Image description

প্রিয় পাঠক, দেখুন তো, লেখাগুলোর কথা মনে পড়ে কি না :

‘ব্যক্তির দুর্নীতির খেসারত ব্যক্তির শাস্তিতে শেষ হয় না, তার দায় ভোগ করে দেশ, প্রজন্মের পর প্রজন্ম। ব্যক্তির দুর্নীতি তাই রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক বিপর্যয় ঘটিয়ে ফেলে। রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে, অর্থনীতির ভিত ধসে যেতে পারে।’

কিংবা : ‘তুড়ি মেরে ধনী হওয়াই হাল আমলের বাংলাদেশের নতুন প্যারাডক্স বা ধাঁধা।

... কিন্তু গত দুই দশকে দুর্নীতি, প্রতারণা, ব্যাংক লোপাট, সড়ক-সেতুতে বাঁশ দেওয়া উন্নয়ন বদলে দিচ্ছে বাংলাদেশ প্যারাডক্সকে। কালা টাকা ধলা মুখ নিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। রাতারাতি ধনী হওয়ার তাড়না যে কতজনকে পোড়াচ্ছে!... আজ হোক, কাল হোক, চাক ভেঙে মধু খাওয়া ভালুকদের থামাতেই হবে।’

প্রথম বয়ানটি ২০২৪ সালের ১২ জুলাই দৈনিক সমকালে ছাপা হওয়া ‘দুই স্ত্রীর গল্প অথবা ভালো জিন খারাপ জিন’ শিরোনামের নিবন্ধ থেকে নেওয়া।

আর দ্বিতীয়টি আরো আগে ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২১ তারিখে দৈনিক প্রথম আলোয় ছাপা হওয়া ‘তুড়ি মেরে ধনী হব, কে ঠেকাবে’ শীর্ষক নিবন্ধ থেকে পাওয়া।

নিবন্ধ দুটির লেখক সিনিয়র সাংবাদিক ফারুক ওয়াসিফ। দুর্নীতির বিরুদ্ধে এভাবে তীব্র-তীক্ষ বয়ান সাংবাদিকজীবনে বহুবার ঝেড়েছেন তিনি। এখন তিনি প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের (পিআইবি) মহাপরিচালক পদে আসীন।

সদ্য বিগত অন্তর্বর্তী সরকার তাঁকে একটি জাতীয় দৈনিকের প্ল্যানিং এডিটর থেকে ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বের রাষ্ট্রের

সাংবাদিকতাবিষয়ক সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান পিআইবির সর্বোচ্চ পদে বসায়।

কথায় আছে, কারো সততা-নৈতিকতা পরীক্ষার জন্য প্রথমে তার হাতে টাকা দাও, তারপর দাও ক্ষমতা; দেখো সে কী করে!

আমরা দেখছিলাম। দেড় বছর ধরে দেখতে দেখতে সেই পরীক্ষার রেজাল্ট এখন কালের কণ্ঠের হাতে। প্রিয় পাঠক, চলুন দেখে আসি একজন দুর্নীতিবিরোধী কলমসৈনিকের পরীক্ষার খতিয়ান :

দুই দিনে ২৪ লাখ : তার আগে দেখা যাক, পিআইবি আসলে কী কী কাজ করে থাকে। প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি) আইন-২০১৮-এ বলা আছে, সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান পিআইবির কাজ মূলত সাংবাদিকতা বিষয়ে গবেষণা, প্রকাশনা এবং দেশব্যাপী সাংবাদিকদের পেশাগত মানোন্নয়নে প্রশিক্ষণ দেওয়া।

আরো কিছু দায়িত্বসহ সংবাদপত্র, বার্তা সংস্থা, রেডিও, টেলিভিশন, তথ্যকেন্দ্র এবং গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের উপদেশক ও পরামর্শক সেবা প্রদান করাও পিআইবির কাজের অংশ।

গত বছর ১৮ ও ১৯ ফেব্রুয়ারি। এই দুই দিনে পিআইবিতে ‘তারুণ্যের উৎসব ২০২৫’ কেন্দ্রিক বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠানের নামে বিপুল টাকা খরচ দেখানো হয়। এর মধ্যে চারটি অনুষ্ঠানের বিপরীতে পিআইবির তৈরি বিল-ভাউচার কালের কণ্ঠ সংগ্রহ করেছে। নথিগুলো ঘেঁটে দেখা গেছে, অনুষ্ঠান চারটির ব্যয়বিবরণী দেওয়া হয়েছে যথাক্রমে এ রকম :

ফারুক ওয়াসিফ, আপনিও!

