানের রাজনীতিতে কট্টর রক্ষণশীলদের আধিপত্য বাড়ার সাথে সাথে তাকে ধীরে ধীরে কোণঠাসা হতে দেখা যায়। এরপর তিনি ইরানের 'অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস'-এর সদস্য হন—যে বডি সাংবিধানিকভাবে সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের ক্ষমতা রাখে। কিন্তু ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে রয়টার্স জানায় যে, গার্ডিয়ান কাউন্সিল রুহানিকে 'অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস'-এর নির্বাচনে পুনরায় প্রার্থী হতে বাধা দিয়েছে।

এর দুই বছর পর, ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলায় খামেনির মৃত্যুর পর, সংবিধান অনুযায়ী দেশটি একটি অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থায় প্রবেশ করে, যা 'অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস' নতুন নেতা নির্বাচন না করা পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি গোলাম-হোসেন মোহসেনি-এজেই এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের সদস্য আয়াতুল্লাহ আলিরেজা আরাফিকে নিয়ে একটি অন্তর্বর্তীকালীন নেতৃত্ব পরিষদ গঠিত হয়েছে, যারা পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতার নাম ঘোষণার আগ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবেন।

আর সর্বোচ্চ নেতা পদে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে ইরানের অভিজাত মহলে যে ফিসফাস ও গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, সেখান থেকেই রুহানির নাম পুনরায় সামনে এসেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনৈতিক জীবনে তার এই সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন প্রমাণ করে যে, ইরানের উপদলীয় সমীকরণে রুহানি ঠিক কীসের প্রতিনিধিত্ব করেন: এমন একটি শাসনব্যবস্থা যা কৌশলগত আপস, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা এবং নিয়ন্ত্রিত সম্পৃক্ততাকে অগ্রাধিকার দেয়—একই সাথে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সাংবিধানিক-ধর্মীয় কাঠামোর প্রতি সম্পূর্ণ অনুগত থাকে।

খামেনির উত্তরসূরি নির্বাচনের পরিকল্পনা করার সময় ইরান একটি বড় প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছে: বাস্তববাদী নেতাদের অন্তর্ভুক্ত করে সরকারের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো হবে, নাকি 'নিরাপত্তাই প্রথম' নীতিতে আরও কঠোর অবস্থান নেওয়া হবে? রুহানি ঠিক এই মোড়েই দাঁড়িয়ে আছেন—তিনি এই ব্যবস্থার রূপকার নন এবং এখন আর প্রধান সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীও নন, কিন্তু তিনি এই ব্যবস্থার এমন একটি দীর্ঘস্থায়ী নির্দেশক, যা প্রমাণ করে যে না ভেঙেও ইরানের এস্টাবলিশমেন্ট (ক্ষমতা কাঠামো) ঠিক কতটা নমনীয় হতে পারে।

সূত্র : আল জাজিরা