১. ‘তারুণ্যের উৎসব ২০২৫’ উপলক্ষে সংগীতসন্ধ্যা। নথিতে এটির তারিখ লেখা হয়েছে ১৮-১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫; স্থান : পিআইবি অডিটরিয়াম। মোট ব্যয় : ৫,৭৩,০০০ টাকা।

২. ‘জুলাই অভ্যুত্থানের চলচ্চিত্র, আলোকচিত্র, গ্রাফিতি ও ভিডিও প্রদর্শনী’, তারিখ : ১৮-১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫। মোট ব্যয় : ৪,৬৭,৫০০ টাকা।

৩. ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান : সংহতি ও প্রত্যাশা’ শীর্ষক সেমিনার। তারিখ : ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫। মোট ব্যয় ৬,৯১,৫০০ টাকা।

এর মধ্যে ২০০ জন অংশগ্রহণকারীর ভাতা এক হাজার টাকা করে মোট দুই লাখ টাকা। তালিকায় ভাতার সঙ্গে অংশগ্রহণকারীদের ‘ট্রেনিংসামগ্রী প্রাপ্তি’ নামের ঘর করে সেখানে ‘ফোল্ডার, কলম, নোটবুক ইত্যাদি’ দেওয়া হয়েছে বলা আছে। প্রত্যেকের প্রাপ্তির ঘরে ১০ টাকার রাজস্ব স্ট্যাম্পও লাগানো হয়েছে।

আরো আছে, ঢাকার বাইরে থেকে আসা ৫০ জন অংশগ্রহণকারীর যাতায়াত ভাতা দুই হাজার টাকা করে মোট এক লাখ টাকা। পাঁচজন আলোচকের সম্মানী ১০ হাজার টাকা করে মোট ৫০ হাজার টাকা। ২৫০ প্যাকেট নাশতা ২০০ টাকা করে ৫০ হাজার টাকা। ২৫০ প্যাকেট লাঞ্চ ৫০০ টাকা করে এক লাখ ২৫ হাজার টাকা।

বাকি খরচ ডেকোরেশনসহ নানা খাতের দেখানো হয়েছে।

৪. ‘গণ-অভ্যুত্থানের দিশা ও দর্শন’ শীর্ষক সেমিনার। তারিখ : ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫। মোট ব্যয় ৬,৬৫,৫০০ টাকা।

এর মধ্যে ২০০ জন অংশগ্রহণকারীর ভাতা ১০০০ টাকা করে মোট দুই লাখ টাকা। এই তালিকায়ও ভাতার সঙ্গে অংশগ্রহণকারীদের ‘ট্রেনিংসামগ্রী প্রাপ্তি’ নামের ঘর করে সেখানে ‘ফোল্ডার, কলম, নোটবুক ইত্যাদি’ দেওয়া হয়েছে বলা আছে। ১০ টাকার রাজস্ব স্ট্যাম্প এখানেও আছে।

আরো হিসাব দেখানো হয়েছে—ঢাকার বাইরে থেকে আসা ২৫ জন অংশগ্রহণকারীর যাতায়াত ভাতা ২০০০ টাকা করে ৫০,০০০ টাকা। পাঁচজন আলোচকের সম্মানি ১০,০০০ টাকা করে ৫০,০০০ টাকা। ২৫০ প্যাকেট নাশতা ২০০ টাকা করে ৫০,০০০ টাকা।  ২৫০ প্যাকেট লাঞ্চ ৫০০ টাকা করে এক লাখ ২৫ হাজার টাকা।

বাকি খরচ ডেকোরেশনসহ নানা খাতের।

এভাবে চারটি অনুষ্ঠান বাবদ মোট প্রায় ২৪ লাখ টাকা খরচ দেখানো হয়েছে।

সাংবাদিকরা বিস্মিত : পিআইবির নথিগুলো ঘেঁটে দেখা যায়, চারটি অনুষ্ঠানেরই আলাদা করে খরচের খাত দেখানো হয়েছে। প্রথমে অনুষ্ঠানের দিন পনেরো আগে প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র রিসার্চ অফিসার ও সমন্বয়কারী গোলাম মুর্শেদ নিজে স্বাক্ষর করে খরচের হিসাব মহাপরিচালক বরাবর দাখিল করেছেন। পরে মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ ওই দিনই হিসাবের নথিতে নিজে স্বাক্ষর করে দিয়েছেন। এরপর প্রতিটি খাতের খরচের বিপরীতে ভাউচার দাখিল করা হয়েছে, যার প্রতিটি পাতায় গোলাম মুর্শেদের স্বাক্ষর রয়েছে। পাকা হিসাব, এতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। কিন্তু নথি ঘাঁটতে গিয়ে আমাদের চোখ আটকে যায় একটি নামে। ১৯ ফেব্রুয়ারির সেমিনারে উপস্থিত থেকে এক হাজার টাকা ভাতা নিয়েছেন এস এম আজাদ, কালের কণ্ঠ, ঢাকা। কিন্তু আমাদের জানা আছে, কালের কণ্ঠের সিনিয়র রিপোর্টার ও ক্রাইম বিভাগের সাবেক ইনচার্জ এস এম আজাদ ২০২২ সালে চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে পর্তুগালে চলে গেছেন এবং সেখানেই আছেন। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে সব শুনে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, আমি মাসখানেক হলো দেশে এসেছি। গত বছর পিআইবির সেমিনারে যাওয়া বা ভাতা নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। গত শনিবার তিনি সশরীরে কালের কণ্ঠের অফিসে এসে দেখেন, পিআইবির তালিকায় তাঁর নামে ভাতা তোলার যে স্বাক্ষর দেওয়া, সেটি তাঁর নয়, ভুয়া স্বাক্ষর। এই ঘটনার পর কালের কণ্ঠ ব্যাপক অনুসন্ধানে নামে। দুটি সেমিনারে ২০০ জন করে যে ৪০০ জনকে মোট চার লাখ টাকা ভাতা দেওয়া হয়েছে বলে পিআইবি বিল করেছে, সেই তালিকার বেশির ভাগই ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনার সাংবাদিক। তাঁদের মধ্যে অন্তত ৭০ জনকে ফোন করে জানতে চাওয়া হয়। প্রত্যেকেই বলেন, এ রকম কোনো সেমিনারের কথা তাঁরা জানেনই না; উপস্থিত থাকা বা ভাতা নেওয়া দূরের কথা। তালিকায় থাকা তাঁদের স্বাক্ষরের ছবি তুলে পাঠানো হলে প্রত্যেকেই নাকচ করে দেন; কেউ কেউ নিজেদের প্রকৃত স্বাক্ষরের নমুনা পাঠিয়ে দেন, যাতে পিআইবির স্বাক্ষর জালিয়াতির প্রমাণ স্পষ্ট।

তালিকায় থাকা ঢাকা পোস্টের সিনিয়র রিপোর্টার জসিম উদ্দিন মাহির বলেন, ‘আমি এমন কোনো সেমিনারে অংশ নিইনি। কোনো ভাতাও তুলিনি। নথিতে যে স্বাক্ষর আছে, সেটি আমার নয়।’

দ্য ডেইলি স্টারের সাংবাদিক জামিল খান বলেন, ‘আমার নাম ব্যবহার করে কে বা কারা এই কাজ করেছে, জানি না। আমি ওই সেমিনারে যাইনি, স্বাক্ষরও করিনি।’

তালিকায় থাকা দৈনিক জনকণ্ঠের সাংবাদিক ফজলুর রহমান বলেন, ‘এভাবে আমার নাম ব্যবহার করে জালিয়াতি করা হয়েছে। এটা আমার জন্য অসম্মানের।’

খুলনার সাংবাদিক শামসুজ্জামান শাহীন নিজের স্বাক্ষরের নমুনা পাঠিয়ে বলেন, ‘ভুয়া স্বাক্ষর। আমি ওই সেমিনারের কথা জানিও না।’ তাঁর কাছে খুলনার আরো আটজন সাংবাদিকের নাম-স্বাক্ষর পাঠালে তিনি খোঁজ নিয়ে জানান, এখানকার কেউ ওই সেমিনারে যাননি। সব ভুয়া। 

আলোচকরা অবাক : পিআইবির কথিত সেমিনারের বিলে নাম ও স্বাক্ষর থাকা ‘শহীদুল্লাহ লিপন’ নামে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো শিক্ষক নেই বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সহিদ উল্যাহর ডাকনাম লিপন। ‍তিনি বিভিন্ন সময় পিআইবির অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে থাকেন। তাঁকে বিষয়টি জানানো হলে তিনি যেন আকাশ থেকে পড়েন। কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গত বছর কোনো সেমিনারেই অংশ নিইনি। এমনকি গত তিন-চার বছরেও পিআইবিতে আমার যাওয়া হয়নি। এ ধরনের দুর্নীতি ও জালিয়াতির পেছনে কারা, তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’ এ ছাড়া অধ্যাপক সহিদ উল্যাহর স্বাক্ষরের সঙ্গে পিআইবির নথিতে পাওয়া স্বাক্ষরের কোনো মিল পাওয়া যায়নি।

আমাদের অনুসন্ধানে পিআইবির তালিকা মতে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে খান মোহাম্মদ বাহাদুর নামে কোনো শিক্ষকের নাম পাওয়া যায়নি। ড. নেওয়াজ মোহাম্মদ বাহাদুর নামে একজন শিক্ষক আছেন, যিনি রসায়নবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, পিআইবির কোনো অনুষ্ঠানে এযাবৎকালে অংশগ্রহণ করেননি। এ ধরনের কোনো সেমিনারের কথা তিনি জানেনও না; আমন্ত্রণও কখনো পাননি।

নাম থাকা আরেকজন শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, ‘গত বছর ফেব্রুয়ারি মাসে পিআইবির কোনো সেমিনারে যোগ দেওয়ার কথা মনে পড়ছে না। সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরের দিকে মফস্বলের সাংবাদিকদের একটি কর্মশালায় অংশ নিয়েছিলাম। কিন্তু জুলাই ইস্যুতে পিআইবিতে কোনো অনুষ্ঠানে গিয়েছি—এমন কথা মনে পড়ে না।’

অথচ দুটি সেমিনারের নামে ১০ জন আলোচককে ১০ হাজার করে মোট এক লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছে পিআইবি।

ভাউচারে ভুয়ামি : আলোকচিত্র ও গ্রাফিতি বাঁধাইয়ের জন্য বিল ধরা হয় ৬০ হাজার টাকা। এর মধ্যে আল-আমীন আর্ট গ্যালারির নামে ৯ ফেব্রুয়ারি ১০০টি বাঁধাইয়ে ২০ হাজার টাকা এবং ১১ ফেব্রুারির বিলেও সমপরিমাণ ছবি বাঁধাই ও ব্যয় ধরা হয়েছে। বিস্ময়কর হলো, দুটি বিলেই মেমো নম্বর একই—২৮১।

এই বিলের সূত্র ধরে গত শনিবার সকালে ৩৬ পুরানা পল্টনের ঠিকানায় যাই। মাস তিনেক আগে ওই প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন হয়ে এখন সেটি ‘বিসমিল্লাহ আর্ট গ্যালারি’। তবে মালিক ও কর্মচারী একই।

নাঈম নামের একজন কর্মচারীকে বিলটি দেখালে তিনি কিছুক্ষণ ভাবেন। এরপর বলেন, ‘গত দুই-তিন বছরের মধ্যে কেউ এতগুলো ছবি বাঁধাই করেছে, এমন কিছু তো মনে পড়ছে না। এ ছাড়া বিলের হাতের লেখাও এখানকার কারো না।’

প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার (নাম প্রকাশ করতে অনিচ্ছুক) বলেন, অনেকে একটি বা দুটি ছবি বাঁধাই করে একটি খালি ভাউচার চেয়ে অনুরোধ করেন। সম্ভবত খালি ভাউচার নিয়ে তাঁরা নিজেরা ইচ্ছামতো লিখে নিয়েছেন।

একই ঠিকানায় আরেকটি প্রতিষ্ঠান সোহেল ফ্রেম গ্যালারির নামে ২০২৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি (মেমো নম্বর-১৩৮৮) ২০ হাজার টাকার বিল। তবে ওই ঠিকানায় নেই প্রতিষ্ঠানটি। খুঁজে খুঁজে নতুন ঠিকানা—১১ নম্বর পুরানা পল্টনের ইব্রাহিম ম্যানশনের নিচতলায় ৩৩ নম্বর দোকানটিতে যাই। বিলটি দেখালে মো. সোহেল রানা বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাকান। এরপর হেসে উঠে বলেন, ‘ভাই, আমার হাতের লেখা এত সুন্দর!’ সোহেল রানা বলেন, এই লেখার সঙ্গে তাঁদের ম্যানেজার সাব্বির স্যারের লেখারও মিল নেই। এটি ভুয়া।

‘তারুণ্যের উৎসব’ শীর্ষক অনুষ্ঠানের নামে তিনটি ভাউচার তৈরি করা হয় ‘দ্য নিউ নূর অ্যান্ড কোং ডেকোরেটরস’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের প্যাডে। পৃথক তিনটি ভাউচারে ৬০ হাজার, ৩০ হাজার ও ২৫ হাজার টাকার বিল দেখানো হয়েছে। খাত হিসেবে লেখা—ব্যানার, ফেস্টুন, গেট, টেবিল, ফুল দিয়ে সাজসজ্জা ইত্যাদি।

এটি পাওয়া গেল রাজধানীর সেগুনবাগিচায় সুবাস্তু তাজ ভিলার ৯ নম্বর দোকানে। কিন্তু সেখানে ব্যানার-ফেস্টুন তৈরির কোনো যন্ত্রপাতি দেখা গেল না। নেই কম্পিউটার, প্রিন্টিং মেশিন বা ডিজাইন সেটআপ।

দোকানের ম্যানেজার হেলাল মিয়া পিআইবির ভাউচারটি দেখে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ‘প্যাড দেখে মনে হচ্ছে আমাদের, কিন্তু লেখা বা সাইনও আমাদের না।’ তিনটি ভাউচারে কাশেম ও সহিদ নামে দুই স্বাক্ষর রয়েছে। কিন্তু দোকানের বর্তমান ও সাবেক কর্মীদের তালিকা ঘেঁটেও এমন নামের কাউকে পাওয়া গেল না। দোকানের মালিক রাজিব আহমেদ বলেন, ‘অনেক সময় দেখা যায়, কাজ শেষে কেউ খালি ভাউচার চায়। বলে, অন্য খরচ সমন্বয় করবে। ব্যবসার খাতিরে দিতে হয়। হয়তো কোনো সময় ভাউচার নিয়ে পরে নিজেরা কপি করেছে। কিন্তু গত দুই-তিন বছরে পিআইবির সঙ্গে আমরা কোনো কাজ করিনি।’ আরো বিস্ময়কর বিষয় হলো, কিছু ভাউচারে একই সঙ্গে লাইটিং ও ব্যানার-ফেস্টুনের কাজ দেখানো হয়েছে। অথচ সংশ্লিষ্ট দুই দোকানই স্পষ্ট জানায়, তারা ব্যানার-ফেস্টুন বানায় না।

আসলটা লাল, পিআইবিরটা কালো : রাজধানীর শান্তিনগর বাজার রোড এলাকার ‘বিসমিল্লাহ রেস্তোরাঁ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের প্যাডে দুটি বিল করা। প্রতিটিতে ৫০০ টাকা দামের লাঞ্চ প্যাকেট ২৫০টি; মোট এক লাখ ২৫ হাজার টাকা। দুই বিলে আড়াই লাখ টাকা। ভাউচারে খাবারের ধরন উল্লেখ নেই; শুধু ‘লাঞ্চ প্যাকেট’ লেখা। সরেজমিনে গিয়ে দোকানের পুরনো হিসাবপত্র খতিয়ে দেখা হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ওই সময়ে তাঁরা পিআইবি থেকে এমন কোনো বড় অর্ডার পাননি। দোকানের কর্মচারীরা বলেন, বড় অনুষ্ঠানে সাধারণত চিকেন বিরিয়ানি দেওয়া হয়, যার দাম ১৫০ থেকে ১৭০ টাকা। সাদা ভাত, গরুর মাংস, ডাল-সবজি নিলে সর্বোচ্চ ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা। ৫০০ টাকার প্যাকেট আমাদের এখানে নেই। এক কর্মচারী বলেন, ‘২৫০ জনের অনুষ্ঠানে ৫০০ টাকা দরের প্যাকেট এই প্রথম শুনলাম। এখানে বসে খেলে ৫০০ টাকা হতে পারে, কিন্তু প্যাকেট হিসেবে খুবই অস্বাভাবিক।’

এই হোটেলের ব্যবহৃত একটি ভাউচার সংগ্রহ করা হয়। সেটি হালকা লাল রঙের। কিন্তু পিআইবির জমা দেওয়া ভাউচারটি সাদাকালো। দোকানের অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের বেশির ভাগ বিল মেশিনে হয়। হাতে লিখলে নির্দিষ্ট ফরম্যাট আছে। সেটার সঙ্গে পিআইবিরটার কোনো মিল নেই। সাইনও জাল।’

তাঁর মতে, ‘কোনো একসময় হয়তো খালি ভাউচার নিয়ে ফটোকপি করে তারপর নিজেরা লিখে ব্যবহার করেছে।’

কথিত দুটি সেমিনারেই সকালের নাশতার বিল দেখানো হয় হক ব্রেড অ্যান্ড কনফেকশনারির নামে। রাজধানীর শান্তিনগর চৌরাস্তায় ১২৮ নিউ কাকরাইল রোডে এই বেকারিতে গত রবিবার বিকেলে সরেজমিনে গিয়ে ম্যানেজারকে মেমো দুটি দেখালে তিনি বলেন, তাঁদের হাতের লেখা মিলছে না। এমনকি ২০০ টাকা দামের ৫০০টি প্যাকেজ গত বছর তাঁদের বিক্রি হয়েছে কি না, তাও মনে পড়ছে না।

এভাবে পিআইবির তারুণ্যের উৎসব বা সেমিনারের নামে যতগুলো বিল-ভাউচার আমাদের হাতে আছে; তার রেশির ভাগই আমরা সরেজমিনে যাচাই করেছি। প্রতিটি ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট দোকানের হিসাব খাতায় পিআইবির সঙ্গে লেনদেনের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

ফেসবুক পেজে সেমিনার নেই : পিআইবির নিজস্ব ফেসবুক পেজে তাদের সব কর্মসূচির ছবি, ভিডিও নিয়মিত প্রকাশ করে। ১৮-১৯ ফেব্রুয়ারির তারুণ্যের উৎসব-২০২৫-এর উদ্বোধনী ও সমাপনী অনুষ্ঠানের ছবি ফেসবুক পেজে শেয়ার করলেও ৪০০ জন অংশগ্রহণকারী নিয়ে করা দুটি সেমিনারের কোনো ছবি, ভিডিও তাদের পেজে শেয়ার করা নেই। অথচ ওই বছর ১২ ফেব্রুয়ারি পিআইবির সেমিনারকক্ষে মোবাইল সাংবাদিকতাবিষয়ক প্রশিক্ষণের বিষয়টিও এখানে আছে। কিন্তু ওই দুটি সেমিনারবিষয়ক কোনো প্রেস রিলিজ নেই, গণমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এ ধরনের কোনো তথ্য নেই। পিআইবির ওয়েবসাইট ঘেঁটেও ওই দুটি সেমিনারের তথ্য পাওয়া যায়নি।

এত জায়গা কই?

চারটি অনুষ্ঠানের মধ্যে শুধু সংগীতসন্ধ্যার স্থান লেখা হয়েছে পিআইবি অডিটরিয়ামে। বাকি তিনটির বেলায় পিআইবিতে লেখা হলেও সুনির্দিষ্ট করে স্থানের নাম বলা হয়নি। সরেজমিনে পিআইবির দুটি ভবন ঘুরে দেখা যায়, ১ নং ভবনে ২৩৮ আসনবিশিষ্ট একটি অডিটরিয়াম এবং ৬০ আসনবিশিষ্ট একটি সেমিনারকক্ষ রয়েছে। ২ নং ভবনে ৬০ আসনবিশিষ্ট একটি সেমিনারকক্ষ এবং ৩০ আসনবিশিষ্ট দুটি শ্রেণিকক্ষ রয়েছে। তাই তারুণ্যের উৎসব চলাকালে একসঙ্গে ২০০ জন নিয়ে সেমিনার করার মতো কক্ষ নেই।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পিআইবির এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তারুণ্যের উৎসব চলার সময় ওই দুই দিনে অন্য কোনো সেমিনার হয়নি।’

গোলাম মুর্শেদের ভাষ্য : কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানী টিম বক্তব্য নেওয়ার জন্য গোলাম মুর্শেদসহ পিআইবির অন্য কর্মকর্তাদের মুখোমুখি হলে প্রথমে তাঁরা জোর গলায় সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। কিন্তু কালের কণ্ঠের টিমের কাছে থাকা সব নথি-প্রমাণ একের পর এক তুলে ধরলে এক পর্যায়ে গোলাম মুর্শেদ ঘাবড়ে যান এবং সব অপকর্মের কথা স্বীকার করেন। অকপটে তিনি বলতে থাকেন, পিআইবির ডিজি ফারুক ওয়াসিফের নির্দেশেই তিনি এসব করতে বাধ্য হয়েছেন (এই কর্মকর্তার বিস্তারিত স্বীকারোক্তি সাইড স্টোরিতে)।

ফারুক ওয়াসিফ বললেন : প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ-পিআইবির মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফকে গতরাতে একাধিকবার ফোন করা হলে একবার তিনি ধরেন। অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের একটি বিল পিআইবির একটি দুষ্টচক্র তৈরি করেছিল; কিন্তু আমি সেটিকে অনুমোদন দিইনি। আর এই খাতে কোনো টাকাও খরচ করা হয়নি।’

যদি অনুমোদনই না করেন, তাহলে তিনিসহ পিআইবির ছয়জনের স্বাক্ষর সংবলিত বিল তৈরি করে টাকা উত্তোলন হলো কিভাবে?—এমন প্রশ্নের জবাবে ফারুক ওয়াসিফ বলেন, ‘প্রতিদিন আমাকে অনেক ফাইলে স্বাক্ষর করতে হয়। তাই এ ধরনের একটি ফাইলে স্বাক্ষর করে পরে ভুয়া বিলের বিষয়টি সামনে এলে তা আমি বাতিল করি।’

তাহলে এই বিলের সমপরিমাণ টাকা ব্যাংক থেকে উত্তোলন করা হলো কেন?—এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কোনো খাতে টাকা ব্যয় করতে হলে আমাদের কোনো না কোনো কর্মকর্তার স্বাক্ষরে বিল তোলা হয়। তাই গোলাম মুর্শেদ সাহেবের স্বাক্ষরে মন্ত্রণালয়ের সিনেমা তৈরির একটি বিল তুলে তাদের দিয়ে দেওয়া হয়।’

আপনার নির্দেশেই এই ভুয়া বিল তৈরি হয়েছে এবং সেটা আপনি অনুমোদন দিয়েছেন, যা এর সঙ্গে সম্পৃক্ত কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন—বলা হলে ফারুক ওয়াসিফ বলেন, ‘এমন কথার কোনো ভিত্তি নেই, এটা মিথ্যা। আমি বরং ভুয়া বিলের ফাইলের অনুমোদন বাতিল করেছি। আমাকে জড়িয়ে যে তথ্য দেওয়া হচ্ছে, সেটা সঠিক নয়। পিআইবির একটি চক্র আমাদের কাজকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে এমন রিউমার ছড়িয়ে যাচ্ছে।’ (ফারুক ওয়াসিফের বক্তব্যের বিস্তারিত সাইড স্টোরিতে)।

ডাহা মিথ্যাচার  : পিআইবির ডিজি ফারুক ওয়াসিফ দুর্নীতির অভিযোগ মিথ্যা দাবি করলেও কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, পিআইবির কর্মকর্তারা চারটি অনুষ্ঠানের নামে তৈরি করা বিল আগেই পরিশোধ দেখিয়ে ২০২৫ সালের জুন মাসে বিলগুলো পাস করেন। পরবর্তী সময়ে পিআইবির ‘সম্পাদক নিরীক্ষা’ নামে সোনালী ব্যাংক ভিকারুননিসা নূন স্কুল শাখা, ঢাকা থেকে চারটি চেকে ২৩ লাখ ৯৭ হাজার ৫০০ টাকা উত্তোলন করেন গোলাম মুর্শেদ।

অনুসন্ধানে জানা যায়, পিআইবির ‘সম্পাদক নিরীক্ষা’ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট (১৬৩৫০০১০০০৪৬৭) থেকে ২৯ জুন দুটি এবং ৩০ জুন দুটি চেকের মাধ্যমে এই টাকা উত্তোলন করা হয়। ওই ব্যাংকের চারটি চেকে যথাক্রমে ছয় লাখ ৯১ হাজার ৫০০ টাকা, চার লাখ ৬৭ হাজার ৫০০ টাকা, ছয় লাখ ৬৫ হাজার ৫০০ টাকা এবং পাঁচ লাখ ৭৩ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়। এই টাকার অঙ্ক পিআইবির বিতর্কিত চারটি অনুষ্ঠান উপলক্ষে অনুমোদিত বিলে উল্লেখিত টাকার অঙ্কের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।